অ্যালিস মুনরো : ২০১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী

আলিচ মনরো : ২০১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী

অ্যালিস মুনরো : শৈশবকাল থেকে পড়াশোনার প্রতি আমার আগ্রহ বেড়ে যায়। কারণ, হ্যান্স ক্রিস্টিয়ান এন্ডারসনের দ্য লিটল মারমেইড  গল্পটি আমার পড়ার সুযোগ হয়েছিলো।  গল্পটি সম্পর্কে আপনি জানেন কিনা জানি না।  তবে এটি অত্যন্ত বেদনায়দায়ক একটি গল্প।  ছোট্ট মৎস্যকন্যা এক রাজপুত্রের প্রেমে পড়েছিলো।  কিন্তু সে তাকে বিয়ে করতে পারলো না।  কারণ সে মৎস্যকন্যা !  গল্পটি এতোই বিষয়াদময় যে, পুরো ঘটনাটি আপনাকে বলা আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব।  বলতে গেলেই আমি অঝর ধারায় কাঁদতে থাকি।

গল্পটি পড়া শেষ হলে আমাদের কংক্রিট দিয়ে নির্মিত বাসার বাইরে এসে আমি চারপাশ দেখতে থাকি। আমি গল্পটি পরবর্তীতে আরো এগিয়ে নিয়ে যাই। পরিশেষে মিলনের মধ্যদিয়ে গল্পটির সমাপ্তি টানি। এর কারণ ছোট্ট মৎস্যকন্যা।  গল্পটি আমার মনে এক ধরণের আলোড়ন সৃষ্টি করে, যা সবার ক্ষেত্রে একই ধরণের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না। তবে আমার ক্ষেত্রে এটি ভিন্ন ধরণের সাড়া জাগিয়েছিলো। কিন্তু আমি এক্ষেত্রে উৎকৃষ্টতর দিকটি উপলব্দি করেছিলাম। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, মৎস্যকন্যাটি রাজপুত্রকে বিয়ে করে চিরসুখী হবে।

হ্যান্স ক্রিস্টিয়ান এন্ডারসনের 'দ্য লিটল মারমেইড' বই
হ্যান্স ক্রিস্টিয়ান এন্ডারসনের ‘দ্য লিটল মারমেইড’ বই

হ্যান্স ক্রিস্টিয়ান এন্ডারসনের বই সমূহ 

রাজপুত্রকে পাওয়ার জন্য মৎস্যকন্যা প্রাণপণ চেষ্টা করতে প্রস্তুত ছিলো। তাই সে তার অবস্থান থেকে সব ধরণের অস্বাভাবিক প্রচেষ্টাও চালিয়ে গেলো।  তাছাড়া মৎস্যকন্যাকে তার হাটুতে পরিবর্তন আনতে হয়েছিলো। সাধারণ মানুষের চলাফেরার জন্য হাত-পা থাকে। কিন্তু মৎস্যকন্যা মানুষের মতো চলতে পারে না। তাই, প্রতি পদক্ষেপে তাকে অভাবনীয় কষ্ট করতে হয়েছে !  রাজপুত্রকে পাওয়ার জন্য এভাবেই তাকে এগুতে হলো।  তাই আমি চিন্তা করলাম যে, পানিতে সে মৃত্যুর চেয়ে বেশি কিছু পাওয়ার যোগ্য।  পুরো বিশ্ব নতুন গল্পটি জানবে কি জানবে না এনিয়ে আমার কোনো মাথাব্যাথা ছিলো না। কারণ, উপলব্দি করার পরপরই আমি এটি প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিই। এরপর থেকে আমি লিখতে শুরু করি।

প্রশ্ন : আপনি কিভাবে গল্প বলা ও লেখার কৌশল রপ্ত করলেন ?

সবসময় আমি গল্প বাঁধতাম। আমার বিদ্যালয় বেশ দূরে ছিলো।  সাধারণত স্কুলে যাওয়ার পথে গল্প তৈরি করতাম।  আমার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গল্পগুলো নিজেকে ঘিরে লিখতে শুরু করলাম। একজন রচয়িতা হিসেবে গল্পগুলো সম্প্রতি প্রকাশ হচ্ছে না বলে আমার কোনো ধরণের মাথাব্যাথা ছিলো না।  এমনকি লোকজন আমার লেখাগুলো সম্পর্কে জানতে পারছে কিংবা পড়ছে কিনাএনিয়ে আমি কোনোভাবে উদ্বিগ্ন ছিলাম না। মৎস্যকন্যার গল্পটি সম্পর্কে বলতে গেলে আমি খুবই সন্তুষ্ট। ছোট্ট মৎস্যকন্যা ছিলো খুবই সাহসী ও বুদ্ধিমতী। তাছাড়া তার মধ্যে কতিপয় অসাধারণ গুণ ছিলো। সে লাফ দিতে পারতো এবং তার জাদুকরী শক্তি ছিলো।

প্রশ্ন : নারীদের অবস্থানের প্রেক্ষিতে গল্পটি বলার কী কোনো প্রয়োজন ছিলো ?

আমি কখনো গল্পটি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে লিখতে বসিনি।  তবে আমি নিজেকে কখনো নারী ছাড়া অন্য কিছু ভাবিনি।  ছোট্ট বালিকা বা নারীদের নিয়ে অনেক ভালো ভালো গল্প রয়েছে। নাবালিকা (টীন, ১৩ থেকে ১৯ বছর) হওয়ার পর আপনি মানুষের চাহিদা পূরণসহ অন্যান্য প্রয়োজনে সাহায্য করতে এগিয়ে যেতে পারেন। তবে তরুণ থাকাকালে নারী হওয়ার জন্য আমার মধ্যে কোনো ধরণের হীনমন্যতা ছিলো না। এর কারণ হয়তো এমন হতে পারে যে, আমি অন্টারিও [কানাডার ১৩টি প্রদেশের মধ্যে একটি]-এর একটি জায়গায় বাস করতাম। সেখানকার নারীদের মধ্যে অধিকাংশই পড়াশোনা ও গল্প করতেন। অন্যদিকে পুরুষরা বাইরের গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকতেন। তাদের গল্প করার সুযোগ ছিলো না।  সেখান থেকেই আমার গল্প লেখা ও বলার অভ্যেস গড়ে উঠে।

মেরি অ্যালিস মনরো
অ্যালিস মনরো

প্রশ্ন : কীভাবে ওই পরিবেশ আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছিলো ?

আপনার জানার জন্য বলছি যে, আমি মনে করিনি যে, আমার অনুপ্রেরণার প্রয়োজন রয়েছে। আমার কেবল মনে হয়েছে বিশ্বে গল্পের প্রয়োজন আছে। তাই আমি কয়েকটি গল্প লিখতে চেয়েছি। আর আমি তা চালিয়ে যেতে চেয়েছি।  তাছাড়া লেখালেখি অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে হবে এধরণের কিছু ভাবিনি। কাউকে বলতে হবে বলে আমার প্রয়োজন বলে মনে হয় না। তবে বিপুল সংখ্যক পাঠকদের কাছে যেতে পারলে এটি খুবই আগ্রহ উদ্দীপক বিষয় হবে বুঝতে পেরে আমার খুব বেশি সময়ক্ষেপণ করতে হয়নি।

অ্যালিস মনরো এর বই সমূহ

প্রশ্ন : গল্প বলার ক্ষেত্রে আপনি কোন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন?

অবশ্যই প্রথমদিকে গল্পে মিলনের মধ্যদিয়ে সমাপ্তি টানাকে আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতাম। আমার দিক থেকে বিচ্ছেদের মধ্যদিয়ে গল্পের শেষ হওয়াকে আমি মেনে নিতে পারতাম না। পরবর্তীতে আমি ওয়াটারিং হাইটস [ইংরেজ ঔপন্যাসিকে এমেইল ব্রোন্টে রচিত উপন্যাস] পড়তে শুরু করলাম, যেখানে অনেক বেশি বিচ্ছেদের মধ্যদিয়ে সমাপ্তির গল্প আছে। এরপর আমি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলাম এবং পছন্দমত বিষাদঘন গল্প হাজির করলাম।  

প্রশ্ন : কানাডার ছোট্ট শহরকে তুলে ধরার জন্য কোন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ?

আপনাকে ওখানকার অভিজ্ঞতা নিতে হবে।  আমার মনে হয় যে, সব ধরণের জীবনযাপনই আগ্রহের উদ্রেক করতে পারে। যে কোনো ধরণের পরিবেশ আমাদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে। কোনো শহরের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে বসবাস করার মধ্যে আমি কোনো সাহসিকতা দেখি না, যাকে সাধারণত উচ্চস্তরের সংস্কৃতি বলা হয়। এই সংস্কৃতির সঙ্গে আমার মিলিয়ে চলার চেষ্টা করতে হয়নি।  ‍আমি একমাত্র ব্যক্তি যিনি নিজের গল্প সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। যদিও আমি কাউকে এনিয়ে বলতে চাইনি।

প্রশ্ন : আপনি কি সবসময় নিজের লেখা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন ?

লেখক জীবনের শুরুর দিকে লেখকদের সঙ্গে সাক্ষাককালে আমি খুবই আত্মবিশ্বাসীহীন হয়ে পড়তাম।  তবে দীর্ঘ দিন ধরে আমি আত্মবিশ্বাসী।  ধীরে ধীরে আমি বুঝতে শুরু করি যে, বিষয়টি যেভাবে আমি ভেবেছিলাম তার চেয়ে একটু বেশি কঠিন। তবে কোনো সময় আমি ভেঙে পড়িনি।  নিয়মিতভাবে আমি লেখালেখিটাই কেবল করতে পেরেছি। 

প্রশ্ন : আপনি কোনো গল্প লিখার সময় কী পুরো ঘটনাটি সাজিয়ে ফেলেন ?

হ্যাঁ। গল্পের ঘটনা প্রথমেই সাজিয়ে নিই। তবে এটা বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত হয়।  একটি ঘটনা ধরে আমি গল্প শুরু করি। এরপর প্লটটির উপর কাজ করি। এটি বিভিন্নভাাবে এগিয়ে যায়।  আমার লেখার ভিত্তিতে গল্পের বাকবদল ঘটে।  তবে স্পষ্টভাবে গল্পের সম্পূর্ণ ধারণা নিয়ে লিখতে শুরু করতে হবে।

প্রশ্ন : লেখার সময় আপনি সাধারণত গল্পে কীভাবে নিমজ্জিত থাকেন ?

অকল্পনীয় ! তবে আমি সবসময় ছেলেমেয়েদের নিয়ে দুপুরের খাবার খাই। আমি একজন গৃহিণী।  সুতরাং অবসরে আমি লিখতাম।  তবে হতাশ হলেও আমি কখনো লেখা থেকে দূরে থাকিনি।  আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, আমার গল্পগুলো খুব বেশি মানসম্পন্ন নয়।  সুতরাং আমাকে অনেক বেশি শিখতে হবে।  তাছাড়া কাজটি আমার প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। আমি কোনোভাবে থেমে থাকিনি।  আর লেখালেখি আমি অতীতে কখনো করিছি বলে মনে করিনি।

অ্যালিস মনরো'র নামে স্ট্যাম্প চালু করেছিল কানাডা সরকার।
অ্যালিস মনরো’র নামে স্ট্যাম্প চালু করেছিল কানাডা সরকার।

প্রশ্ন : গল্প বলার ক্ষেত্রে কোন বিষয়টি আপনার কাছে সবচেয়ে কঠিন বলে মনে হয় ?

আমার মতে, গল্প পড়াকালে যে অংশটি আপনার কাছে মানহীন বলে উপলব্ধ হয়। প্রথম অংশ অসাধারণ, দ্বিতীয় অংশ খুবই চমৎকার বলে মনে হতে পারে।  কিন্তু কোনো এক সকালে আপনার মনে হতে পারে ‘কি বাজে জিনিস’ আপনি লিখলেন। এরপরও আপনাকে ওই গল্পের ভিত্তিতে কাজ করে যেতে হবে।  এক্ষেত্রে আমি সঠিক জায়গায় আছি বলে মনে হয়।  কেননা বাজে গল্প লেখার জন্য আমি নিজেই দায়ী।

প্র্রশ্ন : আপনি নিজে সন্তুষ্ট না  হলে গল্পটি কিভাবে পুনরায় নির্মাণ করেন ?

অকল্পনীয় পরিশ্রম।  এর চেয়ে অধিকতর মানসম্পন্ন ব্যাখ্যা-পদ্ধতি খুঁজে বের করার চেষ্টা করি।  আপনার কাছে বিভিন্ন চরিত্র রয়েছে, যেগুলোকে বিভিন্নভাবে সাজানো যায়।  কিন্তু চরিত্রগুলো নিয়ে আপনাকে বহুমুখী দুষ্টিকোণ থেকে ভাবতে হবে। লেখক জীবনের প্রথমদিকে আমি অনেক ভাসাভাসা কথা বলে গল্প রচনা করেছি। ধীরে ধীরে আমি এই রাস্তা থেকে বের হতে শুরু করি।  এরপর আস্তে আস্তে গল্প নিয়ে ভাবতে থাকি এবং গল্পকে উন্নত করতে আরো বিচিত্রমুখী চিন্তাপদ্ধতির আশ্রয় নিই। বাস্তবত আমার অনেক বিষয় শেখার রয়েছে।

প্রশ্ন : ইতোমধ্যে আপনি কয়টি গল্প ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন ?

তরুণ থাকাকালে প্রায় গল্পই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি। এবিষয়ে আমার তেমন কিছু মনে পড়ছে না।  তবে আমার জানা মতে, সম্প্রতি এধরণের ঘটনা খুব কমই ঘটেছে। গল্পগুলো জীবন্ত করতে গিয়ে আমাকে এধরণের কাজ করতে হয়েছে।  তবে এখনো অনেক ক্ষেত্রে ভুল হয়ে যায়।  আর ভুলগুলো আমি উপলব্ধি করতে পারি।  আপনাকে ভুলগুলো শোধরে নিতে হবে।

প্রশ্ন : আপনি কখনো কোনো গল্প ছুঁড়ে ফেলার জন্য আফসোস করেন ?

আমি এধরণের কিছু মনে করি না। কারণ এই নিদারুণ যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা আমার অসংখ্যবার হয়েছে।  শুরুর দিকে এই উপলব্দিও আমার ক্ষেত্রে ঘটেছে।  তবে এধরণের ঘটনা খুব বেশি ঘটেনি।

প্রশ্ন: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনার লেখায় কীভাবে পরিবর্তনগুলো এসেছে ?

ওহ্। এটা ধারাবাহিকভাবে ঘটেছে।  আপনি সুন্দরী রাজকন্যা নিয়ে লিখতে শুরু করলেন।  এরপর গৃহিণী ও সন্তানাদি এবং পরবর্তীতে নারীদের নিয়ে লিখলেন।  এভাবে চলতে লাগলো।  কোনো ধরণের পরিবর্তনের মানসিকতা ছাড়াই আপনি লিখতে থাকেন। আপনার ইচ্ছাই পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

প্রশ্ন : আপনি একজন গৃহিণী ও লেখক হওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য নারী লেখকদের কাছে নিজেকে কী গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ?

এবিষয়য়ে আমি নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারবো না।  তবে আমি আশা করি যে, আমি এটা করতে পেরেছি।  আমার মনে হয় যে, তরুণ লেখক হিসেবে অন্যান্য নারী লেখকদের লেখা পড়ে আমি বিপুলভাবে উৎসাহিত হয়েছিলাম।  কিন্তু আমি কারো কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়েছি কিনা সেটা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়।  আমার মনে হয় যে, নারীদেরও অনেক কিছু করার আছে, যা অবশ্য সহজ বলছি না।  তবে বর্তমানে নারীদের দ্বারা গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে। অন্যান্য নারীদের মতো  বাড়ির বাইরে কেবল ঘোরাঘুরি যেমন করতে হয়, তেমনি একজন লেখক হিসেবে লেখা নিয়ে খুব বেশি নিবিষ্টচিত্ত হওয়া।

অ্যালিস মনরো'র নামে স্ট্যাম
অ্যালিস মনরো ‘র সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় তোলা ছবি। 

প্রশ্ন : আপনার গল্প পড়ে বিশেষত নারীদের মধ্যে কেউ কি প্রভাবিত হয়েছেন ?

আমিও চাই যে, আমার গল্পগুলো পাঠকদের কাছে পৌঁছে যাক।  নারী, পুরুষ, শিশু যে কেউ পাঠক হতে পারে, এনিয়ে আমার কোনো মাথাব্যাথা নেই।  জীবনকে ঘিরেই গল্পগুলো সাজানোর চেষ্টা করি।  গল্পগুলো পড়ে লোকজন বলবে, এটা সত্য নয় কিংবা সত্য- এধরণের কিছু না।  বরং তারা গল্পগুলো পড়ে তাদের মধ্যে নতুন কিছু উপলব্দির সঞ্চার হবে। এর মানে এও নয় যে, মিলনের সমাপ্তি বা অন্য কোনো কিছু খুঁজে পাবে।  বরং প্রতিটি গল্প পড়ে শেষ করার মধ্যদিয়ে পাঠককে এমন একদিকে পরিচালিত করবে যাতে সে নিজেকে ভিন্ন একজন হিসেবে উন্মোচন করবে।

প্রশ্ন : Who do you think you are লেখার নেপথ্য কাহিনী কী ? এই গল্প দ্বারা আপনি কী বুঝাতে চেয়েছেন ?

আমি গ্রামাঞ্চলে বেড়ে উঠেছি। ত আমার প্রতিবেশিদের অধিকাংশ ছিলেন স্কটিশ-আইরিশ (কানাডা)। এখানকার লোকজন সাধারণত অতিরিক্ত কোনো কিছু করতে চাইতো না।  নিজেকে  খুব বেশি বুদ্ধিমান বা স্মার্ট না ভাবার একটি আটপৌরে ধারণার চল ছিলো।  এটি এখাকার একটি সাধারণ চিত্র।  ‘আহ, তুমি নিজেকে খুব বেশি বুদ্ধিমান মনে করো।’ লেখার মতো কোনো কিছু করতে গেলেই আপনাকে কোনো না কোনো সময় বুদ্ধিমান বা স্মার্ট হতে হবে।  তবে আমি একটু অস্বাভাবিক প্রকৃতির মানুষ ছিলাম।

প্রশ্ন : আপনি কি প্রথমদিকে নারীবাদী ছিলেন ?

আমি কখনো নারীবাদ শব্দটির সঙ্গে পরিচিত ছিলাম না।  তবে অবশ্য আমি একজন নারীবাদী ছিলাম।  কারণটা একটু বিস্তারিতভাব বলছি।  আমি কানাডার এমন একটা জায়গায় বেড়ে উঠেছি যেখানে পুরুষদের চেয়ে নারীদের লেখালেখির বেশি সুযোগ-সুবিধা ছিলো।  তবে লেখক মানেই পুরুষ হবে এধরণের ধারণার চল ছিলো না। তুলনামূলকভাবে নারী-পুরুষের গল্পের মধ্যে নারীর গল্পকে কম গুরুত্ব দেওয়া হতো না।  কেননা এটা পুরুষদের কাজ ছিলো না। আমার তারুণ্যের সময় এ-চলটি খুব ভালোভাবেই ছিলো।  এখন সে অবস্থা মোটেই নেই।

প্রশ্ন : বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষে নারীবাদ কি আপনার লেখায় কোনো পরিবর্তন এনেছিলো ?

অবশ্য এটা ঘটেছিলো। এধারণা আমাকে লেখক হতে অনেক বেশি সচেতন ও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। কারণ আশপাশের লোকদের লেখালেখি সম্পর্কে আমি যতই ওয়াকিবহাল হতে থাকলাম ততই আমি ভীত হতাম।  সম্ভবত আমার মনে হয়েছিলো যে, একাজ আমার দ্বারা সম্ভব নয়।  তবে এই ধারণায় আমি আবদ্ধ ছিলাম না। হয়তো কিছু সময়ের জন্য ছিলাম। কিন্তু আমি বিপুলহারে লিখতে চেয়েছিলাম।  আমি চেষ্টা করে এগিয়ে গিয়েছি এবং কোনো না কোনোভাবেই তা করা আমার দ্বারা সম্ভব হয়েছিলো।

প্রশ্ন : লেখা কি আপনার কাছে উপহার ছিলো ?

আমার চারপাশের লোকজন এভাবে ভাববে বলে আমার মনে হয় না।  তবে লেখালেখিকে আমি কখনো  উপহার বলে ভাবিনি।  কেবল আমার কাছে মনে হয়েছে যে, কঠোর পরিশ্রম করতে পারলে একাজটি আমার পক্ষে করা সম্ভব।  তবে লেখালেখি যদি কোনো উপহার হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবে তা মহৎ কোনো কিছু। 

প্রশ্ন : আপনি যথেষ্ট ভালো করছেন না। আপনার মনে কখনো কী এধরণের কোনো দ্বিধার উদ্রেক হয়েছিলো ?

ওহ্, সবসময়, সবসময় !  আমি যে সংখ্যক লেখা শেষ করেছি বা প্রকাশ করেছি তার চেয়ে বেশি ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি। এধরণের ঘটনা আমার বিশ বছর পর্যন্ত হয়েছে।  আমি এখনো আমার প্রত্যাশিত লেখার ধরণ রপ্ত করার জন্য সংগ্রাম করছি।  সুতরাং এটা কোনো সহজ পথ  ছিলো না।  

প্রশ্ন : মা আপনার সম্পর্কে কী ভাবতেন ?

মা সম্পর্কে আমার অনুভূতি খুব বেশি অস্বাভাবিক ছিলো।  কারণ তিনি অসুস্থ ছিলেন।  তিনি পারকিনস রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। প্রায় ক্ষেত্রে তার সাহায্যের প্রয়োজন হতো। কথা বলতে তার কষ্ট হতো। লোকজন মার কথা বুঝতে পারতো না। তিনি সঙ্গ খুব পছন্দ করতেন। সামাজিক সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে খুব বেশি আগ্রহী ছিলেন।  কিন্তু তার বাচনগত সমস্যার কারণে তা সম্ভব ছিলো না। আমি বিব্রতকার পরিস্থিতির মুখোমুখি হতাম। আমি তাকে ভালোবাসতাম। তবে আমি তার হয়ে নিজেকে পরিচিত করতে চাইনি।  কারণ তিনি যা বলতে চেয়েছেন তা লোকদের কাছে পৌঁছে দিতে যেমন কঠিন তেমনি কোনো কিশোর বয়সী কারো পক্ষে কোনো ব্যক্তি বা নিজের পিতামাতার অসম্পূর্ণতা নিয়ে ভাবাও একই ধরণের বিষয় ছিলো।  যে কেউ এধরণের পরিস্থিতি থেকে দূরে থাকতে চাইবেন।

অ্যালিস মনরো সঙ্গে নোবেল পদক ।
অ্যালিস মনরো সঙ্গে নোবেল পদক ।

প্রশ্ন : তিনি আপনাকে কোনোভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলো ?

সম্ভবত করেছিলেন।  কিন্তু কোন পদ্ধতিতে করেছিলেনে তা আমি বুঝতে কিংবা লক্ষ্য করতে পারিনি।  গল্প লেখা থেকে বিরত থেকেছি এধরণের কোনো  মুহূর্ত আমি স্মরণ করতে পারছি না।  এর মানে এসব বিষয়ে আমি লিখিনি। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো আমার পিতামাতা দুজনেই পড়শোনা করতেন।  তবে আমার মা কারো লেখক হওয়ার সিদ্ধান্তকে পিতার চেয়ে বেশি সাদরে গ্রহণ করতেন বলে আমার মনে হয়।  সম্ভবত তিনি এই নির্বাচনকে প্রশংসনীয় বলে মনে করতেন।  কিন্তু আমি যে লেখক হতে যাচ্ছি যা আমার চারপাশের লোকজনদের মধ্যে কেউই জানতেন না।  এর কারণ আমি তাদেরকে জানতে দিইনি।  এটা অধিকাংশের কাছে হাস্যকের টেকেছিলো। কারণ আমার পরিচিত অধিকাংশ লোকই জীবনে পড়াশোনা করতো না। তারা জীবনকে খুব ব্যবহারিক দিক থেকে বিবেচনা করতো।  জীবন সম্পর্কে আমার ধারণা আশপাশের লোকদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিলো।

প্রশ্ন : একজন নারীর প্রেক্ষিতে কোনো  সত্য গল্প বলা কী খুব বেশি কঠিন ছিলো ?

না।  কোনোভাবে তা নয়।  বরং একজন নারী হিসেবেই আমি লিখেছি।  এটি কখনো আমাকে বিরক্ত করেনি।  আমার বেড়ে উঠার ক্ষেত্রে নারী হওয়াটা আমার কাছে বিশেষ কিছু ছিলো। লেখক কিংবা শিক্ষিত বলতে সাধারণত নারী ছিলো, যে ছিলো বিদ্যালয়ের শিক্ষক বা এধরণের কোনো কিছু।  পড়াশোনার সঙ্গে বেশিরভাগ নারী সম্পৃক্ত ছিলো। পুরুষরা কৃষিকাজ ও অন্যান্য কাজে বাইরে ব্যস্ত থাকতো।

 প্রশ্ন : আপনি শ্রমজীবী শ্রেণিভুক্ত পরিবারের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন ?

হ্যাঁ। একারণে আপনার গল্পগুলোও এভাবে শুরু হয়েছে। আমি একটি শ্রমজীবী পরিবারভুক্ত বলে আমি উপলব্ধি করিনি।  আমি কেবল নিজের অবস্থান ও লেখালেখির জগতে বাস করতাম।

প্রশ্ন : আপনি কি লেখালেখি, সন্তান লালনপালন ও রাতের খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট সময় মেনে চলতেন ?

যখনই সম্ভব হতো তখনই লিখতাম।  আমার প্রথম স্বামী খুব বেশি আমার কাজকর্মে আন্তরিক ছিলো।  তার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো সে প্রশংসা করতো।  কাজটাকে সে কোনো নারীর পক্ষে অসম্ভব মনে করেনি, যা সাধারণত আমার পরিচিত অনেকেই করতো। সে আমার কাজটিকে সাদরে গ্রহণ করেছিলো। সে কখনো এই অবস্থা থেকে নড়বড় করেনি।  এক সময় আমরা একটি বইয়ের দোকান দিব বলে সিদ্ধান্ত নিই।  প্রত্যেকেই মনে করলেন যে, এবিষয়ে আমরা খুব বেশি বেপরোয়া। আমাদের অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছিলো।

প্রশ্ন : আপনাদের দুজনের জীবনে বইয়ের দোকানটি প্রতিষ্ঠার প্রথমদিকে এটি কেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিলো ?

এটা আমাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম ছিলো।  এটাই একমাত্র সম্বল। এছাড়া আমাদের উপার্জনের অন্য কোনো উৎস ছিলো না। দোকানটি খোলার প্রথমদিন আমাদের উপার্জন ছিলো ১৭৫ ডলার। বর্তমান অবস্থায় উপনীত হতে আমাদের অনেক দীর্ঘ সময় লেগে গেছে।  ডেস্কে আমি বসি এবং লোকজনদের বই খুঁজতেও সাহায্য করি।  লোকজন দোকানে আসেন এবং বই কেনেন।  বিক্রির চেয়ে এটি একটি মিলনকেন্দ্র হিসেবে বেশি উপযুক্ত জায়গা।  রাতের বেলায় বিশেষত এটি বেশি চোখে পড়ে।  আর যখন নিজের বইয়ের পাশে বসে থাকি, তখন লোকজন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করতে কাছে আসেন। এটি দারুণ অভিজ্ঞতা।  অনেক মজার মজার ঘটনাও ঘটে।  এই পর্যন্ত আমি একজন গৃহিণী হিসেবেও একইভাবে ভূমিকা রেখেছি।  একইভাবে আমি একজন লেখক, যা বিশ্বজগতে প্রবেশ করার জন্য একটি অসাধারণ সুযোগ।  আমি খুব বেশি অর্থ উপার্জন করেছি বলে মনে করি না। লোকজনদের সঙ্গে আমি খুব কমই কথা বলেছি।  কেউ আমার কাছে আসলে তা আমি উপভোগ করি।  কারণ তারা কেবল আমার স্বহস্তলেখা বা অটোগ্রাফের জন্য আসে না।

প্রশ্ন : তরুণ নারীরা আপনার বই পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে লিখবেন বলে কী আপনি মনে করেন ?

যতক্ষণ তারা পড়ার অভ্যেস রপ্ত করছে না ততক্ষণ তারা কি উপলব্ধি করছে তার তোয়াক্কা করি না।  আমি আশা করি লোকজন আমার লেখাগুলো পড়ে অনুপ্রাণিত হবে এবং নিজের জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক খুঁজে পাবে।  তবে এটি প্রধান বিষয় নয়।  আমি লোকজনদের জানাতে চাই যে, সম্ভবত আমি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নই।

প্রশ্ন : আপনি কি কোনো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ?

সম্ভবত।  এর মানে কী আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না। তবে আমার তা মনে হয়।  আমি খুব সহজভাবে লিখি তা মনে করি না।  বরং এটাই আমার লেখার পদ্ধতি।  আমার মনে হয় যে, স্বাভাবিক গতিতে সাবলিলভাবে আমি লিখি।  অবচেতন মনে আমি লিখতে থাকি।

প্রশ্ন : আপনি কখনো লিখতে না পারায় লেখা থেকে দূরে থেকেছেন ?

হ্যাঁ।  এক বছর আগেও এধরণের ঘটনা ঘটেছে।  তবে তা আমার সিদ্ধান্ত ছিলো।  এক্ষেত্রে না লিখতে পারার সঙ্গে এর কোনো সম্পৃক্ততা ছিলো না। পৃথিবীর অন্যান্যদের মতোই আমিও তা করতে চেয়েছিলাম।  আপনি লেখার সময় একটা আলাদা জগতে বাস করেন। সেখানে আপনি কী করছেন অন্যেরা এবিষয়ে অবগত নয়। আপনি একটি গোপন পথ দিয়ে আবিষ্কারের নেশায় আছেন, যা দৈনন্দিন জগতে ঘটতে যাচ্ছে।  সারাজীবন আমি তাই করেছি।  এখন অনেকটা ক্লান্ত।  পুরো জীবন এ পথেই কাটিয়ে দিলাম। অধিকতর একাডেমিক পন্থা অবলম্বনকারী লেখকদের সাক্ষাত লাভ করার পর আমি একটু ধাক্কা খেলাম।  কারণ জানতে পারলাম যে, এভাবে আমি লিখতে পারলাম না।  এই গুণ আমার অর্জন হয়নি।

প্রশ্ন : মনে হয় গল্প বলার এটি ভিন্ন ধরণের একটি পথ ?

হ্যাঁ।  সচেতনভাবে এবিষয় নিয়ে আমি কখনো কাজ করিনি।  তবে আমি সচেতনভাবে নিজের প্রশান্তিমত লিখেছি, যেখানে কিছু চিন্তার উদ্রেক করতে পেরেছি।

al-munro-award
মিসেস জেনি মুনরো স্টকহোম কনসার্ট হলে  ১০ ডিসেম্বর  ২০১৩ তে তাঁর মহিমান্বিত কিং কার্ল এক্সভি গুস্তাফের কাছ থেকে তাঁর মা অ্যালিস মুনোর পক্ষে নোবেল পদক এবং ডিপ্লোমা গ্রহণ করেছেন।

প্রশ্ন: আপনি কখনো নোবেল পুরস্কার পাবেন বলে আশা করেছিলেন ?

না, কখনো না।  আমি ছিলাম একজন নারী ! তবে নারীদের মধ্যেও অনেকেই নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন। সম্মান পেতে আমি ভালোবাসি। কিন্তু আমি এভাবে ভাবিনি। মনে হয়, প্রায় লেখক কাজ শেষ করার পর নিজের লেখাকে অবমূল্যায়ন করে। আপনি অবশ্যই বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে পরিচিতদের কাছে বলেন না যে, সম্ভবত আমি নোবেল পুরস্কার পাবো। সাধারণত কোনো বিশেষ কিছুকে সম্ভাষণ করার এটি কোনো সাধারণ আচরণ নয় !

অ্যালিস মনরো এর নির্বাচিত গল্প বই সমূহ কিনতে ক্লিক করুন ! 

প্রশ্ন : সম্প্রতি আপনি কখনো নিজের লেখা পুরনো বই পড়েছেন ?

না।  আমি পড়তেই ভয় পায় !  সম্ভবত পড়লেই খুব সামান্য পরিবর্তন করার জন্য আমি খুব বেশি ভয়ংকরভাবে বেপরোয়া হয়ে উঠবো।  কয়েকটি বইয়ের ক্ষেত্রে এধরণের পরিবর্তন করার পর বুঝতে পারলাম যে, এই পরিবর্তনে ইতিবাচক কোনো কিছু ঘটে না।  কারণ এটি বইয়ের বাইরের কোনো গল্প নয়।

প্রশ্ন : স্টকহোমের লোকজনদের কাছে আপনার কোনো কিছু বলার আছে কী ?

আমাকে এই বিপুল সম্মান প্রদানের জন্য তাদের কাছে আমি খুবই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।  এই সম্মান পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত।  পৃথিবীতে কোনো কিছুই আমাকে এতো আনন্দ দিতে পারেনি !  আপনাকে ধন্যবাদ।


উৎস: Alice Munro, In Her Own Words: 2013 Nobel Prize in Literature ভিডিও’র ভিত্তিতে ট্রান্সক্রাইব করা হয়েছে।

সূত্র : https://www.youtube.com/watch?v=EgKC_SDhOKk&t=333s

আরও পড়ুনঃ 

জীবনানন্দ দাশ: সলজ্জ এক কবি যাঁর পান্ডুলিপি এখনো আবিষ্কার করে ফিরতে হয় 

যুগান্তকারী ১০ জন নোবেল বিজয়ীর গল্পকথা

বিশ্বসেরা ২০ জনঃ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব যাদের বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি

আকর্ষণীয় ফিকশন-চরিত্র নির্মাণের কলাকৌশল

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png