কেন তার নাম ‘তারাশঙ্কর’ !!! জানেন কি

44

237

কেন তার নাম ‘তারাশঙ্কর’ !!! জানেন কি

  • 0
  • #লেখক কুঞ্জ
  • Author: rokomari
  • Share

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সাত বছর বয়সেই যার কবিতার শুরু…
‘আমার জীবনের প্রথম রচিত কবিতা খড়ি দিয়ে লিখেছিলাম আমাদের বৈঠকখানা বাড়ির একটি খড়খড়িওয়ালা দরোজার গায়ে। তখন বয়স আমার সাত বছর। আটে পড়েছি। আমার দরজায় লেখা কবিতাটি কিন্তু ব্যঙ্গ কবিতা নয়। যাকে বলে জাত কবিতা, তাই দস্তুর মতো করুণরস অবলম্বন করে লেখা। তিন বন্ধুতে খেলা করছিলাম, হঠাৎ আমাদের বৈঠকখানার সামনের বাগানে একটা গাছের ডালে পাখির বাসা থেকে একটি পাখির বাচ্চা মাটিতে পড়ে গেল। তিন বন্ধুতে ছুটে গিয়ে তাকে সযত্নে তুলে এনে বাঁচাবার এমনই মারাত্মক চেষ্টা করলাম যে, বাচ্চাটি বারকয়েক খাবি খেয়েই মরে গেল। বালক মনে একটি করুণরসের ধারা সঞ্চারিত করে গেল। আমার সঙ্গীদের মধ্যে একজন ছিল পাঁচু। সে একটা খড়ি দিয়ে আমাদের দরজায় খণ্ড খণ্ড করে দুই লাইন কবিতা রচনা করে ফেলল। আমিও পাঁচুর খড়িটি নিয়ে পাঁচুর কবিতা নিয়ে লিখলাম—

‘পাখির ছানা মরে গিয়েছে

মা ডেকে ফিরে গিয়েছে

মাটির তলা দিলাম সমাধি

আমরাও সবই মিলিয়া কাঁদি।’

(বই- আমার সাহিত্য জীবন)

এভাবেও কবি হওয়া যায়? সাহিত্যের মানচিত্রে এমন করেও আচড় কেটে দেওয়া যায়? হ্যাঁ, যায়। সাহিত্য মানেই বিশাল এক আকাশ। যে আকাশে আছে চাঁদ, ঝকঝকে তাঁরা আর তার পেছনে নিকষ অন্ধকার। সাহিত্যের পথে অনেকেই চলা শুরু করলেও তাদের বেশিরভাগই পেছনের ঐ নিকষ অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু আমাদের আজকের যে হুমায়ূন কিংবা সুনীল, এটাই কিন্তু বাংলা সাহিত্যের সবটুকু নয়। এর পেছনে আছে বিশাল এক অতীত। আর এই অতীতকে একটু একটু করে যত্ন নিয়ে বুনেছেন সাহিত্যের কিছু মহারথী। এমনি একজন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। উপরের কবিতা লেখার গল্পটা তারই। এই গল্পটা অবশ্য এই দরজাতেই আটকে থাকেনি। এরপর তার দালপালা মেলেছিল, আরো অনেকদূর!

ছোটবেলা থেকেই মাদুলী আর তাবিজের সাথে বেড়ে উঠেছিলেন তারাশঙ্কর। এর পেছনে অবশ্য যথেষ্ট কারণ ছিল। লেখকের জন্মের আগেই তার বড়ভাই মৃত্যুবরণ করেন। বাবা-মা চাননি বড় ছেলের মতো ছোট ছেলে ভবিষ্যতেও কোন দাগ পড়ুক। তাই, তারা মায়ের জন্য বেশ জমাট এক পূজোর আয়োজন করেন তারা। সেই পূজোর ঠিক দশমাস পরেই জন্ম নেন তারাশঙ্কর। ফলে তারা মায়ের প্রতি সম্মান রেখে তার নামকরণ করা হয়।

অবশ্য, তারাশঙ্করের পুরো পরিবারই ছিলেন অনেক বেশি ধার্মিক। বীরভূম জেলার এক জমিদার বাড়িতে ১৮৯৮ সালের ২৪শে জুলাই জন্ম নেন লেখক। বাবা হরিদাস বন্দোপাধ্যায় ও মা প্রভাবতী দেবী বুকে আগলে রেখেছিলেন তাদের ছেলেকে। বাঙালি এই পরিবারে শাস্ত্রজ্ঞান, মহাভারত, রামায়ণ ইত্যাদির চর্চা ছিল বেশি। তবে তারাশঙ্কর ছটবেলা থেকেই বঙ্কিম আর অন্যান্য লেখকদের সাহিত্য পড়ে বড় হয়ে উঠেছিলেন। লেখার প্রতি তাই তার ঝোঁকটাও ছিল একেবারে অন্যরকম।

সেন্ট জেভিয়ার্সে পড়া শুরু করেছিলেন লেখক। তবে মহাত্মা গান্ধীর ‘অসহযোগ আন্দোলন’টাও ঠিক সেই সময়েই শুরু হয়েছিল। পড়াশোনার পাট শেষ না করেই সেই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন তারাশঙ্কর। বছরখানিক কারাবাসও করতে হয়েছিল তাকে। শেষমেশ পড়াশোনা সেখানেই থেমে গিয়েছিল তার।

লেখক স্বত্ত্বা তো আরো আগে থেকেই ছিল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এর ভেতরে। ১৯৩২ সালে রবীন্দ্রনাথের সাথে পরিচয়ের পর সেটারই সাথে দুটো পাখাও জুড়ে গিয়েছিল যেন। এরপর আর থেমে থাকেননি তিনি। শরৎচন্দ্র আর বঙ্কিমের সময় তখন পেরিয়ে গিয়েছে। পরবর্তী যোগ্য উত্তরসূরী হয়ে সেই সময়কেই আরো সামুনে নিয়ে গিয়েছেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। তখনকার বেশ নামকরা পত্রিকা ছিল কল্লোল। এই পত্রিকায় প্রথম নিজের ছোটগল্প ‘রসকলি’ প্রকাশ করেন লেখক। রাজনীতিতেও বেশ ভালোভাবেই জড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি। প্রথমে ইউনিয়ন বোর্ড প্রেসিডেন্ট, পরে আট বছর দরে বিধান সভার সদস্য হয়ে কাজ করেন তিনি। তবে লেখার নেশা ছোটেনি কখনোই।

কৃষকদের কষ্ট, গ্রামের গল্প, শহরের কাহিনী, সমাজতন্ত্র আর পুঁজিবাদ- সবকিছু দেখেছেন লেখক। আর তাই তার লেখায় যেমন আছে শহুরে ছোঁয়া, তেমনই আছে গ্রামের কথাও। নিশিপদ্ম, বিচারক, ফরিয়াদ, কালিন্দী, গণদেবতা, আরোগ্য নিকেতন, রাধারানী, সপ্তপদী, হাঁসুলি বাঁকের উপকথা, কবি, ধাত্রীদেবতা, চাঁপাডাঙার বৌ, নীলকণ্ঠ, জলসাঘর, বেদেনী, হারানো সুর, অভিযান, ডাকহরকরা, পঞ্চপুত্তলী, উত্তরায়ণ, মহানগরী, হীরাপান্না, গুরুদক্ষিণা; রবীন্দ্রনাথ ও বাংলার পল্লী, পথের ডাক, কালান্তর; নাটক দ্বীপান্তর, পথের ডাক, দুই পুরুষ ইত্যাদি বইয়ের মাধ্যমে নিজের চিন্তাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন লেখক। আর সেই লেখনী হয়ে উঠেছে চলচ্চিত্রও। জলসাঘর ও অভিযান (১৯৬২), অগ্রদানী, আগুন, আরোগ্য নিকেতন, উত্তরায়ণ, কবি, কান্না, কালিন্দী, গণদেবতা, চাঁপাডাঙার বউ, জয়া, ডাকহরকরা, দুই পুরুষ, ধাত্রীদেবতা, ফরিয়াদ, বিচারক, বিপাশা, মঞ্জরী অপেরা, রাইকমল, শুকসারী, সন্দীপন পাঠশালা, সপ্তপদী, হার মানা হার, হাঁসুলি বাঁকের উপকথা, বেদেনী- এমন আরও চলচ্চিত্রে রয়েছে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এর বলা গল্পগুলো।

১৯৭১ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন এই গুণী লেখক। ‘রবীন্দ্র পুরষ্কার, ‘পদ্মভূষণ’, ‘পদ্মশ্রী’, ‘জ্ঞানপীঠ’সহ প্রচুর পুরষ্কার পেয়েছেন এই লেখক। তবে সবচাইতে বড় পুরষ্কার, মানুষের ভালোবাসা, আজও পেয়ে চলেছেন তিনি।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যাইয়ের জনপ্রিয় সকল বই রকমারি থেকে সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

আরও পড়ুন “শুভ্র” হুমায়ূন আহমেদ এর সবচেয়ে কম আলোচিত একটি চরিত্র । 

Write a Comment