রোহিঙ্গা : নিজের দেশেই যখন ভিনদেশি

রোহিঙ্গা

রাঙ্গুন, রোয়াং বা রোহিঙ্গা যাই বলি না কেন চায়ের কাপে ঝড় তোলার ইস্যু এখন এটাই।  কিন্তু তর্ক বিতর্কের আগে জেনে নেয়া চাই কিছু কথা।  ইতিহাস যা বলেঃ কারা এই রোহিঙ্গা ? ইতিহাস পর্যালোচনা করে যতটুকু জানা যায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি পুরোনো উপকূলীয় অঞ্চলে আরাকানের জনগোষ্ঠী হল রোহিঙ্গারা। যদিও বার্মিজ জাতীয়তাবাদীরা ৩০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে বসবাসরত রাখাইনদের কোন প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণই সমর্থন করেন না।

চতুর্থ দশক থেকেই আরাকান ভারত উপমহাদেশের প্রাচীনতম রাজ্যগুলোর মধ্যে একটি। যতদূর জানা যায় প্রথম আরাকান রাজ্য ছিল ধনিওয়াদি।  এরপর শাসনকার্য স্থানান্তরিত হয়ে চলে যায় আরাকানের উত্তরে অবস্থিত ওয়াইথালিতে।  এ অঞ্চলের সংস্কৃতলিপি থেকে ধারণা পাওয়া যায় যে প্রথম আরাকানদের প্রতিষ্ঠাতা ছিল ভারতীয়রা।  পরবর্তিতে ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দে নরমিখলা ওরফে সোলায়মান শাহ আরাকান আক্রমণ করে প্রতিষ্ঠা করেন ম্রাউক-উ নামক রাজবংশ।  প্রায় দুশো বছরেরও অধিককাল স্থায়ী থাকে এই মুসলিম শাসন।  কিন্তু ১৭৮০ সালে বর্মী রাজা দখল করে নেয় আরাকানকে।

এরপর বার্মা চলে আসে ইংরেজদের শাসনের আওতায়।  চলে দমন করে রাখার আরেক অধ্যায়। ১৯৪০ সালে যখন পাকিস্তান আন্দোলন শুরু হয় তখন পশ্চিমাঞ্চলীয় বার্মার রোহিঙ্গা মুসলিমরা তাদের পূর্ব পাকিস্তানের সাথে একত্রিত করার দাবী জানিয়ে বিচ্ছিন্ন আন্দোলনের আয়োজন করে।  কেননা সংখ্যাগরিষ্ঠদের কাছে পদদলিত হবার ভয় ছিল বরাবরই।  কিন্তু তৎকালীন নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রস্তাবনার যুক্তি অসমর্থনযোগ্য বলে তাদের সহায়তার চেষ্টা করেন নি।

রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির
২৩ শে জানুয়ারি, ২০১৩ কক্সবাজার, থেকে ৩০০ মাইল দূরে বালুখালী রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির ।  সূত্র – globalcitizen.org

 

১৯৫৮ সালে জেনারেল নেউইন-এর নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বার্মার প্রশাসনিক দায়ত্বি গ্রহণ করার পর আরাকান রোহিঙ্গাদের বিরক্তদ্ধে এক বেপরোয়া উচ্ছেদ অভিযান শুরুত্ব করে। এই উচ্ছেদ অভিযারের শিকার হায়ে প্রায় বিশ হাজার রেহিঙ্গা।উদ্বাস্থ কক্সবাজর সীমন্তে পালিয়ে আসে।  তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানে গর্ভনর জাকি হোসেন নেতৃত্বে পাকিস্তান পক্ষ ও বার্মা পক্ষের মধ্যে কক্সবাজারে উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয় এ বর্মি পক্ষ একে আকিয়াবে একটি সাম্পদায়িক মগ গোষ্ঠীর করসাজি বলে অভিহিত করেন এবং সকাল উদ্বাস্তুদের স্বদেশে ফিরিয়ে নেন।  আবার ইমিগ্রেশন কতৃক উপস্থাপিত সংশ্লিষ্ট ছাপানো পরমে মংডুর মহকুমা প্রশাসক কোন বিচার-বিবেচনা ব্যতিরেকে দস্তখত করেছেন, যার অর্থ ছিল বেআইনিভাবে কিছু দেশের নাগরিককে তাদের আবাসভূমি থেকে বিতাড়িত করা এবং একজন নাগরিকে অধিকারকে অস্বীকার করা।  বিজ্ঞ বিচারক উল্লেখ করেন। যে, দেশে একজন নাগরিককে স্বীয় আবাসভূমি থেকে তিাড়ন করা মৃত্যুর দণ্ডাদেশ দেয়ার সামিল।  বর্তমানে বর্মি সৈন্যরা মগ-দসু্যর মতো শুরু করে বর্বর অত্যাচার, হত্যা, রাহাজানি ও লুণ্ঠন।  বর্মি সৈন্যরা যত্রতত্র আরাকানিদের বন্দি করে মুক্তিপণ আদায় করতে থাকে।  মুক্তিপণ আদায় না করলে পাশবিক নির্যাতনের মাধ্যমে বন্দিদের হত্যা করতে থাকে আগুনে পুড়িয়ে।
একসময় চট্টগ্রাম ছিল অশান্তির স্থান শান্তির জন্য দলে দলে মানুষ আরাকানো যেত।  আর এখন (২০১৭) মানুষ চট্টগ্রামে আশ্রয় নিচ্ছে

থ্যসুত্র – বই থেকেঃ

 

রোহিঙ্গা nation
মিয়ানমার কীভাবে তার বেশিরভাগ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে বহিষ্কার করেছিল এটি তাঁর চিত্র। বর্তমান এ দেড় মিলিয়ন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে বসবাস করছে যা মিয়ানমারের বর্তমানে অবশিষ্ট রোহিঙ্গার থেকে বেশী।  সূত্র – আল জাজিরা


কিভাবে কেড়ে নেয়া হল তাদের অধিকার ? 

স্বাধীন হবার পর থেকে একটা সময় বার্মা যখন মিয়ানমার হল তার সাথে সাথে আরাকান রাজ্য রূপ নিল রাখাইন রাজ্যে।  বহুযুগ থেকে বাস করা এই রাখাইন বংশধর নিয়েই শুরু হয় বিপুল তর্কযুদ্ধ।

এদিকে মিয়ানমারে তখন চলছে সামরিক জান্তা শাসন।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চীনের পক্ষে অবস্থানকারী বীর নেতা অং সান এর কণ্যা অং সান সুচি ফিরে আসেন দেশে।  গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য তার অহিংস সংগ্রাম তাকে নিজদেশে গৃহবন্দি করে রাখে দীর্ঘকাল । এ কারণে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কারও লাভ করেন।

কিন্তু ইতোমধ্যে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ১৯৮২ সালের সংবিধানে নাগরিকত্ব নিয়ে তৈরি হয় নতুন আইন।  যেখানে নাগরিকত্বের সংজ্ঞায় বলা হয়,‘Nationals such as the Kachin, Kayah, Karen, Chin, Burman, Mon, Rakhine or Shan and ethnic groups as have settled in any of the territories included within the State as their permanent home from a period anterior to 1185 B.E., 1823 A.D. are Burma citizens’।

এই আইনের ফাঁকেই তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করে শত বছরের এই রাখাইন গোষ্ঠি আসলে বহিরাগত।  অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের পরে পূর্ব বাংলা থেকে এসে আশ্রয় নিয়েছে।  ফলে তাদের পূর্বপুরুষেরা এই অঞ্চলের হওয়া সত্বেয় তাদের কাছ থেকে নাগরিকত্বের অধিকার সম্পূর্ণভাবে কেড়ে নেয়া হয়। 
সমকালীন আন্তর্জাতিক আইন

বর্তমান আলোচনার শুরু কোথায়  ? 

নাগরিকত্ব হারিয়ে যখন রোহিঙ্গারা সব রকম মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, যখন নিজের দেশে নিজেরাই ভিনদেশি, তখন থেকেই তারা একটু একটু করে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিতে শুরু করে।

কিন্তু এদেশে প্রথম রোহিঙ্গা উদবাস্তুদের ঢল শুরু হয় ১৯৭৮ সাল থেকে।  কারণ সে সময় মিয়ানমার সামরিক সরকার শুরু করে ‘অপারেশন নাগামিন’।  যেখানে অবৈধ অভিবাসী চিহ্নিত করে রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন শুরু হয়।  তখন দলে দলে তারা আসতে থাকে বাংলাদেশে।

গতবছর অক্টোবর মাসে রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানে ব্যাপক হারে নির্যাতনের জের ধরে গত ২৪ আগস্ট রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা পুলিশ চেকপোস্টে হামলা চালায়।  এরপর থেকেই শুরু হয় ধ্বংসযজ্ঞ। সেনাবাহিনীর পালটা আক্রমণ, অত্যাচার সইতে না পেরে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম এখন আশ্রয় নিতে এসেছে বাংলাদেশে।

বিপুলহারে এসব দরিদ্র মানুষগুলো এখন নির্মম এবং দুর্বিষহ জীবন পার করছে। মূলত সে কারণেই আবার বিশ্বে আলোচনার শীর্ষে চলে এসেছে রোহিঙ্গা ইস্যু।

রোহিঙ্গা : নিজের দেশেই যখন ভিনদেশি
১৯৭০ এর দশকের শেষের দিক থেকে প্রায় এক মিলিয়ন রোহিঙ্গা ব্যাপক অত্যাচারের কারণে মিয়ানমার থেকে বিতারিত হয়ে বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহন করে। এখানে তাঁর একটি চিত্র তুলে ধরা হল।  সূত্র – আল জাজিরা

দায় কাদের ?

রোহিঙ্গাদের দায় কার? চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায় মিয়ানমারের। কিন্তু মানবিকতার দিক থেকে আমরা কেউ কি এই দায় এড়াতে পারি ?

রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ নিয়ে বর্তমানে বিশ্বের কাছে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে আছেন অং সান সুচি।  যিনি মানবিকতা রক্ষায় অহিংস সংগ্রাম করে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।  তার কাছ থেকে আর যাই হোক নিজের দেশের মানুষের প্রতি এমন নির্মম অত্যাচারের বিরোধিতা না করে বরং নিশ্চুপ নিরবতা আশা করা যায় না একেবারেই।

ভয় হতে অভয় পথে ও অন্যান্য রচনা, দি লেডি এন্ড দ্য জেনারেলস অং সান সুচি ও বার্মার মুক্তি সংগ্রাম, সেনা নির্যাতনের দায় হিসেবে আরো যে একজনের কথা উঠে এসেছে তিনি হলেন মিয়ানমার সেনাপ্রধান মিন অং লাইং।  যতদূর জানা যায় মূলত তার নির্দেশেই পুলিশ ঘাটিতে হামলার জের ধরে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো হচ্ছে অমানুষিক নির্যাতন। যে দেশে দীর্ঘদিন ধরে চলে এসেছে সামরিক শাসন এবং সংসদে যাদের ২৫ শতাংশ আসন বরাদ্দ থাকে সেনা সদস্যদের জন্য সে দেশে খুব রাতারাতি কোন আইনি পরিবর্তন করা যে সম্ভব নয় তা ভালই বোঝা যায়।

বিশ্ব কি চায় ?

বিশ্বের বেশিরভাগ বাঘা বাঘা দেশ এই রোহিঙ্গা গণহত্যার বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে মিয়ানমারের ওপর। এমনকি বসে থাকেনি সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রও। জাতিসংঘে বরাবরের মতই রোহিঙ্গা ইস্যুকে গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা মুসলিমদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছে অনেকেই। এখন শুধু দেখার বিষয় শেষ পর্যন্ত মিয়ানমার তাদের বিবেকের দৃষ্টি থেকে কতটা অগ্রসর হয় এই সমস্যা সমাধানে।

আমরা বাঙ্গালীরা সবসময়ই পাত পেরে দিয়েছি। সে আমাদের কমে যাওয়া নয় বরং গর্বের।  আর সেই জায়গা থেকে একদিন হয়তো ক্ষমতাধর মানুষদের সুমতি হবে।  একদিন হয়তো রোহিঙ্গা জাতি ফিরে পাবে তাদের সার্বভৌমত্বের অধিকার।  বুক ভরে নিঃশ্বাস নেবার অধিকার।

তবে যারা আরো তথ্য জানতে চান তারা সংগ্রহ করতে পারেনঃ Modern China-Myanmar Relations: Dilemmas of Mutual Dependence 

 

এক নজরে দেখে নিন মায়ানমার সম্পর্কিত  বেস্ট সেলার ৫ টি বইয়ের নাম ও লিঙ্কঃ

 

আরও পড়ুনঃ 

কলমের ইতিবৃত্ত

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ১০ টি বই, আপনার পড়া আছে কয়টি???

গেম অব থ্রোন্স থেকে যে ৮ টি শিক্ষা আপনি নিতে পারেন

বঙ্গে ইংরেজি শিক্ষার ইতিহাস

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png