জাপানের বৈধ জুয়া !!

পাচিনকো, জাপানি জুয়াখেলা

আন্ডারগ্র্যডে আমার একটি সাবজেক্ট ছিল, জাপানি সংস্কৃতি। পড়াতে আসতেন মজার একজন শিক্ষক। ক্লাস শুরুর দিন উনি হুঙ্কার দিয়ে বলে নিলেন – জাপানি সংস্কৃতি ক্লাসরুমে বসে শেখার জিনিস নয়। ক্লাসের দিন উনি ওনার গাড়ি দিয়ে আমাকে এই জিনিস সেই জিনিস দেখাতে নিয়ে যান। একদিন নিয়ে গেলেন পাচিনকো খেলতে।

বিশাল এক রুম। গরগর আওয়াজ। সিগারেটের গন্ধ।

উনি ১০০০ ইয়েন দিয়ে কিছু পিন বল কিনলেন। সম্ভবত ১০০ টি। মার্বেলের চেয়ে ও অনেক ছোট। অনেকটা গাড়ির বিয়ারিং এর ভেতরে যে গোল গোল স্টিলের বল থাকে ঐ ধরণের বল। এই বলগুলো ঢেলে দিতে হয় একটা ফানেলের ভেতর। একটা একটা বল পড়তে থাকে আর সেই বলটাকে শুট করে পাঠাতে হবে বিভিন্ন স্কোর ওয়ালা খোপের ভেতর। ছোটবেলায় যে বাগাডুলি খেলেছি, এক্সাক্টলি সেই খেলা।

পাচিনকো জাপানি জুয়াখেলা 1

৭ মিনিটেই আমার সব পিনবল শেষ হয়ে গেল। আমার ওস্তাদ খেলেই যাচ্ছেন। উনি বেশ স্কোর করেই যাচ্ছেন। স্কোর করা মানে বলের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। এই বলগুলো রিসেপশনে নিয়ে যেতেই কয়েকটা কয়েন দিলেন। ওনারা বলেন মেডেল। মেডেল গুলো নিয়ে পাচিনকো হল থেকে বেরিয়ে অন্য আরেকটি দোকানে গেলেন। মেডেল দিলেন- ৩০০০ ইয়েন এলো। খুশির সাথে বললেন, তোমারটা মিলে ২০০০ ইয়েন ইনভেস্ট, পেলাম ৩০০০ ইয়েন। ১০০০ ইয়েন লাভ।

এটা যে জুয়া খেলা তা বুঝলাম ওনার ব্যাখ্যা থেকে।
বললেন, এই খেলার নাম পাচিনকো। জাপানি জুয়া খেলা।
বলেন কি? এটা কি জুয়া খেলা?
-ইয়েস। জাপানে জুয়া খেলা নিষিদ্ধ।
বলেন কি? পুলিশ দেখে না?
-দেখে। ওরা নিজেরা ও খেলে।

জুয়া খেলার যে সংজ্ঞা, সেই সংজ্ঞায় পাচিনকো পড়ে না।

পাচিনকো, জাপানি জুয়াখেলা 2পাচিনকো পার্লারে তুমি একটা গেইম খেলেছ। অন্য যে কোন খেলার মতই। যেমন গেইম খেলা, বোলিং খেলা, বিলিয়ার্ড খেলা। শুধু তফাৎ টা হচ্ছে, খেলার পর স্কোর অনুযায়ী একটা পুরস্কার নিচ্ছ। তোমরা বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পাওনা? এটা ও তাই।

পুরস্কার হিসাবে তোমাকে দেয়া হচ্ছে মেডেল।
পুরস্কার তুমি বাড়িতে নিয়ে সাজিয়ে রাখতে পারো। ইচ্ছা করলে রিসাইকেল শপে বিক্রি ও করে দিতে পারো।
আমার ইচ্ছা আমি এই মেডেল বিক্রি করলাম আর পয়সা নিলাম।
সরকার থেকে দেখতে গেলে পিস বাই পিস প্রত্যেকটা প্রসেস আইনি, বেআইনি নয়। একজন জুয়াড়ি হিসাবে আমি জিতে গিয়ে আলাদা ইনকাম করলাম। আমি জুয়া হিসাবে দেখতে পারি। কিন্তু সরকার জুয়া হিসাবে দেখতে পারছেনা। জুয়া নিষিদ্ধ হলে ও প্রত্যক্ষভাবে জুয়ার সংজ্ঞায় না পড়ায় সরকার দোষ দেখতে পারছেন না। এরা সেই সুযোগটাই নিয়েছে। অবৈধ একটা ব্যবসা বৈধ ভাবে করছে।

পাচিনকো জাপানি জুয়াখেলা কে নিষেধ করতে হলে বোলিং, বিলিয়ার্ড, এসব খেলাই বন্ধ করতে হবে। শুধু পাচিনকোর জন্য তো আর আলাদা আইন তৈরি হতে পারে না।

পাচিনকো, জাপানি জুয়াখেলা 3 আরো কিছু তথ্য দিলেন, সব মনে করতে পারছি না। গুগোল চাচ্চু থেকে কিছু তথ্য দিচ্ছি।

(১) পাচিনকো জাপানি জুয়াখেলা পার্লারের সংখ্যা ১৭০০০ এর মতো। জাপানে ছোট বড় শহরের সংখ্যা ৬৫০। একেকটা উপজেলা বলতে পারেন। একটা শহরে গড়ে ২৫ টির ও বেশি পাচিনকো পার্লার।

(২) শুধু পাচিনকোর মার্কেট ভ্যালু ৩০০ বিলিয়ন ডলার। ১৯৯৪ সালের হিসাব মতে। ২০১৫ সালে শুধু জাপানি পাচিনকো গুলো যা আয় করেছেন তা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জুয়ার শহর লাস-ভেগাস, সিঙ্গাপুর, এবং মাকাউ শহরের আয় একসঙ্গে করলে ও জাপানের সমান হবে না। জাপানের মার্কেট এতোই বড়।

(৩) পাচিনকো খেলে বৃদ্ধরা। যৌবনকালে অনেক টাকা কামিয়েছেন। সেই টাকা খরচ করার জায়গাটুকু কোথায়? পাচিনকো কেউ খেলে টাকা বানানোর জন্য আর কেউ খেলে এন্টারটেইন্মেন্টের জন্য। ওনারা হারেন। এই হারার টাকার একাংশ যায় পাচিনকো পার্লারের মালিকের কাছে। বাকি অংশ খেলায় জিতিয়ে দেন। খেলায় জেতা ভাগ্য নয়, কম্পিউটার দিয়ে কন্ট্রোল করে। এমন ক্যাম্পেইন ও দেখা যায়, আজ দ্বিগুণ লোক জেতানো হবে, আজই আসুন।

(৪) জাপানের পাচিনকো ব্যাবসায়ীদের ৮০% এথনিক কোরিয়ান।

(৫) পাচিনকো উচ্চারণ করার সময় পুরোটা উচ্চারণ করতে হবে। “পা” বাদ দিয়ে বাকিটা উচ্চারণ করলে খবর হ্যাজ।

সম্পুর্ন অবৈধ এক ব্যবসা। কিন্তু পিস বাই পিস বৈধ। ১৯২০ সাল থেকে শুরু। ১০০ বছর হয়ে গেল। কোন নতুন আইন তৈরি করতে পারছেনা।

তবে গত বছর ২০১৮ সালে একটা আইন পাশ হয়েছে। ৩ টি রিসোর্ট কে ক্যাসিনো চালানো লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। পরীক্ষামূলক ভাবে।

আমাদের দেশে ক্যাসিনো অবৈধ।
হাউজি বৈধ?
লটারি?

লিখেছেনঃ আশির আহমেদ,  এক নজরে আশির আহমেদঃ জাপান কাহিনী ধারাবাহিক ভাবে লিখেছেন আশির আহমেদ, তিনি জাপানের কিয়ুশু বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহযোগী অধ্যাপক । দীর্ঘ ২৮ বছরের জাপানের অভিজ্ঞতা বাংলাভাষীদের জন্য লিখে যাচ্ছেন আশির-ঢঙের জাপানকাহিনি। তিনি দেশটিকে ও টুরিস্টদের মতো বাইরে থেকে দেথেনি- দেখেছে একজন বিদেশি হিসেবে যে বহুদিন সে দেশে থাকতে থাকতে নানা বাস্তব ও মানবিক অভিজ্ঞতায় ভরে উঠেছে। এ বই তারই উষ্ণ সজীব বিবরণ। জাপান এর বিভিন্ন কাহিনী নিয়ে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৪( জাপান কাহিনী-১ থেকে ৫ খন্ড)। তাঁর সবগুলো বই দেখুন রকমারি ডট কম -এ

 

আশির আহমেদ এর জাপান কাহিনি (১ম, ২য়, ৩য় ৪র্থ ও ৫ম খণ্ড) রকমারি কালেকশন বই একত্রে কিনতে এখানে ক্লিক করুন ! 

তথ্য সূত্র; জাপানিজ পাচিনকো https://en.wikipedia.org/wiki/Pachinko

আরও পড়ুনঃ 

জাপান কাহিনীঃ জাপানি মিডিয়া

দক্ষ কর্মী হওয়ার জন্য মস্তিষ্কের বিকাশ কেন জরুরি ?

বই পড়লে আয়ু বাড়ে !

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png