সাদাত হোসাইনের যে ৩ টি উপন্যাস আপনি পড়তে পারেন

0

208

সাদাত হোসাইনের যে ৩ টি উপন্যাস আপনি পড়তে পারেন

  • 0
  • #লেখক কুঞ্জ
  • Author: rokomari
  • Share

দুটো ইচ্ছে নিয়ে স্বপ্নযাত্রার শুরু। এক- খেয়ানৌকার মাঝি হওয়া, দুই- নিজের নামটি ছাপার অক্ষরে দেখতে পাওয়া। মাদারীপুরের কালকিনি থানার কয়ারিয়া নামের যে গ্রামে জন্ম, তার পাশ দিয়েই তিরতির করে বয়ে গেছে ছোট্ট এক নদী। খেয়ানৌকার মাঝি হওয়ার স্বপ্নটা তাই সত্যি হওয়াই ছিল সহজ। কিন্তু হলো উল্টোটা। পূরণ হলো দ্বিতীয় স্বপ্নটি! সাদাত হোসাইন হয়ে গেলেন লেখক। এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা সাত। লিখেছেন, কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস। যা প্রশংসা কুঁড়িয়েছে পাঠক মহলে। ‘আরশিনগর’ এবং ‘অন্দরমহল’ নামের দীর্ঘ কলেবরের উপন্যাস দুটি রীতিমত চমকে দিয়েছে পাঠকদের। এ বছর প্রকাশিত তাঁর নতুন উপন্যাস “মানবজনম” বইমেলা ও রকমারি ডট কমের বেস্ট সেলার লিস্টে থাকার পাশাপাশি পাঠকদের ভালোবাসাও কুড়িয়েছে অবিরাম। শুধু লেখালেখিই নয়, দুর্দান্ত আলোকচিত্রী সাদাত হোসাইন নিজের স্বপ্নের সীমানাটাকে বাড়িয়ে নিয়ে গেলেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণেও। তার নির্মিত ‘বোধ’ ও ‘দ্যা শ্যুজ’ নামের নির্বাক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দুটি প্রশংসার ঝড় তুলেছে বিশ্বব্যাপী। কাজ করছেন একাধিক নতুন ফিল্ম নিয়ে। সাদাত হোসাইনের জগত জুড়ে অমিত স্বপ্নের বসবাস।

সেই স্বপ্নের সবটা ছুঁয়ে ছুটে যেতে চান অবিরাম। সম্প্রতি আলোকচিত্র, লেখালেখি এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য জিতেছেন ‘জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যশনাল অ্যাওয়ার্ড’।

সাদাত হোসাইনের বেস্ট সেলার ৩ টি উপন্যাস যা আপনি পড়তে পারেন

মানবজনম হেমার খুব বাসায় যেতে ইচ্ছে করে। তারপর তার সেই একলার বারান্দাটায় চুপচাপ বসে থাকতে ইচ্ছে করে। সজনে গাছগুলো কি পাতা ছেড়েছে? ঝুম বৃষ্টিতে সেই পাতাগুলো এখন নিশ্চয়ই গাঢ় সবুজ হয়ে উঠেছে। হেমার বুকের ভেতরটা কেমন তড়পায়। এত ভেবেও নিজেকে কেন সে অনুভূতিহীন করতে পারে না? মানুষ এমন কেন? একটা পাতার জন্য, একটা ফুলের জন্য, এক ফোটা শিশিরের জন্য, একটা কল্পনার নদী, খানিক মেঘ, একটা পাহাড়, খানিক বৃষ্টি, খানিক স্মৃতি, খানিক স্পর্শ কিংবা ভুলে যাওয়া একটা গোটা মানুষের জন্যও কেন তার মন কেমন করে!

মানুষ হয়ে জন্মানোর এই এক কষ্ট! সকলই কেমন বুকের ভেতর ডুবে ডুবে লুকিয়ে থাকে। তারপর সুযোগ পেলেই ভেসে ভেসে ওঠে। তারপর বানের জলের মতন সকল কিছু ভাসিয়ে দেয়।

আকর্ষনীয় ছাড়ে সাদাত হোসাইনের বেস্টসেলার একসাথে

অন্দরমহল হরিহরণ দীর্ঘ সময় চুপ করে বসে রইল। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল, ‘ও ছেলে তোর, তা বিষ্ণুপুরের কি কেউ জানে?’ হেমাঙ্গিনী দেবী সাথে সাথেই জবাব দিল না। চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘জানে’। হরিহরণ বলল, ‘কে জানে?’ হেমাঙ্গিনী দেবী বলল, ‘বড়বাবুর স্ত্রী’। হরিহরণ এবার সত্যি সত্যি অবাক হল, ‘বড় বাবুর স্ত্রী মানে? অবনীন্দ্রনারায়ণের স্ত্রী? বীণাবালা?’ হেমাঙ্গিনী অন্ধকারেই হ্যা সূচক মাথা নাড়াল। তারপর স্মিত কন্ঠে বলল, ‘হ্যা’। হরিহরণ বলল, ‘তোর কি হয়েছে হেমাঙ্গিনী? আমায় খুলে বল। স্পষ্ট করে বল’।

হেমাঙ্গিনী আবারও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর সেও ঠান্ডা গলায় বলল, ‘এই জমিদার বাড়ির সাথে আমার কিছু হিসেব আছে হরি কাকা। তোমারও ছিল। কিন্তু তুমি পালানো মানুষ। পালানো মানুষ হিসেব ভয় পায়। তারা হিসেব ছেড়ে পালায়। তুমিও পালাচ্ছ’। হরিহরণ বলল, ‘ তত্ত্ব কথা ছাড় হেমাঙ্গিনী। এখন তত্ত্ব কথার সময় নয়। আসল কথা বল। তুই কি খেলা শুরু করেছিস? আমায় বল’। হেমাঙ্গিনী দেবী বলল, ‘সব বলব হরি কাকা। সব বলব। তার আগে আমার ছেলেকে বাঁচাও হরি কাকা। আমায় জঙ্গলের ভেতর ওই বাড়িতে নিয়ে চল’। হরিহরণের হঠাৎ মনে হল, আসলেইতো, আগে ছেলেটার কি হাল সেটি দেখা জরুরী। আর এখন এই শেষ রাতে ওখানে আর কারো থাকার কথাও না। হরিহরণ আর কথা বাড়াল না। সে হেমাঙ্গিনী দেবীর হাত ধরে টেনে নাও থেকে নামল। তারপর আবার ঢুকল বারোহাটির জঙ্গলে। হরিহরণ এবার আরো সংক্ষিপ্ত পথ ধরল। কিন্তু গভীর জঙ্গলে সেই ভাঙা বাড়ির সামনে এসে হেমাঙ্গিনী দেবী আর হরিহরণ থমকে গেল। বাড়ির সামনে দেবেন্দ্রনারায়ণ সম্পূর্ণ একা দাঁড়িয়ে আছেন। হরিহরণ আর হেমাঙ্গিনী দেবী নিশ্চুপ, নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল আড়ালে। দেবেন্দ্রনারায়ণ বাড়ির ভেতর ঢুকলেন। তারপর দীর্ঘসময় পর বাড়ির ভেতর থেকে বের হলেন। হরিহরণ আর হেমাঙ্গিনী দেবী দেখল দেবেন্দ্রনারায়ণের কাঁধে কাপড়ে মোড়ানো ছেলেটি। মশালের আলোয় তার পা দুখানা দুলছে।

হরিহরণ আর হেমাঙ্গিনী দেবী বিষ্ফোরিত চোখে দেখল, দেবেন্দ্রনারায়ণ ছেলেটিকে একটি বৃক্ষের সাথে হেলান দিয়ে বসিয়ে রাখলেন। তারপর আবার ঢুকে গেলেন বাড়িটিতে। তার কিছুক্ষণ বাদে দেবেন্দ্রনারায়ণ আবার বাড়ি থেকে বের হয়ে এলেন। ততক্ষণে দাউদাউ আগুনে জ্বলতে শুরু করেছে বাড়িটি। দেবেন্দ্রনারায়ণ একবারের জন্যও পিছু ফিরে তাকালেন না।

তিনি ছেলেটিকে ফের কাঁধে তুলে নিলেন। তারপর ঢুকে গেলেন জঙ্গলে।

আরশিনগর ইমাম আকরাম হোসেন দাঁড়িয়ে ছিলেন ইলেক্ট্রিসিটির পিলারটার নিচে। আরশিই তাকে প্রথম দেখল। তার আর তখন অত কিছু ভাবার অবস্থা নেই। সে তখন ঘোরগ্রস্ত এক মানুষ। তীব্র আতঙ্কে দিশেহারা। সে ইমাম সাহেবের দিকে অর্ধেকটা পথ দৌড়ে এসে হঠাৎ লুটিয়ে পরল কাদায়। ইমাম সাহেব যখন তাকে তুললেন, তখন আরশির শরীর থরথর করে কাঁপছে। আর সে বিড়বড়ি করে একটা মাত্র কথাই বলছে, আমি কিছু দেখি নাই। আমি কিছু দেখি নাই। আমি কিছু দেখি নাই ইমাম আকরাম হোসেন বুদ্ধিমান মানুষ। তিনি যা বোঝার বুঝে নিলেন। আরশিকে কাঁধে করে নিয়ে তিনি নেমে এলেন যযাতিপুর বাজার পেরিয়ে নদীর ঘাটে। সেখানে সারি সারি নৌকা বাঁধা। তিনি দেখে শুনে একখানা ছইঅলা নৌকায় উঠে পড়লেন। বিপত্তি বাঁধাল তালা। গাছের সাথে লোহার শেকল দিয়ে তালা মেরে বেঁধে রাখা হয়েছে নৌকাগুলো। অবশ্য তালা ভাঙতে খুব একটা বেগ পেতে হল না তার। আরশিকে ছইয়ের ভেতর শুইয়ে রেখে নৌকা ছাড়লেন ইমাম সাহেব। কিন্তু কোথায় যাবেন তিনি? আরশি বা তার, কারও জন্য আর যযাতিপুরে থাকা সম্ভব না। কোনভাবেই সম্ভব না। যযাতিপুর মানেই এখন তাদের জন্য অবধারিত মৃত্যু। সুতরাং যতটা দূরে সরা যায়। ইমাম সাহেব হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি নৌকা বেয়ে নদীর আড়াআড়ি চলে যাবেন। গন্তব্য রাঙারোড। রাঙারোড থেকে কোন একটা ব্যবস্থা করে নিবেন। আরশি রাঙারোড যেতে পারে, লোকমান এটা ধরণাও করতে পারবে না। ইমাম সাহেব রাঙারোড থেকে সোজা চলে যাবেন পিরোজপুর। তার গ্রামের বাড়ি। তারপর বাকিটা ভাবা যাবে। ইমাম আকরাম হোসেন আল্লাহর নাম নিয়ে বৈঠা ডুবালেন পানিতে। তখন শো শো করে বয়ে যাচ্ছে ঝড়ো বাতাস। উত্তাল হয়ে উঠছে নদী। তুমুল বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে চরাচর। নিকষ অন্ধকারে ঢেকে আছে রাতের পৃথিবী। সেই ভয়াবহ দূর্যোগের রাতে ওই অসীম মহাশুন্যের ওপারে বসে কেউ একজন হয়তো লিখে চলেছেন অন্য এক গল্প।

সাদাত হোসাইনের সকল বইয়ের লিঙ্ক

Write a Comment