ছড়াসম্রাট সুকুমার বড়ুয়ার জানা অজানা অধ্যায় !

সুকুমার বড়ুয়া

‘ধন্য সবাই ধন্য/ অস্ত্র ধরে যুদ্ধ করে/ মাতৃভূমির জন্য’ সুকুমার বড়ুয়ার রচিত ‘মুক্তিসেনা’ কবিতাটি কে না পড়েছে শৈশবে, স্কুলের বইতে? ছোটবড় সবাই মজা পায় তার ছড়া পড়ে। এই ছড়াকারের কিছু অজানা ঘটনা এখানে তুলে ধরা হলো-

লেখালেখির শুরু

গ্রামে মনসার পুঁথি হতো, পুঁথি শুনতে শুনতে কবি হয়েছেন সুকুমার। প্রথম ১৪ বছর মনে মনে লিখেচছেন, ১৪ বছর পর বাস্তবের লেখক হলেন।

‘অসময়ে মেহমান’ রহস্য

সুকুমার বড়ুয়ার বিখ্যাত ছড়া ‘ঠিক আছে ঠিক আছে’। ছড়ার ‘অসময়ে মেহমান, ঘরে ঢুকে বসে যান’— এখানে মেহমানটা আলাদা কেউ নয়। সাধারণ ঘটনা থেকেই এটি লিখেছেন। ছড়াকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের আকাল দেখেছেন, ব্রিটিশ আমলের মন্বন্তর দেখেছেন, দুর্ভিক্ষ দেখেছেন। দেখেছেন দুমুঠো ভাতের জন্য, একটু ফেনের জন্য মানুষ কী রকম আহাজারি করত। এই আকালের দিনে অসহায় মানুষের কান্না দেখেছেন। এ রকম সময়েই কিছু মানুষ আছে, যারা ওপর দিয়ে সব সময় ‘ঠিক আছে ঠিক আছে’ বলত, অথচ ভেতরে প্রচণ্ড হাহাকার। এই ‘ঠিক আছে’ শব্দটা তখন লেখকের মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। মানুষের বাইরের ও ভেতরের রূপটাকে তুলে ধরতেই ‘ঠিক আছে ঠিক আছে’ ছড়াটা লিখেছেন তিনি।

কোয়াল খাইয়ে’র পেছনের ঘটনা

সুকুমার বড়ুয়ার একটি আঞ্চলিক ছড়াগ্রন্থের নাম ‘কোয়াল খাইয়ে’। বইটি যেভাবে লেখা হলো- একটা ছেলের সঙ্গে একটা মেয়ে সুতো দিয়ে মালা গাঁথছিল। মেয়েটার বাড়ি চাটগাঁয়, ছেলেটা ছিল ভিন্ন জেলা কুমিল্লার। মালা গাঁথার সময় হাত থেকে হঠাৎ সুতোর বান্ডিল পড়ে যায়। তখন মেয়েটা বলে উঠল ‘অবুক রে বুক’। এই ‘অবুক রে বুক’ শব্দটাকে রূপ দেওয়ার জন্যই ‘কোয়াল খাইয়ে’ বইটি লেখেন তিনি।

‘পাগলা ঘোড়া’র গল্প

১৯৬৯ সালের গণ আন্দোলনের সময় একটা ছড়া লিখলেন সুকুমার। ওটা ফরাসি ভাষায়ও অনুবাদ হয়েছে। আবার ইন্ডিয়া রেডিওতে প্রচার হয়েছে। লেখাটা ছিল- ‘চিচিং ফাঁক হে, চিচিং ফাঁক/ বন ময়ূরের পুচ্ছ পরে নাচছিল সব শকুন খাক/ দমকা জ্বরে হঠাৎ করে ঘটিয়ে দিল ঘুর্বিপাক/ চিচিং ফাঁক হে, চিচিং ফাঁক।’ ১৯৭০ সালে একজন টিচার তাঁর লেখার কাটিংগুলো নিয়ে আব্দুল হাই সাহেবের কাছে পাঠালেন। আব্দুল হাই সাহেব একটা চিঠি লিখে কবি আলী আহসানের কাছে দিয়েছেন। তখন লুৎফুল হায়দার চৌধুরী ওনাকে দিলেন দেখার জন্য। এরপর বাইশটি ছড়া নিয়ে প্রথম গ্রন্থ ‘পাগলা ঘোড়া’ প্রকাশিত হয়।

জীবনের লক্ষ্য

সুকুমার ভাবতেন বড় হয়ে কিছু একটা হবেন। ছোটকালে গল্প শুনতেন। রাজপুত্রদের গল্প শুনতেন, ঐ ধরনের একটু, যাদুকরী শক্তির কিছু একটা হবেন। এইরকম চিন্তা করতেন তিনি।

শিশুশ্রমিক

সুকুমার বড়ুয়া শৈশবে দুস্থ শিশুশ্রমিক ছিলেন। কাজ করার পাশাপাশি লেখালেখি করতেন।

পড়াশোনা ও প্রতিবন্ধকতা

তৃতীয় শ্রেণীতে ওঠার পর গুণি এই ছড়াকারের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। যখন পড়ালেখা করেন তখন পরের বাড়িতে ছিলেন। পরের বাড়ি থেকে তাঁকে যে কিছুদিন স্কুলে যেতে দিয়েছে এটাই ছিল ভাগ্য। তিনি পরীক্ষা দিতে যাবেন, বাড়িরওয়ালা তাঁকে পরীক্ষা দিতে দিলেন না। তাঁর পড়ালেখার অবস্থা ভালো দেখে হেডমাস্টার নিজেই পরীক্ষার ফি দিতে রাজি হলেন। তারপরেও তাঁকে পরীক্ষা দিতে যেতে দিলেন না। তিনি যখন পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিলেন তখন তাঁকে ওই বাড়ির মহিলা জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় যাচ্ছো? তিনি বললেন, পরীক্ষা দিতে যাই। মহিলা বললেন, ‘না যেতে হবে না। আমার বাচ্চা সামলাও।’ মহিলার দুই ছেলে ছিল। তাদের পড়ালেখা বন্ধ করে নাই। কিন্তু তাঁর পড়ালেখা বন্ধ করে দিলো। এই ঘটনায় সুকুমার খুব কষ্ট পেয়েছিল। আহত হয়েছিল মনে মনে।

অভাবের জীবন

অভাবী জীবন ছিল সুকুমার বড়ুয়ার। অনাথ ছিলেন। বাড়িতে বাড়িতে কাজকর্ম করেই সময় কাটাতেন। লেখা ছাপা হয়েছে তখনও এক বাসায় কাজ করতেন তিনি। যাদের রান্না করতেন, তাদের পাতে ভাত-তরকারী দিয়ে পেপার আনতে ছুটতেন। তারপর তাদের দেখাতেন। তারা বলতো তুই না রান্না করস? আবার লেখক হয়ে গেলি! তাজ্জব হয়ে যেত।

ঢাকার যাপন

১৯৬০ সালে ঢাকায় চলে এলেন সুকুমার। এসে, গেলেন বৌদ্ধ মন্দিরে। সেখানে পেলেন ডিপি বড়ুয়াকে। তিনি কাজ দেন। ওনারা একটা পাঁচ-সাত জনের মেস নিয়েছিলেন। পয়ত্রিশ টাকা ভাড়া দিতেন। কিছুদিন পর মেস ভেঙে গেল। এরপর ওয়ারীতে একটা বাসায় কাজ দিলেন। ওরা ত্রিশ টাকা বেতন দিত। তখন আর ভালো লাগছিল না তাঁর। অনেক কাজের চাপ ছিল। লেখালেখি তখন ভালো করে হয়নি। এরমধ্যে মা মারা গেলেন। এরপর আমি আবার ডিপি বড়ুয়ার কাছে আসলেন। তিনি ১৯৬২ সালে নিউট্রিশন সার্ভে নামে একটা প্রজেক্টে কাজ দিলেন। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত কাজ করেছেন।

বাজিকর

সুকুমার একদিন বাজি ধরে ১৫ টাকা মাইনের চাকরিটাকে তুচ্ছ করে চলে এসেছিলেন চট্টগ্রাম শহরে। শৈশবে চায়ের দোকানে কাজ করেছেন, ফেরি করে বাদাম ও আইসক্রিম বিক্রি করেছেন। কিন্তু জীবনের বাজিতে হারেননি তিনি। নিজের ভাষায় ‘দুই ক্লাস পাস’ সুকুমার বড়ুয়া হয়েছেন ছড়াসম্রাট।

সুকুমার বড়ুয়ার সকল বই

আরও পড়ুনঃ 

বাংলা সাহিত্যের যেসব বই থেকে সিনেমা বানানো হয়েছে

লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের এই তথ্যগুলো আপনি জানতেন কি ?

rokomari

rokomari

Published 29 Jan 2018
Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png