জাপানের কনফুসিয়াস দর্শন এবং কনফুসিয়াস প্রভাবিত জীবন

জাপানের কনফুসিয়াস দর্শন

মাত্র কয়েকবার জাপানে গিয়ে বই লেখার সাহস যাদের হয়েছে, তাদের মধ্যে আমি একজন। বইটির কয়েকটি সংস্করণ হয়েছে এবং নিজে আবার পাঠ করতে গিয়ে দেখি এর অনেক কিছুই আমার স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত। তাই নিজের বইয়ের একজন নতুন পাঠক হিসেবে লেখাটি আমাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করল, যখন পড়লাম জাপানের কনফুসিয়াস দর্শন এবং তাদের কনফুসিয়াস প্রভাবিত জীবন সম্পর্কে।

আমাদের গ্রামের সাধারণ মুসল্লিরা কনফুসিয়াসের নাম শোনেন নি। যেমন- সেখানকারও অনেকে আমাদের ধর্মের সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানেন না। জাপানে গিয়ে ধর্মকে কারও চোখে পড়বে না। তিনশ’ বছর আগে যদি কেউ যেতেন তা হলে অন্য কথা। পশ্চিমের সঙ্গে যোগসূত্র তাদের জীবনে ধর্ম নিরপেক্ষতার বাতাস এত প্রবলভাবে বইয়ে দিয়েছে যে আজকের জাপানযাত্রীকে বিশেষ করে যদি তিনি হিন্দু, বৌদ্ধ বা ইসলাম প্রভাবিত কোন এশীয় অঞ্চলের পর্যটক হন, তার খানিকটা আহত হবারই কথা। এই ধর্ম নিরপেক্ষতার আসল প্রভাব পশ্চিম থেকে নয়। এটি কনফুসিয়াসের দর্শনের অন্তর্নিহিত প্রভাব, যা জাপানি সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে। কনফুসিয়াসের দর্শনের এই প্রভাব পড়েছিল চীনা সমাজে নবম শতাব্দীতেই এবং কোরিয়াতে পঞ্চদশ শতাব্দীতে। পূর্ব এশীয়দের এই দর্শন পরিচিত ‘পণ্ডিতদের শিক্ষা’ জাপানীতে গুকইয়ু [Jukiyo]।

কিন্তু পাশ্চাত্যে এর নামকরণ ধর্ম নিরপেক্ষতার গুরু কনফুসিয়াস এর নামেই যিনি খৃষ্টপূর্ব ৫৫১ থেকে ৪৭৯ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। কনফুসিয়াসের ছিল না কোন দেব দেবী, কোন ধর্মকর্ম উপাসনা, কোন রোজা-নামাজ, কোন মোল্লা পুরোহিত, গ্রন্থ ছিল, কিন্তু ছিল না মন্দির, মসজিদ, কোন ভোজনালয়, শুধু ন্যায় চিন্তা, ন্যায় জীবন যাপন, এর মূল ছিল রাজার প্রতি আনুগত্য, পিতার প্রতি আনুগত্য ও সমাজের শৃঙ্খলা ও রুচি আচার মেনে চলা। ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে চীনাদের সর্বাত্মক প্রভাব যখন জাপানে প্রবেশ করে তখন থেকে কনফুসিয়াসের ভাবনা জাপানীদের জীবন চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।

confusius

আবার তকুগাওয়াদের আগমনে তাদের দু’শ বছর কনফুসিয়াসের দর্শন ধীরে ধীরে জাপানীদের সমাজ জীবনে এত প্রভাব ফেলে, যা চীনা ও কোরিয়াদের সমপর্যায় ভুক্ত। আবার মজার ব্যাপার হল রাজনৈতিক ভাবে জাপানীরা ছিলেন কনফুসিয়াস থেকে বহু দূরের সামন্ততান্ত্রিক পদ্ধতির ধারক। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে কনফুসিয়ান দর্শন এর বদলে পাশ্চাত্য ধারণা স্থান পেতে থাকে। বিশেষ করে তকুগাওয়া সামন্ত রাজারা টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে কনফুসিয়াসের শিক্ষা রদ করে পাশ্চাত্য ধারণার দিকে ঝুঁকে পড়েন।

সমকালীন জাপানীরা কনফুসিয়াসের অনুসারী নন। কিন্তু কনফুসিয়াসের এ্যথিক্যাল ভ্যালু জাপানীদের চিন্তার মধ্যে গ্রথিত। জাপানীদের বর্তমান আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা, গণতান্ত্রিক শাসন ও মূল্যবোধ জীবন-যাপন সব কিছুর মধ্যে এই দীর্ঘ কালের লালিত কনফুসিয়ান দর্শন কাজ করেছে। কেউ আর কনফুসিয়াস ধর্মের অনুসারী নন, কিন্তু প্রায় প্রতি জাপানীই কনফুসিয়াস প্রভাবিত।

বৌদ্ধধর্ম পরজন্মের জন্যই বিশেষভাবে মানব সমাজকে ডাক দিয়েছে। আত্মার নির্বাণই এর লক্ষ্য। পূর্ব এশীয়ায় বৌদ্ধধর্মের মহায়ান আদৃত হয়েছে আর খেরাবাদ স্ফুর্তি পেয়েছে শ্রীলঙ্কায় ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অন্যান্য দেশে। পরকালের প্রসঙ্গে মহায়ানের সঙ্গে মিল বেশি পশ্চিমা স্বর্গ ভাবনার।

জাপানে মহায়ান বৌদ্ধধর্ম তিনভাবে স্ফুর্তি পায়। নবম শতাব্দীতে এসোটেরিক বৌদ্ধধর্ম জন্ম দেয় যাদুমন্ত্রতন্ত্র শিক্ষা, আচার ও শিল্পের। এক শতাব্দী চলে গেলে মুখ্য চর্চা ছিল বিশ্বাসের। এই বিশ্বাস ছিল অমিত বুদ্ধের, যে বুদ্ধ সমস্ত প্রাণীজগতের জন্যে আনবেন মহানির্বাণ বা মোক্ষ। এই মতবাদের ফলে দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকে আর কয়েকটি জাতির সৃষ্টি হয়-একটি জোদোসু, শিনসুনিচিরেন, যারা এখন জাপানে সবচেয়ে বড় Sect. তৃতীয় চর্চা হল আত্মবিশ্বাস অর্জন। শুধু ধ্যান ও সংযমী ধ্যানের সাধনায় সম্ভব হবে নিজের আত্মার-উন্নতি। একটি ছিল বিখ্যাত জেন বা সাধন মার্গ বুদ্ধিজম, যা ১১৯১ থেকে ১২২৭ সালে দু’টি জেন সেক্ট সৃষ্টি করে। এরও কয়েকটি বিভাগ আছে যেমন জ্যাজেন [বসে থেকে ধ্যানের ব্যবস্থা], কোয়ান [আত্মশুদ্ধি], সাতোরি [অকস্মাৎ জ্ঞান লাভ]।

প্রচুর বৌদ্ধ মন্দির ও মঠ জাপানে দেখতে পাওয়া যাবে। তবু জাপানের সামাজিক জীবনে এর তেমন প্রভাব খুঁজে পাওয়া যায় না। জাপানীদের মধ্যে অনুসারী আছেন, তবে তা হল নিছক। আত্মমার্গের উন্নতি কল্পে, ততটা ধর্মকে আঁকড়ে না।

সিন্টো জাপানের প্রাচীনতম ধর্ম। এখন তাও প্রায় দূরাগত বংশী ধ্বনির মত। সিন্টো ধর্মে আছে প্রকৃতির আদিম পূজা, চন্দ্রসূর্য, পাহাড় বৃক্ষ, পানি ও লিঙ্গপূজা, বিভিন্নস্থানে সূর্য দেবতা কামির পূজা হয়। ছোট ছোট দেবতারা আছেন যাদেরকে তুলনা করা চলে হিন্দুধর্মের লৌকিক দেবতাদের সঙ্গে। যেখানেই বড় বড় পাথর পাহাড় পাহাড়ী ঝর্ণা সেখানেই রূপকথা থেকে বেরিয়ে আসা দেবতারা সিন্টো ধর্মের অনুসারীদের কাছ থেকে আদায় করে নেন ভক্তি, পূজা, অর্চনা। আবার আমাদের গ্রামীণ বাংলাদেশের মত ধানের দেবীও পূজা পান। পুরনো সিন্টো ধর্মে কোন এথিক্স এর অস্তিত্ব নেই, নেই কোন গ্রন্থ। পরজন্মের জন্যও নেই কোন দর্শন।

আমাদের লৌকিক দেবতাদের সঙ্গে সিন্টোদের কোথায় মিল কোথায় অমিল তা নিয়ে গবেষণা চলতে পারে। আমি যেহেতু কুচবিহারের লোক তাই অবশ্যই মাশান ঠাকুরের সঙ্গে এদের কোন কোন ঠাকুরের প্রভূত মিল খুঁজে পেয়ে যারপরনাই আনন্দিত হয়েছি। মাশান অর্থ সম্পূর্ণ কালো। সবার মধ্যে দেখতে কালো হলে সবাই তাকে মাশান বলে ডাকে। আমাকেও সে নামে ডাকা হত।

sinto temple

বাংলাদেশে, ভারতে মানুষ হয় হিন্দু, নয় মুসলমান, নয় বৌদ্ধ, জৈন, খৃষ্টান, শিখ, না হয় নাস্তিক। জাপানে একটি ধর্মেরই অনুসারী হতে হবে এমন ভাবনা জাপানীরা ভাবে না। তাই আধুনিক জাপানের অভ্যুদয়ের আগে পর্যন্ত জাপানীরা একই সঙ্গে বৌদ্ধধর্মের এবং সিন্টো ধর্মের অনুসারী আবার, অনেকাংশে ভীষণভাবে কনফুসিয়াস প্রভাবিত।

জাপানে খৃষ্টধর্ম আসে ১৫৪৯ সালে। খ্যাতনামা জেসুট মিশনারী সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার আসেন এখানে নিজে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ারের নামে ঢাকায় একটি স্কুল আছে। সে স্কুলে পড়তেন আমার বোন ফেরদৌসী। আমি পড়তাম সেন্ট গ্রেগরী স্কুলে। যিনি নিজেও একজন নামকরা সেন্ট। সে সময়ে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে খৃষ্টধর্ম। তকুগ্যাওয়া, শোগানরা এর বিরোধিতা করে। জাপানে এখন অনুসারীদের সংখ্যা হবে শতকরা দু’জন।

জাপানের মানুষের কাছে আধ্যাত্মিক চেতনা যেমন একেবারেই মূল্যহীন বলা যাবে না, তেমনি সিন্টো, বৌদ্ধ, খৃষ্ট ধর্মের বাইরেও তারা নতুন নতুন চিন্তাধারার কাছে যেতে প্রস্তুত। লোকবিশ্বাস, লোকশ্রুতি, লোকদেবতা, আদিম জাপানী মানসের মত তাদের চিন্তায় আনে নতুন চমক। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার অল্পশিক্ষিত সাধারণ মানুষের কাছে এখন নতুন নতুন ধর্মের বাণী নিয়ে পৌঁছে গেছেন নতুন মহাপুরুষেরা। এই সব ধর্মের মধ্যে আছে সিন্টো, বৌদ্ধ ও চীনাদের লোকবিশ্বাস ও যাদু।

জাপানে এখন নতুন ধর্মের সংখ্যা একশ’-তে দাঁড়িয়ে গেছে। নতুন নতুন ধর্ম এখনও সরকারী স্বীকৃতির অপেক্ষায়। এদের মধ্যে সোকা গাক্কাই [মূল্যবোধ চেতনা বিকাশ সংঘ] এর অনুসারী এই মুহূর্তে এক কোটি ষোল লক্ষ। তেনরিকরোয়ো [স্বর্গীয় সত্যের বাণী] অনুসারী বিশ লক্ষ। একজন কিষাণ রমনী ১৮৩৮ এই নতুন ধর্মের প্রতীক। এই সমস্ত নতুন ধর্মের অনুসারীদের আধুনিক মিলনায়তন আছে, আছে ধর্মালোচনা সংস্থা; এর ফলে তাদের আধ্যাত্মিক প্রয়োজনের চেয়েও জাগতিক প্রয়োজন বেশি বলে মনে হয়।

হ্যাঁ মুসলমানও আছে জাপানে। সংখ্যায় কম যদিও। জাপানী মুসলমানের সঙ্গে দেখা হয়েছে যারা সত্যিকার ইসলামে বিশ্বাসী, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, রোজা রাখেন, হজ করেন এমন কি যুদ্ধ প্রথার চরম বিরোধী। মস্জিদের সংখ্যাও জাপানে কম নয়।

তবে সব মিলিয়ে জাপানে ধর্মের অবস্থাটা গোলমেলে। সিন্টো ও বৌদ্ধ ধর্মের মূর্তিও মন্দির চোখে পড়েছে বটে। কিন্তু এর সঙ্গে জাপানী মনের যোগ নেই। শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ যদিও কোনও ধর্মের অনুসারী বলে উল্লিখিত, কোন ধর্মেই তারা বিশ্বাসী নন। এই মুহূর্তে জাপানে গেলে ধার্মিক লোক বলতে চোখে পড়বে সেই লোকবিশ্বাসের অন্তর্গত মানুষদের। ধর্মকে সমাজ ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এখানে একটা মজার কথা আমাকে বলতেই হয়। তা হল জাপানীরা যেমন বিণয়ী, তেমনি সরল।

একটি খৃষ্টান দম্পত্তির সঙ্গে আমার আলাপ হয়, যারা মানবতার অন্তর্নিহিত মর্মবেদনার সঙ্গী। আমি জিজ্ঞেস করলাম: ‘তোমরা খৃষ্টান হলে কেমন করে? উত্তর: কেন, টেলিভিশন দেখে? যীশুখৃষ্ট মানবাত্মার শেষ ভরসা স্থল বলে বিশ্বাস করেছি’। দেখলাম, দু’জনেই মন দিয়ে আমার কথা শোনে। যাদের কাছেই ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের কথা বলেছি, গভীর মনোযোগের সঙ্গে শুনেছে।

শেষ বক্তব্য:

আমাদের মনে হয়, তোমার সঙ্গে আগে দেখা হলে আমরা মুসলমানই হয়ে যেতাম।

japan mosque

আমেরিকাতেও একই ব্যাপার দেখেছি। আমার লেখা নবীর জীবনীতে সে কথা বিস্তারিত বলেছি। প্রতি বছর পঁচিশ হাজার নতুন মুসলিম হচ্ছে কি করে?

জাপানেও তাই। ধর্ম প্রচারের সুন্দর ক্ষেত্র জাপানে প্রস্তুত। ওরা সত্য গ্রহণে উৎসুক। আমরা চাচ্ছি বাংলাদেশে এমন একটি সমাজ, যেখানে বৈষম্য থাকবে না। শুধু অর্থনৈতিক নয়, ধর্মীয় বটে। সত্যিকথা বলতে কি এই বৈষম্যের মধ্যে আমরা বাস করছি। জাপান থেকেও ধর্ম নিরপেক্ষতার দৃষ্টিভঙ্গি আমরা গ্রহণ করতে পারি।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী
সাহিত্য-সংগীত ব্যক্তিত্ব

মুস্তাফা জামান আব্বাসীর বই সমূহ-

Nusrat Nazmi

Nusrat Nazmi

Published 07 Jan 2020
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png