আবু ইসহাকের এই গল্পগুলো হয়তো আপনি জানেনই না

1

154

আবু ইসহাকের এই গল্পগুলো হয়তো আপনি জানেনই না

  • 0
  • #লেখক কুঞ্জ
  • Author: rokomari
  • Share

আবু ইসহাক বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক। তিনি অল্প লিখলেও, সে সব লেখা সুপরিচিত এবং পাঠকপ্রিয়। সর্বাধিক খ্যাতি পেয়েছেন তার সূর্য দীঘল বাড়ি উপন্যাসের জন্য।  ১৯৪৬ সালে, মাত্র বিশ বছর বয়সে রচনা করেন বিখ্যাত এই উপন্যাসটি। যদিও এটি প্রকাশ হয় ১৯৫৫ সালে কলকাতা থেকে। পরে এই উপন্যাসের ভিত্তিতে মসিহউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলীর যৌথ পরিচালনায় একটি শিল্পসফল চলচ্চিত্রও নির্মাণ হয়েছিল। নিম্মে এই লেখকের জীবন থেকে নেওয়া কিছু গল্প তুলে ধরা হলো।

 

জন্ম, পড়াশোনা ও সংকটের গল্প-

 

আবু ইসহাকের জন্ম ফরিদপুর জেলার শিরঙ্গল গ্রামে ১৩৩৩ সালের (১৯২৬, নভেম্বর) ১৫ই কার্তিক। ঝিঝারী-উপসী উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয় থেকে ১৯৪২ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন। একটি ‘স্কলারশিপ’ও পান। এই ‘স্কলারশিপ’ নিয়ে পড়তে যান ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে। ১৯৪৩ সালে দেখা দেয় দেশ জোড়া দুর্ভিক্ষ। শতে শতে হাজারে হাজারে নয়– লাখে লাখে দুর্গত মানুষ পথে বেরিয়ে পড়ে। সমাজ সংসার ভেঙে যায়। সেই সময় ‘স্বেচ্ছাসেবক’ হয়ে দুর্গত মানুষদের সেবায় ‘লঙ্গরখানায়’ কাজ করেন। আই এ পাস করেন ১৯৪৪ সালে। এই সময় তাদের সংসারে ঘটে বিপদ। বাবা মারা যান। সঙ্গে সঙ্গে তার পড়াশোনারও ইতি ঘটে।

চাকুরির গল্প-

 

চাকুরী নেন বেসামরিক সরবরাহ বিভাগে। চাকুরী জীবন কলকাতা, পাবনা, ঢাকা ও অধিকাংশ সময়ই নারায়ণগঞ্জে অতিবাহিত হয়। ১৯৪৯ সাল থেকে পুলিশ বিভাগে ছিলেন।

পরিবারের গল্প-

 

আবু ইসহাকের বাবা মৌলভী মোহাম্মদ এবাদুল্লাহ কাঠের ব্যবসা করতেন। এছাড়া গ্রামের কিছু কৃষি জমির মালিকও ছিলেন মোহাম্মদ এবাদুল্লাহ। আবু ইসাহাকের মা আতহারুন্নিসা ছিলেন সাধারণ একজন গৃহবধূ। ছয় ভাইবোনের মধ্যে আবু ইসহাক ছিলেন পঞ্চম। আবু ইসহাকের বাবা কাঠের ব্যবসায়ী হলেও শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। ছেলেমেয়েদের মানসিক বিকাশের কথা চিন্তা করে তিনি ওই সময়ের বিখ্যাত দুটি বাংলা সাময়িকপত্রের গ্রাহক হয়েছিলেন। নিয়মিত গ্রাহক হওয়ায় ‘সওগাত’ ও ‘দেশ’ পত্রিকা নিয়মিত পেতেন আবু ইসহাক ও তার ভাইবোনেরা।

লেখালেখির গল্প-

 

ছোটবেলা থেকেই কবিতা ও গল্প নিয়ে চলে আবু ইসহাকের সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াস। প্রথম মুদ্রিত গল্প ‘অভিশাপ’ প্রকাশিত হয় ১৯৪০ সালে–কবি নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘নবযুগে’। তার প্রথম উপন্যাস, সূর্য-দীঘল-বাড়ী’ ১৯৫০-৫১ সালে ‘নও বাহার’ মাসিক পত্রে ধারাবাহিকভাবে বেরোয়। ১৯৫৫ সালে তা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। কাজের ফাঁকে ফাঁকে যা কিছু লিখতে পারতেন তা পূর্ব বাঙলার নানা কাগজে মাঝে মাঝে পত্রস্থ হতো।

প্রথম লেখা ছাপা হওয়ার গল্প-

 

পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায়ই আবু ইসহাক গল্প ও কবিতা লেখা শুরু করেন। তার এসব লেখার বেশকিছু স্কুলের দেয়াল পত্রিকা ‘প্রভাতী’-তে ছাপা হয়েছে। স্কুলের গণ্ডির বাইরে তার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়। মাত্র ১৪ বছর বয়সে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘নবযুগ’ পত্রিকায় ছাপা ‘অভিশাপ’ নামের সেই গল্পটিই তাঁকে সাহিত্যিক হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সময় ‘সওগাত’ ও ‘আজাদ’ পত্রিকায় তাঁর লেখা বেশ কয়েকটি গল্প ছাপা হয়। ওই সময় কলেজ বার্ষিকীতে তাঁর অনুবাদ করা একটি কবিতাও ছাপা হয়েছিল।

সূর্য-দীঘল বাড়ি‘র গল্প-

 

সূর্য-দীঘল বাড়ি’ ১৯৪৮ সালে রচিত হয় এই উপন্যাসটি। প্রকাশকের অভাবে সাত বছর বাদে প্রকাশ পেলে বেশ নড়াচড়া হয় উপন্যাসটি নিয়ে। উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর বেসরকারি সরবরাহ বিভাগের পরিদর্শকের চাকরি নিয়ে আবু ইসহাক প্রথম কাজ শুরু করেন নারায়ণগঞ্জে। নারায়ণগঞ্জ তখন দুর্ভিক্ষ কবলিত। নারায়ণগঞ্জে তাঁর বন্ধু কবি আনিসুল হক চৌধুরী দেশের দুর্ভিক্ষের চিত্র একটি উপন্যাসের মাধ্যমে তুলে ধরার ব্যাপারে তাকে উৎসাহিত করেন। আবু ইসহাকের সংবেদশীল মনেও বাংলাদেশের মানুষের দুর্যোগ, দুর্ভোগ, কুসংস্কার ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির খপ্পরে পড়ে দেশের অধিকাংশ মানুষই তখন বাঁচার আশায় দিশেহারা। নারায়ণগঞ্জে থাকার সময় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের ট্রেনের একশ্রেণির যাত্রীর মধ্যে এই দিশেহারাদের দেখছিলেন আবু ইসহাক। যারা নিঃস্ব হয়ে পেটের ভাত জোগাড়ের আশায় শহরে গিয়েছিল, কিন্তু শহরে কোনো ভরসা না পেয়ে তারা গ্রামে ফিরে আসে। গ্রামে ফিরেও তারা বাঁচার আশ্বাস পায় না। এইসব দিশেহারা, নিঃস্ব, অসহায় মানুষদের নিয়ে আবু ইসহাক নারায়ণগঞ্জে থাকাকালেই তার প্রথম ও অন্যতম উপন্যাস ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ রচনার কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ চার বছর পর ১৯৪৮ সালে এটি লেখার কাজ শেষ হয়। ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত এটি ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয় ‘নওবাহার’ নামক মাসিক পত্রিকায়। উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় রচনার সাত বছর পর ১৯৫৫ সালে। প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় কলকাতা থেকে এবং পরে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে। ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’-তে এমন অনেক কিছুই আছে যা দেশে ও বিদেশে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।

অভিধানের গল্প-

 

প্রথম দিকে আবু ইসহাক খুব বেশিদূর যেতে চাননি তিনি। লিখতে বসেছিলেন বিশেষিত শব্দের ছোটখাটো একটা অভিধান। লিখতে লিখতে তিরিশ বছর কেটে গেল। কখন কেটে গেল টেরই পেলেন না। নিজের বিশাল কাজ দেখে পরে নিজেই অবাক হয়ে গেলেন। শেষ দিকে এসে এ কাজে পুরো পরিবার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। কাজটাও বেশ অদ্ভুত। নানা ধরনের বইপুস্তক ও পত্রপত্রিকা চষে শব্দ বের করতেন। শব্দগুলো ছোট ছোট কার্ডে লিখে নিতেন। কার্ডগুলো রাখতেন গুঁড়ো দুধের খালি কৌটায়। পরে সেগুলো বাছাই করে সুতোয় মালা গেঁথে সাজাতেন। এই মালা গাঁথার কাজ ও বিশেষিত শব্দের কার্ড গুছিয়ে দিতেন স্ত্রী, কন্যা, পুত্র ও নাতি-নাতনিরা। এভাবে দুই লাখেরও বেশি বিশেষিত শব্দ নিয়ে মালা গাঁথলেন তিনি। শব্দের এই মালাগুলো পুস্তক আকারে রূপ নিয়ে হলো বাংলা ভাষার মূল্যবান সম্পদ ‘সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান‘। ১৯৯৩ সালের জুনে বাংলা একাডেমি থেকে অভিধানটির প্রথম অংশ (স্বরবর্ণ) প্রকাশিত হয়। ১৯৯৮ সালে বাংলা একাডেমি ‘সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান’-এর ব্যঞ্জনবর্ণ অংশ (ক থেকে ঞ) প্রকাশ করে। বিশাল এই অভিধানের বাকি অংশ প্রকাশে উদ্যোগী ছিল বাংলা একাডেমি। আবু ইসহাকের আকস্মিক মৃত্যুতে অভিধানের কাজ মাঝপথে থেমে যায় এবং বাকি অংশগুলো প্রকাশে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। আবু ইসহাক তাঁর এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সমাপ্ত করে যেতে পারেননি। পুরো অভিধানের পৃষ্ঠাসংখ্যা ২৫ হাজারের বেশি হতো বলে ধারণা করেছিলেন আবু ইসহাক।

সখের গল্প-

 

আবু ইসহাকের শখ ছিল মাছ ধরা, শিকার করা এবং মৌমাছি পালন। এছাড়া আড্ডাপ্রিয় মানুষ ছিলেন ইসহাক। করাচিতে থাকাকালীন সমমনা পড়ুয়া বাঙালিদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন প্রবাসী পাঠচক্র। পাঠচক্রের সদস্যদের বাসায় প্রতি মাসে চক্রাকারে আড্ডা বসাতেন।

আবু ইসহাকের সকল বই দেখতে

Write a Comment