মহাদেশ-মহাকালঃ নতুন এক গল্পের বিন্যাসে

মহাদেশ-মহাকাল

মানব জীবনের প্রতিটি ধাপে ছড়িয়ে থাকে রং-বেরঙের গল্প। একেক জীবন যেনো একেক গল্পতরী। জীবন নামক সেই নৌকো কোথায় গিয়ে ঠেকে তা কেউ জানে না। অজানা দেশ, অজানা মানুষ, অজানা আবেদন মানুষের কাছে ম্যাজিকের মতো কেমন চেনা হয়ে যায়! স্মৃতির পাহাড় দীর্ঘতর হয়। ভাবনার জগত হয় বিস্তৃত। জীবনে আসে পরিবর্তন। পরিবর্তিত মানুষ ছুটে চলে সমস্ত অনিশ্চয়তা ঠেলে আগামীর পথে। কখনও বাধ্য হয়ে, আবার কখনও ভাগ্য সয়ে চলে এই ছুটোছুটি। এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে কিভাবে ছুটে চলে মানুষ! আর  কিভাবেই বা সে হয়ে উঠে নিষিদ্ধ গল্পের অংশ? সেই জীবনের গল্প বলা আছে “মহাদেশ-মহাকাল” উপন্যাসে।

            ভাগ্যের অন্বেষণে বাংলাদেশের নিঝর নামের এক তরুণ যায় ইতালির একটি ছোট শহর রিমিনিতে। ঘটনাক্রমে সেখানে বিশ্ববিখ্যাত প্রসাধনী সামগ্রী ম্যাকের এক সুন্দরী বিক্রয়কর্মী তাতিয়ানার সাথে তার পরিচয় ঘটে, যে কিনা আত্মহত্যা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু কী সেই কারণ? সেটি জানতে বাংলাদেশী তরুণের আগ্রহের সীমা নেই। সেটা জানতেই, নিঝর জোঁকের মতো লেগে থাকে তাতিয়ানার সাথে। এক সময় তাতিয়ানা আর নিঝরের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব হয়। জীবনকে ভিন্নভাবে দেখতে শুরু করে তাতিয়ানা। তাতিয়ানা মৃত্যুকে ভয় পাওয়া শুরু করে। জীবনকে ভালোবাসতে শিখে। কিন্তু সবার  সামনে ধীরে ধীরে চলে আসে এক বাংলাদেশীর সংস্পর্শে বদলে যাওয়া ইতালীয় নারীর নীল জীবন-সংগ্রামের গল্প। মাফিয়া, যৌনাচার সব মিলে তাতিয়ানার জীবন মোড় নেয় অন্যদিকে। এক সময় তাতিয়ানাকে অপহরণ করে মাফিয়া চক্র। বিচ্ছেদ ঘটে নিঝর আর তাতিয়ানার। ইতালির বিভিন্ন শহরের আশ্রয়ে শুরু হয় নিঝর আর তাতিয়ানার ভিন্নগল্প। একেকটি ধাপে একেকভাবে এগুতে থাকে কাহিনী। কিন্তু সবার মধ্যে এমন একটা সাঁকো থাকে যা দিয়ে শুধু সামনে হাঁটা যায়। দুর মহাদেশে নিঝর ছুটে চলে অনিশ্চিত পথে। যে পথ মোটেও সহজ নয়। উপন্যাসের প্রথম পর্বের ইতি ঘটেছিলো এভাবেই।

            সত্যি বলতে কী, পরের গল্পটা পাঠকের। তারা বিভিন্ন মাধ্যমে আমাকে উপন্যাসটিকে বর্ধিত আকারে প্রকাশের জন্য অনুরোধ করতে থাকে। প্রতিনিয়ত বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে মহাদেশ-মহাকাল নিয়ে তাদের ভালো লাগার কথা জানায়। এই উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে আমি ইতালির বিভিন্ন শহরে ঘুরেছি। একবার, দুবার না। বেশ কয়েকবার। আমি দীর্ঘ সাড়ে চার বছর সময় দিয়েছি এই উপন্যাসটি লেখার জন্য। যখন প্রথম পর্বটি লেখা শেষ হয়, তখন আমার মনেও প্রশান্তি ছিল না। সব সময় একটা অতৃপ্তির ঢেকুর আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো। কেন জানি মনে হচ্ছিলো, এটি আরো দূরে যাবার কথা। সত্যি বলছি, তখনও আমি জানতাম না, মহাদেশ-মহাকাল ঠিক কোথায় যাবার কথা। কিন্তু সব সময় মনে হতো এটি আরো এগুবে। এগুতেই  থাকবে। এক সময় হয়তো আমার গল্প লেখা শেষ হবে। কিন্তু অনন্তকাল ধরে চলতে থাকবে মহাদেশ-মহাকাল। মহাকাল হয় তো এ-গল্প গর্ভে ধারণ করবে, হয়তো করবে না। কিন্তু সময়ের এধাপে মহাদেশ-মহাকাল পাঠকের দারুণ ভালোবাসা পেয়েছে। যার প্রমাণ হলো, এই উপন্যাটি ঘিরে আসা অসংখ্য রিভিউ। এই বইয়ের শেষে একটি পরিশিষ্ট অংশ জুড়ে দেয়া হয়েছে। যেখানে প্রথম পর্বের ওপরে পাঠকের কিছু চমৎকার রিভিউ স্থান পেয়েছে। প্রায় প্রতিটি রিভিউতে আছে উপন্যাসটিকে বাড়ানোর ইঙ্গিত। আর হয়তো একারণেই বইটির প্রকাশক অচিন্ত চয়নও আমাকে আমাকে মহাদেশ-মহাকালের বর্ধিত সংস্করণ আনার জন্য অনুরোধ করতে থাকে। আমি খেয়াল করে দেখেছি, আমার ভেতরের চাওয়াটাও পাঠক আর প্রকাশকের সাথে মিলে যাচ্ছে। তাই আমি আবারো লেখা শুরু করি। কিন্তু এই লেখাটা এগুতে থাকে ধীরে ধীরে। কারণ, শুরু থেকেই এই বইটি লেখা আমার জন্য একদম সহজ ছিল না। অনেক কিছু পড়তে হয়েছে। জানতে হয়েছে। এরপর লিখতে হয়েছে।

book_image
BUY NOW
           মহাদেশ-মহাকাল নিয়ে আরকানুল ইসলাম সৌরভ নামের একজন প্রিয় পাঠকের রিভিউ ছিল এমন-

মহাদেশ-মহাকাল উপন্যাসে আমাদের বৈশ্বিক সমাজের না বলা এক চরম সত্যকে নিখুঁতভাবে সবার সামনে তুলে এনেছেন লেখক সাজ্জাক হোসেন শিহাব। উপন্যাসের নায়িকা ইতালীয় যুবতী তাতিয়ানা, নায়ক প্রবাসী এক বাঙালি নিঝর, মাফিয়া দলের সদস্য ফেব্রিস আর ফেব্রিসের গডফাদার এন্ড্রিউ। এদেরকে নিয়েই দারুণ এক গল্পের বিন্যাসে এগুতে থাকে উপন্যাস মহাদেশ-মহাকাল। উপন্যাসটি পড়লে দেখা যাবে নিঝর নামের একজন বাংলাদেশী যুবক ইতালিতে পাড়ি জমিয়েছেন জীবিকার প্রয়োজনে। সেখানে গিয়ে ভাগ্যক্রমে দৈব্যচক্রে ইতালীয় সুন্দরী যুবতী তাতিয়ানার সাথে তার দেখা মেলে। লেখকের অসাধারণ লেখনির মাধ্যমে উপন্যাসটি দারুণ এক শিল্পরুপ ধারণ করেছে।

নিঝর এবং তাতিয়ানার প্রথম দেখা হয় ইতালির রিমিনিতে অবস্থিত বিশ্ববিখ্যাত প্রসাধনী সামগ্রী ম্যাকের একটি শো-রুমে, তাতিয়ানা ছিলো ম্যাকের একজন বিক্রয়কর্মী। নিঝর সেখানে গিয়েছিল তার বন্ধুর প্রেমিকার জন্য “অটাম পিঙ্ক-৬১১” মডেলের একটি লিপস্টিক কিনতে। তাতিয়ানাকে প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে যায় নিঝরের। কারণ তাতিয়ানার ছিলো মানুষকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখার অসাধারণ এক ক্ষমতা। আর ছিল অপরুপ সৌন্দর্য। এখান থেকেই মূলত গল্পের শুরু। এরপর থেকে তাদের মাঝে যোগাযোগ হতে থাকে। তাতিয়ানা ছিল এতিম। নিঝর ওয়েটার হিসেবে কাজ করত বাংলাদেশী মালিকানাধীন একটি ইতালিয়ান হোটেলে। তাতিয়ানাকে কথার জাদুতে ফেলে নিঝর। আস্তে আস্তে তারা নিজেদের মাঝে ভাল সম্পর্ক গড়ে তুলে। এক পর্যায়ে নিঝর জানতে পারে তাতিয়ানার সাথে ঘটে যাওয়া সব নির্মম ঘটনা। তাতিয়ানার জীবনে তখন একটাই চাওয়া। আর তা হল মৃত্যু! নিঝর, তাতিয়ানার কথাশুনে অবাক হয়ে যায়! নিঝর কিছুতেই বুঝতে পারে না কেন এত সুন্দরী একটা মেয়ে শুধুই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চায়! একদিকে তাতিয়ানা তার মৃত্যুর সময়-স্থান ঠিক করে এবং নিজের মতো করে ঐ সানমারিনো নামক জায়গাতে গিয়েই সে মরতে চায়। অন্যদিকে নিঝর তাকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টায় থাকে। কারণ, নিঝর যে তাতিয়ানাকে কিছুতেই হারাতে চায় না! বড্ড বেশি ভালোবেসে ফেলেছে সে তাতিয়ানাকে। এভাবে বেশকিছু বার মৃত্যুর হাত থেকে তাতিয়ানাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে নিঝর। কি এমন ইতিহাস নিজের মাঝে লুকিয়ে বেঁচে আছে তাতিয়ানা, যার কারণে সে এই বয়সে স্বেচ্চায় মৃত্যু চায়? প্রশ্নটি সারক্ষন নিঝরের মনে ঘোরপাক খায়। কিন্তু তাতিয়ানাকে জিজ্ঞাসা করতে পারে না। কারণ, তাতিয়ানা নিঝরের সাথে কথা বলার আগে একটা শর্ত জুড়ে দিয়েছিলো। আর তা হলো, তাতিয়ানার আত্মহত্যার কারণ যেনো কখনই নিঝর জানতে না চায়। জানতে চাইলে তাতিয়ানা আর কখনই কথা বলবে না নিঝরের সাথে! সেই ভয়ে নিঝর চুপ করে থাকে। আর ভাবে, কিভাবে তাতিয়ানাকে এই মৃত্যুপুরি থেকে ফিরিয়ে আনা যায়। এর মাঝে নিঝর কৌশলে তার নিজের জীবনের গল্প শোনায় তাতিয়ানাকে। বারবার নিঝর তাতিয়ানাকে বোঝাতে চেষ্টা করে, মৃত্যু কোনো সমাধান নয়। জন্মপরিচয়হীন তাতিয়ানা তার কথা এবং ইচ্ছায় অটল থাকে। একটুও সরতে রাজি নয় সে। তবুও বারবার চেষ্টা করতে থাকে নিঝর।

শত চেষ্টার পর একদিন নিঝর, তাতিয়ানাকে সেই মৃত্যুপুরি থেকে বের করে নিয়ে আসে। তাতিয়ানার মুখ থেকে বের করে ফেলে সেই লুকানো ইতিহাস, যা কিনা একটি সাগর ও ভেনিস নামক শহরকে ঘিরে। নিঝর কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারে না, তাতিয়ানার জীবনের সেই বেদনাদায়ক ইতিহাস! এত সুন্দরী একজন মেয়ের জীবনে ইতালির মতো এমন আধুনিক দেশে এমন ঘটনা ঘটতে পারে কিভাবে! এই জীবনের নাম নীল জীবন। তাতিয়ানার জীবনের গল্প শুনে নিঝর পরিচিত হয় ফেব্রিস, এন্ড্রিউ নামদ্বয়ের সাথে। তাতিয়ানার নীল জীবন উপন্যাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সবকিছু বুঝতে পেরেও নিঝর, তাতিয়ানাকে নিয়ে ঘর বাধার স্বপ্ন দেখে। কারণ তাতিয়ানা ছিল অত্যান্ত সরল ও প্রশস্ত মনের অধিকারি একজন মানুষ।

অতপর তারা যখন এক হওয়ার জন্য পরিকল্পনা করে, তখন আবার হারিয়ে যায় তাতিয়ানা। সে হারিয়ে যাবার রহস্যজট খোলেনি। নিঝর অপেক্ষা করতে থাকে তাতিয়ানার জন্য। এখনও কি নিঝর অপেক্ষা করছে তাতিয়ানার জন্য? এরপর তাদের আর দেখা হবে কি! তারা কি আবার এক হতে পারবে! নাকি তাতিয়ানা বাধ্য হয়ে চলে গেল তার জীবনের আরও এক নতুন অধ্যায় শুরু করতে? এমন সব অজানা প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আমাদের সামনে হয়তো হাজির হবে মহাদেশ-মহাকাল-এর বর্ধিত সংস্করণ। হয়তো হবেনা। সে প্রশ্নের উত্তর কেবল এমন ভিন্নস্বাদের উপন্যাসের স্রষ্টাই দিতে পারবেন। আমরা শুধু অপেক্ষায় থাকতে পারি। পরিশেষে বলবো বইটা পড়ার সময় আমি যেন একটা মোহের মধ্যে ছিলাম এবং জীবনের কিছু নির্মম সত্যও আমার কাছে উন্মোচন হয়েছে। লেখকের লেখার ধরণ যথেষ্ট সাজানো গোছানো এবং ভালো। খুব ভাল লেগেছে বইটা পড়ে। সবাইকে অনুরোধ রইল বইটি পড়ার জন্য।”

              প্রিয় পাঠকদের অনুরোধে মহাদেশ-মহাকাল-এর বর্ধিত সংস্করণ আসছে।  সাথে অনেক অজানা কথা চলে আসবে এই সংস্করণে। চলে আসবে আধুনিক ইতালির পেছনের কিছু গল্প এবং সমসাময়িক ইতালির এক শ্রেণীর মানুষের কঠিন জীবন-বাস্তবতা। তাতিয়ানা আর নিঝর মিলে পাঠককে নিয়ে যাবে অন্য রকম কিছু অভিজ্ঞতায়। উপন্যাসের এই সংস্করণে হয়তো পাঠক তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে পারবে একটা ভালো সমাপ্তি দেখে। কিন্তু লেখক হিসেবে আমার উপলব্ধি হলো, এমন গল্প বিনি সুতোর মতো এক কালকে অন্য কালের সাথে সংযুক্ত করে দেয়। মানুষের জীবনের আশ্রয়ে মহাকালব্যাপী তার পরিধি। আর এই গল্পগুলো ছড়িয়ে আছে দেশ থেকে মহাদেশে, ছড়িয়ে থাকবে আগামীতে। মহাদেশ-মহাকাল আপনাদের ভালোবাসায় সিক্ত থাকুক সব সময়। অনন্তকাল।

সাজ্জাক হোসেন শিহাব এর বই সমূহ
mahbub setu

mahbub setu

Published 19 Dec 2019
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png