জ্যাঁ পিঁয়াজের মতবাদ: যেভাবে শিশুর বুদ্ধিমত্তার বিকাশ হয় (পর্ব ০১)

jean piaget

শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশের প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণায় সুইজারল্যান্ডের মনোবিজ্ঞানী জ্যাঁ পিঁয়াজে অমর হয়ে রয়েছেন। জন্ম থেকে শিশুদের বুদ্ধির বিকাশ কিভাবে হয়, কিভাবে সে চারপাশের প্রকৃতি থেকে জ্ঞান লাভ করে, সেই জ্ঞানের সাথে বড়দের জ্ঞানের পার্থক্য কী, আনুষ্ঠানিক লেখাপড়ায় এই জ্ঞানীয় উপাদানগুলো কিভাবে প্রভাব ফেলে- তা নিয়েই গবেষণা করেছেন। তিনি ১৯৩০ সালে International Bureau of education এর ডিরেক্টর হিসেবে নিযুক্ত হন। তাঁর কালজয়ী মতবাদ Piaget’s theory of cognitive development এখনও বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। জ্যাঁ পিঁয়াজের বিভিন্ন মতবাদ ও গবেষণাগুলো ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে এখানে-

’জ্ঞানের’ কি কোন আকার-আকৃতি-অবয়ব কল্পনা করা যায়? ‘জ্ঞান’ শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে এ্যাবস্ট্রাক্ট কিছুর ছবি ভেসে উঠে। জ্ঞান যেহেতু একটি বিমূর্ত ধারণা আবার জ্ঞানের কাঠামোকে ধারন করতে না পারলে তার পরিবর্তন বা পরিবর্ধনও বোঝা যাবে না।

জ্ঞানের এই কাল্পনিক কাঠামো আসলে এক ধরনের সিঁড়ি, যার সাহায্যে এর প্রকৃতি বোঝা যায় এবং নতুন জ্ঞান তৈরির জন্য এই কাঠামোর কতটা পরিবর্তন হচ্ছে তা যাচাই করা যায়। পিঁয়াজে মানুষের জ্ঞানের একটি অবয়ব কল্পনা করে তার গঠন ও বিকাশের ধারণা উপস্থাপন করেন।

তার মতে, শিশুর জ্ঞান বয়সের সাথে সাথে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ হয় এবং জ্ঞানই তার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। শিশুর জীবনে অর্জিত এই জ্ঞানীয় কাঠামোর কয়েকটি নির্দিষ্ট স্তর রয়েছে। বুদ্ধিমত্তা বিকাশের এ সকল স্তরের প্রত্যেকটির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে, এক সিঁড়িতে পা রেখে যেমন আরেকটি সিঁড়ির নাগাল পাওয়া যায়, তেমনি এখানেও একটি স্তরের সমাপ্তির পরে আরেকটিতে যাওয়া যায়। একটির সাথে অপর স্তরের বিশেষ গুণগত পার্থক্য রয়েছে।

আগে যেমন মনে করা হতো, শিশুরা পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির ক্ষুদে সংস্করণ, আসলে তেমনটি নয়। শিশুরা এক একটি বয়সে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তিত্বে সমৃদ্ধ। একটি নিষিক্ত ডিম্বানু থেকে সময়ের সাথে সাথে পর্যায়ক্রমে বড় হয়ে ওঠে মানব-শিশু। এরই সাথে মিল রেখে পিঁয়াজে শিশুর বুদ্ধিমত্তা বিকাশকেও কতকগুলো পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন। বিভিন্ন বয়সে শিশু বিভিন্ন পর্যায়ে অবস্থান করে।

পিঁয়াজে শিশুর বুদ্ধিমত্তার বিকাশকে মোট চারটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন। প্রতিটি ভাগের জন্য নির্দিষ্ট বয়স চিহ্নিত করেছেন। সব শিশুর জীবনেই পিঁয়াজের চিহিত এই স্তরগুলো দেখতে পাওয়া যায়, তবে কিছু কিছু শিশুর বেলায় সময়কালের তারতম্য ঘটে। বুদ্ধিমত্তা বিকাশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তর অনুযায়ী শিশুর বয়সের তারতম্য হলেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে, সবাইকেই এই স্তরগুলো পর্যায়ক্রমে অতিক্রম করতে হয়, কোনটি বাদ দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

পিয়াজের মতে শিশুর জ্ঞান বিকাশের এই চারটি স্তর

১. ইন্দ্ৰীয়-পেশীয় সমন্বয় কাল (Sensorimotor Period) : জন্ম থেকে ২ বৎসর

২. প্রাক প্রায়োগিক কাল (Pre-operational Period) : ২ থেকে ৭ বৎসর

৩. বাস্তব প্রায়োগিক কাল (Concrete operational Period) : ৭ থেকে ১১ বৎসর

৪. রীতিবদ্ধ প্রায়োগিক কাল (Formal operational Period): ১১ থেকে ১৫/১৬ বৎসর

শিশুর জীবনের এই পরিবর্তনগুলো বয়স অনুযায়ী ঘটতে থাকে; তবে এক্ষেত্রে পরিবেশ ও জৈবিক-সামাজিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। পিঁয়াজে এই প্রতিটি স্তরের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেন । শিশুরা তাদের বয়সের সাথে সাথে জ্ঞানীয় কাঠামোর কোন স্তরে অবস্থান করছে, তা প্রকাশিত এই লক্ষণগুলো দেখে বলা যায়।

বয়স অনুযায়ী শিশুর যে স্তরে থাকা উচিত, শিশুর বুদ্ধিমত্তা সেই স্তরেই থাকবে এমন কোন কথা নেই। কিছু শিশুর মধ্যে সবসময় বয়স উপযোগী স্তরের লক্ষণ দেখা যায় না । কারো কারো ক্ষেত্রে ঠিকমত ম্যাচুরিটি হয় না, আবার কেউ কেউ শেখার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ পায় না বলে এমনটি ঘটে। আবার মেধাবী শিশুদের বেলায় বয়স উপযোগী কোন স্তরে পৌছার পূর্বেই তাদের মধ্যে পরবর্তী স্তরের লক্ষণগুলো প্রকাশিত হতে থাকে।

পিঁয়াজে তাঁর জ্ঞানীয় মতবাদ ব্যাখ্যা করার জন্য কতকগুলো মৌলিক টার্ম (term) বা ধারণা প্রবর্তন করেন। তাই তার জ্ঞানীয় মতবাদ বুঝার জন্য এই ধারণাগুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকা আবশ্যক। এখানে প্রয়োজনীয় কয়েকটি মৌলিক ধারণার ব্যাখ্যা দেওয়া হলো-

’স্কিমা’ বা জ্ঞানীয় একক

ছোটবেলায় আমরা বেশিরভাগই বিল্ডিং ব্লক জাতীয় খেলা করেছি। অনেকগুলো রঙ-বেরঙের ব্লক দিয়ে বড় একটা বিল্ডিং অনেক সময় ঘোড়া, পাখি এমন আরও অনেক কিছু বানিয়ে ফেলা ছিলো শৈশবের নিত্যদিনের গল্প। বড় একটা বিল্ডিং তৈরি করতে যেমন অনেকগুলো ব্লক লাগে, তেমনি পিঁয়াজের জ্ঞান বিকাশ তত্ত্বে এমন একটি মৌলিক ধারণা রয়েছে যা অনুভূতি ও আচরণের সমন্বয়। এই ধারণাটির নাম স্কিমা (schema), বহুবচনে হলো schemata।

পিঁয়াজে স্কিমাকে জ্ঞান অর্জনের মানসিক কাঠামো হিসাবে বলেছেন। তাঁর মতে পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়া এবং জ্ঞান অর্জন- এই দুই মিলেই মানুষের প্রকাশ্য আচরণ গঠিত।

নির্দিষ্ট পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে শিশুর স্কিমাটার রিপিট হয়। স্কিমাটা সৃষ্টির ধারাটা কিছুটা এমন যে, শিশু জন্মের সময় যে চোষা, নড়াচড়া করার মতো রিফ্লেক্স নিয়ে জন্মায়।

এগুলো সবই সে জৈবিকভাবেই সম্পাদিত করে। শিশু বারবার এই আচরণগুলো প্র্যাকটিস করার ফলে এগুলোর উপর তার একধরনের দক্ষতা তৈরি হয়।

শিশু যদি তার এই দক্ষতা অন্যান্য পরিস্থিতিতে কাজে লাগাতে পারে তখনই বোঝা যায় যে, শিশুর মধ্যে বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটছে। এই বুদ্ধিগত আচরণই একধরনের স্কিমা। ঘটনাটিকে একটি সাধারণ সমীকরণ হিসাবে দেখা যায় :

জন্মকালীন প্রতিবর্তী ক্রিয়া ও স্বতস্ফূর্ত নড়াচড়ার ক্ষমতার পুনঃপুনঃ ব্যবহারের ফলে সৃষ্টি হয় দক্ষতা। এই দক্ষতাপূর্ণ আচরণের দ্বারাই প্রকাশ পায় বুদ্ধি বা স্কিমা।

কোন খেলনা বিল্ডিং তৈরির জন্য যেমন ব্লকের প্রয়োজন তেমনি বুদ্ধিমত্তা বিকাশের জন্য চাই এমন অসংখ্য স্কিমা। কোন কোন ধারণা সৃষ্টির জন্য এক বা একাধিক স্কিমা প্রয়োজন হয়। আবার একই ধারণার সাথে অতিরিক্ত স্কিমার মিশ্রণে তৈরি হয় নতুন ধারণা। যেমন- শিশুদের চোষা একটি স্কিমা, অনুরূপভাবে ধরা, দেখা, অনুভব করা ইত্যাদি সবই স্কিমার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে ।

নবজাতকের মুখে কিছু দিলে সে তা চুষতে থাকে, হাতে কিছু ধরিয়ে দিলে সেটা আঁকড়ে ধরে। আবার কয়েক মাস বয়স হলে চোখের সামনে কিছু নাড়াচাড়া করলেও সে তার দৃষ্টিকে সেদিকে ঘুরাতে পারে, এসব কিছুই স্কিমার উদাহরণ। পিঁয়াজের মতে শিশুদের স্কিমা তাদের চারপাশের বস্তুর প্রতি এমনভাবে প্রতিক্রিয়া করে, যার অর্থ- আমি বস্তুটিকে চুষতে পারি বা চুষি না, আমি বস্তুকে ধরতে পারি বা ধরি না।

চোষা এবং আঁকড়ে ধরা হলো একধরনের রিফ্লেক্স; কিন্তু পিঁয়াজে এগুলোকে স্কিমা হিসাবে বর্ণনা করেছেন। কারণ রিফ্লেক্সের ধারণা দ্বারা বোঝা যায় যে, শিশুরা উদ্দীপনা না পাওয়া পর্যন্ত কোন প্রতিক্রিয়া করে না। নবজাতকের আচরণ পরীক্ষা করে পিঁয়াজে দেখান যে, শিশু যখন নিজ ইচ্ছায় এ ধরনের আচরণ করে, তখনই তাকে স্কিমা বা জ্ঞানীয় কাঠামোর একক বলা হয়।

এই স্কিমাকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে, যেমন-

১. আচরণগত স্কিমা: শিশুর আচরণে এর বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। যেমন- কোন বস্তুর দিকে এগিয়ে যাওয়া বা না যাওয়া।

২. সাংকেতিক স্কিমা: দুই বছর বয়স থেকে সাংকেতিকভাবে কোন ধারণা প্রকাশ করা যেমন, হাত নেড়ে কাউকে বাই বাই জানানো।

৩. প্রায়োগিক স্কিমা: কর্মদক্ষতা প্রকাশক কোন স্কিমা যেমন, শিশু ৪-৫ বছর বয়স থেকে জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালতে পারে।

পরবর্তী পর্বে পিঁয়াজের জ্ঞান বিকাশ তত্ত্বের আরও কিছু মৌলিক ধারণা নিয়ে আলোচনা করা হবে।

প্যারেন্টিং-এ সহায়ক নির্বাচিত কিছু বই

১) তোত্তোচান: জানালার ধারে ছোট্ট মেয়েটি (শিশুদের প্রাইমারি শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে লেখা)
২) প্যারেন্টিং (এই আধুনিক যুগে আমার সন্তানকে কিভাবে মানুষ করবো)
৩) মনকাহন -২য় খণ্ড (পাওয়ার অফ পজেটিভ প্যারেন্টিং)
৪) স্মার্ট প্যারেন্টিং উইথ মুহাম্মাদ (সা.) (সন্তান প্রতিপালনের নববি কর্মকৌশল)

প্যারেন্টিং নিয়ে সেরা বইগুলো দেখুন

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Published 05 Dec 2018
Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png