অপারেশন নেমেসিস : তুরস্কের গণহত্যার প্রতিশোধ নেওয়া হয় যে মিশনে

অপারেশন নেমেসিস

আজকের সকালটা তালাত পাশা’র কাছে বেশ অদ্ভুত আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে। তিনতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে দূরের বাড়িগুলো দেখছেন, ধবধবে শুভ্র মেঘ ভেসে বেড়ানো আকাশ দেখছেন আর ভাবছেন পৃথিবীর সমস্ত স্নিগ্ধতা জড়ো হয়েছে তার শহরে। পাশা সাহেব সিদ্ধান্ত নিলেন সতেজ হাওয়া উপভোগ করতে শহরের পিচঢালা রাস্তায় একটু হাঁটবেন, অবশ্য রোজই তিনি মর্নিং ওয়াকে বের হন। হয়তো জানতেন না একটু পর এরকম সুন্দর এক সকালে তার জন্য কি মর্মান্তিক পরিণতি অপেক্ষা করছে !

অপারেশন নেমেসিস তালাত পাশা
তুরস্কের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাত পাশা

পাশা সাহেবের বাড়ির কাছেই এক যুবক ভোররাত থেকে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চুল উশকোখুশকো, গায়ে মলিন শার্ট, স্বাস্থ্য একেবারে ভঙ্গুর। মনে হয় যেন কোন চালচুলোহীন ভবঘুরে যে এক সপ্তাহ ধরে কিছু খায়নি।

পাশা সাহেব লম্বা কালো কোর্টের কলারের ভাঁজ ঠিক করতে করতে তার রাজকীয় বাড়ির গেট দিয়ে বের হলেন। পাশা সাহেবকে দেখামাত্রই যুবকের ঝিমধরা দেহে একটা চমক খেলে গেল। দীর্ঘ ছয় মাস চোখে চোখে রাখার পর আজ তার শিকারকে হাতের নাগালে পেয়ে যুবকের চোখ দপ করে জ্বলে উঠল। পকেটে হাত দিয়ে শেষবারের মতো চেক করে নিল রিভলবারসহ সব ঠিকঠাক আছে কিনা।

পাশা সাহেব জগিং করতে করতে যুবকের দিকেই আসছেন, তার ও যুবকের দুরত্ব ক্রমশ কমছে। একসময় যুবকের একদম কাছাকাছি চলে আসলেন পাশা। যুবক ক্ষিপ্রতার সাথে পকেট থেকে লোড করা রিভলবার বের করে পাশা সাহেবের ঘাড়ে তাক করলো। পরপর তিনবার বুলেট ফায়ার করার ঠাশ ঠাশ শব্দ শোনা গেল !

অপারেশন নেমেসিস -সগোমন তেহলিরিয়ান
তালাত পাশার হত্যকারী সগোমন তেহলিরিয়ান

ভাবছেন হয়তো কোন থ্রিলার গল্পের অংশ এটি ? মোটেই নয়। উপরের ঘটনাটি হচ্ছে ১৯২১ সালের ১৫ই মার্চে বার্লিনে সংঘটিত একটি গুপ্ত অভিযান, যেটি ‘অপারেশন নেমেসিস’ এর একটি অংশ ছিল। উপরে যে পাশাসাহেবের কথা বলা হলো, তিনি তুরস্কের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাত পাশা, আর খুনী ব্যক্তিটি হলো সগোমন তেহলিরিয়ান, জাতিতে আর্মেনীয় এবং আর্মেনীয় গণহত্যার পর বেঁচে যাওয়া অল্পসংখ্যক মানুষের একজন।

অপারেশন নেমেসিস - অটোমান সাম্রাজ্য
অটোমান সাম্রাজ্য

অপারেশন নেমেসিসের প্রেক্ষাপট

আর্মেনিয়া চতুর্থ শতকে পৃথিবীর প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে খ্রিস্টান ধর্মকে রাষ্ট্র ধর্ম করার ঘোষণা দিয়েছিল। এরপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজার অধীনে তারা শাসিত হয়েছে। পনের শতকে তারা অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে চলে আসে। অটোমানরা শুধু খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী হওয়ার জন্য তাদের অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে দেখতো। অটোমানদের চোখে আর্মেনীয়রা ছিল ‘অবিশ্বাসী’। তাই সুযোগ পেলেই অটোমানরা আর্মেনীয়দের উপর নিপীড়ন চালাতো।আর্মেনীয়রা ইতিহাসে দুবার অটোমানদের দ্বারা গণহত্যার শিকার হয়। একবার উনিশ শতকের শেষ দিকে ১৮৯৫-৯৬ সালে এবং আরেকবার প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়।

পড়ুন সাহাদত হোসেন খান এর অটোমান সাম্রাজ্য নিয়ে লেখা ৩ টি বই (রকমারি কালেকশন)

অপারেশন নেমেসিস - বাকুর যু্দ্ধকালীন অবস্থা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অটোমান সাম্রাজ্যের বাকুর যু্দ্ধকালীন অবস্থা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অটোমান তুর্কিরা অক্ষশক্তির পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং একই সাথে অক্ষ শক্তির খ্রিস্টানদের বাদে বাকি খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ‘হলিওয়ার’ ঘোষণা করে। হলিওয়ারের প্রধান শিকার হয় আর্মেনীয়রা। অটোমানরা আর্মেনীয়দের পুরো জাতিকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্নকরার জন্য ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত গণহত্যা সংঘটিত করে। তুরস্কের বাইরে ও আজারবাইজানে বাসকরা সংখ্যালঘু আর্মেনীয়রা নৃশংস গণহত্যার শিকার হয়। প্রায় দেড়মিলিয়ন আর্মেনীয় মানুষ এই গণহত্যার শিকার হন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এই গণহত্যার বিচার শুরু হয়। প্রহসনের বিচারে একত্রিশ জনের মধ্যে চারজনকে অভিযুক্ত করা হয় কিন্তু এরাও রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় বিভিন্ন দেশে পালিয়ে যায়। তুরস্কের বাইরে পুরো পৃথিবীতে অবাধে ভ্রমণ করতে থাকে। এটা গণহত্যার পর বেঁচে থাকা আর্মেনীয়রা মেনে নিতে পারেনি।

আর্মেনিয়ান রেভ্যোলুশনারি ফেডারেশনের ৯ম বিশ্ব কংগ্রেস অধিবেশন

এরপর১৯২০সালে আর্মেনিয়া স্বাধীনতা ঘোষণাকরে। ইয়েরেভান’কে আর্মেনিয়ার রাজধানী করা হয়। সেখানে আর্মেনিয়ান রেভ্যোলুশনারি ফেডারেশনের ৯ম বিশ্ব কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। এই বিশ্ব কংগ্রে সে আলোচনার মূলবিষয় ছিল আর্মেনীয় গণহত্যায় যারা জড়িত তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা। কংগ্রেস গুপ্তহত্যা অভিযানের মাধ্যমে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা পরবর্তীতে ‘অপারেশন নেমেসিস’ নামে পরিচিত হয়। অপারেশন নেমেসিস  এর  ‘নেমেসিস  ‘ হলো গ্রিক দেবদেবী।

অপারেশন নেমেসিসের মাস্টারমাইন্ড
অপারেশন নেমেসিসের ৩ মাস্টারমাইন্ড আরমেন গারো, এ্যারন শাখালিন, শাহান নাটালি

আরমেন গারো, এ্যারন শাখালিন, শাহান নাটালি-এই তিনজন ছিল অপারেশন নেমেসিসের মাস্টারমাইন্ড। এরাই মূলত অপারেশনের সব পরিকল্পনা করতেন। তবে অপারেশন পরিচালনার দলগুলো বিভিন্ন পেশার এবং পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আর্মেনীয়দের নিয়ে গঠিত হয়। অপারেশনের মূল টার্গেট ছিল তালাত পাশা। তালাত পাশা’ই মূলত গণহত্যার নির্দেশ দেন এবং জাতিগতভাবে তাদের নিশ্চিহ্ন করতে বলেন।

তালাত পাশা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির পরাজয় সুনিশ্চিত জেনে জার্মানিতে আত্মগোপন করেন। সেখানে গিয়ে তিনি তার নাম পাল্টিয়ে ফেলেন এবং ব্যবসায়ীর বেশে থাক থাকা শুরু করেন। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হয়নি। ১৯২১ সালের ১৫ মার্চ তাকে বার্লিনের শার্লোটেনবার্গের রাস্তায় গুলি করে মারা হয়।

জামাল পাশা ছিলেন অপারেশন নেমেসিসের আরেক টার্গেট এবং কুখ্যাত তিন পাশার মধ্যে অন্যতম। তিনি ছিলেন একজন মিলিটারি লিডার। অত্যন্ত নির্মম প্রকৃতির একজন মানুষ। এজন্য তাকে ‘জামাল দ্যা বুচার’ বলা হতো। তাকে ১৯২২ সালের ২১ জুলাই তিবলিসিতে স্টেফান জেঘিগিয়ান নামের গুপ্তহত্যাকারী দিয়ে হত্যা করানো হয়।

Ahmet_djemal
সিরিয়া সরকারের গভর্নর ও নৌমন্ত্রী জামাল পাশা

তিন পাশার সর্বশেষ পাশা ছিল এনভের পাশা। তিনি পেশায় একজন মিলিটারি অফিসার এবং ১৯০৮ সালে সংঘটিত হওয়া ‘তরুণ তুর্কি বিপ্লব’ এর একজন নেতা ছিলেন। তাকে তাজিকিস্তানে ১৯২২ সালে হ্যাকপ মেলকুমোভ নামের একজন অপারেশনের সদস্য দ্বারা হত্যা করা হয়।

ফাতালি খান খয়স্কি ছিলেন আজারবাইজানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। ১৯১৮ সালে বাকুতে যে গণহত্যা সংঘটিত হয় তার পুরো দায়ভার চাপানো হয় তার উপর। তাকে ১৯২০ সালের ১৯ জুন তিফলিসের এরেভেনিয়ান স্কয়ারে আরাম ইয়েরগেনিয়েন নামের একজন আততায়ী হত্যা করে। এছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন ব্যক্তি গুপ্তহত্যার শিকার হন, যারা গণহত্যায় জড়িত ছিলেন।

Khoysky
আজারবাইজানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ফাতালি খান খয়স্কি

পুরো অপারেশনে মাত্র দুজন আততায়ী ধরা পরেন। তার মধ্যে একজন হলেন বার্লিনে অপারেশন পরিচালনাকারী সেই তেহলিরিয়ান। তাকে আদালতে ডাকা হয় এবং তিনি দ্ব্যার্থকণ্ঠে বলেন,”আমি জানি আমি আমার বিবেকের কাছে নির্দোষ। আমি একজনকে হত্যা করেছি কিন্তু আমি মার্ডারার নই, কারণ আমি যাকে হত্যা করেছি সে আমার পরিবারসহ দেড় মিলিয়ন মানুষের হত্যার জন্য দায়ী। আমি নিজের চোখের সামনে আমার মায়ের মাথা দেহ থেকে আলাদা হতে দেখেছি,আপন বোনকে ধর্ষিত হতে দেখেছি।”

“আমি জানি আমি আমার বিবেকের কাছে নির্দোষ। আমি একজনকে হত্যা করেছি কিন্তু আমি মার্ডারার নই, কারণ আমি যাকে হত্যা করেছি সে আমার পরিবারসহ দেড় মিলিয়ন মানুষের হত্যার জন্য দায়ী। আমি নিজের চোখের সামনে আমার মায়ের মাথা দেহ থেকে আলাদা হতে দেখেছি,আপন বোনকে ধর্ষিত হতে দেখেছি।”

পড়ুন সাহাদত হোসেন খান এর ‘ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন‘ বইটি !

তেহলিরিয়ানের আইনজীবী আদালতে যুক্তি প্রদর্শন করে যে তেহলিরিয়ান গণহত্যাকালীন যে ট্রমার মধ্যে ছিল, সেটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি এবং সে তালাত পাশাকে হত্যার সময় মানসিকভাবে সুস্থ ছিল না। আদালত এ যুক্তি গ্রহণ করে তাকে মুক্তি দেয়। অনুরূপভাবে আরেকজন আততায়ীকেও মুক্তি দেয়া হয়। ১৯২২ সালের শেষের দিক থেকে আর্মেনিয়া, আজারবাইজান ও জর্জিয়ার সরকার একসাথে বলশেভিকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার ‘প্রমিথিউস’ বিল পাশ করলে আর্মেনীয় সরকার এই অপারেশন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়।

উৎস :
www.armeniagogo.com
www.operation-nemesis.com
www.mediamax.am/en
www.yonkerstribune.com
www.independent.co.uk

অপারেশন নেমেসিস সম্পর্কে আরও জানতে পড়ুন-
Eric Bogosian, Operation Nemesis: The Assassination Plot that Avenged the Armenian Genocide, Little, Brown and Company, April 21st, 2015

আরও পড়ুনঃ

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ১০ টি বই, আপনার পড়া আছে কয়টি???

যুগান্তকারী ১০ জন নোবেল বিজয়ীর গল্পকথা

গেম অব থ্রোন্স থেকে যে ৮ টি শিক্ষা আপনি নিতে পারেন

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png