ডায়েট বিষয়ক ৮ টি টিপস, সুস্থ থাকুন ব্যস্ত জীবনে !

ডায়েট টিপস

স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল-এই প্রবাদ বাক্যের সাথে আমরা সকলেই পরিচিত। এই ডিজিটাল শতাব্দীতে এসে আমাদের জীবন গতি পেয়েছে অনেক কিন্তু প্রবল গতিতে ছুটতে ছুটতে আমরা হারিয়ে ফেলছি সুস্থ্য থাকার প্রেরণা। অতিরিক্ত কাজের চাপে আমরা অনেকেই সঠিক রুটিনে খাওয়া-দাওয়া করতে পারি না। আমাদের খাদ্যতালিকার একটা বড় অংশ দখল করে বসে আছে নানা ধরনের অস্বাস্থ্যকর খাবার। ব্যায়াম এবং শারীরিক পরিশ্রমের ব্যাপারে আমাদের অনেকেরই প্রবল অনীহা কাজ করে। ফলশ্রুতিতে সারাবিশ্বব্যাপী বেড়ে চলছে হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির হার। অথচ আমরা একটু সচেতন হলেই স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির হাত থেকে নিজেদের অনেকাংশেই মুক্ত রাখতে পারি। বিজি লাইফে সহজে পালনযোগ্য ইজি কিছু ফিটনেস টিপস নিয়ে আমাদের এই ধারাবাহিক আয়োজন। প্রথম পর্ব ডায়েট বিষয়ক কিছু টিপস নিয়ে।

১.  ডায়েট মানেই খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে বসে থাকা নয়

ডায়েটের ব্যাপারে এটা বহুল প্রচলিত একটা ভুল ধারনা। ওজন/মেদ-ভুড়ি বেড়ে না গেলে আমরা সাধারণত ডায়েট নিয়ে খুব একটা চিন্তা করি না। ওজন বেড়ে গেলে মাথায় ভর করে ডায়েটের চিন্তা! আমরা চিন্তা করি খাওয়া-দাওয়া একদম বন্ধ করে বসে থাকলেই আমাদের ওজন রাতারাতি কমে যাবে, ২-১ মাসের মধ্যেই আমরা হয়ে যাবো হলিউড/বলিউডের বিখ্যাত কোনো নায়ক/নায়িকার মতো মেদহীন সুঠাম দেহের অধিকারী। কিন্তু খাদ্যগ্রহণের সময়, খাদ্য উপাদান, ক্যালরি গ্রহণ বনাম ক্যালরি খরচ ইত্যাদি অনেক বিষয়ে সঠিক ধারনা না থাকায় আমাদের “ডায়েট প্ল্যান” ঠিকমতো কাজ করে না। সুস্থ থাকার জন্য ডায়েট করতে গিয়ে আমরা হয়ে যাই অসুস্থ! ডায়েট মানেই শুধু খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে বসে থাকা না, ডায়েট শুধু অতিরিক্ত ওজনধারীদের জন্যও না। বরং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য সঠিক নিয়মে সঠিক খাদ্য সঠিক পরিমানে গ্রহন করাই ডায়েট।

মেদ নিয়ে চিন্তিত?? জানুন কিভাবে মেদ কমাবেন

২.  ডায়েট প্ল্যান তৈরি করা

আমরা চাইলেই প্রতিদিন আমাদের কত ক্যালরি খরচ হয় তার একটা তালিকা তৈরি করে ফেলতে পারি। ক্যালরি ক্যালকুলেটর এখন অনলাইনেই পাওয়া যায়। উচ্চতা, ওজন এবং শারীরিক পরিশ্রমের বিবরণ ইনপুট দিলেই আপনার প্রতিদিনের ক্যালরি খরচ সহজেই জানতে পারবেন। এটার সাথে সামাঞ্জস্য রেখে প্রতিদিনের ক্যালরি এবং পুষ্টিগুনের বিচারে কোন বেলা কি খাদ্য গ্রহন করতে হবে তার একটা তালিকা তৈরি করে ফেলা যায়। ডায়েট প্ল্যান করলে খাবারের পুষ্টিগুন এবং ক্যালরি গ্রহন সহজেই হিসাবে রাখা যায়। এটা নিয়ে বাড়তি টেনশন থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব হয়।

৩.  সঠিক সময়ে খাদ্যগ্রহন

খাদ্যগ্রহণের সময় ও পরিমান সম্পর্কে একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে-“সকালে খাও রাজার মতো, দুপুরে খাও রাজপুত্রের মতো আর রাতে খাও ভিখারির মতো!” খুবই ভালো উপদেশ! কিন্তু বেশিরভাগ মানুষের খাওয়া-দাওয়ার অভ্যাস এর ঠিক উল্টো। সকালে অফিসের জন্য তাড়াহুড়া করতে গিয়ে আমরা অনেকেই ঠিকমতো নাস্তা না করেই বের হয়ে যাই। দিনের শুরুতে শরীরের এনার্জির জন্য সকালের নাস্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দিনের অনেকটা সময় আমরা এনার্জি সংকটে ভুগে থাকি। দুপুরের খাবার দাবার অনেকেই যত্ন নিয়ে পর্যাপ্ত পরিমানে খেলেও আমরা সবচেয়ে বেশি পরিমানে খাদ্যগ্রহন করে থাকি রাতে। আর খাওয়া শেষ করেই নাক ডেকে ঘুম! ফলে রাতের খাবারে যেই ক্যালরিটুকু আমরা গ্রহণ করি তা আর খরচ করা হয়ে উঠে না। ফলাফল-বাড়তি মেদ, অতিরিক্ত ওজন ইত্যাদি। আসুন “রাজকীয় ব্রেকফাস্টের” অভ্যাস তৈরি করি, রাতে ৮টার ভিতর হালকা করে ডিনার শেষ করে ফেলি, সুস্থ থাকি। এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে পড়তে পারেন ডঃ মোহাম্মদ কবীরউল্যাহ ের এই বইটি

৪.  শর্করা এবং অন্যান্য খাদ্য উপাদানের অনুপাত

আমাদের খাওয়া-দাওয়ার একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে শর্করা জাতীয় খাবার বিশেষ করে ভাত। কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাকে বলা হয় শরীরের জ্বালানী। কিন্তু আমরা যেই পরিমানে শর্করা গ্রহণ করি সেই অনুপাতে শারীরিক পরিশ্রম করি না। ফলশ্রুতিতে অতিরিক্ত শর্করা শরীরে ফ্যাট হিসেবে জমা হতে থাকে, যা মোটা হওয়ার অন্যতম প্রধান কারন। অনেকেই মনে করে থাকেন ফ্যাট জাতীয় খাবার বাদ দিলে শরীরে আর ফ্যাট জমা হবে না। কিন্তু শরীরে মেদ জমার প্রধান কারন হলো শরীরের প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট গ্রহন। অতিরিক্ত শর্করা গ্রহন টাইপ-২ ডায়বেটিসের ঝুঁকি অনেকাংশে বৃদ্ধি করে থাকে। শর্করা জাতীয় খাবার নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে আমরা স্বাস্থ্যগত অবস্থার বেশ উন্নতি করতে পারি। এর একটা সহজ উপায় হলো প্লেটে অনুপাত মতো খাদ্য নেওয়া। খাবারের প্লেটে ভাত নেওয়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে ভাত যাতে অর্ধেক প্লেটের বেশি না হয়। বাকি অর্ধেক প্লেট আমিষ এবং অন্যান্য তরকারি দিয়ে পূর্ণ করতে হবে। সকালের নাস্তা এবং দুপুরের খাবারের চেয়ে রাতের খাবারে অবশ্যই কম পরিমানে শর্করা গ্রহণ করতে হবে।

খাদ্যের পুষ্টিগুণ ও খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে জানুন

৫.  মিষ্টি এবং চিনি

আমাদের অনেকেরই মিষ্টি জাতীয় খাবারের প্রতি বাড়তি আকর্ষণ আছে। চিনি শরীরে প্রবেশ করার পর তা হজম করার জন্য ইনসুলিন নির্গত হয়। রক্তে যতক্ষন ইনসুলিনের মাত্রা বেশি থাকে ততক্ষন শরীর জমে থাকা মেদ ভাঙ্গে না। এছাড়াও দীর্ঘদিন অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাদ্য গ্রহনের ফলে শরীরে ইনসুলিন সঠিকভাবে কাজ করে না। এটা ডায়বেটিসের অন্যতম প্রধান কারন। অতিরিক্ত শর্করা জাতীয় খাবারও শরীরে একইভাবে কাজ করে কারন শর্করা হজম হয়ে তা শরীরের ব্যবহারের জন্য চিনিতে রুপান্তরিত হয়। তাই মিষ্টি জাতীয় জিনিস পরিমিত মাত্রায় খেতে হবে। চা-কফির সাথে অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করলে এই ব্যাপারে ভালো ফল পাওয়া যাবে।

৬.  ফাস্টফুড

ব্যস্ততার কারণে আমাদের অনেক সময়ই বাইরে খাওয়া-দাওয়া করতে হয় আর বাইরে খাওয়া বলতে অনেকেই বুঝে থাকেন ফাস্টফুড খাওয়াকে। ফাস্টফুড আইটেমগুলো বিভিন্ন দিক দিয়েই শরীরের অনেক ক্ষতি করে থাকে। বেশিরভাগ ফাস্টফুডই অনেক বেশি চিনি এবং সোডিয়াম থাকে। এগুলোতে পুষ্টিগুণ বলতে কিছু না থাকলেও ক্যালরির দিক দিয়ে অনেক উচ্চ। ফলে নিয়মিত ফাস্টফুড গ্রহণে উচ্চরক্তচাপ, কোলেস্টেরল বৃদ্ধি, মোটা হয়ে যাওয়া, ডায়বেটিসসহ আরও অনেক ধরনের স্বাস্থ্যগত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। বাইরে যদি খাওয়াই লাগে তাহলে বেশি তেলে ভাজা অথবা অতিরিক্ত চিনি জাতীয় জিনিস না খাওয়াই উত্তম। আর নাস্তা হিসেবে ফাস্টফুডের বদলে ফল/সবজি খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করা গেলে তা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হবে।

৭.  কোমল পানীয়

কোল্ড ড্রিংক্স আমাদের অনেকেরই খুব প্রিয়। সারাদিনে কয়েক লিটার কোল্ড ড্রিংক্স পান করেন এমন লোকেরও অভাব নেই। আমাদের সবার প্রিয় কোমল পানীয় বিভিন্নভাবে আমাদের স্বাস্থ্যের গুরুতর ক্ষতি করছে। কোল্ড ড্রিংক্সে থাকা অতিরিক্ত চিনি এবং সোডিয়াম বিভিন্নভাবে আমাদের শরীরের ক্ষতি করে। কিডনি, হাড়ের ক্ষতি, হৃদরোগ, ডায়বেটিসসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যগত ক্ষতির কারণ এই কোমল পানীয়। কোমল পানীয় গ্রহণ করা একদমই বাদ দিতে না পারলে এর পরিমান কমিয়ে দেওয়া উচিত। কোমল পানীয়ের বদলে পানি পান করার অভ্যাস তৈরি করতে হবে।

খাবার নিয়ে ভাবছেন ?? জানুন খাবার যখন খেতে বারণ

৮.  বেশি করে পানি পান করা

পানির অপর নাম জীবন। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন অন্তত ২.৫-৩ লিটার পানি পান করা উচিত। পর্যাপ্ত পানি পান অনেকভাবেই শরীরের জন্য উপকারী। পর্যাপ্ত পানি পান করলে কিডনী, পরিপাকতন্ত্রসহ শরীরের ভিতরের অঙ্গ সতেজ থাকে। শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের হওয়া, হজমে সহায়তা করা, ওজন কমাতে সাহায্য করা সহ আরও অনেক উপকারী দিক আছে। পানি পান শুরু হোক ভোরবেলা থেকেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে দুই গ্লাস পানি করা উচিত। এছাড়া সারাদিন ঠিকভাবে পানি পান করা হচ্ছে কিনা তা খেয়াল রাখা উচিত।

ব্যস্ততা জীবনের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু তা অবশ্যই স্বাস্থ্যকে বাদ দিয়ে নয়। ব্যস্ত জীবনে নিজেদের স্বাস্থ্যের প্রতি একটু যত্নবান হলেই আমরা বেঁচে থাকতে পারি সুস্থ ও সুন্দরভাবে।  সাথে করতে পারেন ইয়োগা, সেটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে আরেকদিন, তবে তার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত ইয়োগা সম্পর্কে জানতে পারেন এখানে

আরও পড়ুনঃ 

যে ৭ টি পরামর্শ আপনাকে সুস্থ্য রাখবে প্রতিদিন

অধিক সময় বই পড়ার ৭ টি কার্যকর অভ্যাস !!

 

rokomari

rokomari

Published 29 Jan 2018
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png