একজন মোস্তফা কামাল এবং তার আড়াই দশকের লেখালেখি

112

184

একজন মোস্তফা কামাল এবং তার আড়াই দশকের লেখালেখি

  • 0
  • #অন্যান্য
  • Author: rokomari
  • Share

উপন্যাস থেকে শুরু করে শিশুসাহিত্য, ছড়া, রম্য রচনা কিংবা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী- লেখালেখির ভুবনে প্রায় সবক্ষেত্রেই রয়েছে তার পদচারণা। আর সেই পদচারণাও খুব অল্প সময়ের জন্য নয়। প্রায় আড়াই দশক ধরে এখানে কাজ করছেন তিনি। আর একটু একটু করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, শক্ত করেছেন নিজের আসনকে। তিনি এসেছিলেন জয় করতে, মানুষের মাঝে নিজের চিন্তাগুলোকে ছড়িয়ে দিতে। আর সেটা করে দেখিয়েছেনও তিনি। লেখক হিসেবে তার শুরুটাই যেন ছিল স্থায়ীভাবে থাকার জন্য। বলছিলাম লেখক মোস্তফা কামালের কথা।

৩০শে মে, ১৯৭০ সালে জন্ম নেন মোস্তফা কামাল। বরিশালের হিজলা উপজেলার আন্ধারমানিক গ্রামে বাবা মোঃ হোসেন হাওলাদার এবং মা সুফিয়া বেগমের ঘর আলো করে আসেন তিনি। তার বেড়ে ওঠাটা ছিল আর দুই ভাই-বোনের সাথে। তবে বাকিদের চাইতে একটু অন্যরকম ছিলেন মোস্তফা কামাল। ছোটবেলা থেকেই একটু প্রতিবাদী চিন্তার অধিকারী ছিলেন এই লেখক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবসময় লড়াই করেছেন, কথা বলেছেন তিনি। আন্ধারমানিক গ্রামটি বেশ উন্নত স্থান হলেও আশেপাশে নানারকম অনুন্নয়ন আর অনিয়ম দেখেছেন মোস্তফা কামাল ছোটবেলা থেকেই। চরের দখল নিয়ে মানুষের মারামারি, দরিদ্র কৃষকদের ফসল ঘরে না তুলতে পারার কষ্ট- এই সবটাই দেখে বড় হয়েছেন লেখক। আর তাই সমস্ত অনিয়ম আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে চেয়েছেন তিনি। কিন্তু কীভাবে মানুষ তার কথা শুনবে? মানুষের কাছে নিজের এই কথাগুলোকে পৌঁছে দিতেই কলম হাতে তোলেন মোস্তফা কামাল।

প্রথম অষ্টম শেণীতে থাকতেই চারপাশের অনিয়ম নিয়ে লেখেন মোস্তফা কামাল। বরিশালের ‘সাপ্তাহিক বিপ্লবী’ পত্রিকায় নিজের লেখা পাঠান। সেই প্রথম নিজের লেখা পত্রিকার পাতায় দেখার সুযোগ হয় মোস্তফা কামালের। এরপর আর থামেননি লেখক। তৎকালীন ‘দৈনিক প্রবাসী’ এবং ‘সাপ্তাহিক বিপ্লবী’তে নিয়মিত লেখা পাঠাতে শুরু করেন তিনি। শুধু প্রতিবেদন নয়, ছড়া আর গল্পও লিখতে শুরু করেন তিনি। মা সুফিয়া বেগম ছিলেন ছেলের লেখার মূল উৎসাহদাত্রী। লেখা ছাপা হলেই মোস্তফা কামাল যেমন মাকে দেখাতেন, তেমনই মা সুফিয়া বেগমও সবসময় ছেলেকে আরো বেশি লিখে যেতে বলতেন। মা জানতেন, ছেলে বড় লেখক হবে। সুফিয়া বেগম ভুল জানতেন না।

লেখালেখির শুরু এসময় হলেও, মূলত ১৯৯১ সাল থেকে নিয়মিত লেখক হিসেবে কাজ শুরু করেন মোস্তফা কামাল। এসময় লেখালেখি আর শখ ছিল না, অনেকটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল যেন। না লিখলে সময় কাটতে চাইতো না! লেখকের প্রথম ছড়া ছিল ‘দুষ্টু ছেলে’। প্রথম গল্প লিখেছিলেন তিনি মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে। গল্পের নাম ছিল ‘বীরাঙ্গনার লড়াই’। আর উপন্যাসের হাতেখড়ি হয়েছিল ‘পাপের উত্তরাধিকার’কে দিয়ে। তবে ১৯৯৩ সাল থেকেই নিয়মিত বই প্রকাশ করা শুরু করেন মোস্তফা কামাল। বর্তমানে লেখক হিসেবে গল্প, উপন্যাস ইত্যাদির মাধ্যমেই আমরা তাকে চিনি। তবে লেখকের প্রথম বইটি ছিল একটি গবেষণাধর্মী বই। ‘আসাদ থেকে গণঅভ্যুথান’ নামে এই বইটির শুরু অবশ্য হয় পত্রিকা থেকে। নিয়মিত একটি গবেষনা সিরিজ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় প্রাথমিকভাবে। আর সেখান থেকেই তৈরি হয় বই।

প্রথম বই পাঠক জনপ্রিয়তা পেলেও পরবর্তীতে নিজের মূল লেখক ধারায় ফিরে আসেন মোস্তফা কামাল। প্রকাশিত হয় তার গল্পের বই। সেটা ছিল ১৯৯৬ সালের কথা। পরের বছর, ১৯৯৭ সালেও তার আরেকটি বই প্রকাশিত হয়। এরপর প্রতি বছর মোস্তফা কামালের কয়েকটি করে বই প্রকাশিত হয়েছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, পশ্চিমবঙ্গেও ছড়িয়ে পরছে লেখকের জনপ্রিয়তা। বিশেষ করে, তার ‘জননী’ বইটি বয়সভেদে পাঠকজনপ্রিয়তা লাভ করেছে। লন্ডনের অলিম্পিয়া পাবলিশার্স থেকে বইটির ইংরেজি অনুবাদ ‘দ্য মাদার’ প্রকাশিত হয়েছে। তবে শুধু লেখক হিসেবে বইয়ের পাতায় আবদ্ধ থাকতে চাননি মোস্তফা কামাল। তিনি দেশ ও সমাজের জন্য আরো বেশি করে কাজ করতে চেয়েছেন। আর তাই একটা সময় পত্রিকার সাথেও যুক্ত হয়েছেন। লেখক ও সাংবাদিক হতে চেয়েছিলেন মোস্তফা কামাল ছোটবেলা থেকেই। সেই ইচ্ছেটা পূরণও করেছেন তিনি। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রথম সারির জাতীয় দৈনিক কালের কন্ঠে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে নিয়োজিত আছেন এই লেখক। গল্প, উপন্যাসের পাশাপাশি রম্যতেও হাত দিয়েছেন তিনি। প্রতিবছর তার লেখা রম্য বই ‘পাগল-ছাগল ও গাধাসমগ্র’ নতুন পর্ব নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। ক্লোনমামা, মিরাকুলাস, বিমানরহস্যের মতো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতেও তিনি নিজের দক্ষতা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের পাশাপাশি কলকাতাতেও মোস্তফা কামালের বই প্রকাশিত হয়েছে। গোয়েন্দা কাহিনী ও সায়েন্স ফিকশন নিয়ে প্রকাশিত তার এই বইগুলো উপভোগ করেছেন ওপার বাংলার মানুষও।

নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে মিনু আফরোজকে বেছে নিয়েছেন লেখক। মিনু আফরোজের বাবা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ডাক্তার আবু সোলায়মান। নিজের লেখনীতে মুক্তিযুদ্ধের ছাপ তাই লেখক আরো কাছ থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে দিতে পেরেছেন। লেখালেখির জীবনে মায়ের পর অন্যতম মানুষ হিসেবে পাশে পেয়েছেন তিনি স্ত্রীকে। দুই ছেলে-মেয়ে মুগ্ধতা ও মুহিতকে নিয়ে তার সুখী সংসার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করেও বাংলা সাহিত্যেই নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন মোস্তফা কামাল। বইয়ের পাশে টিভি নাটকও লিখেছেন তিনি। পরিচিতি পেয়েছেন কলামিস্ট হিসেবে।

তেলবাজ’, ‘পারমিতাকে শুধু বাঁচাতে চেয়েছি’, ‘অগ্নিপুরুষ’, ‘অগ্নিকন্যা’, ‘ডাকাতের কবলে ফটকুমামা’, ‘হাসির চার উপন্যাস’,  ‘হ্যালো কর্নেল’, ‘কবি ও একজন নর্তকী’, চার জয়িতা’, ‘আমি রাসেল বলছি’, ‘নির্বাচিত প্রেমের গল্প’, ‘আমি কবি’, ‘বান্দরবানের জঙ্গলে’, ‘অপার্থিব’ সহ এখন পর্যন্ত প্রায় শতাধিক বই লিখেছেন মোস্তফা কামাল। ইংরেজিতেও ‘থ্রি নভেলস’ নামে বই প্রকাশিত হয়েছে লেখকের। এই বছর তার অগ্নি ট্রিলজির তৃতীয় বই ‘অগ্নিমানুষ’ প্রকাশ পেয়েছে। যেখানে মূল চরিত্র ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। লেখকের লেখনীতে রাজনীতি, সমাজ, ভালোবাসা, মুক্তিযুদ্ধ, প্রগতিশীল চিন্তা ইত্যাদি খুঁজে পাওয়া যায়। তবে লেখকের সব লেখাই অনন্য। কোনোটির সাথে কোনোটির মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। প্রতিনিয়ত নতুন কিছু লেখার জন্যই চেষ্টা করেন তিনি। কাজের ফাঁকে প্রতিদিন লিখে যান। আর তাই, বইমেলা কিংবা বইমেলার বাইরে, সবসময়েই খুঁজে পাওয়া যায় মোস্তফা কামালকে।

ইতিমধ্যে বেশ কিছু পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়েছে মোস্তফা কামালকে। এর মধ্যে ২০১৭ সালে কলকাতা থেকে ‘সায়েন্স ফিকশন সাহিত্য পুরষ্কার ২০১৭’ অর্জন করেন তিনি। তবে মোস্তফা কামালের কাছে রয়েছে আরেকটি খুব বড় পুরষ্কার। আর সেড়ি হলো- মানুষের ভালোবাসা।

ঘরে বসে লেখকের বইগুলো হাতে পেতে এখুনি অর্ডার করুন রকমারিতে।   

Write a Comment