একজন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, জীবন ও লেখালেখি প্রসঙ্গ

6

461

একজন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, জীবন ও লেখালেখি প্রসঙ্গ

  • 0
  • #লেখক কুঞ্জ #লেখকের ক্যানভাস
  • Author: rokomari
  • Share

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একজন বাংলাদেশী কথাসাহিত্যিক। তিনি একজন স্বল্পপ্রজ লেখক ছিলেন। দুইটি উপন্যাস, গোটা পাঁচেক গল্পগ্রন্থ আর একটি প্রবন্ধ সংকলন এই নিয়ে তাঁর রচনাসম্ভার। বাস্তবতার নিপুণ চিত্রণ, ইতিহাস ও রাজনৈতিক জ্ঞান, গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সূক্ষ্ম কৌতুকবোধ তাঁর রচনাকে দিয়েছে ব্যতিক্রমী স্বাদ। এই লেখকের জীবন থেকে নেওয়া কিছু তথ্য উপস্থাপন করা হলো।

  • বেড়ে ওঠা-

কিংবদন্তী এই কথাশিল্পীর জন্ম গাইবান্ধা জেলার সাঘাটায়। ১৯৪৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধা জেলার গোট্টিয়া গ্রামে মামা বাডিতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস বগুড়া জেলায়।

  • পড়াশোনা-

বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক (১৯৫৮) এবং ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন (১৯৬০)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেন (১৯৬৪)।

  • কর্মক্ষেত্র-

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কর্মজীবন শুরু হয় জগন্নাথ কলেজে প্রভাষক পদে যোগদানের মাধ্যমে। এরপর তিনি মিউজিক কলেজের উপাধ্যক্ষ, প্রাইমারি শিক্ষা বোর্ডের উপ-পরিচালক, ঢাকা কলেজের বাংলার প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মফিজউদ্দিন শিক্ষা কমিশনের সদস্য ছিলেন।

  • মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-

মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিচিত মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেন আখতারুজ্জামান এবং গোপনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। তাঁর লেখা প্রতিশোধ, অন্য ঘরে অন্য স্বর, খোঁয়ারি, মিলির হাতে স্টেনগান, অপঘাত, জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল, রেইনকোট প্রভৃতি গল্পে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধপরবর্তী রাজনৈতিক এবং সামাজিক বাস্তবতা।

  • লেখালেখি-

জীবনে খুব বেশি তিনি লেখেননি। তবে যা লিখেছেন তা বিশ্বমানের। তার খোয়াবনামা’ও ‘চিলেকাঠার সেপাই’ পাঠকনন্দিত। ‘চিলেকাঠার সেপাই উপন্যাসে’স্বার্থকভাবে তিনি উপজীব্য করেছেন এ দেশের রাজনীতির পাকিস্তান পর্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আন্দোলন ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনকে। এটি অবলম্বনে পরবর্তীতে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ‘খোয়াবনামা’র মূল প্রসঙ্গ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি জনপদে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রভাব। এই উপন্যাসের জন্য তিনি পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কার।

  • লেখার মূল্যায়ন-

ইলিয়াস নিজে মনে করতেন না যে, তিনি খুব কম লিখেছেন। তাঁর দুটো উপন্যাস যেমন মহাকাব্যিক ব্যাপ্তিতে লেখা, তেমনি ছোটগল্পগুলোও ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা নিয়ে রচিত নয়। বরং গল্পগুলো খুব ঘন সন্নিবদ্ধ সমাজচিত্র, মানবিক সম্পর্ক ও প্রচ্ছন্ন অথচ জোরালো বক্তব্যে ঠাসা। হোর্হে লুইস বোর্টেস বলতেন যে, একজন লেখকের যা বলার তা প্রথম কয়েক পৃষ্ঠাতেই বলা হয়ে যায়। এজন্য তার সৃষ্টিকর্মে কলেবর বৃদ্ধির অর্থ একটা বক্তব্যের নানামাত্রিক পুনরাবৃত্তি। শিশু যেমন মাকে নামের নেশায় নানা ছলে, নানা সুরে ডাকে, তেমনি লেখার নেশায় পেয়ে বসলে লেখকও হয়তো নানা সুরে নানা ছন্দে একই কথার পুনরাবৃত্তি ঘটান। ইলিয়াসের সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে অন্তত এ পুনরাবৃত্তির অভিযোগ করা যাবে না। তার গল্পগুলো একটা থেকে অন্যাটা এবং উপন্যাস দুটো খুব স্পষ্টভাবে স্বতন্ত্র— যদিও দুটোই রাজনৈতিক উপন্যাস। তো এসব বিচার কররে ইলিয়াস একই কথা নানাভাবে বলেন— অন্তত একথা বলা যাবে না। স্বল্পপ্রজ লেখক হিসেবে পরিচিতি থাকলেও ইলিয়াস নিজে কিন্তু মনে করতেন না যে, তিনি খুব কম লিখেছেন। তাঁর একেকটি ছোটগল্পের রসদ নিয়ে বলে জনপ্রিয় ও বহুপ্রজ লেখকরা দু-একটি উপন্যাস লিখে ফেলতে পারতেন। আর কয়েক বছরের ব্যবধানে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি নিয়ে সৃষ্টি করা চিলেকোঠার সেপাই আর খোয়াবনামা তো নিঃসন্দেহে তাঁদের দু-এক ডজন উপন্যাসের জন্ম দিতে পারত। এসব কারণে অর্থাত্ এই দীর্ঘদিনের ভাবনা-চিন্তা ও পরিকল্পনার অভিজ্ঞতা, রসদ সংগ্রহের প্রস্তুতি এবং দীর্ঘ সময় ধরে লেখার যে যন্ত্রণা/আনন্দ, সেই অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো ইলিয়াস মনে করতেন যে, তাঁর রচনার পরিসর নেহাত সংকীর্ণ নয়। ইলিয়াসের উপন্যাস ও ছোটগল্পের মূল শক্তিই ছিল তাঁর নিষ্ঠা ও সততা। নিজের লেখার প্রতি, পাঠকের প্রতি, সৃষ্ট চরিত্রের প্রতি এবং স্থান ও সময়ের প্রতি তিনি ছিলেন সর্বতোভাবে সত্ ও একনিষ্ঠ। নিজের কাজ সম্পর্কে যথেষ্ট আস্থাবান না হয়ে তিনি লেখা ছাপতেন না। পাঠকের নিছক মনোরঞ্জনের জন্য কিছু লেখা কিংবা একুশে বইমেলা ধরতে কিছু লেখা— না সে ধরনের লেখক ইলিয়াস ছিলেন না। তিনি এক প্রবন্ধে লিখছেনও, যে কাঠমিস্ত্রি সত্যই শিল্পী, তিনি কখনো চকচকে বাহারি কিছু তৈরি করে সন্তুষ্ট হন না, মনটা তাঁর খুঁত খুঁত করে। এমন কাজকে তিনি গ্রাহককে প্রতারণারই শামিল বলে মনে করেন। আর এই সন্তুষ্ট না হওয়ার জন্য তাকে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হয়। যাঁরা সত্যিকারের লেখক, তাঁদের উপন্যাসের প্রথম বাক্যটি লিখতেও কখনো কখনো দিনের পর দিন, এমনকি মাসের পর মাসও পেরিয়ে যায়। নাকি মার্কেসের কথায় জানতে পাই তিনি একটি উপন্যাস শুরু করতে বছরের পর বছর সময় অতিবাহিত করতেন। সার্ভেন্তেস দস্তয়ভস্কি, জয়েস, মার্কেসের একনিষ্ঠ পাঠক ইলিয়াসও তাঁদের দেখানো পথই অনুসরণ করেছেন।

  • সম্মান ও পুরস্কার-

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী বলেছেন, ‘কী পশ্চিম বাংলা কী বাংলাদেশ সবটা মেলালে তিনি শ্রেষ্ঠ লেখক।’ লিখেছেন, ‘ইলিয়াস-এর পায়ের নখের তুল্য কিছু লিখতে পারলে আমি ধন্য হতাম।’ বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৮৩ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৯৬ সালে আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সকল বই

 

আরও পড়ুন একরোখা আহমদ ছফা’র সাহসী ঘটনা

 

Write a Comment

Related Stories