বই পড়া কিভাবে আমাদের মস্তিষ্কে পরিবর্তন ঘটায়

পাঠ কিভাবে মস্তিষ্কে পরিবর্তন ঘটায়

পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনার মস্তিষ্ক অসংখ্য বিমূর্ত (অ্যাবসট্রাক্ট) প্রতীকের সঙ্গে আদানপ্রদানের মাধ্যমে শব্দকে বোধগম্য করে তোলে এবং সংশ্লেষণের মাধ্যমে শব্দগুলোকে কতিপয় জটিল ধারণায় রূপ দেয়। এটি খুবই আশ্চর্য্যজনক একটি প্রক্রিয়া। ইংরেজ লেখক ক্যাটি অলডাম বলেছেন যে, একটি বই পাঠের মাধ্যমে এমন এক অতীন্দ্রিয় (সারিয়েল) ক্রিয়া সংঘটিত হয়, যা অনেকটা এরকম যে, “ফালি ফালি করা একটি গাছের প্রতি অপলক দৃষ্টিতে ঘণ্টাখানেক তাকিয়ে থাকলে নিশ্চিতভাবে আপনি অলীক জগতে (হলোসিনেটিং) পতিত হবেন।”

যেহেতু পাঠের এসব বিষয় আপনাকে ইতোমধ্যে যথেষ্ট বিস্ময়াভিভূত করেনি। সুতরাং বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন। যদি আপনার প্রচুর পড়ার অভ্যাস থাকে, তাহলে তা কেবল আপনার মস্তিষ্কের অঙ্গগুলোর পুননির্মাণ করে না, বরং আপনাকে একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হিসেবে উপস্থাপন করে।

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, মস্তিষ্ক একটি জটিল যন্ত্রবিশেষ যার অনেক কিছু এখনো আমাদের কাছে অস্পষ্ট। পাঠের সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের মধ্যে বিভিন্ন ধরণের পরিবর্তন ঘটতে থাকে। প্রযুক্তি বিপ্লবের ফলে মুদ্রণের বাইরে পাঠের একটি বিশাল জায়গা সৃষ্টি হয়েছে, যাকে আমরা সাধারণত ‘সফট’ কপি বলি। কিন্তু এখনো আমরা মুদ্রিত বই তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ি। পাঠের ফলে মস্তিষ্কে কোন ধরণের স্নায়ুবিক পরিবর্তন ঘটে, পাঠকের জ্ঞাতার্থে এবিষয়ক কয়েকটি পর্যালোচনা তুলে ধরা হলো।

ইমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, একটি উপন্যাস পাঠ আপনার মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যেকার সম্পর্ক সুদৃঢ় ও বেগবান করে তোলে, যা ভাষাগ্রহণ প্রক্রিয়াকে পরিচালিত করে। প্রকল্পের প্রধান গবেষক নিউরোসায়েন্টিস্ট জর্জ বার্নস লিখেছেন যে, এই প্রক্রিয়াটি গ্রাউন্ডেড কগনিশনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। সাঁতার কাটা সম্পর্কিত কোনো কিছু পাঠ আপনার নিউরনগুলোকে চাঙ্গা করে তোলে, যা উক্ত কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যদিও আপনি তখনো বসে আছেন।

অভিযোজন বা খাপ খাওয়ার ক্ষমতা সৃষ্টি

মারিয়ান্নে ওলফ্, পরিচালক, সেন্টার ফর ডাইস্লেক্সিয়া, ডাইভার্স লার্নার্স অ্যান্ড সোসাল জাস্টিস

পাঠ কেবল মস্তিষ্কের কোনো একটি বিশেষ অংশে ক্রিয়াশীল নয়। বরং মস্তিষ্ক বিভিন্ন অংশের মধ্যে আর্ন্তসম্পর্ক সৃষ্টি করে। পাঠ ভাষাগত ধ্বনি (সাউন্ড) ও কথোপকথনের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে প্রতীক চিহ্নিতকরণকে নিশ্চিত করে। পরিশেষে, এই প্রক্রিয়া অর্থ সরবরাহ করে। কেননা, বিবর্তনের দিক থেকে পাঠ ও মানবমস্তিষ্কের সম্পর্ক প্রায় জ্ঞানজগতের নতুন শাখা। বস্তুত, পাঠের সঙ্গে লিখিত ভাষা বা অন্য কোনো ফরমেট কিংবা মস্তিষ্কের ক্রিয়া গবেষক মহলে এখনো একটি চলমান বিতর্ক।

মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য যে বই গুলো পড়তে পারেন !

মানুষ কেবল কয়েক হাজার বছর আগে পাঠ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় লাভ করেছে। এই উদ্ভাবনের মাধ্যমে আমরা নিজেদের মস্তিষ্ককে নতুনভাবে সাজিয়েছি, যা আমাদের চিন্তা পদ্ধতিকে আরো বিস্তৃত করেছে। তাছাড়া পাঠের মধ্যদিয়ে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিবর্তন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আমাদের পূর্বসূরিদের চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক নির্মাণে মানবমস্তিষ্কের অসাধারণ সক্ষমতার ফলে এই উদ্ভাবন সম্ভব হয়েছে। অভিজ্ঞতা লাভের মধ্যদিয়ে মস্তিষ্কই এ প্রক্রিয়া সম্ভব করে তুলেছে।

ওলফ্ উল্লেখ করেছেন যে, পাঠক্রিয়া অন্যান্য কাজগুলোর মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে, যা আপনাকে স্থান, কাল, পাত্রভেদে আচরণ করতে শেখায়। তাছাড়া এই অনুভূতির অভাবে ডিজিটাল স্ক্রিনে কোনো কিছু দীর্ঘ সময় ধরে পড়া যেমন কঠিন তেমনি মনে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে।

গ্রেগরি বার্নস, ডিসটিংগুইসড অধ্যাপক, ইমোরি বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিচালক, এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ইন নিউরোসায়েন্স

যেহেতু, মস্তিষ্ক ভাষা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতীক থেকে বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহ করতে পারে। এই কাজটা করে নিউরোপ্লাসটিসিটি। ২০ শতকের দ্বিতীয় ভাগে পরিচালিত গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে যে, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে পরিবর্তন ঘটতে থাকে। এমনকি এই পরিবর্তন বৃদ্ধাবস্থায়ও ঘটে থাকে। তবে, একটি বিকাশমান মস্তিষ্কের পরিবর্তনের মাত্রা বয়স্কদের চেয়ে একটু বেশি বলে গবেষকরা মনে করেন।

ইমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, একটি উপন্যাস পাঠ আপনার মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যেকার সম্পর্ক সুদৃঢ় ও বেগবান করে তোলে, যা ভাষাগ্রহণ প্রক্রিয়াকে পরিচালিত করে। প্রকল্পের প্রধান গবেষক নিউরোসায়েন্টিস্ট জর্জ বার্নস লিখেছেন যে, এই প্রক্রিয়াটি গ্রাউন্ডেড কগনিশনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। সাঁতার কাটা সম্পর্কিত কোনো কিছু পাঠ আপনার নিউরনগুলোকে চাঙ্গা করে তোলে, যা উক্ত কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যদিও আপনি তখনো বসে আছেন।

স্নায়ুর (নিউরন) এধরণের পরিবর্তন (দৈহিক সংবেদন ও সাড়া প্রদান পদ্ধতি) অনুসারে একটি উপন্যাস পাঠ আপনাকে বাস্তবিকভাবে একজন কেন্দ্রিয় চরিত্রে রূপান্তর করতে পারে। ইতোমধ্যে আমরা অবহিত হয়েছি যে, প্রাথমিকভাবে পছন্দের গল্পগুলো আপনাকে কারো সমরূপ করে গড়ে তুলতে পারে। বর্তমানে আমরা এও দেখছি যে, পাঠের মধ্যদিয়ে জৈবিকভাবে প্রাণির মধ্যে অনেক কিছু ঘটানো সম্ভব হচ্ছে।

সহনশীলতা কিভাবে বৃদ্ধি পায় ?

কেইথ ওয়াটলী, ইমেরিটাস অধ্যাপক, কননিটিভ সাইকোলজি, ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো

ফিকশনের মাধ্যমে একজনের জীবনপদ্ধতি কিভাবে অন্যের জীবনে স্থানান্তরিত হয় তা বাস্তব জীবনে আমরা অনেক ক্ষেত্রে দেখেছি। ২০১৩ সালে নিউইয়র্কের দ্য নিউ স্কুল’র একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, ফিকশন সাহিত্য পাঠকদের মধ্যে এধরণের প্রাণ পাওয়া গেছে। এমনকি এই ধারার পাঠক অন্যদের আবেগ, অনুভূতি উপলব্ধি করার মাত্রা অতিক্রম করতে পেরেছেন।

ইংরেজ লেখক ক্যাটি অলডাম বলেছেন যে, একটি বই পাঠের মাধ্যমে এমন এক অতীন্দ্রিয় (সারিয়েল) ক্রিয়া সংঘটিত হয়, যা অনেকটা এরকম যে, “আপনি ফালি ফালি করা একটি গাছের প্রতি অপলক দৃষ্টিতে ঘণ্টাখানেক তাকিয়ে থাকলে নিশ্চিতভাবে আপনি অলীক জগতে (হলোসিনেটিং) পতিত হবেন।”

নন-ফিকশন ও জেনর ফিকশন পাঠকদের ক্ষেত্রে একই ফলাফল পাওয়া যায়নি। গবেষণায় দেখা গেছে যে, সাহিত্য-পাঠ ‘মাইন্ড রিডিং’ (মানসিক অবস্থা বুঝার ক্ষমতা) দক্ষতাকে বিকশিত করে। তবে মস্তিষ্ক খুব বেশি জটিল যন্ত্র, যার অনেক প্রক্রিয়া আমাদের এখনো শেখার আছে।

সম্প্রতি কেইথ ওয়াটেলী’র গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতা আরো বৃদ্ধি করেছে। তার মতে, উপন্যান ফিকশনের মতো ব্যক্তির মধ্যে রূপান্তর ঘটায়। তাছাড়া, ফিকশন আমাদেরকে বাস্তব অভিজ্ঞতার স্বাদ পেতে সহায়তা করে।

যখন আমরা অন্য কারো সম্পর্কে পড়ি তখন আমরা তাদের অবস্থান অনেকটা তাদের মতো করে কল্পনা করতে পারি। যা তাদেরকে অধিকতর ভালোভাবে বুঝা এবং নিজেদেরকে অঙ্গীভূত করতে আমাদের সক্ষম করে তোলে।

আত্মউন্নয়ণের জন্য বিখ্যাত লেখকদের এই ইংরেজি বই গুলো পড়তে পারেন !

যাই হউক, যারা এধরণের সংকীর্ণ কাজের বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করেন তারা মূলত সন্দেহবাদী। আমরা চাই যাতে পাঠের মধ্যদিয়ে একজন পাঠক চরিত্রের ভিতরে প্রবেশ করতে পারেন। প্রাবন্ধিক মার্ক ও কনেল বলেন যে, “আমার পঠিত বই নিজের মধ্যে বিরাজ করে। এসব বইয়ের শক্তি অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে অনেক বেশি, যা আমাকে অনেক সহনশীল করে তোলে।”

পাঠ মস্তিষ্কের প্রশান্তি আনয়নে সহায়ক

ডেভিড লুইস, কগনিটিভ নিউরোসাইক্লোজিস্ট, ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স
পাঠ পরিশেষে একজন ব্যক্তিকে অসাধারণ ও সুখী করে গড়ে তোলে। প্রায়োগিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, একটি ভালো বই আমাদের মধ্যে আত্মপ্রশান্তি নিয়ে আসে। এটি কোনো অবস্থান থেকে অন্য কোনো জায়গায় স্থানান্তরের চেয়ে আলাদা কিছু বুঝায়। বরং মুদ্রিত বইয়ের শব্দের সঙ্গে কল্পনায় সক্রিয়ভাবে বাস করা, যা আপনার সৃজনশীলতা ও চেতনার মধ্যে একটি ভিন্ন জগত সৃষ্টি করে। টলস্টয় বলেছিলেন “আপনি প্রকৃতপক্ষে কি বই পড়ছেন, এটা কোনো ঘটনাই না। লুইস এর সঙ্গে যোগ করে বলেন, যতক্ষণ না আপনি এর মধ্যে “গভীরভাবে ডুব না দেন।”

সূত্র : https://www.grammarly.com/blog/reading-affects-brain/

আরও পড়ুনঃ

বই পড়লে আয়ু বাড়ে !

দক্ষ কর্মী হওয়ার জন্য মস্তিষ্কের বিকাশ কেন জরুরি ?

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png