আমি কেন লিখি- আসিফ মেহ্‌দী

0
1024

যখন চারদিক সুনসান হয়ে যায়, রাতের আঁধার ঘনীভূত হয়, তেমনি এক ক্ষণে জানালার কানাগলি দিয়ে দূর আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে খুঁজে ফিরি লেখালেখির প্রতি আমার স্পর্ধিত ভালোবাসার কারণ! ফেলে আসা জীবনের কথা ভাবি। বন্ধুরা যখন টিফিন পিরিয়ডে খেলাধুলা করেছে, ক্লাসরুমে বসে আমি লিখেছি। চাকরিজীবনে অফিস শেষে কলিগরা যখন বাসায় চলে গেছেন, কোনো মিটিং রুমে একাকী বসে আমি লিখেছি। বাসার সবাই যখন কোনো উৎসবের হইহুল্লোড়ে মেতেছে, আমি আমার পড়ার রুমটিতে ঘাপটি মেরে লিখেছি। যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে যাত্রীরা যখন ত্যক্ত-বিরক্ত, তখনও আমি বাসের এক কোণায় ঠায় দাঁড়িয়ে মনের আনন্দে লেখার আইডিয়া নিয়ে ভেবেছি। লেখার আইডিয়া নিয়ে সাধনা ও আরাধনা করতে গিয়ে এক সময় ঠাণ্ডা-গরম-ক্ষুধা-পিপাসা অনুভবের ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছি।

মন ও মগজের লক্ষ-কোটি চিন্তা ও ভাবনার রঙিন প্রজাপতিগুলোর মধ্য থেকে সবচেয়ে মুগ্ধতা সৃষ্টিকারীগুলোকে ধরতে চেয়েছি। মাথাকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা হাজারো ভ্যারিয়েবলস থেকে সেরাগুলো সেঁচে তুলে আনতে চেয়েছি, লেখার জালে আটকাব বলে। প্রিয়জনদের সঙ্গে যখন আড্ডা দিয়েছি, সেখানেও লেখার উপকরণ খুঁজেছি! যখন ঘুরতে বেরিয়েছি, লেখার উপাদান কুড়িয়েছি। একটিই আশা- যদি লেখাতে আরও এক চিমটি আনন্দ ভরে দেওয়া যায়, আরও এক মুঠো মজা জুড়ে দেওয়া যায়! অফিসে কেউ পৌঁছানোর আগেই আমি পৌঁছে গেছি শুধু কল্পনা ও বাস্তবে পাওয়া কয়েকটি লাইন লিখব বলে; আবার ফেরার সময় সবার শেষে ফিরেছি তেমন আরও ক’টা লাইন লিখব বলে। এ কর্মযজ্ঞ চলেছে ছুটির দিনেও; এমনকি যখন মধ্যরাত, তখনও। লেখালেখিতে সম্মোহিত রাখার জন্য ডিএনএ-র কোনো জিন দায়ী কিনা, তা আমার জানা নেই।

লেখালেখির মাধ্যমে দৃশ্যমান জাগতিক প্রাপ্তি আমার নেই। টাকা, সম্পদ, সার্টিফিকেট, পদক, পুরস্কার, প্রতিবেদন কিছুই জোটেনি কপালে। তবুও আমি বছরের পর বছর, মাসের পর মাস, দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লিখে চলেছি। কারণ, এর পেছনে রয়েছে অদৃশ্য অথচ সুখ অনুভব করার মতো কিছু প্রাপ্তি! আমার লেখা সায়েন্স ফিকশন পড়ে যখন কোনো শিশু গোটা গোটা অক্ষরে চিঠি লিখে আমাকে তার ভালো লাগার কথা উচ্ছ্বাসের সঙ্গে জানিয়েছে, তখন সুখানুভূতিতে আমার চোখে পানি চলে এসেছে! যখন কোনো তরুণ বলেছে যে আমার লেখা কোনো বাক্য তার জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে সাহায্য করেছে, তখন অনুভব করেছি অপরিমেয় শান্তি! জীবনবোধ শাণিত করতে আমার একটি বই একজন সাতবার পড়েছেন জেনে আমি স্রষ্টার দিকে কৃতজ্ঞদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেছি।

এসব অনুপ্রেরণা পৃথিবীর যেকোনো প্রণোদনা প্যাকেজের চেয়ে শক্তিশালী। হয়তো সেই শক্তিতেই নিজের লেখা বই রোদে পুড়ে দুই হাতে বয়ে নিয়ে গেছি স্কুল বা কোচিং সেন্টারের দোরগোড়ায়; যদি আরও দুজন ছাত্র আমার বইটা পড়ে-এই আশাতে! এসবে টাকার লাভ হয়নি; বরং প্রাপ্তি হিসেবে বইয়ের ভার বইবার কারণে প্রবল মাজাব্যথা নিয়ে বিছানায় পড়ে থেকেছি। দীর্ঘদিন অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণে যুক্ত হয়েছে প্রেশারের যন্ত্রণা। কারণ, সবসময় ভেবেছি, না ঘুমিয়ে আরও কিছুক্ষণ বেশি লেখালেখি করি! ভোগের বদলে ভুগেছি বলা চলে; তবে অবশ্যই শারীরিকভাবে; মানসিক ও আত্মিকভাবে নয়। অনেক ক্ষেত্রে ত্যাগও করেছি ঢের- লেখালেখির কারণে মানুষের সেবা ঠিকমতো করতে পারব না বলে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়েও ডাক্তারি পড়িনি; লেখাতে ব্যাঘাত ঘটবে বলে আইবিএ-র এমবিএ-তে চান্স পেয়েও পড়িনি; লেখার সময় ঠিকমতো পাচ্ছিলাম না বলে লাখ টাকার কর্পোরেট জব ছেড়েছি; লেখাতে সময় দিতে পারব না বলে একসময় সার্টিফিকেটিয় জ্ঞানার্জনকেও বর্জন করেছি।

রকমারি ডট কম এ থাকা আসিফ মেহদীর সবগুলো বই দেখতে ক্লিক করুন

এত ভুগেও, এত ত্যাগের পরও কেন আমি লিখে চলেছি, একসময় তার কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছি। উত্তরও পেয়েছি। লেখালেখি করে আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো- মানুষের হাসিমুখ! সঙ্গে নিজের মনের শান্তি ও আত্মিক তৃপ্তি তো আছেই। মানুষকে সুখী দেখলে, মানুষের হাস্যোজ্জ্বল মুখ দেখলে আমার ভালো লাগে। আর আমার লেখার কারণে যদি কোনো মুখে হাসি ফুটে ওঠে, কোনো হৃদয় সুখ অনুভব করে; তখন মনে হয়, অন্তত কিছু মানুষের আনন্দঘন মুহূর্তের কারণ হতে পেরেছি আমি; পৃথিবীর বুকে ক্ষুদ্র হলেও অবদান রাখতে পেরেছি। মানুষের বেদনা ও বিব্রত অবস্থা আমি সহ্য করতে পারি না; কষ্টে চোখে পানি চলে আসে। তাই প্রাণপণে চেষ্টা করি এমন কিছু লিখতে, যা মানুষকে দুঃখের সময়ও মানসিক শক্তি দেবে; সেই ক্ষণেও তাদের মুখে হাসির আভা এনে দেবে। আবার, এসব আনন্দময় চতুর্পাশই পরবর্তী লেখার জন্য আমার উপযুক্ত মানসিক অবস্থা সৃষ্টি করে। লেখালেখির জন্য যে সতেজ মনটি দরকার, তা আমি অর্জন করি পাঠকবন্ধুদের আনন্দময়তা থেকেই। কথাগুলো এক লাইনে ব্যক্ত করার জন্য আমি আব্রাহাম লিংকনের বলা গণতন্ত্রের সংজ্ঞার ফরম্যাটটির সাহায্য নিতে চাই। বলতে চাই, ‘I write of the happiness, by the happiness, for the happiness.’

LEAVE A REPLY