বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ১০ উপন্যাসের পেছনের ঘটনা !

24

483

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ১০ উপন্যাসের পেছনের ঘটনা !

  • 0
  • #লেখকের ক্যানভাস
  • Author: rokomari
  • Share

আটারো শতকের সাড়া জাগানো লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় । তিনি ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ২৬ শে জুন ১৩ই আষাঢ় ১২৪৫ বাংলা পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনার কাঁঠালপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকে তিনি ছিলেন মেধাবী এবং কর্মচঞ্চল। পিতা যাদবচন্দ্র ডেপুটি কালেক্টর ছিলেন। ১৮৫৮ সালে তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাশ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, লেখক, উপন্যাসিক, বিচারক ইত্যাদি। পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেট এ কাজ করতেন। সর্বপ্রথম লেখা কবিতা ছাপা হয় ১৮৫২ সালে ‘সংবাদ প্রভাকর’ নামক পত্রিকায়। পরবর্তিতে তিনি ১৮৭২ সালে ‘বঙ্গদর্শন’ নামক পত্রিকার সম্পাদকের কাজ করেন। তিনি-ই প্রথম সাহিত্যিক যিনি বাংলা ভাষায় সর্বপ্রথম শিল্পসম্মত উপন্যাস লিখেছিলেন। তাঁর রচিত বই ছিলো ৩৪টি। এসকলের মধ্যে প্রথম বই ‘দুর্গেশনন্দিনী’। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য ‘সাহিত্যসম্রাট’ উপাধি লাভ করে। এই মহান মানুষটি ১৮৯৪ সালে ৮ই এপ্রিল ইহলোক ত্যাগ করেন। আজকের আয়োজনে থাকছে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর বিখ্যাত সব উপন্যাসের পেছনের ঘটনা।

দুর্গেশনন্দিনী০১।  দুর্গেশনন্দিনী

বঙ্কিম কোনও লেখা প্রকাশের আগে সচরাচর তেমন কাউকে পড়তে দিতেন না। কিন্তু ‘দুর্গেশনন্দিনী’ তিনি অনেককেই পড়ে শুনিয়েছিলেন। বঙ্কিমের মেজ দাদা ছিলেন জয়নারায়ণ চট্টোপাধ্যায়। তিনি বেঁচে ছিলেন ১০৮ বছর। জয়নারায়ণ বেশ ভাল গল্প বলতে পারতেন। ‘দুর্গেশনন্দিনী’-তে উল্লেখিত ‘গড় মান্দারণ’ কি এই মেজদাদুর কাছে থেকেই পাওয়া?

এই মেজদাদুর বিষ্ণুপুর অঞ্চলে যাতায়াত ছিল। মান্দারণ ‘গ্রাম জাহানাবাদ ও বিষ্ণপুর’-এর মধ্যে পড়ে। ওই অঞ্চলে মান্দরণের ঘটনাটি উপন্যাসের মতো লোকমুখে কিংবদন্তি হিসেবে চলে আসছিল। মেজদাদু মান্দারণের জমিদারের গড় ও বৃহৎ পুরী ভগ্নাবস্থায় দেখেছিলেন। স্মরণ করা যাক, উপন্যাসটির গোড়ার পর্ব— ‘৯৯৭ বঙ্গাব্দে নিদাঘ শেষে এক দিন এক জন অশ্বারোহী পুরুষ বিষ্ণুপুর হইতে মান্দারণের পথে একাকী গমণ করিতে ছিলেন।’ আর উপন্যাসের ‘সমাপ্তি’-তে রয়েছে— ‘ফুল ফুটিল। অভিরামস্বামী গড় মান্দারণে গমণ করিয়া মহা সমারোহের সহিত দৌহিত্রীকে জগৎসিংহের পাণিগৃহীত্রী করিলেন।’ অনুমান, বঙ্কিম মেজদাদুর কাছ থেকেই শুনেছিলেন গড় মান্দারনের গল্প। তখন বয়স মাত্র তাঁর আঠারো কী উনিশ। আর পঁচিশ বছর বয়সে তিনি লিখলেন ‘দুর্গেশনন্দিনী’।

ভাটপাড়ার পণ্ডিতরা দুর্গেশনন্দিনী-কে অভিনন্দন জানালেও কলকাতার পণ্ডিতরা এর কোনও সুখ্যাতি করেননি। পণ্ডিত দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ তাঁর ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকায় বঙ্কিমী ভাষাকে ‘শব পোড়া’ বলে কটাক্ষ করেন।

দুর্গেশনন্দিনী পড়ার পর অনেকেই বলতে থাকেন, ওয়াল্টার স্কট-এর ‘আইভানহো’-র ছায়া রয়েছে। বঙ্কিম ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’-এ এ নিয়ে লেখালেখি দেখে মন্তব্য করেন, ‘আমি কিন্তু ইতিপূর্বে আইভ্যানহো পড়িনি।’

বিষবৃক্ষ০২।  বিষবৃক্ষ

কাঁটালপাড়ার বাড়িতে কবি নবীনচন্দ্র এসেছেন বঙ্কিমের সঙ্গে দেখা করতে। প্রথম আলাপ। বঙ্কিমকে তিনি কিছু পড়ে শোনাতে বললেন। বঙ্কিম ‘বিষবৃক্ষ’ থেকে কিছুটা অংশ শোনালেন। পড়তে পড়তে নিজেই কেঁদে ফেললেন। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন, ‘বিষবৃক্ষ’ আমি নিজেই পড়তে পারি না।

০৩।  রাধারণী

পিতা যাদবচন্দ্র তখন জীবিত। রাধাবল্লভ জিউ-এর রথযাত্রা হচ্ছে। বঙ্কিম ছুটি নিয়ে কাঁটালপাড়ার বাড়িতে। রথের মেলার ভিড়ে একটি ছোট মেয়ে হারিয়ে গেল। মেয়েটির বাড়ির লোকের পাশাপাশি বঙ্কিমও মেয়েটিকে খোঁজার চেষ্টা করেন। এই ঘটনার দু’মাস বাদে প্রকাশিত হয় উপন্যাস ‘রাধারণী’।

রজনী০৪।  রজনী

বঙ্কিম ‘রজনী’ উপন্যাসের হীরালাল চরিত্রটি এঁকেছিলেন সে যুগের এক বিখ্যাত সংবাদপত্রের সম্পাদককে আদর্শ করে।

আনন্দমঠ০৫।  আনন্দমঠ

ছোটবেলায় শোনা গল্পের ছাপ ছিল তাঁর আনন্দমঠ-এর ঘটনায়। অনাহারের গল্প। খাবারের অভাবে চুরি-ডাকাতির গল্প।

কৃষ্ণকান্তের উইল০৬।  কৃষ্ণকান্তের উইল

বঙ্কিম ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এর একটি পরিচ্ছেদ লিখছেন। এমন সময় ট্রেনে চেপে কলকাতা থেকে দুই বন্ধু এলেন। বঙ্কিম লেখা ফেলে উঠে গেলেন। ভাই পূর্ণচন্দ্র বললেন, ‘কী লিখছিলেন বলে দিলে আমিই না হয় লিখব।’ ভাইয়ের আবদার রাখতে বঙ্কিম হাসতে হাসতে ভাইকে লেখার অনুমতি দিলেন। যাবার সময় বলেও গেলেন, কী লিখতে হবে। কৃষ্ণকান্তের উইল কিছুটা পড়ে পূর্ণচন্দ্র বুঝলেন, বঙ্কিমের সুরে লেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব না। তিনি উঠে পড়লেন।

০৭।  Rajmohan’s wife

‘এডুকেশন গেজেট’ –এ একসময় বঙ্কিম লেখালেখি করতেন। কর্মস্থল খুলনায় বসে লিখছিলেন ‘Rajmohan’s wife’। এটি কিশোরীচাঁদ মিত্রের Indian Field পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়। সে সময় বঙ্কিম সরকারি চাকুরি নিয়েছেন। বেশি পরিমাণে ইংরেজি চর্চা।

কপালকুণ্ডলা০৮।  কপালকুণ্ডলা

কপালকুণ্ডলা বঙ্কিমচন্দ্রের দ্বিতীয় উপন্যাস। এটি তিনি উৎসর্গ করেন মেজদাদা সঞ্জীবচন্দ্রকে। বঙ্কিম তাঁর প্রথম কর্মস্থল যশোর থেকে বদলি হয়ে নেগুয়া যান। এই মহকুমা এখন আর নেই। কাঁথি হয়েছে। নেগুয়া কাঁথির কাছে দরিয়াপুর ও চাঁদপুরের অনতিদূরে। বঙ্কিমের ভাই পূর্ণচন্দ্রের কথায় এখানেই কপালকুণ্ডলা কাহিনির উৎপত্তি।

বঙ্কিম তখন নেগুয়া মহকুমায়। একদিন এক কাপালিক বঙ্কিমের পিছু নিলেন। প্রতিদিনই গভীর রাতে বঙ্কিমের সঙ্গে তাঁর দেখা হত। খুলনা যাওয়ার আগে কাঁটালপাড়ার বাড়িতে কিছুদিন তিনি ছিলেন। এই সন্ন্যাসী-কাপালিক বঙ্কিমের মনে গভীর রেখাপাত করে। অনুমান, উপন্যাসের কাহিনি এভাবেই তাঁর কাছে ধরা দেয়।

দেবী চৌধুরাণী০৯।  দেবী চৌধুরাণী

সে সময় এক দিন দীনবন্ধু মিত্র এসে হাজির। তাঁকে বঙ্কিম হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘‘যদি শিশু বয়স থেকে ষোলো বছর বয়স অবধি কোনও নারী সমুদ্রতীরে বনমধ্যে কাপালিকের দ্বারা প্রতিপালিত হয়, কাপালিক ছাড়া অন্য কাউকে দেখতে না পায়, সমাজের কিছুই জানতে না পারে, তা’হলে কী হবে?’’

দীনবন্ধু কিছুই বলতে পারলেন না। সঞ্জীবচন্দ্র বললেন, কিছু দিন সন্ন্যাসীর প্রভাব ‌থাকবে। পরে সন্তান হলে স্বামীপুত্রের প্রতি স্নেহ জন্মালে সে সমাজের লোক হয়ে যাবে। বঙ্কিম একবার যাদপুরে ডাকাত দলের পাল্লায় পড়েন। এই ঘটনা স্থান পেয়েছিল উপন্যাস ‘দেবী চৌধুরাণী’-তে।

১০।  যুগলাঙ্গরীয়

দাদা শ্যামাচরণ যখন তমলুকের ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন, তখন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একবার সেখানে যান। আর তাম্রলিপ্তের ঘটনা নিয়েই রচিত হন ‘যুগলাঙ্গরীয়’ উপন্যাস। আনন্দমঠ উপন্যাস রচনার অনেক আগেই লেখা হয়েছিল বন্দেমাতরম। ভগ্ন তখন কলেজ স্ট্রিটের বাড়ি। কাগজ ছাপার সময় অনেক সময় ‘ম্যাটার’ কম পড়ত। তখন পাতা ভরানোর জন্য বঙ্কিমকে কিছু একটা লিখে দিতে হতো।

তথ্য: আনন্দবাজার পত্রিকা, বঙ্কিমচন্দ্র রচনাবলী (যোগেশচন্দ্র বাগল), বঙ্কিমচন্দ্র (সুনির্মল বসু), বঙ্কিম প্রসঙ্গ (সুরেশচন্দ্র সমাজপতি), বঙ্কিম জীবনী (শচীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়), অন্য এক বঙ্কিমচন্দ্র (গোপালচন্দ্র রায়), বঙ্গদর্শন পত্রিকা, বঙ্কিমভবন গবেষণা কেন্দ্র কাঁটালপাড়া নৈহাটি, বঙ্কিমচন্দ্রজীবনী (অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য), কাছের মানুষ বঙ্কিমচন্দ্র (সোমেন্দ্রনাথ বসু), বঙ্কিম ১৭৫ (সম্পাদনা: সত্যজিৎ চৌধুরী), ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র (হেমেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত), হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচনাসংগ্র (২য় খণ্ড), বিজলি সরকার।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সকল বই

আরও পড়ুনঃ 

ছড়াসম্রাট সুকুমার বড়ুয়ার জানা অজানা অধ্যায় !

মুহম্মদ জাফর ইকবাল এর যুদ্ধজীবন ও কিছু অজানা কথা !

Write a Comment

Related Stories