শেখ মুজিবের নয়া চীন : তরুণ নেতার সমাজ ও রাষ্ট্রভাবনা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

১৯৫২ সালের ২-১২ অক্টোবর চীনের পিকিংয়ে এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক শান্তি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৩৭টি দেশ অংশগ্রহণ করে। এই সম্মেলনে তখনকার তরুণ রাজনীতিবিদ শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে পূর্ব বাংলার প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। এই প্রতিনিধি দলে পূর্ব বাংলা থেকে আরও ছিলেন আতাউর রহমান খান, তফাজ্জল হোসেন, মানিক মিয়া সহ পাঁচজন। তখন সদ্য গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে রূপান্তরিত চীন রাষ্ট্র দেখতে অনেকেরই আগ্রহ ছিল। মুজিবও নয়া চীন দেখতে উৎসাহী ছিলেন। তিনি চীনের কথা ভাবতেন। মাওলানা ভাসানী তাকে বলতেন, যদি সুযোগ পাও, একবার চীন দেশে যেও। পাকিস্তান আমলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে কারাগারে রাজবন্দী হিসেবে। কারাগারে থাকাকালীন সময়ের রচনাই বর্তমান আলোচ্য গ্রন্থ ‘আমার দেখা নয়া চীন’। রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪৯ সালের অক্টোবরে গ্রেপ্তার হয়ে ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ অবধি কারাগারে বন্দি থাকেন। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার কিছুকাল পরেই তিনি চীন দেশে ভ্রমণের সুযোগ পান। চীন ভ্রমণের সময় তিনি ছোটখাটো নোট নিয়েছিলেন। যেটি তাকে পরবর্তী সময়ে ‘আমার দেখা নয়াচীন’ রচনাতে সহায়তা করে। পরে ১৯৫৪ সালের ৩০ মে তাকে আবার বন্দী করা হয়। তখনই কারাগারে বসে তিনি চীন ভ্রমণের স্মৃতিনির্ভর এই ভ্রমণ কাহিনীটি রচনা করেন। এই ভ্রমণ কাহিনীতে একই সঙ্গে পাওয়া যায় একজন তরুণ রাজনীতিকের উপস্থিতি, দেশপ্রেম, সৌন্দর্যপ্রিয়তা, প্রকৃতির প্রতি মুগ্ধ দৃষ্টিসম্পন্ন এক বঙ্গবন্ধুকে।

সদ্য বিপ্লবের পরে গণচীনের শাসন ব্যবস্থা ও মানুষের জীবন-যাপন বেশ আগ্রহের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছেন তিনি। মুক্ত মন ও অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে এই বর্ণনা হয়েছে সাবলীল। পরবর্তীকালের একজন সফল রাজনীতিবিদ হিসেবে জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রনায়কের আকাঙ্ক্ষা বোঝা যায় এই রচনা পাঠের মধ্য দিয়ে। যখন চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা নিয়ে তার মতামত ও স্বচ্ছ ধারণা জানা যায়, তখন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এক অসাম্প্রদায়িক নেতার আগমনের বার্তাও টের পাওয়া যায়। শান্তি সম্মেলন উপলক্ষ্যে এই ভ্রমণ শুরুর আগেই তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন। ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের কথা উল্লেখ করেছেন নিজের জীবন অভিজ্ঞতা থেকে। সে ক্ষেত্রে যুদ্ধ ও সংঘাত পরিহার করে শান্তির পথে স্বাধীনতার যাত্রাকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন। আবার পরক্ষণেই বিদেশ ভ্রমণে যাওয়ার জন্য দরকারি পাসপোর্ট বানাতে গিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের কাছ থেকে বৈষম্যের শিকার হওয়ার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেন-

“পাকিস্তান নামটা পেয়েছি; আর কতটুকু স্বাধীন হয়েছি আপনারা নিজের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন।” 

বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে একটি সহজাত রসবোধ ছিল। হংকংয়ের একটি ঘটনার উল্লেখ করলে বিষয়টি বোঝা যাবে-

“আতাউর রহমান সাহেব, মানিক ভাই, ইলিয়াস ও আমি রাস্তায় বেড়াতে বেরিয়েছি। হঠাৎ ১৬/১৭ বছরের একটা মেয়ে আতাউর রহমান সাহেবের কোটে একটা গোলাপ ফুল লাগাইয়া দিতে অগ্রসর হয়। মেয়েটি কলারে হাতও দিয়াছে, খান সাহেব হঠাৎ যেন চমকাইয়া উঠলেন। পরে ধাক্কা দিয়া ফুল ছুঁড়ে ফেলে রাগে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করতে করতে এগিয়ে গেলেন। মেয়েটা আশ্চর্য হয়ে দূরে দাঁড়িয়ে রইল। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, আমাদের মতো যুবকদের দিকে নজর না পড়ে আপনার ওপর পড়ার কারণ কী?’ হংকংয়ে ফুল দেওয়াটা হচ্ছে প্রেম নিবেদন। ফুল পরিয়ে দিয়ে মেয়েটি আসলে বোঝাতে চেয়েছে ও একান্তে সময় কাটাতে চায়, তবে তা অর্থের বিনিময়ে। এরপরেই আবার পাওয়া যায় মানবতাবাদী মুজিবকে ‘এই মেয়েদের দোষ দিয়ে লাভ কী? এই সমাজব্যবস্থা। বাঁচবার জন্য এরা সংগ্রাম করছে, ইজ্জত দিয়ে পেটের ভাত জোগাড় করছে। হায়রে মানুষ!” 

sdf
BUY NOW

এই ঘটনার সঙ্গে তখন তিনি মিল খুঁজে পান নিজ দেশের। ১৯৫২ সালে খুলনার দুর্ভিক্ষের সময় সাতক্ষীরা মহকুমায় যখন মাওলানা ভাসানী সভা করতে যান, তখন গরীব মেয়েরা এসে মাওলানা সাহেবকে বলেছে, “হুজুর, এখন আর কেউ আমাদের ভিক্ষাও দেয় না। তাই স্বামীর অনুপস্থিতিতে ইজ্জত দিয়ে কোনো রকমে এক বেলা বা একদিন পরে একদিন চারটা খাই”। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মধ্যে একটি আদর্শ রাষ্ট্র কাঠামো দাঁড় করানোর যে সদিচ্ছা ছিল, সেটি বোঝা যায় চীনের স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি স্কুল, মসজিদ, প্যাগোডা, শ্রমিকদের বাসস্থান গভীর মনোযোগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করায়। সদ্য স্বাধীন হওয়া চীন দেশের আমূল বদলে যাওয়া দেখে তিনি সেখান থেকে বাস্তব ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। পরবর্তী সময়ে আমরা যখন স্বাধীন বাংলাদেশে শেখ মুজিবের শাসনামলে কো-অপারেটিভ সোসাইটি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা দেখতে পাই, তখন বুঝতে বাকি থাকে না, নয়া চীন থেকে তিনি তখন আসলে একটি রাষ্ট্র গড়ার বীজ বুনতে শুরু করেছেন। চীনাদের সবকিছু জয় করার মনোভাব শেখ মুজিবকে আলোড়িত করেছিল এবং তার মনে গভীর রেখাপাত ফেলেছিল।

বিনা পরিশ্রমে অর্থ উপার্জনে তার ছিল আপত্তি। যারা বিনা কষ্টে বা মূলধনে আয় রোজগার করতেন, দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়তেন, তিনি তাদের ঘৃণা করতেন। এখানে আলোচ্য গ্রন্থ থেকে উল্লেখ করা যায়-“বিনা টাকায় ব্যবসা হয় এটা তো জানতাম না! তবে হয়, আমাদের দেশের পীর সাহেবদের। ফুঁ দিয়া ধর্মের কথা বলে মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বড় বড় ঘর করে ও জমি কেনে, কোনো কাজকর্ম করে না। এটা একটা ব্যবসা।… আর একটা ব্যবসা আছে যেটা বিনা টাকায় হয় সেটা বেশ্যাবৃত্তি করা”। রাষ্ট্রের ও জাতির শুদ্ধিকরণ বিষয়ে তিনি মতামত দিয়েছেন এইভাবে –

“জাতির আমূল পরিবর্তন না হলে দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করা কষ্টকর। নতুন করে সব কিছু ঢেলে সাজাতে হবে। ভাঙা দালানে চুনকাম করে কোনো লাভ হয় না-বেশি দিন টেকে না।”

ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি বিষয়ে ও ধর্মকে নিজের ঢাল হিসেবে ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে বলেছেন,

“মানুষ যদি সত্যিকারভাবে ধর্মভাব নিয়ে চলত, তাহলে আর মানুষে মানুষে এবং রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে এইভাবে যুগ যুগ ধরে সংগ্রাম হত না। কিন্তু মানুষ নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য ধর্মের অর্থ যার যেভাবে ইচ্ছা সেইভাবে চালাতে চেষ্টা করছে।” 

নয়াচীনে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল মাও সে তুং-এর নেতৃত্বে। তার নেতৃত্বের প্রশংসা করতে গিয়ে শেখ মুজিব পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আযমের কথাও বলেছেন। দুঃখ করেছেন কায়েদে আযমের পাকিস্তানে মুসলিম লীগের দুঃশাসন দেখতে হচ্ছে বলে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্বাসী হওয়ায় বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান খুনের পরে শেখ মুজিব নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। আবার দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের বিলাসী জীবন-যাপন নিয়েও তার অসন্তোষ ছিল। শেখ মুজিব ও এক অস্ট্রেলিয়ান প্রতিনিধির আলোচনায় উঠে আসে-‘দেশের লোক না খেয়ে মরে, কাপড় পর্যন্ত জোগাড় করতে পারে না, সেই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও রাষ্ট্রদূতদের খরচ দেখলে লজ্জা হয়’।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মধ্যে ছিল তীব্র দেশপ্রেম। চীনের শান্তি সম্মেলনে বাংলায় বক্তব্য দিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়-

“আমি বক্তৃতা করলাম বাংলায়… দুনিয়ার সব দেশের লোকই যার যার মাতৃভাষায় বক্তৃতা করে। শুধু আমরাই ইংরেজি ভাষায় বক্তৃতা করে নিজেদের গর্বিত মনে করি।”

বইটিতে অসাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার শেখ মুজিবের প্রকাশ পেয়েছে। একই সঙ্গে নিজ দেশকে গড়ার সংগ্রামী প্রত্যয়ও পাওয়া যায়। ‘আমার দেখা নয়া চীন’ বইটিতে যুক্ত হয়েছে ১৯৫২ এর শান্তি সম্মেলনের পোস্টার ও ছবি। এ ছাড়া পরবর্তী সময়ে ১৯৫৬ সালে চীনা বিপ্লবের আরেক কিংবদন্তি চৌ এন লাইম্যাডাম সান ইয়াৎ সেন’র ঢাকায় আগমন উপলক্ষ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ছবি। সবশেষে রয়েছে ১৯৫৭ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বিতীয় বার চীন সফরের আলোকচিত্র। এসব বিবেচনায় এটি একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ হিসেবেও বিবেচিত হবে।

দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় এমন একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ, যেটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালী জাতির ও বাংলাদেশের গর্বের নাম শেখ মুজিবুর রহমান; সেই বইটি প্রকাশে আরও সতর্কতা অবলম্বন করা গেলে ভালো হত। ছাপার ভুল সাদা রং দিয়ে আড়াল করার চেষ্টাটি দৃষ্টিকটু হয়েছে। আশা করব, পরবর্তী সংস্করণে এই সব অসংগতি দূর করা হবে।

লিখেছেনঃ সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক এহ্সান মাহমুদ

 

দেখুনঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর লেখা নতুন বই আমার দেখা নয়াচীন

mahbub setu

mahbub setu

Published 19 Dec 2019
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png