ব্যাটল অফ নকশী

ব্যাটল অফ নকশী

১.

নকশী। ঠিক নামের মতোই আদতেও যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের  লীলাভূমি। বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তে মেঘালয়ের কোলঘেঁষা, অরণ্যরাজি শোভিত গারো পাহাড়। সেই পাহাড়েরই পাদদেশে, ঐশ্বরিক প্রাচুর্যস্নাত জনপদ ঝিনাইগাতির অন্তর্গত এই গ্রাম। কিন্তু যখন নগর পোড়ে, দেবালয় কি আর রক্ষা পায়? তাই তো উনিশশো একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধে গোটা দেশ যখন পাক হানাদারদের আক্রমণে হচ্ছে ছারখার দিকে দিকে বইছে রক্তের বন্যা একের পর এক মানুষ যোগ দিচ্ছে মৃত্যুর মিছিলে সেই কালান্তক দুঃসময়ের ছোঁয়া লেগেছিল ছবির মতো সুন্দর নকশী গ্রামেও। রচিত হয়েছিল এক অবিস্মরণীয়… নকশী ট্র্যাজেডি।

২.

এখন শেরপুর জেলায় হলেও, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নকশী ছিল তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর মহকুমায়। বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ন্যাস্ত ছিল ৯৩ পদাতিক ব্রিগেডের অধীনে পাঁচটি অপারেশনাল এলাকার উপর। পাকিস্তানের ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের অধীনে ছিল নকশী বিওপি। এই ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল সুলতান মাহমুদ। নকশী বিওপিতে নিয়মিত বাহিনীর এক প্ল্যাটুন সৈন্য মোতায়েন করেছিলেন তিনি। সেই সাথে তাদের সহযোগী হিসেবে ছিল আরো দুই প্ল্যাটুন রাজাকারও।

গারো পাহাড়
গারো পাহাড়; সূত্র: কালেরকণ্ঠ

৩.

সীমান্তবর্তী হওয়ায় নকশী বিওপি ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা একে গড়ে তুলেছিল একটি শক্তিশালী দুর্গ হিসেবে। চারদিকে ছিল পুরু মাটির দেয়াল। দেয়ালের কাছাকাছি বাংকারগুলো তৈরি ছিল মর্টার ও রকেট লঞ্চারের গোলা বর্ষণ থেকে রক্ষার উপযোগী করে। এছাড়া আর্টিলারি কামান ও মর্টার আক্রমণ থেকে সুরক্ষায় বিওপির মাঝে ছিল একটি কংক্রিটের তৈরি বাংকারও। পরিখার মাধ্যমে এ বাংকারের সাথে বাইরের বাংকারগুলোর যোগাযোগের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বিওপির চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েও প্রতিরক্ষা জোরদার করা হয়েছিল।

৪.

১৯৭১ সালের ৪ আগস্ট এই দুর্গসদৃশ বিওপির দখল নিতেই যুদ্ধের সূচনা করে মুক্তিবাহিনী। জেড ফোর্সের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ৮ম ইস্ট বেঙ্গলের তৎকালীন অধিনায়ক মেজর আবু জাফর মোহাম্মদ আমিনুল হক সার্বিকভাবে এই যুদ্ধ পরিচালনা করেন। আর মাঠ পর্যায়ের নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন আমীন আহম্মেদ চৌধুরী। ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। তবে ২৫শে মার্চ ছিলেন ঢাকায়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঢাকা থেকে পালিয়ে ভারতে গিয়েছিলেন তিনি। এরপর নানা ঘটনাপ্রবাহের পর মুক্তিবাহিনীর জেড ফোর্সের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন।

নকশী যুদ্ধে অংশ নেয়া গ্রামবাসী
নকশী যুদ্ধে অংশ নেয়া গ্রামবাসী; সূত্র: আওয়ার শেরপুর

৫.

নকশী যুদ্ধে আমীনের অধীনস্থ মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন একেবারেই অনভিজ্ঞ। দুটি কোম্পানিতে মোট যোদ্ধা ছিলেন ২০০ জন। তাদের মধ্যে ১০ জন সামরিক, ৮ জন ইপিআর, ২/৩ জন পুলিশ। বাকিরা সকলেই গ্রামের অতি সাধারণ মানুষ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মুসলিম, ছিলেন গারো। ছিলেন খ্রিস্টান ও নিম্ন বর্ণের অনেক হিন্দুও। বেশিরভাগই প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন বড়জোর ২৮ দিন। আবার মাত্র সপ্তাহখানেক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনেকেও ছিলেন। সম্মুখ সমরে লড়াইয়ের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই নকশী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন তাঁরা। এ যে ছিল এক চরম দুঃসাহসিকতা, সে কি বলার অপেক্ষা রাখে?

৬.

৪ আগস্টের প্রথম প্রহরে দুই কোম্পানির মোট ২০০ যোদ্ধা নিয়ে নকশী বিওপি আক্রমণ করেন ক্যাপটেন আমীন। রাত বারোটার দিকে সমাবেশ এলাকা হালজাতি গ্রাম থেকে যাত্রা শুরু করেন তাঁরা। সেখান থেকে বেশ সাবলীল গতিতেই পৌঁছে যান ফর্মিং আপ প্লেসে (এফইউপি)। মাঝ পথে একটি নালা পার হওয়ার প্রয়োজন পড়েছিল। সেটিও নিঃশব্দেই পার করেছিলেন সকলে। সাড়ে তিনটার কিছু পর এফইউপিতে পজিশন নেন তাঁরা। তিনটা ৪৫ মিনিটে গর্জে ওঠে সহায়তাকারী ভারতীয় আর্টিলারি কামান

পাকিস্তানী সেনাবাহিনী
পাকিস্তানী সেনাবাহিনী

৭.

এ পর্যন্ত সব চলছিল ঠিকঠাক, পরিকল্পনা মাফিক। কিন্তু তারপরই যেন শুরু হয় দুঃস্বপ্নের প্রথম অধ্যায়। মুক্তিসেনারা পুরোপুরি যুদ্ধ শুরু করার আগেই এফইউপিতে তাদের নিজেদের আর্টিলারির তিনটি গোলা এসে পড়ে। তাতে গুরুতর আহত হন ছয়জন যোদ্ধা। এদিকে প্রস্তুত ছিল পাকিস্তানি বাহিনীও। তাই মুক্তিসেনাদের আর্টিলারি গর্জে উঠতেই তারাও চালিয়ে দেয় তাদের কামান ও মর্টার। সবমিলিয়ে ঘটনার আকস্মিকতায় মুক্তিসেনারা হয়ে পড়েন কিংকর্তব্যবিমূঢ়, হতভম্ব ও ভীত সন্ত্রস্ত।

৯.

তবে এসবের ভেতরও মাথা ঠাণ্ডা রেখেছিলেন ক্যাপ্টেন আমীন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তিনি তৈরি করে ফেলেন একটি এক্সটেন্ডেড ফরমেশন। খানিক পর অ্যাসল্ট লাইন গঠন করে ‘চার্জ’ বলে হুংকার দেন তিনি। বাকি মুক্তিযোদ্ধারাও ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিয়ে ক্ষিপ্রগতিতে এগিয়ে যান। তাদের উদ্দেশ্য ছিল শত্রু বাহিনীর উপর বেয়নেট চার্জ। তাদের এমন মনোবল দেখে এবার পাকিস্তানী সেনাদের ভয় পাওয়ার পালা। পালিয়ে যেতে শুরু করে তাঁরা। আর মুক্তিযোদ্ধারা তখন উত্তেজনা বাড়ানোর জন্য ‘নারায়ে তাকবির’, ‘আল্লাহু আকবর’, ‘জয় বাংলা’, ‘ইয়া আলী’সহ বিভিন্ন স্লোগানে যুদ্ধের ময়দান প্রকম্পিত করে তুলছেন।

নকশী বিওপির নকশা
নকশী বিওপির নকশা

১০.

কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের এই অগ্রগামিতাও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। শত্রুর আর্টিলারির শেলভো ফায়ার এসে পড়ে তাঁদের উপর। মুহূর্তের মধ্যেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষণিক পূর্বের একতাও। ক্যাপ্টেন আমীনের ডান পায়ের উরু গুলিবিদ্ধ হয়। কিন্তু সেই আঘাতকে পাত্তাই দেন না তিনি। প্রবল উদ্যমের সাথে সামনে বাড়েন। এগিয়ে যান আরো ৫০ গজ। শত্রু বাংকার তখন মাত্র কয়েক গজ দূরে।

১১.

আমীন আহম্মেদ চৌধুরী
আমীন আহম্মেদ চৌধুরী

বাকি মুক্তিযোদ্ধারাও ছত্রভঙ্গ অবস্থায়ই এগিয়ে গিয়ে পলায়নরত পাক হানাদারদের আঘাত করতে থাকেন। এতে ছোটখাট আঘাতের শিকার হচ্ছিল পাকিস্তানিরা। তবে ক্ষণে ক্ষণে মাইন বিস্ফোরণ আর গোলাগুলিও হচ্ছিল, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলেন মুক্তিযোদ্ধারাই। এক পর্যায়ে মাইনের আঘাতে শহীদ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র, মুক্তিযোদ্ধা শামসুল আলম। এভাবে একে একে মাইন ফিল্ডে ফেঁসে গিয়ে উড়ে যেতে থাকেন আরো অনেকে। কেউ তো আবার শত্রুর গুলিবিদ্ধ হয়ে সরাসরি পড়েও যাচ্ছিলেন।

১২.

এই হতাহতের মধ্যেও আরো খানিকটা এগোনোর চেষ্টা চালান ক্যাপ্টেন আমীন। সহযোদ্ধাদের মনোবল চাঙ্গা করতে বেশ কয়েকবার ‘জয় বাংলা’ বলে চিৎকার দেন তিনি। বলেন সবাইকে সামনে অগ্রসর হতে। এরপর পাকিস্তানিদের বিওপি যায় তছনছ হয়ে। কিন্তু বিধি বাম। ঠিক এমন সময়ই একটি বাঁশের কঞ্চি বেঁধে ক্যাপ্টেন আমীনের বা পাঁয়ে। পড়ে যান তিনি। এক পাকিস্তানী সেনা ছুটে এলো তার উপর বেয়নেট চার্জ করতে। তখন ক্লাস এইট পড়ুয়া, এক সুবেদার মেজরের ছেলে সালাম খতম করে দেন সেই পাকিস্তানী সেনাকে। তিনি তাঁর সাথে থাকা ব্যক্তিগত গার্ড হানিফকে নির্দেশ দেন ডানদিকের বাংকারে অবস্থানরত শত্রুর উপর গুলি চালাতে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই শাহাদাৎ বরণ করেন হানিফ। ক্যাপ্টেন আমীন তখন সাইড রোল আর ক্রল করে সরে যাওয়ার চেষ্টা চালান। হঠাৎ করে বাম দিক থেকে একটি গুলি এসে তাঁর ডান হাতের কনুইতে আঘাত করে। তাঁর হাত থেকে ছিটকে পড়ে স্টেইনগান। সেই সাথে মৃত্যু ঘটে এই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ী হওয়ার সমস্ত সম্ভাবনাও।

মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত ভারতীয় আর্টিলারি
মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত ভারতীয় আর্টিলারি; সূত্র: AFP

১৩.

শেষ পর্যন্ত নকশী যুদ্ধে নির্মম পরাজয় ঘটে মুক্তিবাহিনীর। ক্যাপ্টেন আমীন অবশ্য বেঁচে ছিলেন। পরদিন সকালে মেজর আমিনুল হক ও হাবিলদার তাহের উদ্ধার করেন তাঁকে। হাবিলদার তাহের তাঁকে কাঁধে তুলে নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যান। এ যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হতাহতের কোনো বিবরণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু মুক্তিবাহিনীর পক্ষে শহীদ অথবা নিখোঁজ হন ২৬ জন। মোট হতাহতের সংখ্যা ছিল ৩৫। এদের মধ্যে দশজন মুক্তিযোদ্ধার লাশ পরদিন শেরপুরে পাঠিয়েছিল পাকিস্তানিরা। শেরপুরের রাজাকাররা বিকৃত খেলায় মেতে ওঠে সেই লাশগুলো নিয়ে। তাঁরা ছিন্নভিন্ন করে সেইসব মুক্তিযোদ্ধার লাশকে, নিজ মাতৃভূমিকে স্বাধীন করতে যারা ইতিমধ্যেই বিসর্জন দিয়েছেন নিজেদের প্রাণ।

মুক্তিবাহিনীর এক মুক্তিযোদ্ধা
মুক্তিবাহিনীর এক মুক্তিযোদ্ধা; সূত্র: AP

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক বইসমুহ

১৪.

মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্বের জন্য আমীন আহম্মেদ চৌধুরীকে বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ৭। নকশী যুদ্ধে জয়লাভ করতে না পারলেও, সে যুদ্ধে তিনি যে বীরত্ব দেখিয়েছিলেন এবং সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁর সত্যিই কোনো তুলনা হয় না। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, ওই যুদ্ধে শাহাদাৎ বরণ করা অনেক মুক্তিযোদ্ধারই নাম-পরিচয় উদ্ঘাটন করা যায়নি। স্বদেশের তরে সর্বোচ্চ উৎসর্গ করার পরও ইতিহাস তাঁদেরকে মনে রাখেনি। এ বিস্মৃতি তাঁদের নয়, আমাদেরই অপমান। এই স্বাধীন দেশের মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে পারছি যাদের কারণে, তাঁদের সম্পর্কেই আমরা জানি না। এ আমাদেরই ব্যর্থতা যে আমরা তাঁদের স্মৃতিকে সংরক্ষণ করতে পারিনি। আজ তাই আমরা গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি নকশী ট্র্যাজেডিতে অংশ নেয়া এবং প্রাণ বিলিয়ে দেয়া সকল মুক্তিযোদ্ধাকে।

তোমাদের এই ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মুক্তিযোদ্ধা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মুক্তিযোদ্ধা; সূত্র: AP

মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনা বিষয়ক বইসমুহ

তথ্যসূত্র

১।https://archive.ittefaq.com.bd/index.php ref=MjBfMTJfMjFfMTJfMV8xMl8xXzUxMTI=

২। http://archive.prothom-alo.com/detail/date/2012-08-26/news/283958

৩। https://oursherpur.com/

rokomari

rokomari

Published 29 Jan 2018
Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png