কিংবদন্তী জহির রায়হানের আত্মকাহিনী ও একটি অপমৃত্যু !

25

157

কিংবদন্তী জহির রায়হানের আত্মকাহিনী ও একটি অপমৃত্যু !

  • 0
  • #লেখকের ক্যানভাস
  • Author: rokomari
  • Share

জহির রায়হান । প্রখ্যাত সাহিত্যিক। গুণি চলচ্চিত্রকার। ছিলেন ভাষাসৈনিকও। কাজ করেছেন স্বাধীন বাংলার পক্ষে। স্বাধীনতার পরপরই তিনি নিখোঁজ হন। জহির রায়হানের শুরু ও শেষ এখানে উপস্থাপন করা হলো-

জন্ম

জহির রায়হান ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট বর্তমান ফেনী জেলার অন্তর্গত মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তিনি তার পরিবারের সাথে কলকাতা হতে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) স্থানান্তরিত হন। 

পড়াশোনা

তিনি ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। 

বিয়ে

জহির রায়হান ব্যক্তিগত জীবনে দু’বার বিয়ে করেন: ১৯৬১ সালে সুমিতা দেবীকে এবং ১৯৬৬ সালে তিনি সুচন্দাকে বিয়ে করেন, দুজনেই ছিলেন সে সময়কার বিখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী।

কাজের ক্ষেত্র

১৯৫০ সালে তিনি যুগের আলো পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি খাপছাড়া, যান্ত্রিক, সিনেমা ইত্যাদি পত্রিকাতেও কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে প্রবাহ পত্রিকায় যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ সূর্যগ্রহণ প্রকাশিত হয়। চলচ্চিত্র জগতে তার পদার্পণ ঘটে ১৯৫৭ সালে, জাগো হুয়া সাবেরা ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। তিনি সালাউদ্দীনের ছবি যে নদী মরুপথেতেও সহকারী হিসেবে কাজ করেন। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তাকে এ দেশ তোমার আমার এ কাজ করার আমন্ত্রণ জানান; জহির এ ছবির নামসঙ্গীত রচনা করেছিলেন। ১৯৬১ সালে তিনি রূপালী জগতে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন কখনো আসেনি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। 

যা কিছু প্রথম

১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র সঙ্গম নির্মাণ করেন (উর্দু ভাষার ছবি) এবং পরের বছর তার প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র বাহানা মুক্তি দেন।

ভাষাসৈনিক ও অন্যান্য

জহির রায়হান ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং ২১শে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। ভাষা আন্দোলন তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়াতে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যে কজন তরুন প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং যে ১০ জন ব্যক্তি কারাবরন করেছিলেন জহির রায়হান সেই ১০ জনের একজন ব্যক্তিছিলেন। সেই সময়ে ঝির রায়হান তার ভাষা আন্দোলনের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘পোস্টার’ নামে একটি গল্প ও ‘আরেক ফাগুন’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন। তিনি ১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানে অংশ নেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়ার বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিত্রটি দেখে সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ ভূয়সী প্রশংসা করেন। সে সময়ে তিনি চরম অর্থনৈতিক দৈন্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হতে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন।

কালজয়ী চলচ্চিত্র

মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে জহির রায়হানের নির্মিত কালজয়ী চলচ্চিত্রটি হচ্ছে ‘জীবন থেকে নেয়া‘। ১৯৭০ সালে নির্মিত ও মুক্তিপ্রাপ্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা চলচ্চিত্রে যে ছবিটি পুরো পাকিস্তান কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এটি শুধুই একটি পারিবারিক ড্রামা নির্ভর একটি সাধারণ ব্যবসাসফল বাণিজ্যিক ছবি নয়। ‘জীবন থেকে নেয়া’ হলো একটি পরাধীন দেশের স্বাধীনতার আন্দোলনের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া একটি ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল। ‘জীবন থেকে নেয়া’ হলো একটি অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে নিষ্পেষিত জনতার জেগে উঠার প্রতিচ্ছবি। ‘জীবন থেকে নেয়া’ হলো একটি দেশের স্বাধীনতা ইতিহাসের পটভূমির জলজ্যান্ত চিত্র। 

ইচ্ছে

জহির রায়হানের ইচ্ছে ছিল ৫২ এর ভাষা আন্দোলন নিয়ে একটি ছবির তৈরি করার। সেই ছবিটি তৈরি কয়ার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন কিন্তু তৎকালীন সরকার ছবিটি তৈরি করতে অনুমতি না দেয়ায় তা আর তৈরি করতে পারেননি। তবুও জহির দমে যাননি। মনে মনে ঠিকই পরিকল্পনা করেন রুপক অর্থে হলেও তিনি বাঙ্গালীর আন্দোলন সংগ্রাম আর শোষকের হিংস্ররুপ সিনেমায় তুলে ধরবেনই।

‘জীবন থেকে নেয়া’র পেছনের দৃশ্য

প্রথম দিনই নিষিদ্ধ হলো এর প্রদর্শনী। সব সিনেমা হল থেকে পাক আর্মি জব্দ করে নিয়ে গেল সিনেমার রিল। ঢাকার গুলিস্তান হলের সামনে শুরু হলো বিক্ষোভ। পরদিন সেন্সর বোর্ড আবার বসবে সিনেমাটি দেখতে। সাথে থাকবে রাও ফরমান নিজে। জহির অনেক ভেবে একজনের কথাই স্মরণে আনতে পারলেন, যিনি পারেন ছবিটিকে আবার আলোর মুখ দেখাতে। জহির আমজাদকে দায়িত্বটা দিলেন। কারণ আমজাদের এলাকার মানুষ তিনি। আমজাদ গেলেন সেন্সর বোর্ডের সদস্য নাট্যকার আসকার ইবনে সাইকের কাছে। ভদ্রলোক আবার নিয়মিত নামায রোজা করতেন। আমজাদ হোসেন তার হাঁটুর কাছে বসে পা টিপতে টিপতে বললেন, স্যার আপনার উপরে সবকিছু। আপনি প্লিজ কালকে যাবেন। উনি বললেন, আমি অসুস্থ। হাই প্রেসার তাই যেতে পারবো না। ফ্যান ছেড়ে হাত পা ছেড়ে বসে রইলেন। আমজাদ কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বললেন, স্যার সারাদেশ আপনার দিকে তাকিয়ে।

পরদিন সাইক সাহেব গেলেন সেন্সর বোর্ডে। বোর্ডে উপস্থিত অল পাকিস্তান সেন্সর মেম্বার। মানে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সকল সদস্য। আর আমজাদ প্রজেকশন রুমে চুরি করে অবস্থান নিয়ে প্রজেকশনের ছোট ছিদ্র দিয়ে তাকিয়ে রইলেন। ছবিটি শেষ হলো। রাও ফরমান সহ বাকি সদস্যরা ছবিটি দেখলেন। ছবি শেষ হলে পিন পতন নিস্তব্ধতা গোটা রুম জুড়ে। চেয়ারম্যান সাহেব সবার মুখের দিকে তাকিয়ে কি মনে করে আসকার ইবনে সাইককে বললেন, আপনি বলেন। তিনি, কিছুণ চুপ থেকে তারপর দাঁড়ালেন। সবার মুখের দিকে একবার চেয়ে বললেন, ‘স্যার পবিত্র কোরআনে কোন মিথ্যে কথা বলা নেই। মিথ্যে কথা বলবার কোন সুযোগও সেখানে দেয়া হয়নি। জহির হয়ত ভুল করে একটা সত্য সিনেমা বানিয়ে ফেলেছে। এই সত্যকে আমি কিভাবে মিথ্যা বলি!’ কেউ আর কোন কথা বলল না। ছবিটি মুক্তি পেল। তবে প্রজেকশন শেষে রাও ফরমান জহিরকে বললেন, ‘ছবিটি ছেড়ে দিলাম। বাট আই উইল সি ইউ।’ আর এই ইতিহাসের মধ্য দিয়ে ছবিটি নিজেই হয়ে গেল এক জীবন্ত ইতিহাস। এটিই এদেশের প্রথম ছবি যা দেখার অধিকার আদায়ে এদেশের দর্শক আন্দোলনের মাধ্যমে অধিকার আদায় করেছে।

প্রথম গুম হওয়া ব্যক্তি

জহির রায়হান ছিলেন সত্য ও সাহসীকতার চেতনা। কিন্তু তিনিই হলেন সেই বিরল হতভাগা লোক যিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাতেন তাঁর চলচ্চিত্রে, দেশ যখন সত্যি সত্যি স্বাধীন হলো তখন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ‘গুম’ হওয়া ব্যক্তি হয়ে গেলেন জহির রায়হান।

জহির রায়হানের সকল বই

আরও পড়ুনঃ

সুফিয়া কামাল, এক সাহসী কবি, লেখিকা, নারীবাদীর গল্প !

হুমায়ূন আহমেদ এর চোখে হুমায়ুন ফরিদী

Write a Comment

Related Stories