সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদানে যেসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান প্রক্রিয়া

১৯০১ সাল থেকে সাহিত্যে অবদানের জন্য সুইডিশ একাডেমি নোবেল পুরস্কার প্রদান করে আসছে। ১৭৮৬ সালে রাজা গোস্তাফ তৃতীয় (১৭৪৬-১৭৯২) সুইডিশ ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে এই স্বশাসিত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানটি স্থাপন করেছিলেন। সাধারণত প্রতিবছর এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। যে কোনো দেশের সাহিত্যিক উক্ত সম্মান লাভ করতে পারেন। সুইডিশ একাডেমি লিখেছে, “সাহিত্যে আদর্শিক দিক থেকে সবচেয়ে অসাধারণ কাজ”র জন্য এই পুরস্কার প্রদান করা হয় (“in the field of literature the most outstanding work in an ideal direction”)। যদিও সাহিত্যিকের বিশেষ বিশেষ সৃষ্টি অসাধারণ হলেও মূলত সামগ্রিক সৃষ্টিকর্মের জন্য এই দূর্লভ স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। ১৯০১ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সাহিত্যে ১১৬ জন বিজয়ীকে ১১২ বার নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। তার মধ্যে ১৫ জন নারী। সর্বকনিষ্ঠ ৪১ জন এবং সর্বজ্যেষ্ঠ ৮৮ জন। ২০১৯ সালে এই দূর্লভ পুরস্কার অর্জন করেন পোল্যান্ডের সাহিত্যিক ওলগা টোকারজুক ও অস্ট্রিয়ান ঔপন্যাসিক পিটার হ্যান্ডকে উক্ত পুরস্কার লাভ করেন।

সুইডিশ একাডেমি বিজয়ী নির্বাচনের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা রাখেন। প্রতি বছর অক্টোবরের শুরুতে একাডেমি বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করেন। ১৮৯৫ সালে নোবেল পুরস্কার প্রতিষ্ঠাকালীন আলফ্রেড নোবেল (১৮৩৩-১৮৯৬) উক্ত পুরস্কার প্রদানের উইল করে যান। উল্লেখ্য, ১৯১৪, ১৯১৮, ১৯৩৫, ১৯৪০, ১৯৪১, ১৯৪২ ও ১৯৪৩ সালে সাতটি বছর উক্ত পুরস্কার প্রদান করা হয়নি।

রাজা গোস্তাফ
সুইডিশ একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা রাজা গোস্তাফ তৃতীয় (১৭৪৬-১৭৯২)

 

বলা বাহুল্য যে, অসাধারণ সাহিত্যিককে নোবেল বিজয়ী হিসেবে নির্বাচন করা হয়। খুবই দক্ষ ব্যক্তিবর্গ যথাযথ সাহিত্যিককে উক্ত পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেন। ৫০ বছর পার না হওয়া পর্যন্ত মনোনীত ব্যক্তিবর্গ ও তাদের অন্যান্য তথ্য প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

মনোনীত ও বাছাই প্রক্রিয়া

নোবেল পুরস্কার প্রদানে সাহিত্য ক্ষেত্রে আলাদা কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটি যোগ্য ব্যক্তিদের কাছে আমন্ত্রণপত্র প্রেরণ করেন। একাডেমির সদস্যদের মধ্য থেকে তিন বছরের জন্য কমিটির সদস্য নির্বাচন করা হয়। প্রার্থীদের যোগ্যতা মূল্যায়নের জন্য কমিটিকে সহায়তা করতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া হয়।

যোগ্য প্রার্থী

নিম্নোক্ত শর্ত সাপেক্ষে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য আবেদন করা যাবে:

১. সুইডিশ একাডেমি এবং উক্ত প্রতিষ্ঠানের মতো লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য লালন করে অন্য কোনো একাডেমি, সংগঠন ও সোসাইটির সদস্য হতে হবে;

২. বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সাহিত্য ও ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যাপক হতে হবে;

৩. সাহিত্যে ইতোমধ্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন;

৪. সেইসব লেখক শিবিরের (সোসাইটি) সভাপতি হতে হবে যা স্ব স্ব দেশে সাহিত্য সৃষ্টিকর্মে প্রতিনিধিস্থানীয়।

নোবেল বিজয়ী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া

সুইডিশ একাডেমি সাহিত্য ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কার প্রদান করবেন। উক্ত একাডেমির ১৮জন সদস্য রয়েছে। সাহিত্যের জন্য গঠিত কমিটি প্রার্থীদের মূল্যায়ন করেন এবং সুইডিশ একাডেমির কাছে তাদের নাম সুপারিশ করেন। এরপর একাডেমির চার থেকে পাঁচ জন সদস্য নিয়ে গঠিত দল চূড়ান্ত প্রার্থী নির্বাচন করেন।

 সাহিত্য ক্ষেত্রে নোবেল বিজয়ী
২০১৯ সালে সাহিত্য ক্ষেত্রে নোবেল বিজয়ী (২০১৮ সালের জন্য প্রযোজ্য ) পোল্যান্ডের সাহিত্যিক ওলগা টোকারজুক এবং ২০১৯ সালে সাহিত্য ক্ষেত্রে নোবেল বিজয়ী অস্ট্রিয়ান ঔপন্যাসিক পিটার হ্যান্ডকে ।

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য কে মনোনীত হবেন?

সাহিত্য ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কার প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো।

সেপ্টেম্বর– আমন্ত্রণপত্রগুলো প্রার্থীদের কাছে প্রেরণ: নোবেল কমিটি নোবেল পুরস্কার প্রদানের উদ্দেশ্যে ১০০জন যোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রার্থী-ফরম প্রেরণ করেন।

ফেব্রুয়ারি– উপস্থাপনের সর্বশেষ তারিখ: চলতি বছরের ৩১ তারিখের মধ্যে পূরণকৃত ফরমগুলো অবশ্যই নোবেল কমিটির কাছে পাঠাতে হবে। কমিটি প্রাপ্ত ফরম থেকে প্রার্থীদের নিবিড়ভাবে বাছাই করে অনুমোদনের জন্য একাডেমির কাছে প্রেরণ করবে।

এপ্রিল– প্রাথমিক প্রার্থী: এরপর পর্যবেক্ষণ করে কমিটি ১৫ থেকে ২০ জনের নাম বিবেচনার জন্য একাডেমির কাছে প্রাথমিক প্রার্থী হিসেবে প্রেরণ করবে।

মে– চূড়ান্ত প্রার্থী: অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কমিটি পাঁচজন প্রার্থীর নাম সম্বলিত একটি তালিকা বিবেচনার জন্য একাডেমির কাছে সরবরাহ করবে।

সাহিত্যে নোবেল
সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীদের মনোনয়নের প্রক্রিয়া।  সূত্র – nobelprize.org

 

জুন-আগস্ট- সৃষ্টিকর্মের মূল্যায়নধর্মী পাঠ: গ্রীষ্মকালে একাডেমির সদস্যবৃন্দ চূড়ান্ত প্রার্থীদের রচনাগুলো পড়ে মূল্যায়ন করবেন। কমিটির সদস্যবৃন্দ আলাদা আলাদাভাবে এনিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করবেন।

সেপ্টেম্বর– একাডেমির সদস্যবৃন্দের আলোচনা: চূড়ান্ত প্রার্থীদের রচনাগুলো পাঠের পর প্রার্থীদের মেধা ও অবদান নিয়ে আলোচনায় বসবেন।

অক্টোবর– নোবেল বিজয়ী বাছাই: অক্টোবরের শুরুতে একাডেমি নোবেল বিজয়ী বাছাই করবেন। একজন প্রার্থীকে অবশ্যই গ্রহণকৃত ভোটের অর্ধেকের বেশি ভোট লাভ করতে হবে। তারপর বিজয়ী প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে।

ডিসেম্বর– নোবেল বিজয়ীর পুরস্কার গ্রহণ: বছরের ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে বিজয়ীরা পুরস্কার গ্রহণ করেন। প্রার্থীকে একটি নোবেল মেডেল ও ডিপ্লোমা এবং নিশ্চিতজ্ঞাপক পুরস্কারের পরিমাণস্বরূপ একটি প্রামাণ্যদলিল প্রদান করা হয়।

মনোনীতদের নাম কি প্রকাশ করা হয়?

মনোনীত প্রার্থীদের নাম ও তথ্য নোবেল ফাউন্ডেশন ব্যক্তিগত বা গণসম্মুখে ৫০ বছর আগে প্রকাশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই নিষেধাজ্ঞা মনোনীত প্রার্থী ও প্রার্থী-বাছাইকারীদের পাশাপাশি অনুসন্ধান ও পুরস্কার বিষয়ে মতামত প্রদানের বিষয়গুলোকেও স্পর্শকাতর করে তোলে।

নোবেল বিজয়ীদের যে বই সমূহ পড়তে পারেন

আরও দেখুন…

 

আরও পড়ুনঃ 

বিশ্ব পাল্টে দেয়া ১৩ জন ব্যবসায়ী নেতা

ব্যবসায় টিম পরিচালনার ক্ষেত্রে কীভাবে চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখবেন

নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক কাজুও ইশিগুরোর সঙ্গে কথোপকথন

অ্যালিস মুনরো : ২০১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png