মুহম্মদ জাফর ইকবাল এর যুদ্ধজীবন ও কিছু অজানা কথা !

জাফর ইকবাল

মুহম্মদ জাফর ইকবাল । লেখক, পদার্থবিদ ও শিক্ষাবিদ। তাকে বাংলাদেশে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখা ও জনপ্রিয়করণের পথিকৃৎ হিসাবে গণ্য করা হয়। এছাড়াও তিনি একজন জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক এবং কলাম-লেখক। তার লেখা বেশ কয়েকটি উপন্যাস চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে। গুণী এই লেখকের লেখালেখি, যুদ্ধজীবন ও অন্যান্য তথ্য নিম্মে তুলে ধরা হলো-

লেখকবান্ধব পরিবার

মুহাম্মদ জাফর ইকবাল মাত্র ৭ বছর বয়সে সায়েন্স ফিকশন লেখা দিয়ে শুরু করে ছিলেন লেখালেখি। বাবা লিখতেন, মা লিখতেন, ভাইয়েরা লেখেন, বোনেরাও লেখেন, এখন তাদের ছেলেমেয়েরাও লেখে! তারা বইয়ের মাঝে বড় হয়েছেন, কাজেই বই পড়তে পড়তে লেখার ইচ্ছে করবে সেটাই স্বাভাবিক। পরিবারে সেটা নিয়ে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে তাই লেখালেখি করেছেন সবাই। লেখালেখি না করাটাই অস্বাভাবিক হতো। তবে লেখালেখি করে লেখক হিসেবে পরিচিতি হবে সেটা কখনোই মাথায় ছিল না ইকবালের, লেখালেখি করেছেন মনের আনন্দে!

যুদ্ধবিধ্বস্ত জীবন

১৯৭১ সালে তাড়া খাওয়া পশুর মতো ছুটে বেড়িয়েছেন মুহাম্মদ জাফর ইকবাল। একটি দিন শেষ হওয়ার পর অন্য একটা দিন শুরু হবে কি-না জানতেন না! যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর উদ্বাস্তুর মতো ঘুরে বেড়িয়েছেন। রক্ষীবাহিনী বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পর রাস্তায় রাত কাটিয়েছেন। পরের বেলা কোথা থেকে খাবার আসবে জানতেন না। এমন দিন গিয়েছে যে, বাসায় একটা শার্ট, সেটা পরে কখনও বড় ভাই বাইরে গেছে, সে ফিরে এলে সেই শার্ট পরে ছোট্ট জাফর বাইরে গেছেন।

বাবার যুদ্ধ

জাফর ইকবালের বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু তিনি যে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে অস্ত্র হাতে পাকিস্তানিদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন তা নয়। পুলিশ অফিসার ছিলেন, সেই হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছেন, যার জন্য পাকিস্তানি মিলিটারির হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে তাকে। ইকবাল মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে অনেক চেষ্টা করেছিলেন, পারেননি।

অসাধারণ মা পাওয়া

জাফর ইকবালদের সৌভাগ্য, তারা একটা অসাধারণ মা পেয়েছেন। যিনি তাদের পুরো পরিবারটাকে ধরে রেখেছিলেন। এবং তারা যুদ্ধ ফেরিয়েও টিকে গেছেন। অথচ এই দেশে সেই দুঃসময়ে অসংখ্য পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে।

ছোটদের আবদার

পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন কলাম বা নিবন্ধে সমাজ এবং রাজনীতি সচেতন একজন প্রগতিশীল জাফর ইকবালকে দেখা গেলেও এসব বিষয়কে উপজীব্য করে ঔপন্যাসিক হিসেবে তাকে দেখা যায় না। কারণ এমনটি হলে ছোট বাচ্চারা তাকে খুন করে ফেলবে। ছোটরা তাকে বলেছে সবাই বড়দের জন্য লেখে, খবরদার আপনি বড়দের জন্য লিখতে পারবেন না।

২২ পৃষ্ঠায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

মুহম্মদ জাফর ইকবাল মাত্র ২২ পৃষ্ঠায় লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। বইটির ভেতরের গল্পটা সহজ। জোট সরকারের আমলের একটা শ্বাসরুদ্ধকর সময়, মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করার, অবমাননা করার সব রকম চেষ্টা চলছে। জাফররা সমমনা বেশকিছু মানুষ বসেছেন কী করা যায় সেটা নিয়ে কথা বলতে। অনেক সুন্দর সুন্দর পরিকল্পনা এসেছে, ইকবাল তার মাঝে বললেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ।

নতুন প্রজন্ম যদি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটুকু জানে তাহলে তারা দেশের জন্য যে ভালোবাসা অনুভব করবে সেটি আর অন্য কোনোভাবে সম্ভব নয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটুকু হবে ছোট, যেন এক কাপ চা খেতে খেতে পড়ে ফেলতে পারবে, বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে পড়ে ফেলতে পারবে কিংবা দুই ক্লাসের মাঝখানে পড়ে ফেলতে পারবে। প্রতিটি লাইনের রেফারেন্স থাকবে যেন কেউ এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে না পারে।

ইতিহাসটি হবে এক ফর্মার নিউজপ্রিন্টের হ্যান্ডবিলের মতো, পড়ে ফেলে দিলেও ক্ষতি নেই। মূল্য হবে খুব কম যেন পয়সা খরচ না হয়!’ যারা উপস্থিত ছিলেন তারা জাফর ইকবালের প্রস্তাবটি লুফে নিলেন, কিন্তু নিউজপ্রিন্টের হ্যান্ডবিল করতে রাজি হলেন না। সেটা যেন সংগ্রহ করে রাখে সেই রূপটি দেবেন বলে ঠিক করলেন। সেই ঘরটিতে একটি কম বয়সী বাচ্চা মেয়ে ছিল। সে ইতস্তত করে বলল, ‘যদি সেই ইতিহাসটি মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার লেখেন তাহলে আমাদের বয়সী ছেলেমেয়েরাও সেটা পড়ে ফেলবে।’ তার কথাটা মেনে নিয়ে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো। এই হচ্ছে ইতিহাস। এটা লিখতে লেখককে যে পরিশ্রম করতে হয়েছে সেই পরিশ্রম করে দশটা সায়েন্স ফিকশন লেখতে পারতেন।

পুরস্কার কথন

বাংলা একাডেমী পুরস্কার পাওয়ার পর একাডেমী মাঠেই তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেছিলেন, ভালো লাগছে কিন্তু একই সঙ্গে খারাপ লাগাও আছে। আহমদ ছফাকেই এ পুরস্কার দেওয়া হয়নি বলেই তিনি খারাপ লাগার কথা বলেছিলেন। বাংলা একাডেমীর পুরস্কার পাওয়ার পর প্রতি বছরই এই পুরস্কারের মনোনয়ন দেওয়ার জন্য তার কাছে চিঠি পাঠানো হতো। মরণোত্তর পুরস্কার দেওয়ার প্রথা চালু করে আহমদ ছফা কে পুরস্কার দেওয়ার জন্য তিনি অনেকবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু প্রস্তাবকে কেউ গুরুত্ব দেয়নি।

তার পুরস্কারের ব্যাপারে একটা মজার তথ্য আছে। তাকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল ‘ভাষা ও সাহিত্যে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের’ জন্য। তিনি যখন পুরস্কার পেয়েছেন, তখন তিনি মাত্র দুটি পাতলা জিলজিলে বিজ্ঞানের বই লিখেছিলেন। তার খুব লজ্জা লেগেছিল। তাই তিনি প্রতি বছরই বিজ্ঞানের ওপর লিখতে চেষ্টা করেন যেন পুরস্কারটা হালাল হয়।

মুহম্মদ জাফর ইকবালের সকল বই

আরও পড়ুনঃ 

বইমেলা ২০১৯ এ মুহম্মদ জাফর ইকবালের বেস্টসেলার ৫টি বই

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png