বাঙালি সমাজ ও সাহিত্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার উন্মেষ (পর্ব-২)

বাঙ্গলি সমাজ ও সাহিত্য

ইতিহাসের পাতায় দৃষ্টি মেললে দেখা যায়, চৌদ্দ শতক থেকে এই অঞ্চলের ধর্ম ও সমাজচিন্তার ক্ষেত্রে বিদ্যমান রক্ষণশীলতার পাশে এক আধ্যাত্মিক মানবতাবাদী ও সমন্বয়ধর্মী এবং পরম সহিষ্ণুতার ধারার উন্মেষ ঘটেছিল, তা অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের বাঙালির জীবনযাত্রায় প্রতিফলিত হয়।

বঙ্গদেশে মুসলমানদের আগমনের ফলে হিন্দু সমাজে গভীর আধ্যাত্মিক চেতনার উন্মেষ ঘটে। ইসলামের প্রভাবকে মোকাবেলা করার জন্য হিন্দু সংস্কারকগণ ভক্তিবাদের প্রচলন ঘটান। এই ভক্তিবাদকে তৎকালীন যুগের মুসলিম সুফি-সাধকদের মানবতাবাদী অতীন্দ্রিয়বাদের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য লিখেছেন :

এই সমন্বয়-কার্যে মধ্যযুগের সাধকগণ রামানন্দ, কবীর, দাদু, রামদাস, নানক, চৈতন্য বিশেসভাবে সহায়তা করিয়াছেন। এই-সব সাধক জাতিতে জাতিতে, ধর্মে ধর্মে বিভেদ মূর্খতার পরিচায়ক এবং ঈশ্বরে ভক্তিই সকল ধর্মের মূলতত্ত¡ বলিয়া প্রচার করিয়াছেন। ইঁহাদের প্রচারে ভারতে মধ্যযুগে এক অভিনব ভক্তিবাদের জন্ম হইয়াছে।

ইসলামি চিন্তাধারায় এই মরমি ভাবধারার প্রচলন করেছিলেন শেখ সাদী, হাফিজ, জালালুদ্দিন রুমী প্রমুখ পারসিক সুফি-সাধকগণ। মধ্যযুগের প্রাক্কালে চণ্ডীদাসের মানবমহিমার জয়গান অসাম্প্র্রদায়িক চেতনা বিস্তারে এক বিরাট মাইলফলক হিসেবে কাজ করে। চৌদ্দ শতকের দিকে রামানন্দ হিন্দুসমাজের ধর্মান্ধতা ও জাতিভেদ প্রথার বিপরীতে এক নতুন ধর্মীয় গোষ্ঠী গড়ে তোলেন, যার মূলে ছিল ভক্তিবাদ। রামানন্দের অনেক মুসলমান শিষ্য ছিলেন, যাদের একজনের নাম শেখ কবীর উদ্দিন মোমিন আনসারী, যিনি সন্ত কবীর নামে খ্যাত। কবীর পেশায় ছিলেন তাঁতি। তিনি হিন্দু ভক্তিবাদের দ্বারা এতটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন যে, তিনি সুফি অতীন্দ্রিয়বাদের সঙ্গে এর সমন্বয় সাধন করে নিজস্ব একটি গোষ্ঠী গড়ে তোলেন। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ কবীরের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। কবীর উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ঈশ্বরপ্রেম প্রচার করেন।
কবীর কোনো প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক ও আচারসর্বস্ব ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি মনে করতেন ঈশ্বরে এক, রাম রহীম যে নামেই তাকে ডাকা হোক না কেন, তিনি তাতেই সাড়া দেন। কবীর হিন্দি ভাষায় অসংখ্য দোঁহা রচনা করেছেন। এসব দোঁহায় তার মনের ভাব স্পষ্টরূপে প্রকাশিত হয়েছে :

সাধো দেখো জগ বৌরানা
সাঁচ কহো তো মারণ ধারৈ
ঝুঁটে জগ পতিয়ানা।
হিন্দু কহত হৈ রাম হমারা
মুসলমান রহিমানা।
আপস মে দোউ লড়ে মরতে হেঁ
মরম কোই নহি জানা \
বহুত মিলে মোহি নেমী ধর্মী,
প্রাতঃ করে অস্নানা।
আতম ছোড়ে পষানৈ পুজৈ,
তিনকা থোথা জ্ঞানা \
পীতল পাথর পূজন লাগৈ,
তীরথ বর্ত্ত ভুলানা।
মালা পহিনে, টোপী পহিনে,
ছাপ তিলক অনুমান \
সাথী শব্দৈ গারত ভুলে,
আতম জ্ঞান ন জানা।
ঘর ঘর মন্ত্র জো দেত ফিরত হৈঁ,
মাঁয়াকে অভিমানা।
গুরুবা সহিত শিষ্য সব বূড়ে,
অন্তকাল পছতানা \
বহুতক দেখা পীর ঔলিয়া,
পঢ়ৈ কিতাব ক‚রানা।
করৈ মুরীদ কবর বতলাঁবৈ,
উনহু খুদা ন জানা।
হিন্দুকী দয়া মেহের তুরকান কী,
দোনোঁ ধরছে ভাগী।
বহ করে জিবহ বহ ঝটকা মারৈঁ,
আগ দোউ ঘর লাগী।
যা বিধি হসত চলত হৈ হমকো
আপ কহাবৈ স্যানা
কহৈঁ কবীর সুনোঁ ভাই সাধো
ইন মেঁ কৌন দিবানা।

কবীরের অগণিত শিষ্যের মধ্যে নানকের (১৪৬৯-১৫৩৯) নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নানক হিন্দুধর্মের সাথে ইসলাম ধর্মের সংযোগ স্থাপন করেছিলেন। তিনি পৌত্তলিকতা ও বর্ণবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না। তার প্রচারিত শিখ ধর্ম ছিল মূলত অহিংসার ধর্ম। কবীর ও নানক প্রবর্তিত ধর্মমত ও আদর্শ সমকালীন হিন্দু ও মুসলমান সমাজে সহনশীলতা, উদারতা এবং অসা চেতানার প্রকাশ ঘটায়।

ষোল শতকে শ্রীচৈতন্যদেব কর্তৃক বৈষ্ণবধর্ম প্রবর্তনের ফলে বাঙালির ভাবজগতে অভাবনীয় পরিবর্তন সাধিত হয়। তিনি ঈশ্বর সাধনা করতে গিয়ে যে প্রেমবিহ্বল ভক্তিরসের বন্যা প্রবাহিত করেছিলেন, তাতে বাংলার জনজীবনে ব্যাপক সাড়া পড়েছিল। শ্রীচৈতন্যদেব হিন্দুধর্মের আচার-অনুষ্ঠানের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি প্রচার করেন যে, একমাত্র প্রেম ও ভক্তি দ্বারা জাতি-ধর্ম-শ্রেণি-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ ‘হরি’ বা ঈশ্বরের সান্নিধ্যলাভ করতে পারে। অনেক মুসলমান চৈতন্যের ভক্তিবাদে আকৃষ্ট হয়ে তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন, এদের একজন ছিলেন যবন হরিদাস। এরপর খ্রিস্টীয় ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে বাংলার জনজীবনে অসাম্প্রদায়িক, উদার, সহনশীল এবং সমন্বয়ধর্মী চিন্তাধারার উন্মেষ ঘটে; যার প্রভাব সঞ্চারিত হয়েছিল সমকালীন অনেক কবির চেতনায়। আবদুল হাকিম ‘নূরনামা’ গ্রন্থে অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকেই হিন্দু-মুসলিম সমন্বয়ধর্মী সংস্কৃতির কথা বলেছেন, বলেছেন বাংলা ভাষার প্রতি তার গভীর ভালোবাসার কথা :

জেই (যেই) দেসে (দেশে) জেই বাক্ষ (বাক্য) কহে নরগণ।
সেই বাক্য বুজে (বুঝে) প্রভু য়্যাপ (আপ) নিরসুন \
সর্ববাক্ষ বুজে প্রভু কিবা হিন্দুয়ানি।
বঙ্গদেশি বাক্ষ কিবা জত (যত) ইতি বানি \…
য়াল্লা খোদা গোসাই সকল তান নাম।
সর্বগুণে নিরঞ্জন প্রভু গুণধাম \…
মারুফতে (মারফতি) ভেদ জার (যার) নাহিক গমন।
হিন্দুর ঐক্ষর (অক্ষর) হিংসে সে সবের গণ \
যে সবে বঙ্গেতে জর্ম্মি (জন্ম) হিংসে বঙ্গবাণী \
সে সব কাহার জর্ম্ম (জন্ম) নির্নএ (নির্ণয়) ন জানি \

মোগল সম্রাট আকবর ছিলেন এক স্বভাবজাত সাধক, যিনি ঈশ্বর ও মানবপ্রেম, পরম সত্যের প্রতি নিষ্ঠা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ইত্যাদিকে গুরুত্ব দিতেন। তিনি ১৫৫৮ সালে ফতেহপুর সিক্রিতে ‘ইবাদতখানা’ স্থাপন করে বিভিন্ন ধর্মের তুলনামূলক আলোচনার সূচনা করেন। তার ‘ইবাদত খানা’য় তিনি হিন্দু, মুসলমান, জৈন, পার্শী, শিখ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্রের সু্পণ্ডিতদের আহ্বান করে এবং বিভিন্ন ধর্মে পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা শুনে এই সত্যে উপনীত হয়েছিলেন যে, সকল ধর্মের সারবস্তু একই। তিনি ‘দীন-ই-ইলাহী’ নামক এক উদার ধর্মব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। কোরআন, হিন্দুধর্ম-শাস্ত্র ও বাইবেলের বিভিন্ন মতবাদের সার-সংকলন করে তিনি এই নতুন ধর্ম প্রবর্তন করেন। পরবর্তীকালে সম্রাট শাহজাহান ও তার পুত্র দারা শিকো এই সমন্বয়বাদী অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করেন। দারা শিকো হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের মধ্যে সমন্বয়ের ব্যাপক প্রচেষ্টা চালান। তার রচিত গ্রন্থগুলি হিন্দু-মুসলিম মিলনের অমূল্য সম্পদরূপে যুগে যুগে টিকে থাকবে। দারা ছিলেন সুফি ধর্মমতের অনুসারী। সুফি-শাস্ত্র পাঠ করে তার মধ্যে এই বিশ্বাস জন্মেছিল যে, সত্য কোনো বিশেষ ধর্ম বা ধর্ম-সম্প্রদায়ের নিজস্ব সম্পদ নয়- সকল যুগের সকল ধর্মের মধ্যেই সত্য নিহিত।

আঠারো শতকে শাহ ওয়ালীউল্লাহ (১৭০৩-১৭৬৩) ইসলামের শাস্ত্রীয় আইন ও সুফি-সাধকদের প্রবর্তিত চেতনাধারাকে পরস্পর সম্পর্কিত বলে মত প্রকাশ করেন। শাহ ওয়ালীউল্লাহ যেমন মুসলমানদের, রাজা রামহোন রায় (১৭৭৪-১৮৩৩) তেমনি হিন্দুদের মানসভুবনে নবচেতনার উন্মেষ ঘটান। এর ফলে বাঙালির ভাবজগতের ঐতিহ্যে নবচিন্তার প্রতিফলন ঘটে। এতে মানুষের ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে যুক্তির ব্যবহার লক্ষিত হয়। ঐ সময় পল্লি অঞ্চলে কিছুসংখ্যক সমন্বয়ধর্মী ধর্মীয় গোষ্ঠী গড়ে ওঠে, যার অনুসারী ছিল হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়, ভারতের উত্তর প্রদেশের সৎনামী ও বাংলার বাউল সম্প্রদায়ের কথা। বাউলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন লালন শাহ (১৭৬৮-১৮৯৪)। তিনি ছিলেন অসম্প্রদায়িক চেতনার মূর্ত প্রতীক :

লালন জাতিতে জাতিতে ও ধর্মে ধর্মে কোন পার্থক্য দেখেন নাই, হিন্দু ও মুসলমানের ধর্মে কোনো বিভেদ বোঝেন নাই। তিনি আল্লাকে ‘অধোরকালা’ এবং মহম্মদ ও চৈতন্যদেব উভয়কেই সমানভাবে ঐশীশক্তি দ্বারা অনুপ্রাণিত মানবশ্রেষ্ঠ বলিয়া মনে করিয়াছেন। তাঁহারাই মানুষের উদ্ধারের জন্য ধরাধামে অবতীর্ণ হইয়াছেন। তাঁহাদের মধ্যেই ভগবানের পূর্ণ-প্রকাশ হইয়াছে।

জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের উর্ধ্বে উঠে তিনি অসম্প্রদায়িক চেতনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। ধর্ম ও মতপার্থক্য সবকিছুর উপরে তিনি মানবতার জয়গান গেয়েছেন :

সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে।
লালন কয়, জেতের কি রূপ, দেখলাম না এ নজরে \
ছুন্নত দিলে হয় মুসলমান,
নারীলোকের কী হয় বিধান?
বামন যিনি পৈতার প্রমাণ,
বামনী চিনি কি ধ’রে \
কেউ মালা, কেউ তস্ বি গলায়,
তাইতে কি জাত ভিন্ন বলায়,
যাওয়া কিংবা আসার বেলায়
জেতের চিহ্ন রয় কার রে \
গর্তে গেলে ক‚পজল কয়,
গঙ্গায় গেলে গঙ্গাজল হয়,
মূলে একজল, সে যে ভিন্ন নয়,
ভিন্ন জানায় পাত্র-অনুসারে \
জগৎ বেড়ে জেতের কথা,
লোকে গৌরব করে যথা তথা,
লালন সে জেতের ফাতা
বিকিয়েছে সাত বাজারে \

লালনের গান ছাড়াও বিভিন্ন লোকসাহিত্যে অসম্প্রদায়িক চেতনার প্রস্ফুটন ঘটেছে। যুগ যুগ ধরে অসম্প্রদায়িক চেতনা লালনকারী বাংলার নিরক্ষর জনগোষ্ঠী নানান বরন গাভীর যেমন একই বরন দুধ দেখেছে, তেমনি জগতের সকল মানুষকে একই মায়ের সন্তান মনে করেছে। ‘মৈমনসিংহ-গীতিকা’তেও লক্ষ করা যায় অসম্প্রদায়িক কবি মনের পরিচয় :

এই সকল পালাগানের শ্রোতা হিন্দু-মুসলমান উভয়েই। হৃদয়ের কোমল বৃত্তিগুলির উপর যে দেবতা হাসিয়া খেলিয়া ফুলশর সন্ধান করিয়া থাকেন, তিনি হিন্দুর পরিকল্পিত হইলেও আদতেই জাতিভেদ স্বীকার করেন না। এই গাথাগুলিতে জাতীয় বিদ্বেষের কণিকামাত্র নেই, সত্য ঘটনা স্বকীয় গৌরবের বেদীর উপর দাঁড়াইয়া স্রোতার অনুরাগ আকর্ষণ করিতেছে।
হিন্দু ও মুসলমান যে বহু শতাব্দীকাল পরস্পরের সহিত প্রীতির সম্পর্কে আবদ্ধ হইয়া বাস করিতেছিলেন, এই গীতিকাগুলিতে তাহার অকাট্য প্রমাণ আছে। দেওয়ান সাহেবদের অত্যাচারের কথা অনেক স্থলেই পাওয়া যাইবে কিন্তু তাহা ‘মুসলমানী অত্যাচার’ বলিয়া অভিহিত করা অন্যায় হইবে। এই অত্যাচার দুর্ব্বলের উপর প্রবলের অত্যাচার, ব্যাভীচারীর ব্যাভীচার – ইহার জন্য কোন রাষ্ট্রীয় নাম দেওয়া যায় না, ইহা হিন্দু-মুসলমানের ধর্ম্ম বা জাতিঘটিত কোন ঘটনা নহে।

অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বে অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বে এদেশের সমাজ জীবনে ধর্মের প্রতি সহনশীল মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। ইংরেজ শাসনামলের আগে এই উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক বা জাতিগত দাঙ্গা-হাঙ্গামা বলতে আমরা যা বুঝি, সেটা ছিল অনুপস্থিত।

ইংরেজ শাসনের প্রভাবে বাঙালি জীবনে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীই বাঙালি সমাজে ব্যাপকভাবে সম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ায়। এ সময় বাঙালি জীবনে সাম্প্রদায়িক সংঘাত দেখে অনেক কবি-সাহিত্যিক মর্মযাতনা ভোগ করেন। ফলে অসম্প্রদায়িকতার বাণীমূর্তি নির্মাণে তারা প্রয়াস চালিয়েছেন। মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৮-১৯১১) ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সমকালীন সমাজব্যবস্থা নিয়ে সাহিত্য-সাধনা করলেও তিনি অসম্প্রদায়িক মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন। “গোজীবন” নামক প্রবন্ধ লিখে তিনি অসম্প্রদায়িক চেতনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। প্রথম মহাযুদ্ধের পর খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাঙালি সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এ সময় নজরুলের আবির্ভাব মুসলমান সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্রাঘাত হেনে এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলোক সঞ্চার করতে বলেছিলেন। এ সময় অনেক কবি-সাহিত্যিক যুক্তিবাদী ও অসম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সাহিত্যচর্চা করেন।

কাজী নজরুল ইসলাম অসম্প্রদায়িক চেতনার অগ্নিপুরুষ। মুসলমান সমাজের ধর্মীয় সংকীর্ণতা এবং অসম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তিনি লেখনী ধারণ করে বলেন :

‘কোন ধর্ম, কোন জাতি বা মানবের প্রতি বিদ্বেষ আমার ধর্মে নাই, কর্মে নাই, মর্মে নাই। … ইসলাম এসেছে পৃথিবীতে পূর্ণ শান্তি সাম্য প্রতিষ্ঠা করতেÑকোরান মজীদে এই মহাবাণীই উত্থিত হয়েছে।’

নজরুল মানবতাকে সবার উপরে স্থান দিয়েছেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কামনায় তিনি লেখনী ধারণ করেছিলেনিত সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের মধ্যে কোনো গৌরব নেই। ‘মানুষ ধর্মই’ তার কাছে শ্রেষ্ঠ ধর্ম :

এস ভাই হিন্দু! এস মুসলমান ! এস বৌদ্ধ ! এস ক্রিশ্চিয়ান ! আজ আমরা সব গণ্ডী কাটাইয়া সব সঙ্কীর্ণতা সব মিথ্যা, সর্বস্বার্থ চিরতরে পরিহার করিয়া প্রাণ ভরিয়া ভাইকে ভাই বলিয়া ডাকি। আজ আমরা আর কলহ করিব না।

ছুঁৎমার্গ” প্রবন্ধে নজরুল নিজের ধর্মকে ভালোবাসার মাধ্যমে পৃথিবীর সকল ধর্মের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। তিনি হিন্দু-মুসলিম সকল ধর্মের মানুষের মিলন প্রত্যাশা করেছেন :

হিন্দু হিন্দু থাক, মুসলমান মুসলমান থাক, শুধু একবার এই মহা গগন তলের সীমাহারা মুক্তির মাঝে দাঁড়াইয়া মানব – তোমার কণ্ঠে সেই সৃষ্টির আদিম বাণী ফুটাও দেখি। বল দেখি “আমরা মানুষ ধর্ম”।…
মানবতার এই মহা-যুগে একবার গণ্ডী কাটিয়া বাহির হইয়া আসিয়া বল যে, তুমি ব্রাহ্মণ নও, শুদ্র নও, হিন্দু নও, মুসলমান নও, তুমি মানুষ – তুমি সত্য।

কেবল প্রবন্ধ আর অভিভাষণ নয়, বিভিন্ন কবিতায় নজরুল অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতার কথা বলেছেন। ‘ভাঙার গান’ কাব্যের “জাগরণী” কবিতায় তিনি বলেছেন, মানবতা জেগে ওঠো :

দাও মানবতা ভিক্ষা দাও।
পুরুষ সিংহ জাগোরে।
সত্য মানব জাগোরে।
বাধা-বন্ধন-ভয়-হারা হও
সত্য-মুক্তি-মন্ত্র গাও।

‘সাম্যবাদী’ কাব্যের “সাম্যবাদী” কবিতায় নজরুল সকল সম্প্রদায়ের মানুষের জয়গান করেছেন। সকল ধর্মের মানুষকে তিনি এক কাতারে দাঁড় করেছেন। সকল ধর্মের মানুষ অর্থাৎ – হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সকলেই সমান, মানব-হৃদয়ই সকল সত্যের সৃষ্টিক্ষেত্র, সকল ধর্মের মিলন-ভূমি :

গাহি সাম্যের গান-
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু- বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান-
… … … … … … …
মসজিদ এই, মন্দির এই, গীর্জা এই হৃদয়,
এইখানে বসে ঈসা, মুসা পেল সত্যের পরিচয়।

‘বাঁধন হারা’ (১৩৩৪) উপন্যাসে রেবাকে লেখা সাহসিকার চিঠিতে নজরুলের অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। সাহসিকার চিঠিতে নজরুলের চেতনারই মূর্ত প্রকাশ :

… সব ধর্মের ভিত্তি চিরন্তন সত্যের পর-যে সত্য সৃষ্টির আদিতে ছিল, এখনো রয়েছে এবং অনন্তেও থাকবে। এই সত্যটাকে যখন মানি, তখন আমাকে যে ধর্মে ইচ্ছা ফেলতে পারিস। আমি হিন্দু, আমি মুসলমান, আমি খ্রীষ্টান, আমি বৌদ্ধ, আমি ব্রাহ্ম। আমি তো কোন ধর্মের বাইরের (সাময়িক সত্যরূপ) খোলসটাকে ধরে নেই। গোঁড়া ধামিকদের ভুল তো ঐখানেই। ধর্মের আদত সত্যটা না ধরে এঁরা ধরে আছেন যত সব নৈমিত্তিক বিধি-বিধান।

নজরুলের এসব লেখায় মানবতাই মুখ্য, ধর্ম বা সাম্প্রদায়িকতার এখানে কোনো স্থান নেই। ধর্মকে তিনি নেশার সাথে তুলনা করেছেন এবং সে নেশা কাটিয়ে উঠে মানবতার জয়ধ্বনি করেছেন :

কাটায়ে উঠেছি ধর্ম-আদিম-নেশা,
ধ্বংস করেছি ধর্ম-যাজকী-পেশা।
ভাঙি মন্দির, ভাঙি মসজিদ,
ভাঙিয়া গীর্জা গাহি সঙ্গীত-
এক মানবের একই রক্তমেশা।

বাঙালি সমাজে অসাম্প্রদায়িক চিন্তা, মুক্তবুদ্ধি ও প্রগতিশীল চিন্তা প্রসারের ক্ষেত্রে ১৯২৬ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত মুসলিম সাহিত্য সমাজের অবদান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, আবদুল কাদির, আবুল ফজল প্রমুখ বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি মুসলমান সমাজে অসাম্প্রদায়িক চিন্তা বিস্তারে কার্যকর  পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। “শিখা” নামক পত্রিকার মাধ্যমে তারা এ কাজে ব্রতী হন। মুসলিম সাহিত্য সমাজের অন্যতম কর্ণধার আবুল হুসেন লিখেছেন :

 ‘… মানবের ইতিহাস ধর্ম-বায়ু-গ্রস্ত মানুষের পরস্পর দ্ব›দ্ব-দ্বেষাদ্বেষির কলঙ্কে অতি নির্মমভাবে কলঙ্কিত। এ কলঙ্ক অপনোদন করতে হলে মানবের প্রতি পরস্পর প্রীতিই চরমধর্ম বলে ধরতে হবে।’২২ আধুনিক ও বিজ্ঞান-মনস্ক মন নিয়ে আবুল হুসেন ধর্মকে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন আধুনিক ইউরোপীয় বিজ্ঞান ও ইসলাম পরস্পর সম্পর্কযুক্ত : ‘আজ আমরা ধর্মের দোহাই দিয়ে সকল প্রকার চিন্তার স্ফূর্তিকে রুদ্ধ করতে চাচ্ছি। কিন্তু মুক্তবুদ্ধির দ্বার প্রথমে ইসলাম খুঁজছিল।’

মুসলিম সাহিত্য সমাজের কর্মযোগী পুরুষ কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০) বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য যুক্তিগ্রাহ্য অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তিনি লক্ষ্য করেছেন বাঙালি মুসলমানগণ প্রাচীন শাস্ত্র আঁকড়ে ধরে যুগের পরিবর্তনকে অস্বীকার করে সম্মোহিত হয়ে আছে :

মুসলমানের বিশেষ করে, আধুনিক মুসলমানের, এই অবস্থা লক্ষ্য করেই বলতে চাই -সে সম্মোহিত। সে শুধু পৌত্তলিক নয়, সে এখন যে অবস্থায় উপনীত তাতে পৌত্তলিকতারও চরম দশা বলা যেতে পারে – তার মানব সুলভ সমস্ত বিচার-বুদ্ধি, সমস্ত মানস উৎকর্ষ, আশ্চর্যভাবে স্তম্ভিত। বর্তমান তার জন্য কুসংস্কারাচ্ছন্ন, দিগ্দেশবিহীন, অতীত ভবিষ্যৎ তার নেই।

ধর্মের ব্যাপারে কোনো কোনো ক্ষেত্রে রক্ষণশীল মনোভাবাপন্ন হওয়া সত্তে¡ও মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ (১৮৮৫-১৯৬৯) প্রকৃত ধর্মের মধ্যে মানব কল্যাণ ও শান্তি খুঁজে পেয়েছেন। ভারতবর্ষে প্রকৃত ধর্ম না থাকার কারণে সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি হয়েছিল বলে তার ধারণা :

হিন্দু মুসলমানের মধ্যে দাঙ্গা হাঙ্গামা দেখে আমার অনেক বন্ধু বলেন যে, ধর্মটর্ম ভারত বর্ষ থেকে দূর না র্কলে, ভারতে শান্তি হবে না স্বরাজও হবে না। কিন্তু আমি বলি ধর্ম্ম নেই বলেই ত এত বিবাদ হচ্ছে। ধর্ম্মের উদ্দেশ্য, ধার্মিক নিজে শান্তি পাবে, আর পাবে তার হাতে সমস্ত দুনিয়া শান্তি। যা অশান্তি ঘটায়, তা ধর্ম্ম নয়, পরম অধর্ম্ম। ইসলাম শব্দের দু’টি মানে, আত্মনিবেদন, আর একটি শান্তি স্থাপন।

জাতি, ধর্ম, বর্ণ সবকিছুর ঊর্ধ্বে তিনি অসাম্প্রদায়িক বাঙালিরূপে এদেশের মানুষের পরিচয় তুলে ধরেছেন। বিধাতা আমাদের সংস্কৃতি ও জীবনে বাঙালিত্বের যে বৈশিষ্ট্য স্থাপন করে দিয়েছেন তা কোনো ধর্মীয় বাহ্যরূপ ও ক্রিয়াকলাপ দ্বারা বিনষ্ট করা যাবে না।

ধর্মীয় ভাবাদর্শে গঠিত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর একদিকে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠী তাদের চিন্তাচেতনার প্রকাশ ঘটাতে তৎপর হয়, অপরদিকে পূর্ববঙ্গের সচেতন মধ্যবিত্ত সমাজ অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশের পথ প্রসারিত হয়। অর্থাৎ এ সময় ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবোধের পরিবর্তে ভাষা-সংস্কৃতি কেন্দ্রিক ভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক চেতনার উন্মেষ ঘটে। তখন পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম মধ্যবিত্তের সামনে প্রতিদ্বন্দ্বী তখন আর হিন্দু নয়, আগ্রাসী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আশীর্বাদপুষ্ট অবাঙালিরা। ভাষা আন্দোলনের পর এই চেতনা প্রবলরূপ লাভ করে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফন্টের নিরঙ্কুশ বিজয়লাভ, ৬২-র শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন, ৬৬-র ৬-দফা আন্দোলন, ৬৯-র গণ-অভ্যুত্থান এবং ৭১-র মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ। সমকালীন রাজনীতির এই প্রভাব সমাজে তথা সাহিত্যে প্রতিফলিত হয় ব্যাপকভাবে। উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, ছোটগল্প- সাহিত্যের সকল শাখায়ই বাস্তব  রূপায়ণ পরিলক্ষিত হয়। আবুল ফজলের উপন্যাসে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে।
সরদার জয়েন উদ্দিনের ‘আদিগন্ত’ (১৩৬৬) উপন্যাসের ছামাদ পণ্ডিত একজন আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক মানুষ। জীবনের পুরো সময় তিনি গ্রামে বসবাস করে গ্রামের মানুষকে শিক্ষা ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলার চেষ্টা করেন।

গ্রামের দরিদ্র মানুষের কাছে তিনি ‘সোনার মানুষ, গরীবের বন্ধু’  বলে পরিচিত।

ছামাদ পণ্ডিত উদার, অসাম্প্রদায়িক ও শ্রেণীসচেতন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং ত্যাগের আদর্শে উদ্বুদ্ধ ব্যতিক্রমী চরিত্র।

তার আরেক উপন্যাস ‘অনেক সূর্যের আশা’ (১৩৭৩) উপন্যাসের রহমত চরিত্র অসাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় তিনি মর্মাহত হন। সাম্প্রদায়িক কলহ-বিবাদ তাকে বেদনাহত করে।
আনোয়ার পাশার ‘নীড়সন্ধানী’ উপন্যাসের নায়ক অধ্যাপক হাসান উদার, অসাম্প্রদায়িক ও জাতীয়তাবাদী চরিত্র। আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘ক্ষুধা ও আশা’ উপন্যাসের অঘোর চ্যাটার্জী চরিত্র অসাম্প্রদায়িক ও উদার চেতনার অধিকারী। ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে দুটি দেশ হওয়ার আশঙ্কায় তিনি ক্ষেদক্তি করেছেন :

‘এর মূল্য আমাদের দিতে হবে। কিন্তু ধ্বংস ও মৃত্যুর শেষে মুক্ত স্বাধীন ভারতে পঙ্গু হয়ে থাকবে এ যে স্বপ্নেও ভাবতে পারিনা।’

ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র গড়ে ভাষাভিত্তিক যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার উন্মেষ ঘটে অনেক উপন্যাসে তার প্রতিফলন ঘটেছে। মোহাম্মদ মর্তুজার ‘চরিত্র হানির অধিকার’ (১৩৭২) গ্রন্থের নায়ক মালেক চৌধুরী বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল। ইউরোপীয় অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে সে সোচ্চার হয়েছে। ‘বায়ান্নর একুশে ফেব্রæয়ারির রক্তাক্ত শোকাবহ স্মৃতিকে ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য পাকিস্তানি শাসকরা যখন তৎপর তখন ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে শানিত রাখতে সোচ্চার হয় বাংলার ছাত্র-জনতা ও তরুণ সমাজ। এ পটভূমিতেই রচিত হয়েছে জহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্গুন’ (১৩৭৫) উপন্যাস।

আসলে ভাষা আন্দোলনের পর অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার ধারা ক্রমে প্রসারিত। ছাত্র-তরুণরা ভাষা আন্দোলনের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে স্বীয় জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রকাশ ঘটিয়েছে। এ উপন্যাসের মুনিম ও আসাদ অনেকটা প্রাগ্রসর চেতনার অধিকারী। বায়ট্টির শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত হয়েছে অজয় রায়ের ‘পদধ্বনি’ (১৩৭৬) উপন্যাস। উপন্যাসের নায়ক ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল। বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনকেও সে সমর্থন করেছে। তার ছোট ভাই ও সাথী-বন্ধুদের মধ্যে খালেক, শহীদ মন্টুকে সংগ্রামী জীবন অব্যাহত রাখতে দেখে এবং গণচেতনার বিপুল প্রসার লক্ষ করে হাশেম উল্লসিত হয়েছে।

মন্টু অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল ও জাতীয়তাবাদী। নানা পেশা ও শ্রেণির মানুষ পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। ‘পদধ্বনি’ উপন্যাসে তার আলেখ্য ফুটে উঠেছে। শহীদুল্লা কায়সারের ‘সংসপ্তক’ (১৯৬৫) উপন্যাসের উল্লেখযোগ্য চরিত্র সেকেন্দার মাস্টার অসা¤প্রদায়িক ও শ্রেণিসচেতন চরিত্র।

বাঙালি সমাজে অসাম্প্রদায়িক চেতনার যে ধারাপ্রবাহ তা স্ফুরণ একদিনে ঘটেনি, বরং ধাপে ধাপে তার ধারা প্রবল হয়েছে। শুধু তাই নয়, চূড়ান্ত পর্যায়ে এই চেতনার ফলেই অর্জিত হয়েছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। মূলত, ‘এক নয়া আঞ্চলিক বা ভূভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ফলে এই নতুন স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে।’২৯ স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জন একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফসল হলেও এর মূলে রয়েছে একটি অসা¤প্রদায়িক চেতনা। বাংলাদেশ অর্জনের এই সংগ্রাম পুরো জাতিকে প্রভাবিত করে নানামাত্রিকতায়। এর প্রভাব সমকালীন বাংলা সাহিত্যেও লক্ষ করা যায়। ‘সাতচল্লিশ-উত্তর পূর্ববাংলার কবিতা প্রগতিশীল, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রবাহে বিভাগ পূর্বকালের প্রগতিশীল রাজনৈতিক কবিতার ঐতিহ্য এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কবিতার ঐতিহ্যকে আত্মস্থ করে নতুন দিগন্তের সন্ধানে বাঁক নেয়। তাঁদের দৃষ্টিচেতনায় স্থান পায় অসাম্প্রদায়িক মনোভঙ্গি, দেশীয় উত্তরাধিকারের প্রতি আস্থা ও মানবতাবাদী জীবন-সংলগ্ন অনুভূতি এবং মার্কসীয় সাম্যবাদ। এই চেতনাধারার কবিগণ হলেন জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামাল, সিকান্দার আবু জাফর, আহসান হাবীব, আবুল হোসেন, আবদুল গনি হাজারী, সানাউল হক, আতাউর রহমান, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, মযহারুল ইসলাম, শামসুর রাহমান, আহমদ রফিক, হাসান হাফিজুর রহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সৈয়দ শামসুল হক, আবুবকর সিদ্দিক, আবুজাফর ওবায়দুল্লাহ, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, জিয়া হায়দার, বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর, হায়াৎ মামুদ, শহীদ কাদরী প্রমুখ।

পাকিস্তান আমলে পুরো তেইশ বছর ধরে বাংলাভাষা ও সংস্কৃতির ওপর অনবরত আক্রমণ চলেছে। … বাংলা ভাষাকে সংস্কার করা, হরফ বর্জন ও বানানের সরলীকরণ, আরবী হরফ বা রোমান হরফে বাংলা লেখা, উর্দু ও বাংলার সমন্বয়ে পাকিস্তান ভাষা তৈরী করার চেষ্টা সেই প্রয়াসেরই এক একটি দিক। একই সঙ্গে সংস্কৃতির ওপরও হামলা অব্যাহত থাকে। রবীন্দ্র নঙ্গীত বর্জন করা, নজরুল ইসলামের রচনাবলীর পাকিস্তানী সংস্করণ প্রকাশের চেষ্টা…বাঙালির জাতিসত্তাকে কালিমালিপ্ত করা এবং পূর্ববাংলার নাম বদলে পূর্বপাকিস্তান করাÑসেই আক্রমণের কয়েটি উল্লেখযোগ্য অংশ। কিন্তু ষড়যন্ত্র সার্থক হয়নি। মুষ্টিমেয় কিছু বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিসেবী ব্যতীত বাকী সবাই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ করেছে। কবিগণ ছিলেন আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য কর্মী। অনেক সংগ্রামী কবিতা রচনা করে তাঁরা সে সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।৩১ ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের ফলে যে গণসচেতনতা সৃষ্টি হয়, তার ফলে কবিতায় ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা, গণমুখী চিন্তা-চেতনা, অসা¤প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি, স্বাজত্যবোধ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রকাশ বাক্সময় হয়ে ওঠে। এর ফলে ‘কবিরা ক্রমশঃ জনজীবন বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠেছে এবং সংলগ্ন হয়েছেন বৃহত্তর জীবনের ও গণআন্দোলনের। এভাবে কবিতায় বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের যে স্ফুরণ লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে তা আরো স্ফূর্তি পেয়েছে।’৩২ গণঅভ্যুত্থানে সমাজতান্ত্রিক ও অসা¤প্রদায়িক ভাবাদর্শের ছাত্রনেতা আসাদ শহিদ হলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন প্রচÐ শক্তি অর্জন করে। “আসাদের শার্ট” কবিতায় শামসুর রাহমান তেজোদীপ্ত ভাষায় সেই সংগ্রামী চেতনাকেই মূর্ত করে :

গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিম্বা সূর্যাস্তের
জলন্ত মোমের মতো আসাদের শার্ট
উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়।
আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা
সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখন্ড বস্ত্র মানবিক ;
আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।৩৩
(কবিতাঃ আসাদের শার্ট, শামসুর রাহমান)

অসাম্প্রদায়িক চেতনার চূড়ান্ত অর্জন মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ঐতিহ্য। আছে সাংস্কৃতির জাগরণের ইতিহাস। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণের এই ভাবধারা পূর্ববাংলার কবিসমাজকে উদ্বুদ্ধ করেছে। তাঁদের কবিতায় ঘটেছে এর প্রতিফলন।

মূলত, অসাম্প্রদায়িক চেতনাই বাঙালির হাজার বছরের লালিত চেতনাধারার প্রধানতম দিক। বিভিন্ন সময় সা¤প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলেও তা স্থায়ীভাবে প্রাধান্য লাভ করেনি। ফলে অসা¤প্রদায়িক চেতনার উন্মেষ ও বিকাশ ক্রমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়। এর চূড়ান্তরূপ প্রতিফলিত হয় বাহাত্তরের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে সংযোজনের মাধ্যমে।

বাঙালি সমাজ ও সাহিত্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার উন্মেষ – ১ম পর্ব পড়ুন

 

লিখেছেন-  নূহ-উল-আলম লেনিন 

তথ্যনির্দেশ
১. সালাহ্উদ্দীন আহমদ, ইতিহাস ঐতিহ্য জাতীয়তাবাদ গণতন্ত্র (ঢাকা : প্রথমা প্রকাশন, ২০১৩), পৃ. ১০৬
২. উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, বাংলার বাউল ও বাউল গান (কলকাতা : ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানি, তৃতীয় সংস্করণ, নববর্ষ, ১৪০৮), পৃ. ১৩৩
৩. সালাহ্উদ্দীন আহমদ, পূর্বোক্ত, পৃ. ১০৯
৪. সালাহ্উদ্দীন আহমদ, পূর্বোক্ত, পৃ. ১১১
৫. উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৩৭
৬. সালাহ্উদ্দীন আহমদ, পূর্বোক্ত, পৃ. ১১৩
৭. সালাহ্উদ্দীন আহমদ, পূর্বোক্ত, পৃ. ১১৪-১১৫
৮. উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৩৭
৯. ক্ষিতিমোহন সেন, কবীর, প্রথম খÐ (বোলাপুর : ১৩১৭ বঙ্গাব্দ), পৃ. ৭-৯
১০. আবদুল হাকিম, নূরনামা, উদ্ধৃত, মুহম্মদ এনামুল হক, মুসলিম বাংলা সাহিত্য (ঢাকা : ১৯৫৭), পৃ. ২০৮
১১. উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, পূর্বোক্ত, পৃ. ৫৪৪
১২. উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, পূর্বোক্ত, পৃ. ৬৪২
১৩. দীনেশচন্দ্র সেন, “ভূমিকা”, মৈমনসিংহ-গীতিকা, প্রথম খÐ, দ্বিতীয় খÐ (কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৯৬), পৃ. ১৪
১৪. সালাহ্উদ্দিন আহমদ, পূর্বোক্ত, পৃ. ১২৫
১৫. কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুল-রচনাবলী, পঞ্চম খÐ, দ্বিতীয়ার্ধ, আবদুল কাদির (সম্পাদিত), (ঢাকা : বাংলা একাডেমী), পৃ. ২১৯
১৬. কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুল-রচনাবলী, প্রথম খÐ, অবদুল কাদির (সম্পাদিত), পৃ. ৬১১-৬১৪
১৭. তদেব, পৃ. ৬৩২-৬৩৩
১৮. তদেব, পৃ. ৬৩৩
১৯. কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুল-রচনাবলী, দ্বিতীয় খÐ, আবদুল কাদির (সম্পাদিত), পৃ. ৫-৬
২০. কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুল-রচনাবলী, প্রথম খÐ, আবদুল কাদির (সম্পাদিত), পৃ. ৫৯৩
২১. কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুল-রচনাবলী, দ্বিতীয় খÐ, আবদুল কাদির (সম্পাদিত), পৃ. ৩৮৪
২২. আবুল হুসেন, “সত্য”, আবুল হুসেন রচনাবলী, প্রথম খÐ (ঢাকা : ১৩৮৩), পৃ. ৩
২৩. আবুল হুসেন, “মুসলিম কালচার ও উহার দার্শনিক ভিত্তি”, পূর্বোক্ত, পৃ. ১১০
২৪. কাজী আবদুল ওদুদ, শাশ্বত বঙ্গ (কলিকাতা : ১৩৫৮), পৃ. ৩৯৬
২৫. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, ‘অভিভাষণ’, শহীদুল্লাহ্ সংবর্ধনা গ্রন্থ, মুহম্মদ সফিয়্যুল্লাহ (সম্পাদিত) (ঢাকা : ১৯৬৭) পৃ. ১৭
২৬. সরদার জয়েন উদ্দিন, আদিগন্ত (ঢাকা : ১৩৬৩), পৃ. ২০১
২৭. মুহম্মদ ইদরিস আলী, পূর্বোক্ত, পৃ.২৪৩
২৮. আলাউদ্দিন আল-আজাদ, ক্ষুধা ও আশা (ঢাকা : ১৯৭৪), পৃ. ১৮১
২৯. সালাহ্উদ্দীন আহমদ, পূর্বোক্ত, পৃ. ১০৭
৩০. সাঈদ-উর-রহমান, পূর্ব বাংলার রাজনীতি সংস্কৃতি ও কবিতা (ঢাকা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৮৩), পৃ. ৪১
৩১. হাসান হাফিজুর রহমান, “অমর একুশে”, বিমুখ প্রান্তর (ঢাকা : পারাবত প্রকাশনী, ১৩৭০), পৃ. ৩০
৩২. সাঈদ-উর-রহমান, পূর্বোক্ত, পৃ. ১২৯
৩৩. শামসুর রাহমান, “আসাদের শার্ট”, নিজবাসভূমে (ঢাকা : নসাস, ১৯৮৫), পৃ. ২২

Nusrat Nazmi

Nusrat Nazmi

Published 07 Jan 2020
a member of Rokomari team
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png