শাহাদুজ্জামানের লেখালেখি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

10

520

শাহাদুজ্জামানের লেখালেখি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

  • 0
  • #লেখক কুঞ্জ #লেখকের ক্যানভাস
  • Author: rokomari
  • Share

শাহাদুজ্জামান এই সময়ের শক্তিমান গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও গদ্যশিল্পী। গল্প তাঁর লেখালেখির প্রিয়তম মাধ্যম হলেও চিত্রকলা, নাটক, চলচ্চিত্র বিষয়েও তিনি লিখে থাকেন। অনুবাদে সিদ্ধহস্ত। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘কয়েকটি বিহ্বল গল্প’ মাওলা ব্রাদার্স আয়োজিত কথাসাহিত্যের পাণ্ডুলিপি প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ পাণ্ডুলিপি  হিসেবে পুরস্কৃত হয়ে প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে। তাঁর গৃহীত ও ভাষান্তরিত সাক্ষাৎকার সংকলন ‘কথা পরম্পরা’ সুধীমহলে প্রশংসিত। পেশাগতভাবে চিকিৎসক এই লেখক গবেষণা ও অধ্যাপনায় যুক্ত আছেন যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর একাধিক গল্পগ্রন্থ ছাড়াও কর্নেল তাহেরের জীবনভিত্তিক উপন্যাস ‘ক্রাচের কর্নেল’ ও কবি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লিখিত ‘একজন কমলালেবু’ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। এই লেখকের লেখালেখি এবং বিভিন্ন প্রসঙ্গ তুলে ধরা হলো।

সাহিত্যেঘোর

কৈশোরেই সাহিত্যের একটা ঘোর লেগেছিল শাহাদুজ্জামানের। বাবা-মা দুজনেই সাহিত্যানুরাগী ছিলেন। পারিবারিক লাইব্রেরি ছিল তাঁদের। নানা রকম বইপত্রের ভেতর বড় হয়েছেন। সেই ছেলেবেলাতেই দেখেছেন, সাহিত্যের ভেতর দিয়ে জীবনের দিকে তাকালে জীবনটা রহস্যময়, মায়াবী হয়ে ওঠে। সাহিত্য তাঁকে জীবনের ব্যাপারে আরও কৌতূহলী করেছে। লেখালেখি করবেন এমন কোনো ভাবনা কখনো ছিল না। আধা সামরিক বিদ্যালয় ক্যাডেট কলেজে পড়েছেন, পরবর্তী সময়ে ডাক্তারি পড়েছেন, ডাক্তার হিসেবে গ্রামগঞ্জে ঘুরেছেন, বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে গিয়েছেন, কিন্তু সাহিত্যের ঘোর তাঁকে ছাড়েনি। বাস্তবতা আর কল্পনার ভেতর ছোটাছুটি করেচছেন। কপালকুণ্ডলার সেই প্রশ্ন, ‘পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছ?’ কানে বেজেছে তাঁর। পথ হারিয়েছেন অনেকবার, সাহিত্য তাঁকে পথ দেখিয়েছে। জীবন যাপন করতে গিয়ে যেসব প্রশ্ন, কৌতূহল ও দ্বিধার ভেতর দিয়ে গিয়েছেন, সেগুলো মোকাবিলা করতেই একসময় শুরু করেছেন লেখালেখি। লেখালেখির ভেতর দিয়ে দ্বিতীয় জীবন তৈরি করে বাস্তবতা আর কল্পনার ভেতর একটা সেতুবন্ধ তৈরির চেষ্টা করেছেন। তিন দশক ধরে নানা বিষয়ে অবিরাম লিখে তিনি  নিজে যে জীবনটা যাপন করছেন, তাকেই আবার বুঝে ওঠার চেষ্টা করছেন। পরে খানিকটা বিস্ময়ের সঙ্গেই একসময় আবিষ্কার করেছিলেন, তাঁর এই ব্যক্তিগত অভিযাত্রায় সঙ্গী হয়েছেন অনেক পাঠক-পাঠিকা। তাঁরা আগ্রহের সঙ্গে পড়ছেন তাঁর লেখা এবং সেই লেখাকে পাঠক-পাঠিকাদের জীবনের জন্য প্রয়োজনীয়ও মনে করছেন। 

যেভাবে গল্প-উপন্যাসে আসা

আশির দশকের মাঝামাঝি ছাত্রাবস্থায় একাধারে রাজনীতি ও সংস্কৃতির নানা কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন শাহাদুজ্জামান। সে সময় রাজনীতি ও শিল্প-সাহিত্যের আন্তসম্পর্কটি বোঝার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে ওঠেন। বিষয়টা নিয়ে বিভিন্ন ইংরেজি প্রবন্ধ পড়ছিলেন তখন। লেখাগুলো নিংড়ে পড়তে এবং অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়ার ভাবনা থেকে প্রথমে অনুবাদ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে নিজেই মূলত শিল্প-সিহত্য ও রাজনীতিবিষয়ক নানা প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। একপর্যায়ে এসে অনুভব করলেন, নিত্যদিনের সুখ-দুঃখ আর প্রেম-সংশয়ের যে অভিজ্ঞতাগুলো হচ্ছে, সেগুলো অন্যের লেখা অনুবাদ করে কিংবা প্রবন্ধ লিখে আর ধরা যাচ্ছে না। এই ভাবনা থেকেই তাঁর গল্প-উপন্যাস লেখার শুরু।

দর্শন

আশির দশকে শাহাদুজ্জামান যখন লেখালেখি শুরু করেছেন, তখন পৃথিবী পুঁজিবাদী আর সমাজতান্ত্রিক—এ দুই শিবিরে বিভক্ত। সে সময় তৃতীয় বিশ্বের একজন বিবেচক তরুণের জন্য একটা বৈষম্যহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন দেখা ছিল স্বাভাবিক প্রবণতা। শাহাদুজ্জামানও সে সময় মার্ক্সীয় দর্শন দিয়ে আকৃষ্ট হয়েছেন। তাঁর প্রথম দিককার লেখাপত্রে এর প্রভাব আছে। পরবর্তী সময়ে বিশ্বপরিস্থিতি বদলেছে, সমাজতান্ত্রিক সমাজ নানা ভাঙচুরের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছেন। শাহাদুজ্জামান মনে করেন, ‘স্থানিক অভিজ্ঞতাগুলোকে আরও নিবিড়ভাবে বোঝার দরকার এখন। বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শ অনুসরণ করা লেখকের জন্য জরুরি না, তবে লেখকের অবশ্যই একটা রাজনৈতিক বিশ্ববীক্ষা থাকা দরকার।’

লেখালেখির কৌশল

শাহাদুজ্জামানের কোনো রকম লেখা লিখিত হওয়ার পর, ছাপতে দেওয়ার আগে কাছের মানুষদের পড়ান এবং তাদের মতামত জেনে নেন। শাহাদুজ্জামান এই প্রসঙ্গে বলেন- ‘আসলে লেখক হিসেবে আমি তো আমার লেখার ভেতর ডুবে থাকি, ফলে লেখার সাথে আমার একটা গভীর আবেগগত সম্পর্ক থাকে। এই আচ্ছন্নতার যেমন শক্তি আছে, সীমাবদ্ধতাও আছে। একজন নিরপেক্ষ পাঠক যার সাথে এই লেখাটার কোনো পুর্ব আবেগগত সম্পর্ক নাই, তিনি যদি লেখাটা পড়েন তখন তার যে প্রতিক্রিয়া হয় তা লেখক হিসেবে আমার জন্য খুব কাজের। বিদেশের বড় প্রকাশনা সংস্থার সবসময় এডিটর থাকেন। এডিটররা একটা পাণ্ডুলিপি নির্মোহভাবে দেখেন। তারা লেখার টেকনিক্যাল ব্যাপার যেমন দেখেন তেমন এর ভাবনা, বিষয় নিয়েও মতামত দেন। তারা নেহাত প্রুফ রিডার নন। তারা সাহিত্যবোদ্ধা। লেখায় বানান, ভাষা, তথ্যের ধারাবাহিকতা বিষয়ে তারা মতামত যেমন দেন, তেমনি বইয়ের কোনো চরিত্র, ভাবনা, প্রেক্ষাপট নিয়েও তারা লেখকের সাথে বিতর্ক করেন। এডিটর একজন লেখকের ক্রিটিক্যাল ফ্রেন্ড। আমাদের দেশে প্রকাশনার জগতে এডিটর ধারণাটা এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠেনি।’

শাহাদুজ্জামানের সকল বই

আরও পড়ুন একজন মোস্তফা কামাল ও তার আড়াই দশকের লেখালেখি !

Write a Comment

Related Stories