হিলির যুদ্ধ

হিলির যুদ্ধ

১.

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাক হানাদার বাহিনী নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল বাংলার নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষের উপর। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ মেনে নেয়নি পাক বাহিনীর এমন কাপুরুষোচিত আক্রমণ। ঘটনার আকস্মিকতা সামলে উঠে তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল প্রবল পরাক্রমের সাথে। তারা গড়ে তুলেছিল মুক্তিবাহিনী। সেই মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে পাক হানাদারদের যুদ্ধ হয়েছে অজস্র। কখনো মুক্তিবাহিনী হামলা চালিয়েছে অতর্কিতে। আবার কখনো তারা লড়াই করেছে সম্মুখসমরে। একপর্যায়ে ভারতীয় মিত্রবাহিনীও যোগ দিয়েছে যুদ্ধে। তারপরও, গোটা মুক্তিযুদ্ধে প্রচলিত, সুসংগঠিত যুদ্ধের সংখ্যা ছিল একেবারেই হাতেগোনা। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম আলোচিত ও স্মরণীয়… হিলির যুদ্ধ।

হিলির যুদ্ধ
হিলির যুদ্ধ; সূত্র: Wikipedia

২.

হিলির যুদ্ধে বাংলাদেশী মুক্তিবাহিনীর পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মেজর কাজী নূরুজ্জামান। আর ভারতীয় মিত্রবাহিনীর পক্ষে মেজর জেনারেল লছমন সিং। এছাড়া পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পক্ষে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার তাজাম্মুল মালিক। হিলির যুদ্ধ শুরু হয়েছিল নভেম্বর মাসের শেষ দিকে। মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহে সেই সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

শুরুর দিকে তো পাক হানাদাররা একতরফা তাণ্ডব চালিয়ে গেছে সমগ্র পূর্ব বাংলা জুড়ে। অতঃপর মুক্তিবাহিনী গঠনের পরও শুরুর দিকে অভিজ্ঞতার অভাবে খুব একটা সুবিধে করে উঠতে পারছিলেন না তারা। কিন্তু অক্টোবর-নভেম্বর মাসেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা প্রথম সত্যিকারের পাল্টা আক্রমণ হানতে শুরু করেছিলেন। আত্মবিশ্বাসে টগবগ করতে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা তখনই জানান দিয়েছিলেন, হাল ছাড়বেন না তারা। স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে এনে তারপরই থামবেন তারা। এবং এরপর মিত্রবাহিনী যোগ দিলে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর শক্তিমত্তা বেড়ে যায় বহুগুণ। হিলির যুদ্ধের বিশেষত্ব হলো, এ যুদ্ধ পাক-ভারত যুদ্ধের আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবার আগেই শুরু হয়েছিল, আর অব্যাহত ছিল পাকিস্তানের লিখিত সমর্পণ পর্যন্ত।

যৌথ বাহিনী হিলি দখল করে নেয়
১১ ডিসেম্বর বিকেলের দিকে যৌথ বাহিনী হিলি দখল করে নেয়; সূত্র: কলকাতা ২৪X৭

৩.

নভেম্বর মাসে, মুক্তিযুদ্ধের অন্তিম লগ্নে রণক্ষেত্র হিসেবে হিলির ভূমিকা ছিল অপরিসীম। বগুড়া, ঘোড়াঘাট, চরকিসহ অন্যান্য অঞ্চলে কার্যকর সামরিক অপারেশন পরিচালনা করতে হিলি দখল ছিল খুব জরুরি। বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশেই বিস্তৃত হিলির অবস্থান ছিল এই দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি মহাসড়কে। তাই একে বাংলাদেশের গেটওয়েও বলা যায়। উত্তর-পশ্চিম সেক্টরের এই গেটওয়ে সরাসরি ঘোড়াঘাট ও গাইবান্ধার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করত। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই, হিলি হয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মহা মূল্যবান এক রণাঙ্গন।

হিলি ও আশেপাশের অঞ্চল
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে হিলি ও আশেপাশের অঞ্চল; সূত্র: সংগ্রামের নোটবুক

৪.

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীও জানত হিলির গুরুত্ব ঠিক কতটা। তাই এই অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদারের ব্যাপারে চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেনি তারা। এখানে প্রতিরক্ষা অবস্থান নিয়েছিল পাকিস্তানের ৪ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স। পাক বাহিনী তাদের অবস্থানের চারদিকে স্থাপন করেছিল অ্যান্টি ট্যাংক, অ্যান্টি পার্সোনেল, কাঁটাতার ও বুবি ট্র্যাপ। অর্থাৎ নিজেদের অবস্থানের গুরুত্ব বিবেচনা করে, ঠিক সেভাবেই যেন প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছিল তারা।

হিলিতে পাকিস্তানিদের ঘাঁটি
হিলিতে পাকিস্তানিদের ঘাঁটি

৫.

প্রথম দফায় হিলিতে যুদ্ধ হয়েছিল দুটি। প্রথমটি হয়েছিল ২২ নভেম্বর। নোয়াপাড়া, মুরাপাড়া ও বাসুদেবপুর দখলের জন্য ভারতীয় বাহিনী প্রণয়ন করেছিল বিস্তারিত পরিকল্পনা। আর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল ২০২ মাউন্টেন ব্রিগেডকে। এর আগে এই একই ব্রিগেডে ৮ গার্ড রেজিমেন্ট কর্তৃক হিলির উপর পরিচালিত একটি আক্রমণ শত্রুর শক্ত প্রতিরোধের কারণে ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু এবার সেই একই রেজিমেন্ট হিলির নোয়াপাড়া দখলে সক্ষম হয়।

মিত্রবাহিনী
মিত্রবাহিনী যোগ দিলে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর শক্তিমত্তা বেড়ে যায় বহুগুণ।

৬.

দ্বিতীয় যুদ্ধটি হয় ২৪ নভেম্বর। এ দিন ভারতীয় বাহিনীর ৫ গারওয়াল রাইফেলস মুরাপাড়া আক্রমণ করে দখল করে নেয়। এক্ষেত্রে তারা সাহায্য নিয়েছিল ভারতীয় আর্টিলারি ও সাঁজোয়া বাহিনীর। এ যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর চারজন অফিসারসহ মোট ৫১ জন শহীদ হয়েছিলেন। আহত হয়েছিলেন আরো ৭৯ জন।

এ যুদ্ধ পাক-ভারত যুদ্ধের আনুষ্ঠানিকভাবে
এ যুদ্ধ পাক-ভারত যুদ্ধের আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবার আগেই শুরু হয়েছিল, আর অব্যাহত ছিল পাকিস্তানের লিখিত সমর্পণ পর্যন্ত।

৭.

পরের কয়েকটা দিন মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী হিলির আশেপাশে বেশ কিছু অভিযান চালায়। ৭১ মাউন্টেন ব্রিগেড তাঁদের দুটি ব্যাটালিয়ন আর মুক্তিবাহিনীর একটি ব্যাটালিয়ন নিয়ে ২৭ নভেম্বর পঞ্চগড় দখল করে। এরপর তারা সমন্বিতভাবে শত্রুর কোনো প্রতিরোধ ছাড়া দখল করে নেয় ঠাকুরগাঁও জেলাও। ৩ ডিসেম্বর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যৌথ বাহিনীর ২০২ ও ৬৬ মাউন্টেন ব্রিগেড হিলি-গোবিন্দগঞ্জ অক্ষ ধরে অগ্রসর হয়। কিন্তু দেবগঞ্জ ও গোবিন্দপুরে শত্রু বাহিনীর কঠিন প্রতিরোধের সম্মুখীন হলে তারা অভিযান পরিকল্পনায় ইস্তফা দেয়। এদিকে ৫ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর তিনটি রেজিমেন্ট চরখাই দখল করে নেয়। এদিন হিলি বন্দর দিয়ে ঢুকতে থাকে এক ভারতীয় ট্যাংক বহরও। ফলে যৌথবাহিনী হয়ে ওঠে আরো বেশি শক্তিশালী। গোটা অঞ্চল সম্পূর্ণ দখলের উদ্দেশ্যে যৌথ বাহিনী একটি ত্রিমুখী আক্রমণ চালালে, তার অংশ হিসেবে আব্দুল্লাপুর ও গাইবান্ধাকেও তারা সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত করে ফেলে। অতঃপর যৌথবাহিনী পলাশবাড়ি পর্যন্ত শত্রুমুক্ত করে এবং তাঁদের অগ্রাভিযান অব্যাহত রাখে।

ভারতীয় আর্টিলারি ও সাঁজোয়া বাহিনীর
এ যুদ্ধে বিশেষ ভূমিকা ছিল ভারতীয় আর্টিলারি ও সাঁজোয়া বাহিনীর; সূত্র: PIB

জেলা ও সেক্টর-ভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইসমুহ 

৮.

হিলির চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হয় ১০ ডিসেম্বর। এদিন হিলি থেকে ঘোড়াঘাটের পথ উন্মুক্ত করার নিমিত্তে ২০২ মাউন্টেন ব্রিগেড চাঁদপুর, হাকিমপুর ও ঘোড়াঘাটে ঘাঁটি গাড়া শত্রুদের অবস্থান দখলের পরিকল্পনা করে। এ লক্ষ্যে ৮ গার্ড রেজিমেন্ট চাঁদপুর ও হাকিমপুর থেকে শত্রুদের বিতাড়িত করে। ভারতীয় বাহিনীর একটি কোম্পানি ডেঙ্গাবাড়ি শত্রুদের ঘাঁটিতে অনুপ্রবেশ করে আক্রমণ পরিচালনা করে। দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি যুদ্ধের শেষে অবশেষে ১১ ডিসেম্বর বিকেলের দিকে যৌথ বাহিনী হিলি দখল করে নেয়।

মিত্রবাহিনীর সাথে করমর্দন করছেন ইন্দিরা গান্ধী
মিত্রবাহিনীর সাথে করমর্দন করছেন ইন্দিরা গান্ধী; সূত্র: EDTimes

৯.

যৌথ বাহিনীর চাপের মুখে ১১ ডিসেম্বর পাক হানাদাররা তাঁদের গোবিন্দগঞ্জের ঘাঁটিও পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়। গোবিন্দগঞ্জ দখল শেষে যৌথ বাহিনী করতোয়া নদী পার হয়, এবং ১২ ডিসেম্বর তারা মহাস্থানে করতোয়ার উপর নির্মিত ব্রিজটি দখল করে নেয়। সব মিলিয়ে চতুর্দিক থেকে পাক বাহিনীর উপর ক্রমাগত চাপ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে রংপুরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে ২৩ ব্রিগেডের যাবতীয় যোগাযোগ বিচ্ছন্ন হয়ে যায়। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় হিলি, ভাদুরিয়া আর জয়পুরহাটে পাক বাহিনীর ২০৫ ব্রিগেড। তবু সর্বশক্তি দিয়ে তারা বগুড়ায় অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা চালায়। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হয় না। সবদিক থেকেই যোজন যোজন ব্যবধানে এগিয়ে ছিল যৌথ বাহিনী। যৌথবাহিনীর সৈন্যরা রকেট, বন্দুক ও ১০০ পাউন্ডের বোমায় সজ্জিত ভারতীয় বিমানবাহিনীর কাছ থেকে সাহায্য লাভ করছিল। এছাড়া তাদের নিজেদেরও ছিল অত্যাধুনিক ট্যাংক ও মিডিয়াম গান। স্থানীয় সমর্থনও যৌথবাহিনীর জন্য যুক্ত হয়েছিল এক বাড়তি সংযোজন হিসেবে। এই সবকিছুর সমন্বয়ে মুহুর্মুহু আক্রমণের মাধ্যমে তারা শত্রুর কফিনে শেষ পেরেকটি গেঁথে দেয়। অপরদিকে যৌথ বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর মিঠাপুকুর দখলের মাধ্যমে রংপুর বিজয়ও চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন করে।

ভারতীয় ট্যাংক
৫ ডিসেম্বর হিলি বন্দর দিয়ে ঢুকতে থাকে ভারতীয় ট্যাংক; সূত্র: Kind courtesy, The Madras

বিদেশিদের চোখে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইসমুহ 

১০.

হিলির যুদ্ধে উভয় পক্ষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। কিন্তু তারপরও দুই পক্ষই যে হার-না-মানা মানসিকতা দেখিয়েছিল, তা অতুলনীয়। ফলে উভয় পক্ষের সেনারাই নিজ নিজ দেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা লাভ করেন। এ যুদ্ধে একক সাহসিকতা প্রদর্শনের জন্য দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা বীর উত্তম পদকে সম্মানিত হয়েছিলেন মেজর কাজী নূরুজ্জামান। কিন্তু লাখো শহীদ মুক্তিসেনার প্রতি সম্মান রেখে এই পদক প্রত্যাখান করেছিলেন তিনি। কোনোদিন কোনো সম্মাননাও তিনি গ্রহণ করেননি। এছাড়া এই যুদ্ধের সুবাদে বিভিন্ন গৌরবময় সম্মাননা পেয়েছিলেন ভারত ও পাকিস্তানের সেনারাও।

ভারতীয় সেনাবাহিনী
সাহায্য মিলেছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর থেকেও

১১.

সত্যিকারের যুদ্ধ যাকে বলে, তার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল হিলির যুদ্ধেই। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলকে কেন্দ্র করে কীভাবে গোটা একটি অঞ্চলের দখলদারিত্বও নিয়ে নেয়া যায়, সেটিরও দেখা পাওয়া গিয়েছিল এই যুদ্ধেই। বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি ভারতীয় মিত্রবাহিনীরও যে অশেষ অবদান ছিল, সে সাক্ষ্যও বহন করে এই যুদ্ধ। তাই সংঘর্ষপূর্ণ ও রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধ কোনোদিন ভোলার নয়। যতদিন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চিত হবে, এক চিরন্তন রাজতিলক দীপ্ত হবে হিলির যুদ্ধের কপালে।

হিলির যুদ্ধে বিজয়
হিলির যুদ্ধে বিজয় প্রসারিত করেছিল বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয়ের সম্ভাবনাও; সূত্র: Anwar Hossain Foundation

মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনা বিষয়ক বইসমুহ 

তথ্যসূত্র

১। হিলির যুদ্ধ – সংগ্রামের নোটবুক – লিঙ্ক: https://songramernotebook.com/archives/79131

২। অন্তিক ভাইয়ের দেয়া বই

৩। হিলির দুর্গ ভাঙ্গতে ভুল সমরকৌশল – ইকরাম-উদ দৌলা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম – লিঙ্ক: https://www.banglanews24.com/seventy-one/news/bd/540766.details

৪। No. 37 Squadron (Black Panthers) – Archive.org – Link: https://web.archive.org/web/20060116062602/http://www.indianairforce.nic.in/afsqnn37.htm

Shajjadul Islam

Shajjadul Islam

Published 06 Jan 2020
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png