এ পি জে আবদুল কালাম-একজন সৎ রাষ্ট্রপতির গল্প

এপিজে আবদুল কালাম

এ পি জে আবদুল কালাম,  ভারতের ১১ তম রাষ্ট্রপতি। তৎকালীন বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার কালামের নাম প্রস্তাব করলে কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টিসহ অনেক দলই একযোগে তা মেনে নেয়। পেশাগতভাবে তিঁনি একজন বিজ্ঞানী। দীর্ঘদিন কাজ করেছেন ‘ইসরো’, ‘ডিআরডিও’-তে। ১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর তামিলনাড়ুর উপকূল এলাকার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি এবং অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী ড. এ পি জে আব্দুল কালাম। তাঁর পিতা ছিলেন একজন দরিদ্র মানুষ। ডিঙি তৈরি কর সংসার চালাতেন। তামিল মুসলিম পরিবারে ছোটবেলা থেকেই চরম দারিদ্রের মধ্যে বড় হয়ে ওঠেন কালাম। ছোটবেলায় পড়াশোনার খরচ জোগাতে খবরের কাগজও বিক্রি করেছেন তিঁনি। একজন স্বপ্নবাজ মানুষ হিসেবেও তার সুনাম আকাশচুম্বী। নিজে তো স্বপ্ন দেখেছেনই, অন্যকেও তা দেখিয়েছিলেন। এ আয়োজনে থাকছে তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের টুকরো কিছু গল্প।

বাবার শিক্ষা:

এ পি জে আবদুল কালাম যখন ছোট ছিলেন, তাঁর মা তাঁদের জন্য রান্না করতেন। মা সারাদিন প্রচুর পরিশ্রম করার পর রাতের খাবার তৈরি করতেন। এক রাতে বাবাকে এক প্লেট সবজি আর একেবারে পুড়ে যাওয়া রুটি খেতে দিলেন। কালাম অপেক্ষা করছিলেন বাবার প্রতিক্রিয়া কেমন হয় সেটা দেখার জন্য। কিন্তু বাবা চুপচাপ রুটিটা খেয়ে নিলেন। মা পোড়া রুটি খেতে দেয়ার জন্য বাবার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। এর উত্তরে বাবা মা’কে বললেন, ‘প্রিয়তমা, পোড়া রুটিই আমার পছন্দ।’ পরবর্তীতে সেদিন রাতে কালাম যখন বাবাকে শুভরাত্রি বলে চুমু খেতে গিয়েছিলাম তখন জিজ্ঞাসা করলেন যে তিনি কি আসলেই পোড়া রুটিটা পছন্দ করেছিলেন কী-না! বাবা তাঁকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘তোমার মা আজ সারাদিন অনেক পরিশ্রম করেছেন এবং তিনি অনেক ক্লান্ত ছিলেন। তাছাড়া একটা পোড়া রুটি খেয়ে মানুষ কষ্ট পায় না বরং মানুষ কষ্ট পায় কর্কশ ও নিষ্ঠুর কথায়।’

"স্বপ্ন সেটা নয় যেটা মানুষ, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখে;
স্বপ্ন সেটাই যেটা পূরনের প্রত্যাশা, মানুষকে ঘুমাতে দেয় না।" 
- এ পি জে আব্দুল কালাম

স্বপ্নের বাস্তবতা:

পদার্থবিদ্যা এবং গণিতশাস্ত্র এ পি জে আবদুল কালামের পছন্দের বিষয় ছিল। তবে অধ্যয়ন শেষে আব্দুল কালামের কাছে আসে দুইটি চাকরিতে আবেদনের সুযোগ। একটি বিমান বাহিনীতে এবং আরেকটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে। তবে আব্দুল কালামের স্বপ্ন ছিল মিলিটারি বেইজের একজন ফাইটার পাইলট হওয়া।

বছরের পর বছর ধরে তিনি স্বপ্ন দেখতেন একটি উড়ন্ত যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্ট্রাটোস্ফিয়ারের স্তরে চষে বেড়াচ্ছেন যা উড়তে থাকবে সেই উচ্চ সীমানায়।

প্রথমে ডিটিডিপি’র (Directorate of Technical Development and Production) এর ইন্টার্ভিউ দিয়ে তিনি ছুটে যান দেরাদুন বিমান বাহিনীর অধীনে ইন্টার্ভিউ দিতে। তিনি ইন্টারভিউ দেয়ার প্রাক্কালে খেয়াল করেছিলেন বিমানবাহিনীতে শিক্ষা এবং দক্ষতার পাশাপাশি শারিরীক সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে যার কারণে তাঁরা চেয়েছিল হ্যাংলা পাতলা প্রার্থীর চেয়ে স্বাস্থ্যবান প্রার্থীকেই বেছে নিতে।

ফলাফল, ৯ জন প্রতিযোগীর মধ্যে ৮ জনই নির্বাচিত হয় শুধুমাত্র আব্দুল কালাম বাদে। .

জীবনে বারবার হেরেছেন কিন্তু জিতেছেন তার পরেরবারই। কোট টাই পরাও ধরেছেন রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর। দুর্নীতি যার পিছু আসলেও টলাতে পারেনি একবিন্দুর জন্য।

অবদান:

ভারতের অসামরিক মহাকাশ কর্মসূচি ও সামরিক সুসংহত নিয়ন্ত্রিত ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও মহাকাশযানবাহী রকেট উন্নয়নের কাজে তাঁর অবদানের জন্য হয়েছেন ‘মিসাইল ম্যান অফ ইন্ডিয়া।

সমস্ত বাঁধাকে উপড়ে দিয়েছেন নিজের গতিতে। বিয়ে করার সময়ও পাননি। 

আবদুল কালামকে নিয়ে তাঁর সাবেক সচিব অবসরপ্রাপ্ত আইএএস কর্মকর্তা পি এম নায়ারের একটি সাক্ষাৎকার দূরদর্শনের তামিলভাষী আঞ্চলিক চ্যানেল ডিডিপোধিগাই প্রচার করেছিলো। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘ড. এ পি জে আবদুল কালাম যখনই বিদেশ যেতেন, তখনই দামি উপঢৌকন নিতে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন। এর কারণ, এটাই রাষ্ট্রাচার। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশ ও জাতিরাষ্ট্রের কাছ থেকে সফররত বিদেশি রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানদের এ ধরনের উপঢৌকন নেওয়া একটি বৈশ্বিক প্রথা হিসেবে প্রচলিত রয়েছে। এই উপঢৌকন প্রত্যাখ্যান করা হলে তা কোনো জাতির প্রতি একটা উপহাস এবং ভারতের জন্য তা বিব্রতকর। সুতরাং, তিনি বিনা বাক্য ব্যয়ে এসব উপঢৌকন নিতেন। কিন্তু তিনি ফিরে আসার পরে তাঁর নির্দেশ থাকত, সব উপহারসামগ্রীর আলোকচিত্র তুলতে হবে। এর ক্যাটালগ করতে হবে। এরপর তা মহাফেজখানায় দিতে হবে। এরপরে তাঁকে আর কখনো উপহারসামগ্রীর দিকে ফিরে তাকাতেও দেখা যায়নি। তিনি যখন রাষ্ট্রপতি ভবন ত্যাগ করেছিলেন, তাঁকে এমন-কি একটি পেনসিলও নিয়ে যেতে দেখা যায়নি।’

দানশীলতা:

২০০২ সালে ড. এ পি জে আবদুল কালাম যখন রাষ্ট্রপতির পদ নিয়েছিলেন, তখন রমজান মাস। ভারতীয় রাষ্ট্রপতির জন্য এটা একটা নিয়মিত রেওয়াজ যে তিনি একটি ইফতার পার্টির আয়োজন করবেন। একদিন ড. কালাম তাঁর সচিব মি. নায়রাকে বললেন, কেন তিনি একটি পার্টির আয়োজন করবেন? কারণ, এমন পার্টির অতিথিরা সর্বদা ভালো খাবার খেয়ে অভ্যস্ত। তিনি মি. নায়ারের কাছে জানতে চাইলেন, একটি ইফতার পার্টির আয়োজনে কত খরচ পড়ে? মি. নায়ার তাঁকে জানালেন, প্রায় ২২ লাখ রুপি। ড. কালাম তাঁকে নির্দেশ দিলেন, কতিপয় নির্দিষ্ট এতিমখানায় এই অর্থ, খাদ্য, পোশাক ও কম্বল কিনে দান করতে হবে। রাষ্ট্রপতি ভবনের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি টিম এতিমখানা বাছাইয়ের দায়িত্ব পেয়েছিল। ড. কালাম এ ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা পালন করেননি। এতিমখানা বাছাইয়ের পরে ড. কালাম মি. নায়ারকে তাঁর কক্ষে ডাকলেন এবং এক লাখ রুপির একটি চেক দিলেন। তিনি বললেন, তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সঞ্চয় থেকে কিছু অর্থ দান করছেন। কিন্তু এ তথ্য কারও কাছে প্রকাশ করা যাবে না। মি. নায়ার এতটাই আঘাত পান যে তিনি বললেন, ‘স্যার, আমি এখনই বাইরে যাব এবং সবাইকে বলব। কারণ, মানুষের জানা উচিত, এখানে এমন একজন মানুষ রয়েছেন, যে অর্থ তাঁর খরচ করা উচিত, শুধু সেটাই তিনি দান করেননি, তিনি সেই সঙ্গে নিজের অর্থও বিলিয়েছেন।’

সততা:

ড. কালাম তাঁর আত্মীয়দের একবার দিল্লিতে আমন্ত্রণ জানালেন। তাঁরা সবাই রাষ্ট্রপতি ভবনে অবস্থান নিলেন। তাঁদের নগর পরিদর্শন করাতে তিনি একটি বাস ভাড়া করলেন এবং সে অর্থ তিনি পরিশোধ করেন। কোনো সরকারি গাড়ি তাঁর আত্মীয়দের জন্য ব্যবহৃত হয়নি। ড. কালামের নির্দেশনা অনুসারে, তাঁদের থাকা-খাওয়ার খরচ হিসাব করা হলো। বিল দাঁড়াল দুই লাখ রুপি, যা তিনি পরিশোধ করেছেন। ভারতীয় ইতিহাসে এটা আর কেউ করেননি।

ড. কালাম একবার চাইলেন তাঁর সঙ্গে তাঁর বড় ভাই পুরো এক সপ্তাহ যাতে সময় কাটান। তা-ই হলো। কিন্তু তিনি চলে যাওয়ার পরে তাঁর রুমভাড়া বাবদ অর্থ পরিশোধ করতে চাইলেন। কল্পনা করুন, একটি দেশের রাষ্ট্রপতি এমন একটি কক্ষের জন্য ভাড়া পরিশোধ করতে চাইছেন, যা তাঁর নিজের জন্যই বরাদ্দ। এবারে রাষ্ট্রপতির ইচ্ছা পূরণ হলো না। কারণ, তাঁর ব্যক্তিগত স্টাফরা ভেবেছিলেন, এতখানি সততা অনুসরণ তাঁদের পক্ষে বিদ্যমান বিধির আওতায় সামাল দেওয়া কঠিন।

উদারতা:

মেয়াদ শেষ হয়ে এলে ড. এপিজে আবদুল কালাম রাষ্ট্রপতি ভবন ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তখন সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাঁর সঙ্গে দেখা করে বিদায়ী শ্রদ্ধা জানান। মি. নায়ার এভাবেই শ্রদ্ধা জানাতে রাষ্ট্রপতির কাছে একা গিয়েছিলেন। তিনি তাঁর স্ত্রীকে সঙ্গে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটা হয়ে ওঠেনি। কারণ, স্ত্রীর পা ভেঙে গিয়েছিল বলে তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন। ড. কালাম জানতে চাইলেন, তিনি কেন তাঁর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আসেননি। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, দুর্ঘটনাকবলিত হওয়ার কারণে তিনি শয্যাশায়ী। 

পরের দিন। মি. নায়ার শশব্যস্ত হয়ে এদিক-ওদিক তাকালেন। কারণ, তিনি হঠাৎ দেখলেন, তাঁর ঘরের চারপাশে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী ছেয়ে ফেলেছে। নিরাপত্তারক্ষীরা জানালেন, ভারতের রাষ্ট্রপতি তাঁর ঘরে আসছেন। রাষ্ট্রপতি গৃহে প্রবেশ করলেন। মিসেস নায়ারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। এবং কিছুক্ষণ খোশগল্পের পরে চলে গেলেন। মি. নায়ার তাঁর ওই সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘কোনো দেশের প্রেসিডেন্ট একজন সিভিল সার্ভেন্টের ঘরে এভাবে যাবেন না। তাও এমন এক ঠুনকো অজুহাতে।’

ছোট ভাইয়ের শ্রদ্ধা:

এ পি জে আবদুল কালামের ছোট ভাই একটি ছাতা মেরামতের দোকান চালান। মি. নায়ার তাঁর দেখা পেয়েছিলেন আবদুল কালামের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়। তখন রাষ্ট্রপতিরভাই মি. নায়ারের কদমবুসি করলেন, যা ছিল তাঁর তরফে মি. নায়ার এবং তাঁর প্রয়াত ভাই ড. এ পি জে  আবদুল কালামের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন।

এপিজে আবদুল কালামের সকল বই

 

আরও পড়ুন বিখ্যাত ১০ লেখকের বিচিত্র এই অভ্যাসগুলো আপনি জানেন কি?

 

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png