পদ্মা সেতুর নির্মান কাজ প্রকৌশলগতভাবে কত জটিল?

padma bridge

পদ্মা সেতু বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় একটি স্থাপনা হিসেবে নির্মিত হচ্ছে। স্বভাবতই এর নির্মাণকাজ সম্পর্কে মানুষের কৌতূহলের অন্ত নেই। বিশেষভাবে সেতুটির নির্মাণকাজের সময় কি কি প্রকৌশলগত জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং তা সমাধানে কি ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, এ সম্পর্কিত জিজ্ঞাসা প্রায় সকলেরই। পদ্মা সেতু বইটিতে এসব প্রশ্নের সহজবোধ্য উত্তর দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সেতুটি যে স্থানে নির্মিত হবে তার মাটির স্বরূপ কিভাবে এর নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তা তুলে ধরা হয়েছে।

যে মাটির উপরে সেতু বানানো হবে তার গুণাগুণ কেমন বা মাটিটা আসলেই সেতুর পুরো ওজন বহন করতে পারবে কিনা এ ব্যাপারগুলো সেতু নির্মাণের পূর্বে জানা বেশ জরুরি। ভূমিকম্পের সময় মাটিটা কেমন আচরণ করবে, পদ্মা সেতুর এলাকায় যেরকম ভূমিক্ষয় হয় (৬৫ মিটার গভীরতা পর্যন্ত মাটি ধুয়ে নিয়ে চলে গেছে নদী!) সেক্ষেত্রে ভূমিক্ষয়ের আগে ও পরে মাটির আচরণ একই থাকবে, নাকি আগে একরকম পরে অন্যরকম হবে এ ধরনের অনেকগুলো বিষয় সামনে চলে আসে। সেতুর জন্য কোন স্থান নির্বাচন করা উচিত তা নির্ধারিত হওয়ার ক্ষেত্রেও মাটি পরীক্ষা করা (Geotechnical Investigation) খুব জরুরি। পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে ভূমিকম্পের সময় যে ঘটনাটির কারণে সেতুর বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে তা হলো ‘লিকুইফ্যাকশন’ (Liquefaction)। প্রথমে বিষয়টির সাথে পরিচিত হওয়া যাক।

লিকুইফ্যাকশন বা মাটির তরল আচরণ

মাটির কণার ফাঁকে ফাঁকে প্রচুর পরিমাণ পানি থাকে। পানিটা মাটির একদম পৃষ্ঠেও থাকতে পারে আবার কিছুটা নিচে বা গভীরেও থাকতে পারে। কোনো স্থাপনা নির্মাণ করার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম মাটি পরীক্ষণের সময় এটা নির্ণয় করার চেষ্টা করা হয় যে মাটির নিচে পানি কোথায় বা কত গভীরতায় আছে। কৃষিকাজের বেলায় মাটির ভিতর পানি থাকা আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ হলেও স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। মাটিতে যদি পানি না থাকতো, আজকের দিনের অনেক জটিল ও দুরূহ স্থাপনার কাজ অতি সহজেই করে ফেলা যেতো। সয়েল মেকানিক্সের জনক হিসেবে পরিচিত প্রকৌশলী কার্ল তেরজাঘির এ ব্যাপারে বেশ জনপ্রিয় একটি উক্তি আছে :

‘প্রকৌশল চর্চায় মাটির কারণে তৈরি হওয়া প্রতিবন্ধকতাগুলো প্রায় সম্পূর্ণতই মাটির নিজের কারণে না, বরং তা হয় মাটির শূন্যস্থানে ধারণ করে রাখা পানির কারণে। পানিশূন্য একটি গ্রহে মাটি প্রকৌশলবিদ্যার কোন প্রয়োজনই থাকবে না’

In engineering practices, difficulties through soils are almost exclusively not due to soils themselves but to water contained in their voids. On a planet without any water there would have been no need for Soil Mechanics.

প্রত্যেক জায়গার মাটির একটি নিজস্ব ওজন নেয়ার সক্ষমতা থাকে। যদি মাটিকে এর চেয়ে বেশি পরিমাণ ওজন দেয়া হয়, সে তা বহন করতে পারবে না; স্থাপনা ধসে পড়বে। এখানেও একটি ঝামেলা আছে। মাটির ওজন নেয়ার ক্ষমতা (Load Bearing Capacity) আবার একেক সময় একেক রকম হতে পারে। তার মানে, যে মাটি আজকে ছয় তলা বিল্ডিংয়ের সমান ওজন নেয়ার সামর্থ্য দেখালো, আজ থেকে ২০ বছর পরেও সে সমপরিমাণ ওজন নিতে পারবে, এমনটা আশা করা যায় না। মাটির এ ক্ষমতা সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হতে পারে। এর পিছনে কোনো একটি নিয়ামক থাকা আবশ্যক। মাটির অভ্যন্তরস্থ পানি এর একটি বড় নিয়ামক হতে পারে। পানি যদি বেশি পরিমাণে মাটির মধ্যে উপস্থিত থাকে তাহলে তার ওজন নেয়ার ক্ষমতা কম থাকে।

ffty
চিত্রঃ সয়েল মেকানিক্সের জনক হিসেবে পরিচিত কার্ল ভন তেরজাঘি (সূত্রঃ উইকিপিডিয়া)

পানি না থাকলে মাটি সাধারণত বেশি ওজন নিতে পারে। তার মানে মাটির মধ্যে পানির উপস্থিতি স্থাপনার জন্য মোটেও ভালো কিছু নয়।

এবার বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটু ব্যাখ্যা করি। যদিও এই আলোচনা পদ্মা সেতুর সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয় তবুও আশা করি এটা লিকুইফ্যাকশনের বিপদটা বুঝতে সাহায্য করবে। আমাদের দেশের অনেক জায়গাতেই জলাভূমি দেখা যায়। নগরায়নের একটি পর্যায়ে এসে ঢাকা শহর যখন বিস্তৃত হতে শুরু করে, জলাভূমিগুলোকে ভরাট করে দালানকোঠা বানানো শুরু হয়। ভরাট করার কাজে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয় বালু; কিছু জায়গায় মাটিও ব্যবহার করা হয়। এটাকে বলা হয় ‘হাইড্রলিক ফিল’ (Hydraulic Fill)। পানির উপরে মাটি বা বালু ঢেলে দালান বানানোর উপযোগী করা হয়।

ধরি উপরে মাটি বা বালু আছে আর নিচে পানি; এমন সময় ভূমিকম্প হলো। দৃশ্যপটটি আরো ভালোভাবে বোঝার জন্য একটি ছোট ঘটনা দিয়ে চিন্তা করি। ধরি আধা গ্লাস দুধের মধ্যে প্রচুর পরিমাণ বার্লি এমনভাবে ঢেলে দেয়া হলো যাতে বাকি অর্ধেক গ্লাস বার্লি দিয়ে পূর্ণ হয়ে যায়। বার্লি দুধের সাথে এখনো দ্রবীভূত হয়নি; দুধের উপরে গুঁড়ো অবস্থায় ভেসে আছে। চামচ দিয়ে না নেড়ে বা গ্লাসটাকে একটুও না নাড়িয়ে রেখে দিলে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বার্লি দুধের ওপরে ভেসে থাকবে। যেই না গ্লাসকে ডানে-বামে (অর্থাৎ মাটির সাথে সমান্তরালে বা আনুভূমিকভাবে; যেভাবে ভূমিকম্পের সময় ঘরবাড়ি নড়তে থাকে) নাড়াতে শুরু করা হবে তখনই বার্লি নিচের দুধের সাথে মিশে গিয়ে তরলের মতো আচরণ শুরু করবে।

মাটি হচ্ছে অনেক দিক দিয়ে এমন বার্লির মতো। ভূমিকম্প আসার আগ পর্যন্ত কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু কম্পন একবার শুরু হলে তা নিচের পানির সাথে মিশে গিয়ে তরলের মতো আচরণ শুরু করবে। এমনিতে মাটি কঠিন পদার্থ। এভাবে পানির সাথে যখন সে মিশে যায় তখন মাটি তরলের মতো আচরণ শুরু করে। মানে এ সময় মাটির উপরে বাড়ি বানানো আর পানির উপর বাড়ি বানানো একই কথা। মাটির এরূপ তরল আচরণকেই বলা হয় লিকুইফ্যাকশন। এ ধরনের ত্রুটিপূর্ণ মাটি কি পদ্মা সেতু থেকে আসা এতো বিশাল পরিমাণ ওজন নিতে পারার ক্ষমতা রাখে? মোটেই না।

tger
চিত্রঃ ভূমিকম্পের পর তরল মাটির ভিতর ঢুকে যাওয়া একটি বাড়ি (সূত্রঃ ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি প্রেস)

পদ্মা সেতু লিকুইফ্যাকশন

একটি জায়গার মাটি এভাবে তরলীকৃত হয়ে যাবার প্রবণতা কতটুকু দেখায় কিংবা কোনো জায়গার মাটিতে লিকুইফ্যাকশন হবার সম্ভাবনা আসলে কতটুকু আছে, এর পরিমাপকে বলা হয় ‘লিকুইফ্যাকশন পোটেনশিয়াল’ (Liquefactiuon Potential)। পদ্মা সেতুর যে চারটি স্থান প্রাথমিকভাবে সম্ভাব্যতা অধ্যয়নের জন্য নির্বাচন করা হয় তার মধ্যে মূল দুইটি স্থান ছিল পাটুরিয়া-গোয়ালন্দ ও মাওয়া-জাজিরা। এদের মধ্যে পাটুরিয়া-গোয়ালন্দে লিকুইফ্যাকশন পোটেনশিয়ালের অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও মাওয়া-জাজিরা প্রান্তে কোনো প্রকার লিকুইফ্যাকশন পোটেনশিয়ালের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। মাওয়া-জাজিরা প্রান্তের মাটিতে অনেকটা ক্লে (Clay) বা সিল্ট (Silt) ধরনের ২০% এর বেশি ‘সূক্ষ্ম কণা’ (Fine particles) পাওয়া গেছে যা নির্দেশ করে এই জায়গার মাটিতে খুব মিহি মাটির কণার পরিমাণ বেশি। এরা নিজেদের মধ্যে খুব শক্ত বন্ধন ধরে রাখার কারণে লিকুইফ্যাকশনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা কম থাকে।

পদ্মা নদীতে প্রচুর পরিমাণে নদীর তলদেশ থেকে ভূমিক্ষয় হয় যাকে Scouring বলে। লিকুইফ্যাকশন পোটেনশিয়াল মাপতে গেলে শুধুমাত্র Scouring এর আগে মাপলেই হবে না (এটাকে Pre-scouring case বলে)। মাটি ক্ষয়ে নিয়ে যাবার পরেও একবার লিকুইফ্যাকশন পোটেনশিয়াল মাপতে হবে (একে Post-scouring case বলে)। দুই ক্ষেত্রের যে কোনো এক ক্ষেত্রে যদি লিকুইফ্যাকশন পোটেনশিয়াল পাওয়া যায় তাহলেই সেটা পদ্মা সেতুর জন্য অনেক বেশি মারাত্মক হয়ে উঠবে। পাটুরিয়া-গোয়ালন্দ সাইটে এই দুই ক্ষেত্রেই লিকুইফ্যাকশন পোটেনশিয়াল পাওয়া গিয়েছিল যা এই সাইটের পরিবর্তে মাওয়া-জাজিরাকে বেছে নেয়ার পিছনে অন্যতম কারণ।

পদ্মাসেতুর কারিগরি দিক নিয়ে লেখা প্রথম বই পড়ুন

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Published 05 Dec 2018
Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png