আমি কেন লিখি – মোস্তফা কামাল

0
996

লেখালেখিই তো আমার ধ্যান-জ্ঞান, আমার আরাধনা, আমার সাধনা। আমার সমস্ত ভাবনা- সত্ত্বাজুড়ে লেখালেখি। সেই ছোটবেলা থেকে লেখালেখির কথাই ভেবেছি। আমার প্রথম প্রেম আমার লেখা। আমি বেশি ভাবি লেখা নিয়ে। সেভাবেই নিজেকে তৈরি করেছি। পড়াশুনা করেছি এবং প্রতিনিয়ত পড়ছি। সৃষ্টিশীল কাজের মধ্যেই ডুবে থাকতে পছন্দ করি। একটা গল্প, উপন্যাস কিংবা অন্য যে কোনো লেখা লিখে যে আনন্দ হয় তা আর কিছুতে পাই না। সে কারণেই তো লিখি; নিয়মিত লিখতে পারছি।

লেখালেখির ক্ষেত্রে আমি সবসময়ই নিজেকে ভাঙি আবার গড়ি। সব ধরনের বিষয় নিয়েই লিখতে পছন্দ করি। কখনো ভৌতিক, গোয়েন্দা, সায়েন্স ফিকশন লিখি। আবার কখনো প্রেম, বিরহ, হাসির বিষয়ে গল্প-উপন্যাস, নাটক লিখি। সিরিয়াস বিষয় নিয়েও কাজ করি। মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, জঙ্গিবাদ, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সামাজিক বিষয় নিয়েও গল্প উপন্যাস লিখেছি।
লেখার প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণেই হয়তো নিয়মিত লিখতে পারছি।

এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা থাকবে। আমি তা সব সময়ই প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ি। আমার জায়গায় অন্য কোনো লেখক হলে হয়তো লেখালেখিই করতেন না। ছেড়ে দিতেন। কিন্তু আমার অদম্য ইচ্ছাশক্তির কারণেই আমি এখনো লিখে যাচ্ছি, লিখতে পারছি। ভবিষ্যতেও লিখে যাবো। কোনো বাঁধার কাছে হার মানব না।
আমি কখনো নিজেকে বড় ভাবি না। আমি এখনো অতি নগন্য, অতি ক্ষুদ্র একজন লেখক। আমার কতটুকু পরিচিতি আছে তা আমি জানি না। আমার নামটা খুব কমন হওয়ায় আমাকে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। আমি বলি, নামে কী আসে যায়! হাজারো নামের মধ্য থেকে একটি নাম আলাদা করতে হলে বিশেষ কিছু করতে হবে। যা মানুষের হƒদয়ে গেথে থাকবে। আমি কিন্তু সেই কাজটিই করার চেষ্টা করছি।
লেখালেখির ক্ষেত্রে বিদেশ ভ্রমণ খুবই কাজে লাগে। ভ্রমণে গেলে যে অভিজ্ঞতা হয় তা বই পড়েও সম্ভব নয়। দেশ-বিদেশে ঘুরলে দৃষ্টিভঙ্গিই পাল্টে যায়। এই অভিজ্ঞতা লেখালেখির ক্ষেত্রে খুব কাজে আসে। লেখকের পড়াশুনা ও অভিজ্ঞতা যত বেশি থাকবে তাঁর লেখা ততবেশি বৈচিত্র্য থাকবে। লেখায় নতুন মাত্রা পাবে।
এখনো স্বপ্ন দেখি। লেখালেখি করে যেদিন জীবিকা নির্বাহ করতে পারব সেদিন অবশ্যই সবকিছু ছেড়ে ফুলটাইম লেখালেখাই করব। অন্য কিছু না। আমাদের দেশে লেখালেখি করে জীবিকা নির্বাহ করা এখনো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। হয়তো কখনো সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।

আমার কয়েকটা উপন্যাস আছে। যা পড়লে পাঠকরা বুঝতে পারবেন, আমি লেখালেখির জন্য কতটা কষ্ট করি। কতবেশি পড়াশুনা করি। অগ্নিকন্যা, জনক জননীর গল্প, জননী, হ্যালো কর্নেল, জিনাত সুন্দরী ও মন্ত্রী কাহিনী, বারুদ পোড়া সন্ধ্যা, পারমিতাকে শুধু বাঁচাতে চেয়েছি।

মোস্তফা কামালের বেস্টসেলার সব বই এখানে

অগ্নিকন্যা’ আমার ঐতিহাসিক উপন্যাস। একটা বিশেষ সময়কে ধরার চেস্টা করেছি আমি। দেশভাগ থেকে যার শুরু। সেই সময়ের নায়কদের কার কী ভূমিকা ছিল। ঘটনা ও চরিত্রগুলো সত্য। কিন্তু লিখতে হচ্ছে উপন্যাস। কাজটি খুবই কঠিন। অনেক বই পড়তে হয়। সেখান থেকে সত্যটিই খুঁজে বের করতে হয়। অজানা কাহিনী, কিন্তু ধ্রুব সত্য। তা আপনাকে বলতেই হবে। ঐতিহাসিক ঘটনা গল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার কাজটি বড় কঠিন। ভাষার দিকটিও আপনাকে লক্ষ্য রাখতে হয়। দুর্বল ভাষা হলে পাঠক ছুড়ে ফেলবে। ইতিহাসের মতো কাঠখোট্টা বিষয় পড়তে চায় না পাঠক। তাকে বইয়ের ভেতরে ঢোকাতে হলে ভাষার শক্তি থাকতে হবে। প্রেমের উপন্যাস, ভৌতিক কিংবা রহস্য উপন্যাস লেখা সহজ। কিন্তু ঐতিহাসিক বিষয়ে উপন্যাস লেখা সবচেয়ে কঠিন।
অগ্নিকন্যা সম্পর্কে এ কারণেই বললাম, এটা লেখার জন্য ১৮ বছর ধরে আমি নিজেকে প্রস্তুত করেছি। পড়াশুনা করেছি। এটা হয়তো অনেকেই করবেন না। কিন্তু কষ্ট না করলে ভালো কিছু লেখা কি সম্ভব?

রকমারি বেস্টসেলার বইগুলো সব একসাথে এইখানে দেখুন

অনেকে বলে থাকেন, টানাপড়েন কিংবা অর্থ কষ্টের মধ্যে থাকলে লেখালেখি করা যায় না। আমি বলি, অবশ্যই লেখালেখি করা সম্ভব। কেন সম্ভব নয়? কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ খুব কঠিন সংকটের মধ্যেও লিখেছেন। অনেক বড় মাপের লেখা তারা তখনই লিখেছেন। একটা কথা এ প্রসঙ্গে বলি, দেশের এবং সমাজের যত অন্যায়, অনিয়ম, দুঃখ-কষ্ট এগুলো যায় কোথায় জানেন? এগুলো লেখকের মাথায় ভর করে। তারপর সেগুলো নিয়ে লেখক ভাবেন এবং লেখেন। সেটাই তো বড় লেখা।

এক নজরে মোস্তফা কামালঃ 

দীর্ঘ প্রায় আড়াই দশক ধরে লিখে চলেছেন সাহিত্যিক-সাংবাদিক মোস্তফা কামাল। মূলত গল্প-উপন্যাস লিখলেও সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই অবাধ বিচরণ তার। সবখানেই সচ্ছন্দ তিনি। বিষয়ের বৈচিত্র্যের কারণে এরই মধ্যে তার রচিত গ্রন্থের তালিকাও বেশ দীর্ঘ। উপন্যাস থেকে কিশোর উপন্যাসশিশুতোষ বই থেকে বিজ্ঞান কল্পকাহিনিমূলক লেখাছড়া থেকে রম্য রচনা,নাটক থেকে গবেষণামূলক বই এবং সেইসঙ্গে পত্রিকার পাতায় কলাম—এভাবে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে লেখনি তার সদা খরবেগ। এরই মধ্যে গত প্রায় আড়াই দশকে এই বহুপ্রজজনপ্রিয় লেখকের রচিত গ্রন্থর সংখ্যা ৯০টি। কলকাতা থেকে সাহিত্যম প্রকাশ করেছে দুটি বই। আফগানিস্তানে যুদ্ধপরবর্তী পরিস্থিতি, নেপালে রাজতন্ত্রবিরোধী গণঅভু্যত্থান, পাকিস্তানে বেনজীর ভুট্টো হত্যাকাণ্ড এবং শ্ৰীলঙ্কায় তামিল গেরিলা সংকট কভার করে প্রতিবেদন ও নিবন্ধ লিখে আলোচিত হন। এছাড়া পেশাগত দায়িত্ব পালনের জাপান, মালয়েশিয়া, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত ও ভুটান সফর করেন। কলামিস্ট হিসেবেও রয়েছে তার বিশেষ খ্যাতি। তিনি কালের কণ্ঠে “সময়ের প্রতিধ্বনি’ ও ‘রঙ্গব্যঙ্গ” নামে দুটি কলাম লিখছেন। বর্তমানে তিনি কালের কণ্ঠে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত। তার অবসর কাটে বই পড়ে, গান শুনে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত ও দুই সন্তানের জনক।

আরো দেখুনঃ   মোস্তফা কামালের নির্বাচিত ৪ টি বই

LEAVE A REPLY