আমাদের ক্রিকেট সংস্কৃতি ও একজন মাশরাফি !

মাশরাফি বিন মুর্তজা

মাশরাফি বিন মুর্তজা’র যখন ডেব্যু হয় তখন আমি স্কুলে পড়ি। বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়েছে বেশিদিন হয়নি। ক্রিকেটের খবর রাখি আরও আগে থেকে। সেই সময়ে আমার কাছে মনে হয়েছিল বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস যতটা না মাঠের সাফল্য তার চেয়ে অনেক বেশি কূটনৈতিক সাফল্য। সাবের হোসের এর ট্যাকটিকস, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট সার্কিটে সাউথ এশিয়ান জোট, সাথে বাংলাদেশের শুভাকাঙ্ক্ষী আইসিসির সাবেক প্রেসিডেন্ট জাগমোহন ডালমিয়ার লবিং। সব মিলিয়ে প্রাপ্তি আমাদের টেস্ট স্ট্যাটাস। মাঠের বাইরের কূটনীতিতে অবস্থান শক্ত। তবে মাঠের পারফর্মেন্সে কূটনীতি দিয়ে লাভ হয় না। ফার্স্ট জেনারেশন টেস্ট ক্রিকেটাররা অন্তত ইজ্জত বাঁচানোর মত পারফর্ম করবে যতদিন না কিছু কোয়ালিটি প্লেয়ার হাল না ধরে।

নাফিস ইকবালের নেতৃত্বাধীন অনুর্ধ ১৯ তখন অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড সহ অন্যান্য অনুর্ধ ১৯ দলের বিপক্ষে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আমরা সমর্থকরা অপেক্ষায় আছি। এরা জাতীয়দলে এলে ফাটিয়ে দিবে। নাফিস ইকবালের মাঝে অনেকেই তখন ভবিষ্যতের অধিনায়কের ছায়া দেখতেন। কিন্তু যেই লাউ, সেই কদুই। ফাটাফাটি কিছুই হয় না। স্বপ্নভঙ্গের ব্যাথার সাথে কেমন যেন অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। মনে মনে অনেক আশা থাকলেও প্রকাশে সংযত। কারন জানি, আশা পুরনের সম্ভাবনা ক্ষীণ। অনূর্ধ্ব ১৯ থেকে জাতীয় দলে আসার আগে যে ফার্স্ট ক্লাস, লিস্ট এ ম্যাচ খেলে অন্যান্য দেশের খেলোয়াড়রা জাতীয় দলে আসত, আমাদের ক্রিকেট স্ট্রাকচারে সেইটার অস্তিত্ব ছিল না। থাকলেও দুর্বল। কূটনীতি দিয়ে তো এই অনস্তিত্ব ঢাকা যায় না।

সেই সময়ে মাশরাফি বিন মুর্তজা’র নাম শোনা যাচ্ছিল। ছেলেটা নাকি দুর্দান্ত গতিতে বল করে। ১৪০/১৪৫ কিলোমিটার রেগুলার স্পিড। এই কথাগুলো পত্রিকার পাতায় আসত অনুমান নির্ভর জবানবন্দির আকারে। অমুক ব্যাটসম্যান বলেছেন এত গতিময় বোলার আগে বাংলাদেশে কখনো আসেনি। স্পিডগান দিয়ে মেপে কেউ দেখেছে যে অ্যাভারেজ স্পিড ১৪০ আর হায়েস্ট স্পিড ১৫০ এমনটা শুনিনি বা পড়িনি পত্রিকার পাতায়। তাহলে কথাটা জোর পেত। জানিনা বিসিবি তখন স্পিডগানের ব্যবস্থা করেছিল কি না। তখন পর্যন্ত ট্রেনিং ক্যাম্পে অ্যান্ডি রবার্টস এর প্রশংসাই সবচেয়ে বড় সনদ। আশার পারদ আরেকটু চড়ে। অ্যান্ডি রবার্টস তো যেন তেন কেউ না। সে যখন বলেছে তখন ভাল কিছুই হবে।

একটা ফাস্ট বোলার কি? কিভাবে তাকে মেইনটেইন করতে হয় সেই সম্পর্কে আমরা অজ্ঞ। সবচেয়ে পরিচিত পেস বোলার তখন পর্যন্ত হাসিবুল হোসেন শান্ত। ‘ইনসুইঙ্গিং ইয়র্কার’ ডেলিভারি টাও যিনি নিজে নিজে শিখেছিলেন, শেখানোর কেউ ছিল না বলে। টেস্ট দলের প্রফেশনালিজম তখনও শিখে উঠি নাই। খেলা চলাকালিন সময়ে ড্রেসিং রুমে বোর্ডের কর্তাব্যক্তিরা আসা যাওয়া করে এই তখনকার সংস্কৃতি। তার কিছুদিন আগে একজন ফিজিও নাম সম্ভবত গ্যাভিন বেঞ্জাফিল্ড, তখনকার সুপারস্টার মেহরাব হোসেন অপির গায়ে হাত তুলেছিল, যার বিরুদ্ধে বোর্ড ব্যবস্থা নেয়নি। উলটা চুক্তির মেয়াদ বাড়ায়। এই যখন অবস্থা তখন কোন ফার্স্ট ক্লাস না খেলেই আন্তর্জাতিক অভিষেক সরাসরি টেস্টে। ২০০১ এর শেষ দিকে।

তুলনা করার জন্য আরেকজন ফাস্ট বোলার এর উদাহরণ দেই।
গ্লেন ম্যাকগ্রা- অস্ট্রেলিয়ান পেসার সাড়ে ছয় ফুট শরীর নিয়ে খেলেছেন ৩৭ বছর অব্দি। জাতীয় দলকে সার্ভিস দিয়েছেন প্রায় ১৪ বছর। দলের অধিনায়ক সবসময় তাকে প্লেস করতেন ফাইন লেগ, থার্ডম্যান, লং অফ বা লং অনে। যেখানে দৌড়াতে হয় কম। ঝুঁকিপুর্ন ফিল্ডিং করেছেন এমন ঘটনা বিরল। আউটফিল্ডে বলের পিছনে দৌড় দিয়েছেন সেখানেও বাউন্ডারির কাছে গিয়ে স্লো হতেন যেন বিজ্ঞাপনের বোর্ডের সাথে ধাক্কা না লাগে। লাইন লেংথ নিজের সেরা অস্ত্র এইটা শুরুতেই বুঝে অতিরিক্ত গতির দিকে নজর দেন নাই। নিয়ন্ত্রিত পেসে বল করে গেছেন। ফলে মোটামুটি ইনজুরি ছারাই স্মুদ একটা ক্যারিয়ার পার করেছে। এই সব কিছু ম্যাকগ্রা একা একাই শিখে নাই। ম্যাকগ্রার ডেব্যু ম্যাচে সিনিয়র ফাস্ট বোলিং পার্টনার ছিলেন ক্রেইগ ম্যাকডারমট, পল রাইফেলের মত বোলার। মার্ভ হিউজও তখন খেলার মাঝেই ছিলেন। ডেনিস লিলি, ফেফ থম্পসন এর মত গ্রেট ফাস্ট বোলার সামলিয়েছে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ড। সুতরাং তারা জানত কিভাবে একটা ফাস্ট বোলার সামলাতে হয়। আমাদের সুযোগ ছিল যেই জ্ঞান তারা এত বছরে অর্জন করেছে তা আত্তীকরণ করার। দেখেই শিখতে পারতাম। ঠেকে শিখার দরকার ছিল না।

আর আমাদের মাশরাফির সাথে বোলিং ওপেন করেছেন স্পিনার মানজারুল ইসলাম। একই ম্যাচে টেস্টে অভিষিক্ত হন বর্তমান ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ সুজন। সুজনের স্লো মিডিয়াম পেস বলের গতির তুলনা হয় আফ্রিদি বা অনিল কুম্বলের কুইকার ডেলিভারির সাথে। অভিষেকে মাশরাফি ৩২ ওভার বল করে পান ৪ উইকেট। লংগার ভার্শনের কোন ম্যাচ না খেলা এই শরীর এক ইনিংসে তিন/চার স্পেলে সারাদিনে ৩২ ওভার বল করার উপযুক্ত কি না তা কেউ ভাবেনি।

মাশরাফি বিন মুর্তজা
দেবব্রত মুখোপাধ্যায় এর মাশরাফি বিন মুর্তজা’র জীবনী বই “মাশরাফি”

BUY NOW

ব্যাপারটা অনেকটা এরকম যে নজাতক বাচ্চাকে ডায়াপার পরিয়ে সুন্দর মুখ দেখে সবাই আদর করছে। ওইদিকে ডায়াপার যে পাল্টাতে হবে, ঠিকমতো খাওয়াতে হবে এইদিকে কারও খেয়াল নেই। সবাই বাচ্চার কিউটনেস নিয়া বিজি।

কিছুদিন পরে নিউজিল্যান্ড সফর। সেখানেও ক্যাপ্টেন খালেদ মাসুদ মাশরাফিকে দিয়ে টানা স্পেলে বল করালেন। যেই ম্যাচে শেন বন্ড দুই ইনিংসে বল করেছিলে ২৮ ওভার, মাশরাফি বিন মুর্তজা এক ইনিংসে বল করেছিলেন ২৭ ওভার। সোনার ডিম পারা রাজহাঁস এর সবগুলো ডিম আমাদের একসাথে চাই। দেশের দৈনিক পত্রিকাগুলো তখন ‘বিস্ময়বালক মাশরাফি’ টাইপ হেডলাইন এর আবিস্কার নিয়ে ব্যস্ত। তার পরপরই ইনজুরি। সেই সময়ে একটা ছবি দেখেছিলাম এক বহুল প্রচারিত দৈনিকের সাপ্তাহিক ক্রীড়া সাময়িকীতে। কোন পার্কে ঘুরতে গিয়ে মাশরাফির কাঁধের উপর সোজা হয়ে দাড়িয়ে আছে মোহাম্মদ আশরাফুল। ছবি হিসেবে দুর্দান্ত অ্যাক্রোবেটিক। তবে কেউ ভাবেনি এইটা মাশরাফির ফিটনেসের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। দলে তখন হাবিবুল বাশার, আমিনুল ইসলাম, খালেদ মাসুদ, খালেদ মাহমুদ এর মত সিনিয়র। এনাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। সমস্যা গোড়ায়। ফাস্ট বোলারদের পরিচর্যা করার সংস্কৃতিই গড়ে উঠেনি। অনেক পরে আবিস্কার হয়েছে মাশরাফির শুরুর দিকের বোলিং অ্যাকশন পায়ে প্রচন্ড চাপ ফেলত। ল্যান্ডিং টা স্মুদ ছিল না। তখন কর্তা ব্যক্তিরা কেউ খেয়াল করেননি। খেয়াল করতে পারে এমন কাউকে যোগারও করেননি। গতির সাথে সমঝোতা করে অ্যাকশন পালটে অপারেশন থিয়েটারে বার বার আনাগোনা করে মাশরাফি এখনও চলছেন।

মাশরাফি বিন মুর্তজা কে দেখে দধীচি মুনির কথা মনে হয়। আত্মবিসর্জন দিয়ে সে যেমন স্বর্গ ফিরে পেতে সাহায্য করেছিল দেবতাদের, মাশরাফিও তেমনি নিজের সম্ভাবনার অনেকটুকু বিসর্জন দিয়ে একটা ক্রিকেট সংস্কৃতি তৈরি করে দিচ্ছে আমাদের। দলের ট্রেনার, ফিজিওর পাশাপাশি ফাস্ট বোলারদের টেককেয়ার করতে মাশরাফির উপস্থিতি এক টনিক। যার নিজের শরীরটাই ‘হাউ টু প্লে উইদ ইনজুরি’ এর কেস স্টাডি।

মাশরাফি বিন মুর্তজা’র অভিষেক সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে চট্টগ্রামে জিম্বাবুয়ে ১১ রানের লক্ষে ব্যাট করছে দ্বিতীয় ইনিংসে। প্রথম ইনিংসে ৫৪২ রান করা জিম্বাবুয়েকে দ্বিতীয়বার ব্য্যাট করতে নামানোটাই বলার মত সফলতা। ১১ রান ডিফেন্ড করার কোন আশাই নেই। এমন সময়ে বল হাতে প্রথম ওভারে তৃতীয় বলে উপরে ফেললেন ডিওন ইব্রাহীম এর স্ট্যাম্প। প্রতিপক্ষ ওপেনারের স্ট্যাম্প ডিগবাজি খেয়েছে এমন দৃশ্য তখনও আমাদের জন্য বিরলতম। একই ওভারের শেষ বলে কার্লাইলকে স্লিপে ক্যাচ বানালেন। মোটাসোটা শরীরের আকরাম বেশ দক্ষতায় ধরলেন সেই ক্যাচ। ইনিংসে হার এর চেয়ে ৮ উইকেটে হার আমাদের তখনকার সম্মানজনক পরাজয়ের একটা ক্লাসিক উদাহরণ। মাইক্রোফোনে ধরা পরা স্ট্যাম্প ডিগবাজির সেই শব্দ আমার কাছে মাশরাফির অমলিন স্মৃতি।

তার কিছুদিন পরেই ক্রাচে ভর দিয়ে দাঁড়ানো মাশরাফির ছবি সহ এক আর্টিকেল। মলিন মুখে মাশরাফি জানাচ্ছিলেন কিভাবে রিহ্যাব করছেন। দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো মানুষের অভাবের কথাও এসেছিল।

আজ মাশরাফির জন্মদিন। সবাই উইশ করছে। ভালবাসা, আবেগ, সম্মান সবই পাচ্ছেন ক্যাপ্টেন। অথচ বাংলা উইকিতে তার ভুক্তিটা আধাখেঁচড়া। কেউ কি আছেন যিনি আমাদের ক্যাপ্টেনকে নিয়ে বাংলা উইকিপিডিয়াতে আরেকটু ডিটেইলে লিখবেন। আবেগ নয়, ফ্যাক্টস অ্যান্ড ফিগার নিয়ে লেখা। ক্যাপ্টেনের জন্মদিনের উপহার হিসেবেই নাহয় লিখলেন।

সংস্কৃতি জিনিসটা গাছ থেকে হঠাত করে পরেনা। এটা গড়ে উঠে। গড়ে উঠতে সময় লাগে। শ্রম লাগে। অনেকের ত্যাগ লাগে। আমাদেরও গড়ে উঠেনি। সেকারনেই সাবেক বোর্ড প্রধানের সামনে নত হতে হয়েছিল সাকিবকে। যেই ঘোষণা আসার কথা নির্বাচকদের থেকে, সেইটা আসে বোর্ড প্রধানের থেকে। ভব্যতার খাতিরে যা বলা উচিত নয়, প্রধান নির্বাচক বলে ফেলেন অমুক আমাদের দূরতম পরিকল্পনার বাইরে। এসব জঞ্জাল একদিনে সৃষ্টি হয়নি, শেষও হবেনা। সময় লাগবে।

আমাদের ক্রিকেট সংস্কৃতির কারিগর হিসেবে এখনও মাশরাফির চেয়ে যোগ্যতর কেউ আসেনি। ৩৩ বছরের জীবনে ভাল আর খারাপ দুটোর সর্বোচ্চ দেখেছেন। ফলে মাশরাফি এক নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করেছেন। যাতে খেলা কম আর দার্শনিকতা বেশি। চাটুকারিতা, প্রশংসা, অপমান যেকোনো কিছুর অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দিয়ে ফোকাসটা ঠিক রাখেন। এমন কারও উপস্থিতি দীর্ঘ হলে তা দেশের ক্রিকেটের জন্যই মঙ্গলময়।

ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের জীবনীমূলক সকল বই কিনতে পারেন এখান থেকে !!

ক্যারিয়ারের সেরা সময়টা ফেলে এসেছেন কি না তা তর্কের বিষয়। কারন অধিনায়ক হিসেবে মাশরাফি বিন মুর্তজা’র এখনও অনেক কিছু দেয়ার আছে। ক্রিকেট বোর্ডগুলি এমন ব্যক্তিত্বকে নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক পরিকল্পনায় কিভাবে কাজে লাগাবে তা ভেবে রাখে। সম্প্রতি ইংল্যান্ড দলে স্ট্রস এর ভুমিকা লক্ষ করা যেতে পারে। বা ভারতীয় বোর্ডে গাঙ্গুলীর ভুমিকা। আরেকটু পিছনে গেলে রানাতুঙ্গার ভূমিকা লক্ষণীয়। এটাও ক্রিকেট সংস্কৃতিরই অংশ। সেই দিকে আমাদের কি প্রস্তুতি? নাকি সেখানেও মাশরাফিই নতুন করে শুরু করবেন? ক্রিকেট প্রশাসনের সংস্কৃতির মেন্টর হিসেবে? আগেভাগে পরিকল্পনা করে রাখা ম্যাচুরিটির লক্ষন। ততখানি ম্যাচিউর না হলে একজন মাশরাফির অপেক্ষা ছাড়া বিকল্প কি? মাশরাফি এখানে ব্যক্তি।

 

আরও পড়ুনঃ

হুমায়ূন আহমেদ ও তাঁর অটোগ্রাফ কাহিনি

হুমায়ূন আহমেদ এর শ্রেষ্ঠ ১০০ বইয়ের উৎসর্গ পত্র !

দুনিয়া মাতানো যে ১০ বই অবশ্যই পড়া উচিত !

rokomari

rokomari

Published 29 Jan 2018
Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png