নায়ক থেকে মহানায়ক, অরুণ কুমার থেকে উত্তম কুমার !

15

121

নায়ক থেকে মহানায়ক, অরুণ কুমার থেকে উত্তম কুমার !

  • 0
  • #অন্যান্য
  • Author: rokomari
  • Share

বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী নায়ক উত্তম কুমার।  ২০ বছরের বেশি সময় তিনি বাংলা ­চলচ্চিত্রের সম্রাট হিসেবে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। সুদীর্ঘ সময় বাংলা চলচ্চিত্র জগতে অপ্রতিদ্বন্দী অভিনেতা ছিলেন।  ১৯৫০-এর দশকের আগ মুহূর্তে তিনি চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন। পরবর্তী প্রায় সত্তরের শেষ পর্যন্ত একটানা অসাধারণ ছবি আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন।  অভিনয় শিল্পের গুণে দুই বঙ্গের অগণিত নারীর হৃদয় হরণ করেছেন তিনি।

অভিনয়ের প্রাথমিক জীবনে পর পর তিনটি ছবি ফ্লপ হওয়ার পরও আবাল, বৃদ্ধ সকলের কাছে মহানায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।  কিন্তু এই গল্পের নেপথ্য কাহিনী-ই বা কি ছিলো?  কিভাবে অরুণ কুমার থেকে উত্তম কুমার নামে খ্যাতি লাভ করলেন এই জনপ্রিয় অভিনেতা ?

uttom kumar ১

আজকের এই দিনে বাংলাচলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তী পুরুষ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। রকমারির পক্ষ থেকে এই প্রবাদপুরুষের প্রতি সবিনয় শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করছি।

প্রকৃত নাম অরুণ কুমার  হলেও উত্তম কুমার নামে পরিচিত হয়ে উঠেন তিনি।  রক্ত সম্পর্কের এক আত্মীয় অরুণের জন্মগ্রহণের সুসংবাদটিদিতে গিয়ে বলেছিলেন, চপলা দিদির (উত্তম কুমারের মা) সন্তান হয়েছে।  সেই সুসংবাদের সাড়া দিতে গিয়ে উত্তরে বলেছিলেন, উত্তম খবরতো।  এ থেকে অরুণ কুমার আত্মীয়স্বজনদের কাছে উত্তর কুমার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।  পরবর্তীতে ছবির বাণিজ্যিক স্বার্থে জুতসই নাম দিতে গিয়ে অভিনেতা পাহাড়ী স্যানালের পরামর্শে পরিচালক নির্মল দে উত্তম কুমার নামটি ব্যবহার করেন।  এরপর উক্ত নামেই উত্তম কুমার অভিনয় করতে থাকেন, যা চলচ্চিত্রজগতে ব্যাপক সাড়া পেয়েছিলো।

১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় উত্তম কুমার জন্মগ্রহণ করেন।  প্রথম জীবনে তিনি কলকাতা বন্দরে কাজ করেন। শিক্ষাজীবনে সম্মান (গ্রাজুয়েশন) শেষ করতে না পারলেও চলচ্চিত্র জগতে অভাবনীয় কীর্তির স্বীকৃতি স্বরূপ সর্বোচ্চ সম্মান অর্জন করেছিলেন তিনি।  কলকাতার একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। অস্বাভাবিক পরিশ্রমের মধ্যদিয়ে নিজেকে অবিসংবাদিত অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।  মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্র জগতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে গেছেন তিনি।  

উত্তম কুমার মুভি ২

উত্তম কুমারের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র হলো দৃষ্টিদান (১৯৪৮)।  ১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর‘ ছবির মধ্যদিয়ে তিনি চলচ্চিত্র জগতে স্থায়ী আসন করে নেন।  ছবিতে তিনি বাংলাদেশের পাবনার মেয়ে সুচিত্রা সেনের বিপরীত চরিত্রে অভিনয় করেন।  এই ছবির মধ্যদিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে উত্তম-সুচিত্রা জুটি স্থায়ী আসন করে নেয়, যা বাঙালি প্রেমিক-প্রেমিকাদের মধ্যে বিপুলভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো। রোমান্টিক জুটি হিসেবে উত্তম-সুচিত্রা বাঙলাচলচ্চিত্র প্রেমিকদের কাছে অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন।  বঙ্গে প্রথম রঙিন বাংলা ছবিও উত্তম-সুচিত্রার মধ্যদিয়ে শুরু হয়। ছবিটি হলো ‘পথে হলো দেখা (১৯৫৭)’।  এ ছবিতে সুচিত্রাকে নানা রঙের শাড়ি পরতে হয়েছিলো, যা ওই সময় ফ্যাশনে পরিণত হয়েছিলো।  যুবতী নারীরা অনেকটা এই ফ্যাশনে আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। ওই সময় মজা করে বলা হতো, ‘নাইলন শাড়ি পাইলট প্যান্ট, উত্তম কুমারের পকেটে সুচিত্রা সেন।’

উত্তম-সুচিত্রা জুটির উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ছবি হলো হারানো সুর (১৯৫৭), জীবন তৃষ্ণা (১৯৫৭), সপ্তপদী (১৯৬১), চাওয়া পাওয়া (১৯৫৯), বিপাশা (১৯৬২), সাগরিকা (১৯৫৬)। সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় নায়ক (১৯৬৬) ও চিড়িয়াখানা (১৯৬৭) ছবিতেও উত্তম কুমার অভিনয় করেছেন। 

uttom 1

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের শুরুতে দুই বঙ্গে প্রযুক্তিগতভাবে চলচ্চিত্র জগত খুবই পিছিয়ে ছিলো। এই দশকের আগ মুহূর্তে উত্তম কুমার অভিনয় শুরু করেছিলেন। পরপর তিনটি ছবি ফ্লপ হওয়ার পরও উদ্যম ছাড়েননি। ১৯৪৮ সালে তার প্রথম ছবি মুক্তি পাওয়ার পর পরবর্তী পাঁচটি বছর তাঁকে অভাবনীয় সংগ্রাম করতে হয়। চলচ্চিত্র কারখানায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে তিনি ছিলেন খুবই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ফলশ্রুতিতে, ১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ নামের ছবিটি মুক্তি পেলে তার অভিনয়-যাত্রা অনেকটা সহজ হয়ে উঠে। এরপর প্রায় মৃত্যু পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্র জগতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছেন এই কিংবদন্তী অভিনেতা। ২০১ টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। তার এই অভাবনীয় প্রতিভার কারণে তিনি বাঙালি চলচ্চিত্রপ্রেমিকদের কাছে অকল্পনীয়ভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। চলচ্চিত্র কারখানায় তার জনপ্রিয়তা ও চাহিদা তুঙ্গে হয়ে উঠে। একটির পর একটি অসাধারণ ছবি উপহার দিতে থাকেন তিনি। অভিনয় জগতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। হয়ে উঠেন সেকাল ও একালের মহানায়ক।

উত্তম কুমারের অভিনয়ের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো স্বাভাবিকতা। অর্থাৎ প্রাত্যহিক জীবনের সুখ, দুঃখ, রাগ, অভিমান, স্নেহ, ভালোবাসার আসল রূপটি তিনি অভিনয়ের মধ্যদিয়ে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। নিজের সম্পর্কে তার মূল্যায়ন: “ধরাবাঁধা ছকে অথবা সাজানো কণ্ঠে অভিনয় করার ইচ্ছা আমার কোনো দিনই ছিল না। আমি তাই নিজস্ব ধারায় সহজ অভিনয় করতাম। আমরা যেমন করে কথা বলি, রাগ করি, ঠিক তেমনি সহজ অভিনয়। অভিনয় নয়, ভাবেই চরিত্র রূপায়ণ।”

উত্তম কুমার কে লেখা বই “চিরদিনের উত্তম কুমার” কিনতে ক্লিক করুন! 

বাঙালি কিংবদন্তী পরিচালক সত্যজিৎ রায় তাকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, “বাংলা ফিল্মে উত্তম এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ওঁর মতো কেউ ছিল না, ভবিষ্যতেও আসবে না।”

তার সম্পর্কে সুচিত্রা সেন বলেন যে, “এক কথায় বলতে গেলে তাঁর মতো শিল্পী পাওয়া খুব কঠিন। তবে আমার এটাও মনে হয়, তাঁকে কেউ ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারেনি। ”

বাংলা চলচ্চিত্র জগতে উত্তম কুমার অবিস্মরণীয় নাম।  বাংলা ছবিকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে উত্তম-সুচিত্রা জুটির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। বর্তমান চলচ্চিত্র শিল্প নিয়ে আমাদের খেদোক্তির পেছনে মূলত আমরা উত্তম কুমারকে ফিরে পেতে চাই। এই কিংবদন্তি অভিনেতা নিজের প্রতিভাগুণে আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন। অগণিত তরুণী এখনো উত্তমের প্রেমে হাবুডুবু খায়! ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই এই মহান পুরুষ প্রয়াত হন।  

আরও পড়ুনঃ 

কিংবদন্তী জহির রায়হানের আত্মকাহিনী ও একটি অপমৃত্যু !

বাংলা সাহিত্যের যেসব বই থেকে সিনেমা বানানো হয়েছে

Write a Comment

Related Stories