একজন সেলিনা হোসেন, কতটুকু জানা আছে তার বিষয়ে???

90

212

একজন সেলিনা হোসেন, কতটুকু জানা আছে তার বিষয়ে???

  • 0
  • #লেখক কুঞ্জ
  • Author: rokomari
  • Share

বর্তমান সময়ের বাংলা সাহিত্যের ধারায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক সেলিনা হোসেন। সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করলেও ঔপন্যাসিক হিসেবেই তিনি সমধিক খ্যাত। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের নিরন্তর সাধনায় ইতোমধ্যে তিনি নির্মাণ করেছেন নিজস্ব এক শিল্পভুবন, পাঠককে শুনিয়েছেন তাঁর স্বতন্ত্র সত্তার স্বরগ্রাম। সেলিনা হোসেনের ঔপন্যাসিক প্রতিবেদন বিষয়গৌরবে যেমন বিশিষ্ট, তেমনি প্রকরণ-প্রসাধনেও। ইতিহাসের গভীরে সন্ধানী আলো ফেলে ঔপন্যাসিক প্রতিবেদন সৃষ্টিতে তাঁর সিদ্ধি কিংবদন্তিতুল্য। বস্তুত ইতিহাসের আধারেই তিনি সন্ধান করেন বর্তমানকে শিল্পিত করার নানামাত্রিক শিল্প-উপকরণ। সমকালীন জীবন ও সংগ্রামকে সাহিত্যের শব্দস্রোতে ধারণ করাই সেলিনা হোসেনের শিল্প-অভিযাত্রার মৌল অন্বিষ্ট। এক্ষেত্রে শ্রেণি-অবস্থান এবং শ্রেণিসংগ্রাম চেতনা প্রায়শই শিল্পিতা পায় তাঁর ঔপন্যাসিক বয়ানে, তাঁর শিল্প-আখ্যানে। কেবল শ্রেণিচেতনা নয়, ঐতিহ্যস্মরণও তাঁর কথাসাহিত্যের একটি সাধারণ লক্ষণ। উপন্যাসে তিনি পৌনঃপুনিক ব্যবহার করেছেন ঐতিহাসিক উপাদান, কখনো-বা সাহিত্যিক নির্মাণ। মহীয়সী এই লেখকের জীবন থেকে নেওয়া কিছু তথ্য এখানে উপস্থাপন করা হলো।

জন্মকথা-

সেলিনা হোসেনের জন্ম ১৯৪৭ সালের ১৪ জুন। জন্মের সময়ের দিকে তাকালে উপলব্ধি করা যায়, পৃথিবীর ইতিহাসের ভয়াবহতম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন অত্যুঙ্গ পর্যায়ে। তাঁর জন্মের ঠিক তিন মাসের মধ্যে, অর্থাৎ ৬ আগস্ট ও ৯ আগস্ট পৃথিবীতে প্রথম আণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে অনেক দেশেই তখন হতাহতের ঘটনা ঘটে। ভারত বর্ষেও এই যুদ্ধের প্রভাব এসে পড়েছিল। দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। ইতিহাসে ‘পঞ্চাশের মন্বতর’ হিসেবে যা পরিচিত। এই দুর্ভিক্ষে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণে তাৎক্ষণিকভাবে নিহতের তুলনায় ২০ গুণ বেশি মানুষ মারা যায়। এই ভয়াবহতার রেশ সেলিনা হোসেন জন্মমাত্রই লাভ করেন। সবচেয়ে বড় যে বিষয়, তার জন্মের অল্প দিনের মধ্যেই ভারতবর্ষ সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে বিভক্ত হয় এবং ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ঘটনা ঘটে তার জন্মের পাঁচ বছরের মধ্যেই। আরো একটি দিক হলো, তাঁর জন্মস্থান, রাজশাহীতে তখন তেভাগা আন্দোলনের জন্য উত্তাল।

লেখালেখিরর শুরু-

সেলিনা হোসেনের লেখালেখি শুরু সেই স্কুলবেলাতেই। ১৯৬৫ সালে তিনি যখন রাজশাহী উইমেন্স কলেজের ছাত্রী তখন বিভাগীয় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক পান। পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৭ সালে বিএ (অনার্স) ও ১৯৬৮ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তিনি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চর্চায় নিবিড়ভাবে যুক্ত হন। সে সময় তিনি ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। সেখান থেকে তিনি সমাজ দর্শন হিসেবে সমাজতন্ত্র গ্রহণ করেন। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করি যে, সে সময় এই রাজনৈতিক আদর্শ ও সমাজ দর্শন দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও পরবর্তী সময়ে অনেকেই বদলে যায় কিন্তু তিনি তা পরিহার করেননি। বরং লেখনির মাধ্যমে তার বিস্তার ও দিক অন্বেষণ করেছেন।

প্রথম জীবনে সেলিনা হোসেন কবিতা দিয়েই সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলেন। মধ্য সত্তরের দশকে তিনি গল্প লেখা শুরু করেন। ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘উৎস থেকে নিরন্তর’। অর্থাৎ স্বাধীনতাপূর্ব এক বন্ধ্যা ও নিয়ন্ত্রিত সময়ে একজন নারী সাহিত্য মাধ্যমে সক্রিয় থাকছেন, তাঁর গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করছেন- এটা সত্যিই একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। প্রবন্ধের জন্য তিনি ডক্টর এনামুল হক স্বর্ণপদক পান।

লেখালেখির প্রেরণা-

লেখালেখির প্রেরণা পরিবার থেকে পেয়েছেন বিষয়টি ঠিক এমন নয়। তবে শিক্ষার উৎসাহ পেয়েছেন পরিবার থেকেই। সেলিনা হোসেনের আব্বা মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ১৯৩৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে এমএ পাস করেন। বাবার পড়ালেখায় তাঁর নানা খুব সহযোগিতা করেছিলেন। কিন্তু পড়ালেখার ক্ষেত্রে নানা তাঁর দুই মেয়ে—তাঁর মা ও খালাকে ততটা সহায়তা দেননি। এ কারণে নানার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন তাঁর মা। সেলিনা হোসেনের মা-বাবা দুজনেরই শিক্ষার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল। তাঁরা যখন বগুড়ায় থাকতেন, তাঁর বড় বোনদের রিকশায় শাড়ি পেঁচিয়ে স্কুলে পাঠানো হতো। তখন মেয়েদের বাইরে চলাফেরার ব্যাপারে কঠিন পর্দাপ্রথা মেনে চলতে হতো। সেই সময় বাবা বললেন, না, এভাবে নয়; বোনদের তিনি ভারতেশ্বরী হোমসে দিয়ে এলেন। পঞ্চাশের দশকের পাকিস্তান আমলে বড় দুই মেয়েকে পড়ালেখা শেখানোর জন্য কতটা করেছিলেন তিনি, বিষয়টা ভাবার মতো ছিল।

সেলিনার বয়স তখন সাত কি আট। তাঁদের নয় নম্বর ভাইয়ের জন্মের সময় মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। রোজার ছুটিতে বোনেরা বাড়িতে এসে বলল, মা যত দিন সুস্থ না হবে, তত দিন তাঁরা স্কুলে ফিরবেন না। সব শুনে মা বললেন, আমি মরি বাঁচি, তাতে তোমাদের কিছু যায় আসে না। যেদিন স্কুল খুলবে, সেদিনই যেতে হবে। পড়াশোনার ব্যাপারে পরিবারের এই মনোভাব তাঁর লেখালেখির ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল। পরিবারের প্রশ্রয়েই লেখালেখির শুরু। ১৯৫৪ সালে রাজশাহীতে আন্তকলেজ একটা প্রতিযোগিতা হয়েছিল। সেলিনার জীবনের প্রথম লেখা গল্পটি সেখানে প্রথম হয়। অবশ্য লেখালেখির প্রথম দিকে তিনি অনেক কবিতা লিখেছিলেন।

লেখালেখিরর অনুপ্রেরণার ক্ষেত্রে অবদান আছে তাঁর শিক্ষকদেরও। সেলিনা তখন কলেজে পড়েন। আন্তকলেজ প্রতিযোগিতায় মহিলা কলেজ থেকে তাঁর নাম পাঠালেন স্যাররা। প্রতিযোগিতার জন্য সেই সময় গল্পটা লিখলেন, সেটাই প্রথম হলো।

সৌভাগ্যবতী-
সেলিনা হোসেনের অসাধারণ সোনালি শৈশব ছিল। সেই শৈশবে অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, শিক্ষার জায়গা—এসব কিছু ছিল। সব মিলিয়ে তাঁর লেখালেখির অনুপ্রেরণার জায়গাও সেটা। শুরু থেকে তাঁর লেখালেখি এবং এ সূত্রে যে সুন্দর বাস্তবতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে, লেখালেখির জায়গাটাকে যেভাবে পেয়েছে, আমাদের দেশে এই একবিংশ শতাব্দীর মেয়েরা—এখন যারা লিখছে, অনেক সময় তারাও হয়তো সেভাবে পায় না। লিখতে এসে নারী হিসেবে প্রতিকূল কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি তাঁকে। এদিক দিয়ে তিনি সৌভাগ্যবতী।

কর্মক্ষেত্র-

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হওয়ার আগেই সেলিনা হোসেন বিভিন্ন পত্রিকায় উপসম্পাদকীয় লিখতেন। ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমির গবেষণা সহকারী হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। তিনি ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমির প্রথম মহিলা পরিচালক হন। ২০০৪ সালের জন্মদিনে তিনি এ পদ থেকে অবসর নেন। ৩৪ বছরের কর্ম সময়ে তিনি বাংলা একাডেমির অভিধান ও বিখ্যাত লেখকদের রচনাবলি প্রকাশের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পাদন করেন। এ ছাড়া তিনি ২০ বছরেরও বেশি সময় ‘ধান শালিকের দেশ’ পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন।

জনপ্রিয়তা ও সম্মান-

ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত সেলিনা হোসেনের গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস ‘যাপিত জীবন’। পশ্চিমবঙ্গের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিভুক্ত উপন্যাসের এটি একটি। এ ছাড়াও শিলচরের আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পাঁচটি উপন্যাস এমফিল গবেষণাভুক্ত হয়েছে। তবে তাঁর পাঠকপ্রিয় উপন্যাস ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’। এটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে এটি উল্লেখযোগ্য। সেলিনা হোসেনের এক সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, উপন্যাসটি নিয়ে বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্র করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু এবং ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তন ও তাঁর নিরাপত্তার অভাবজনিত কারণে তা আর করা হয়নি। ১৯৮৭ সালে বইটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। প্যারিসের ‘দ্য গল’ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান লিটারেচারের অধ্যাপক পাস্কেল জিন্ক নেট থেকে বইটির ইংরেজি সংস্করণ সংগ্রহ করে অধুনিক অনুবাদের উদ্যোগ নেন। যা পরে ভারতের রূপা প্রকাশনী সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়। তা ছাড়া শিকাগোর ওকটন কমিউনিটি কলেজে এই বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ চারটি সেমিস্টারে পড়ানো হয়। ২০০১ সালে উপন্যাসটি ভারতের কেরালা থেকে মালয়ালাম ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

সেলিনা হোসেনের সকল বইয়ের কিছু অংশ পড়তে কিংবা সংগ্রহ করতে 

Write a Comment