অসমাপ্ত আত্মজীবনী রিভিউ প্রতিযোগ-২০১৬ (২য় পুরস্কার বিজয়ী)

0

288

অসমাপ্ত আত্মজীবনী রিভিউ প্রতিযোগ-২০১৬ (২য় পুরস্কার বিজয়ী)

  • 0
  • #বই রিভিউ
  • Author: rokomari
  • Share

বাংলাদেশ জন্মের ইতিহাসের কষ্টিপাথর-শওকত আলী খান হিরণ

আমাদের সবকিছু যেন অসমাপ্ত থেকে যায়- সুকান্তের কবি জীবন, নজরুলের সংগীত ও কবি জীবন, জহির রায়হান ও তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র জীবন, তেমনি থেকে গিয়েছে পৃথিবীর রাজনীতির কবি জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও আত্নজীবনী। জীবনের চেয়েও আত্নজীবনী হয়েছে আরও সংক্ষিপ্ত ও খন্ডিত। আমরা হয়তো পেতাম ‘এ লং ওয়াক টু ফ্রিডম’, উইংস অব ফায়ার’, ‘এ ডক্টর ইন দ্যা হাউস’ আথবা ‘অডাসিটি অব হোপ’ এর মত আত্নজীবনী। কিন্তু আমরা পেয়েছি ১৯৭৫ পরবর্তী পথ হাড়িয়ে ফেলা অসমাপ্ত বাংলাদেশের মতই ‘অসমাপ্ত আত্নজীবনী’। সত্যিই আমরা বড় দুর্ভাগা জাতি। জাতীর পিতা-বঙ্গবন্ধু ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ আর ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই বলেই বাংলাদেশের ইতিহাস মানেই তাঁর কর্মময়জীবন, আর ইতিহাস গ্রন্থ তাঁর আত্নজীবনী। তাঁর ব্যক্তিগত কাজ-কথা-চিন্তা-পরিকল্পনা-স্বপ্ন-প্রত্যাশা এমনকি সংসার কোন কিছুই শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি, থাকার সুযোগ নেই বা ছিল না বলেই তাঁর সব কিছুই হয়ে উঠেছে মানবজাতী-দেশ-রাষ্ট্র আর একটি স্বাধীন ভূখণ্ড বিণির্মানের জীবন্ত ইতিহাস। তাঁর পেছনে পেছনে চলেছে আমাদের অস্তিত্বের ইতিহাস। রকেট যেমন সাদা পথরেখা ফেলে আকাশে পথ চলতে থাকে, তিনি তেমনি ইতিহাসের পথরেখা তৈরি করে করে সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনের মধ্যদিয়ে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ গন্তবের দিকে দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়েছেন। একান্ত ব্যক্তিগত-শৈশব-বংশপরিচয় বা বিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া সাধারণ ঘটনা ইত্যাদি বর্ণনা করতে গিয়ে এপিজে আবদুল কালাম ‘ইউংস অব ফায়ার’এ যেমন বলেছিলেন ‘অবশ্য পরে আমি বুঝতে পারি এগুলো আসলে প্রাসঙ্গিক … সামাজিক আধেয়র মধ্যে তা নিহিত, তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না’- এধরনের বৈশ্বিক উপলব্ধি আমরা ‘অসমাপ্ত আত্নজীবনী’ তেও দেখতে পাই। ছোট ছোট ঘটনা দিয়ে তাইতো তিনি শুরু করেছেন তাঁর শেকড়ের খবর দিয়ে । মনে হয়েছে এ যেন অ্যালেক্স হ্যালির ‘রুটস্’। সহজ সরল সাবলীল ভাষায় রচিত এ গ্রন্থ পাঠে সহজ থেকে ক্রমাগত জটিল রাজনৈতিক ডামাডোলের ঠিকানা পেতে থাকি। একজন সাধারণ যুবক স্থানীয়ভাবে রাজনীতির সংস্পর্শে এসে কীভাবে ধীরে ধীরে রাজনীতির মূল ধারায় মিশে যেতে থাকে এখানে তার নির্মোহ বয়ান। তিনি যে কাজের সাথে সরাসরি ছিলেন সেটিরই বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু এর মধ্য দিয়েই উঠে এসেছে রাজনীতির মূল স্রতধারার গতিবিধি-ধরন-আদর্শ আর গন্তত্যের ঠিকানা, উঠে এসেছে গ্রামীণ জীবনে রাজনীতির প্রভাব এবং গরিব দুখী মানুষের জীবনে কিভাবে ছাঁপ ফেলতে পারে রাজনীতি। একারণেই হয়তো তিনি হয়ে উঠতে পেরেছিলেন গণমানুষের মুখপাত্র। সময়ের প্রবাহে কীভাবে নেতৃত্ব হাত বদল হয়-হতে থাকে। কেনো হাত বদল হয়, নীতি ও আদর্শের প্রতি অবিচল আস্থা কীভাবে একজন সাধারণকে অসাধারণ করে তোলে, কীভাবে প্রবীণ রাজনীতিকের স্নেহে তৈরি হতে থাকে একজন উদিয়মান রাজনীতির কবি যে হবে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি- এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ উত্তর উপস্থাপিত হয়েছে এই মহানগ্রন্থে। এই জীবনী লিখতেও তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন অনেকের অনুরোধে। তার মানে তিনি যা করেছেন কেবলি সকলের কল্যাণে-চাহিদায়-প্রয়োজনে, এমনিক তার আত্নজীবনী রচনার মত কাজটিও। এ এমন এক গ্রন্থ যেখানে রাজনীতি করার কারণে বাড়িভারা না পাওয়ার মত সামাজিক বেদনা ও বঞ্চনার ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। এরকম রাজনীতির পাশাপাশি অসংখ্য পারিবারিক, সামাজিক গোষ্ঠিগত, আবেগিক, পারিপার্শিক, এমনকি প্রাকৃতিক অনুসঙ্গ উঠে এসেছে একজন সফল রাজনীতিকের দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্য দিয়ে যা গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা-মনন-দূরদর্শীতা সৃষ্টিকরতে সহায়ক। রাজনীতির কোন স্তরই যে সহজভাবে এগোয় না বা কোন সফলতাই বাধা-বিপত্তি-ষড়যন্ত্র-আর্ন্তকোন্দল-রেশারেশি ছাড়া অর্জন হয় না তা এই গ্রন্থের পড়তে পড়েতে ছড়িয়ে আছে। সবকিছুর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর একাগ্রতা, একমুখীতা, স্থির লক্ষ্যের দিকে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়ার যে গতি তা নিবিড়ভাবে সত্য বয়ানে তিনি তুলে ধরেছেন- একজন প্রজ্ঞাবান লেখকের দক্ষতায়। তবুও এ লিখনী তার ৭ ই মার্চের কালজয়ী বক্তৃতাকে ছাঁপিয়ে যেতে পারেনি। তার বক্তৃতা যেমন সকল সেরা উপাদানের সমন্বয়ে হয়ে উঠেছে এক অমর কবিতা-সংগীত-বাণী আর অমিত শক্তির উৎস, এই আত্নজীবনীর ভাষার গাঁথুনি, শব্দ চয়ন, ধারাবাহিকতা ইত্যদিতে সফল হলেও ততটা আলোর ঝলকানি নেই। তবুও বাংলা ভাষায় লিখিত আত্নজীবনীর ঝুড়িতে এটি অনন্য গোলাপ। এই অসমাপ্ত আত্নজীবনীকে তুলনা করা যায় বাংলাদেশের ইতিহাসের ‘আদর্শ একক’ যার সাথে তুলনা করে কেবল অন্যান্য ইতিহাসগ্রন্থের মূল্যায়ন হতে পারে। এ গ্রন্থ পড়তে পড়েত মনে হয়েছে ‘ আবুল মনসুর আহমদ এর ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চার বাছর’ বা সম্প্রতি লিখিত আনিসু্ল হকের ‘যারা ভোর এনেছিল’ ও ‘উষার দূয়ারে’ গ্রন্থের কথা। বিশেষ করে শেষ দুটো গ্রন্থে লেখক অসমাপ্ত আত্নজীবনীর আশ্রয় নিয়েছেন যা সত্যাশ্রয়ী অনবদ্য উপন্যাস বিণির্মানে সহায়তা করেছে। কিন্তু প্রথমোক্তটি সেভাবে রচিত না হলেও বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্নজীবনীর পরের জীবনের অনেক কথা এখানে পাওয়া যায়। আমরা হয়তো জিতে যেতে পারতাম তাঁর পূর্ণাঙ্গ আত্নজীবনী হাতে পেলে। তবে সম্পাদকবৃন্দ তাঁর বাকী জীবনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলেধরে গ্রন্থের উপযোগিতা বাড়িয়ে দিয়েছেন কয়েকশত গুণ। এটি একজন নবীন পাঠকের তৃষ্ণা মেটাতে সক্ষম এবং তাঁর জীবনী নিয়ে ব্যাপক পড়াশোনা ও গবেষণা করতে উৎসাহিত করবে। নির্ঘন্ট একটি গ্রন্থকে গবেষণা কাজে সহজে ব্যবহার উপযোগী করে তোলে। তাই এ ধরনের কষ্টসাধ্য কাজগুলোর জন্য সম্পাদক প্রসংশার পাত্র। সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক সকল আইন যেমন বাতিল হয়ে যায় তেমনি বাংলাদেশের ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে ‘অসমাপ্ত আত্নজীবনী’ র সাথে সংঘির্ষক সকল তথ্য-ইতিহাস বাতিল হয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক, কারণ এর লেখকতো ঘটনারই নায়ক, যে ঘটনাই আমাদের জন্য ইতিহাস, তিনিতো ইতিহাসের নির্মাতা ও নিকটতম দূরত্ব থেকে দেখছেন এবং ইতিহাসের মধ্যে থেকেই লিখেছেন। এ গ্রন্থ তাই ইতিহাসের কষ্টিপাথর।

Write a Comment