কেন লিখি – শাহাদুজ্জামান

কেন লিখি?কেন লিখি? শাহাদুজ্জামান কেন লেখেন? সাহিত্য আমাদের জীবনের সেই বিস্তৃত বিশ্ময়ের মুখোমুখি করতে পারে। আলবেরুনীর একটা কথা বেশ ভালো লাগে আমার। তিনি লিখেছিলেন, ‘হে সৃষ্টিকর্তা, তুমি আমাকে দীর্ঘ জীবন দিও না বরং প্রসারিত জীবন দাও।‘ সেই প্রসারিত জীবনযাপনের লোভেই লেখালেখি করি। 

1
1843
কেন লিখি?কেন লিখি? শাহাদুজ্জামান কেন লেখেন?
লেখকদের কাছে এপ্রশ্নটা করার রেওয়াজ বেশ পুরনো। এর উত্তর দেবার আগে আমি বরং ভাবছিলাম, এ প্রশ্নটা কেন বার বার লেখকদের করা হয়। জগত সংসারে মানুষ যে আরো বিবিধ সব কাজ করে থাকে তাদের কি এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় কখনো? লেখকদের কাছে এই যে প্রশ্ন, এর পেছনের প্রনোদনাটা কি কৌতুহল না জেরা?  সন্দেহ নাই লেখার কাজটা অদ্ভুত। কেনই বা একজন অক্ষরের পর অক্ষর সাজিয়ে একটা বিকল্প জীবন তৈরী করতে চায়? ব্যাপারটা কি?
এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হলে আঁদ্রে জিদ বলেছিলেন, ‘লিখি কারন না লিখলে হাত ব্যাথা করে।‘ গার্সিয়া মার্কেজ বলেছিলেন, ‘লিখি যাতে আমার বন্ধুরা আমাকে আরো একটু বেশী ভালোবাসে।‘ ঠিক নিশ্চিত মনে পড়ছে না সম্ভবত হেমিংওয়ে বলেছিলেন, ’যে কারনে বাঘ হরিন শিকার করে সেকারনে আমি লিখি‘। বোঝা যায় প্রশ্নটাকে তারা হালকা চালেই নিয়েছিলেন। এও বোঝা যায় এ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে এক ধরনের অসহায়ত্বও তৈরী হয়েছিলো তাদের। কারন এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া দুরুহ। তারচেয়ে বরং উত্তর দেয়ার চেষ্টা না করাই ভালো। অনেক লেখক অবশ্য বেশ মনোযোগের সঙ্গেই এ প্রশ্ন মোকাবেলার চেষ্টা করেছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন লিখেছিলেন যে, ‘লেখা ছাড়া অন্য কোন উপায়ে যে সব কথা জানানো যায় না সেই কথাগুলি জানাবার জন্য লিখি।‘
জীবনানন্দ দাস ছোট খাটো একটা নিবন্ধ লিখেই এ প্রশ্নের উত্তর দিতে চেয়েছিলেন, লিখেছিলেন, ‘আমার এবং যাদের আমি জীবনের পরিজন মনে করি তাদের অস্বস্থি বিলোপ করে দিতে না পেরে জ্ঞানময় করার প্রয়াস পাই এই কথাটি প্রচার করে যে জীবন নিয়েই কবিতা।‘ এসব তো সাহিত্যের দিকপালদের কথা। কিন্তু আমি কেন এই লেখালেখির পাকচক্রে পড়লাম? একটা ব্যাপার বুঝি যে না লিখলে সর্বনাশ কিছু হতো না বরং লিখতে গিয়েই যা কিছু সর্বনাশ হয়েছে। কোথাও কোন দস্থখত দেইনি যে লিখতে হবে, না লিখলে আমার মৃত্যুদন্ড হবারও কোন সম্ভাবনা নাই, লিখে বৈষয়িক কোন সুবিধাও বিশেষ হয়নি তারপরও লিখে চলেছি।
কারনটা কি?
কেন লিখি এ বিষয়ে অন্যেরা যা বলেছেন আমি তার চেয়ে অভিনব কিছু বলতে পারবো তার সম্ভাবনা নাই। তারপরও যারা লেখালেখিতে নিযুক্ত তাদের সবারই নিজস্ব একটা গল্প থাকে। আমি আমার নিজের গল্পটা ভাবার চেষ্টা করি। একটা ব্যাপার লক্ষ্য করি যে অক্ষরের সুরঙ্গপথে এই চেনা পৃথিবী ছাড়িয়ে যে নতুন এক পৃথিবীতে চলে যাওয়া যায় তার খোঁজ পেয়েছিলাম বালক বয়সেই। পরিবারের গন্ডির ভেতরেই ছিলো সাহিত্যের হাওয়া। মা সাহিত্যের ছাত্রী, বাবা গভীর সাহিত্য অনুরাগী, ঘর ভরা গল্প, উপন্যাস, কবিতার বই। বালক বয়সে সেইসব বইয়ের পাতায় চোখ রেখে টের পেয়েছিলাম, চোখের সামনে যে জীবন প্রবাহটা দেখি তার বাইরে অদৃশ্য একটা অন্তর্জাগতিক জীবন¯্রােত আছে যেটা বন্দী হয়ে আছে এইসব অক্ষরে।দেখতাম অক্ষরের ভেতর দিয়ে সেই জীবনকে দেখতে গেলে রহস্যময় লাগছে সবকিছু,কেমন মায়াবী লাগছে। সেই মায়া,সেই রহস্যের নেশা পেয়ে বসে আমাকে। আবার প্রকৌশলী বাবা লিখতেন, নিজের ব্যাক্তিগত লেখার খাতাতেই সেসব লেখার পরিনতি। আমরা পরিবারের মানুষরাই ছিলাম তার লেখার পাঠক পাঠিকা। কে জানে আমার প্রয়াত বাবার অপুর্ণ লেখক সত্বাই আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় কিনা। লক্ষ্য করি লেখার পাকচক্রে পড়বার আগে পড়েছিলাম পড়ার পাকচক্রে। নানা রকম বইপত্র পড়েছি। কৈশরে যে পড়াশোনার ঘোর লেগেছিলো তা অব্যহত থেকেছে বরাবর। পরবর্তীকালে পরিবারের গন্ডি পেরিয়ে কিছু বন্ধু বান্ধব, শিক্ষক, অগ্রজ সুহৃদ এদের সুত্র ধরে পড়াশোনার দিগন্তটা বেড়েছে। আমার কৈশোর কেটেছে ক্যাডেট কলেজ নামের এক আধা সামরিক প্রতিষ্ঠানের কড়া নজরদারিতে। তবে সেখানকার সমৃদ্ধ লাইব্রেরী আমার পড়ার ক্ষুধা মিটিয়েছিলো বেশ। তখনও পড়ার নেশাই ছিলো শুধু, লেখার স্পৃহা ছিলো না। মনে পড়ছে এসময় কলেজের দেয়াল পত্রিকা, কলেজ ম্যাগাজিন ইত্যাদিতে আমার বন্ধু বান্ধবরা খুব লিখতো কিন্তু আমি  সেসবে লিখিনি কখনো। গোপনে কবিতা, গল্প লেখার চেষ্টা কিছু করেছি কিন্তু সেগুলো কোথাও ছাপাবার কথা ভাবিনি। তার একটা কারন সম্ভবত এই যে নিজের লেখার পাঠক হতে গিয়ে দেশ বিদেশের যেসব বইপত্র পড়েছি তার সঙ্গে একটা  অবচেতন তুলনা জাগতো মনে এবং নিজের লেখাকে মনে হতো বোকা বোকা। একপর্যায়ে গোপনেও আর কিছু লিখিনি আমি। কেবলই পড়ে গেছি। ক্রমশ আগ্রহ সাহিত্য ছাড়িয়ে শিল্পসাহিত্যের অন্যান্য মাধ্যমের দিকেও ধাবিত হয়েছে। কৌতুহলী হয়ে উঠেছি চলচ্চিত্র, নাটক, চিত্রকলা, সঙ্গীতের ব্যাপারে। ক্যাডেট কলেজ থেকে বেরিয়ে ভর্তি হয়েছি মেডিকেল কলেজে, চট্রগ্রামে। মেডিকেল কলেজে পড়তে এসে পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির বাইরে অবাধ স্বাধীনতায় নাড়াচাড়া করবার সুযোগ পেয়েছি শিল্পসাহিত্যে আমার কৌতুহলের সব অঞ্চলগুলোকে। এসময় সক্রিয় হয়ে উঠি শিল্পসাহিত্যের নানা শাখার বিবিধ কর্মকান্ডে। চলচ্চিত্র সংসদ, গ্রুপ থিয়েটার, লিটল ম্যাগাজিন, চিত্রকলা, সঙ্গীতের দল ইত্যাদির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ঘটে।

দেখে নিনঃ শাহাদুজ্জামানের কথামালা ! বইকথা

আশির দশকের প্রথম ভাগ তখন, দেশ সামরিক শাসনের অধীনে।ফলে রাজনীতির এক উত্তপ্ত আবহ চারিদিকে। রাজনীতির জঙ্গম জগতও আকর্ষন করে আমাকে। ঘনিষ্ঠ হই ছাত্র রাজনীতির বাম ধারার সঙ্গে। রাজনীতি, দর্শন, সমাজবিজ্ঞানের বইপত্রের প্রতি ঝোঁক বাড়ে। এতসব কৌতুহল আর কর্মকান্ড চালু রেখে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মত একটা জটিল পেশাগত পড়াশোনা বজায় রাখা দুরুহ হয়ে পড়ে। সাময়িক ছেদ পড়ে পড়াশোনায়। শিল্পসাহিত্যকে ঘিরে যাবতীয় কর্মকান্ড পাশে সরিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পেশাগত পড়াশোনাতেই পুর্নাঙ্গ মনোযোগ দেয়া উচিৎ কিনা এই ভাবনায় তাড়িত হই। জীবন আর জীবিকার প্রশ্নে দ্বন্দ্ব তৈরী হয়। কিন্তু শিল্পসাহিত্যের ভেতর দিয়ে জীবনের যে বিপুল জঙ্গমতার সঙ্গে পরিচয় ঘটে, শিল্প সাহিত্যের ভেতর দিয়েই যে একজীবনে অগনিত জীবন যাপনের সুযোগ ঘটে তাকে স্থগিত রেখে শুধুমাত্র একটা পেশাগত পড়াশোনায় নিজেকে নিয়োজিত করতে মন সায় দেয়নি আমার। কঠিন প্রতিযোগীতার ভিত্তিতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মত এমন একটা প্রতিষ্ঠিত পেশায় পড়াশোনার সুযোগ পেয়েও আমার এই অনাগ্রহ, খেয়াল পোকার এইসব উপদ্রপ মধ্যবিত্ত পরিবারকে স্বভাবতই করে তোলে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ। ফলে নিজের সঙ্গে, পরিবারের সঙ্গে এক জটিল বোঝাপড়ায় নামতে হয়। শিল্পসাহিত্যের কোন একটা মাধ্যমকে পেশা হিসেবে যে নেব তেমন ভরসাও পাই না। তবে এইটুকু বুঝি যে পেশা যাই হোক শিল্পসাহিত্যের সঙ্গ ছাড়া আমার কাছে বহনযোগ্য হবে না জীবন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পড়া অব্যহত রাখি কিন্তু পথ খুঁজতে থাকি কি করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পেশাগত পড়া আর  শিল্পসাহিত্যের প্রতি অন্তর্গত প্রেরনার একটা সমন্বয় ঘটাতে পারবো। গোপনে খোঁজ খবর নেই বিশ্ব প্রেক্ষাপটে শিল্প¦সাহিত্যের জগতে চিকিৎসক পেশার কেউ আছেন কিনা। সমারসেট মম, চেকভ, বালগাকভ, বনফুল প্রমুখের নাম জেনে মনে মনে ভরসা পাই। এক বাক্য না লিখেও নিজেকে গোপনে বিশ্বসেরা লেখকদের পাশে ভাববার এই চেষ্টা হাস্যকর সন্দেহ নাই। কিন্তু কল্পনায় প্রজাপতি হয়ে চাঁদে উড়ে যেতেও তো আপত্তি নাই। ফলে চিকিৎসাবিজ্ঞানকে পেশা হিসেবে রেখেই সৃজনশীল কোন কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখবো এমন ভাবনা মনের ভেতর জারি রাখি। মাঝে চলচ্চিত্র নির্মান নিয়েও মেতে উঠেছিলাম খুব। অনেক রকম উদ্যোগও নিয়েছিলাম। কিন্তু চলচ্চিত্র নির্মান যে পরিমান সময়, পুঁজি, শ্রম দাবী করে সেটা মেটানো আমার পক্ষে সম্ভব হবে না টের পেয়ে যাই।  আমার জীবনযাপনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সৃজনশীল কাজ বলতে লেখিলেখিটাই চালিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে মনে হয়। ফলে মনোযোগের সঙ্গে লেখালেখি করবো মনে মনে এমন একটা ভাবনা কাজ করে। কিন্তু সত্যিই তাৎপর্যপুর্ন কিছু লেখার যোগ্যতা আমার আদৌ আছে কিনা সন্দেহ জাগে তা নিয়ে। এই রকম একটা পর্বে  কি করে সাহিত্য সৃষ্টি হয়, চলচ্চিত্র, চিত্রকলা, নাটক নির্মিত হয়, কারা সেসব করেন, তারা কি ধরনের মানুষ ইত্যাদি জানবার ব্যাপারে আমার কৌতুহল বেশ তীব্র হয়ে ওঠে। এই সময় আমার পছন্দের বাংলাদেশের মননশীল ধারার বেশ ক‘জন লেখক এবং শিল্পীর সাক্ষাৎকার গ্রহন করি। নিজে উদ্যোগী হয়ে সাক্ষাৎকার নেই লেখক  আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, শিল্পী এস এম সুলতান প্রমুখের। যেখানে তাদের জীবন এবং কাজ নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করি। পাশাপাশি মিলান কুন্ডেরা, পিকাসো, ইবসেনসহ আরো অনেক বিশ্ববরেন্য শিল্পী সাহিত্যিকের সাক্ষাৎকার ইংরাজী থেকে অনুবাদও করি। এসবই ছিলো আমার শিল্প সাহিত্য সৃষ্টির প্রক্রিয়া এবং শিল্পী সাহিত্যিকদের ভেতরের জীবনটাকে জানাবার একটা উপায়। আমার নেয়া এবং অনুদিত সেইসব সাক্ষাৎকারগুলো পরে সংকলিত হয়েছে আমার ‘কথা পরম্পরা‘ বইয়ে। এর কাছাকাছি সময় আমি নন্দনতত্ব, শিল্পসাহিত্যের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়েও খুব আগ্রহী হয়ে উঠি এবং এবিষয়ে বেশ কিছু প্রবন্ধ ইংরাজী থেকে অনুবাদ করি। এও ছিলো শিল্পসাহিত্যের মুল উপাদান, উদ্দেশ্য ইত্যাদি সম্পর্কে আমার বোঝার চেষ্টার একটা অংশ মাত্র। সেই পর্বের করা অনুবাদগুলো সংকলিত হয়েছে আমার ‘ভাবনা ভাষান্তর‘ বইয়ে। এরপর চট্রগ্রামে আমরা ক‘জন সমমনা বন্ধু মিলে ‘প্রসঙ্গ‘ নামে একটা ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশ করি যার মুল লক্ষ ছিলো সাহিত্য, চলচ্চিত্র, চিত্রকলা, নাটক শিল্পসাহিত্যের এই বিবিধ মাধ্যমের ভেতর আন্তসস্পর্কটা তুলে ধরা। সেখানেও আমি বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখি। আমার লেখালেখির প্রাথমিক পর্বের দিকে চোখ রাখলে কতগুলো প্রবনতা লক্ষ্য করি। দেখতে পাই শিল্পসাহিত্যের সৃষ্টি প্রক্রিয়া, শিল্প সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার ভেতর পারষ্পরিক সস্পর্ক, শিল্পসাহিত্যের সামাজিক একং রাজনৈতিক দায়িত্ব ইত্যাদি বিষয়ের গভীর কতগুলো জিজ্ঞাসা থেকে আমার লেখালেখি শুরু। আমার প্রাথমিক পর্বের লেখাপত্রগুলো তাই ঠিক হৃদয়ঘটিত না হয়ে বরং বলা চলে মস্তিষ্কঘটিত।
শাহাদুজ্জামানের বেস্টসেলার সবগুলো বই এই লিঙ্কে
একারনে গল্প, কবিতা নয় আমার লেখা বরং শুরু হয়েছিলো প্রবন্ধ দিয়েই। সেইসঙ্গে আরো লক্ষ করি আমার নিজের মতামত প্রকাশের চেয়ে আমি বরং তখন ভর করেছি প্রতিষ্ঠিত লেখক, শিল্পী, পন্ডিতদের  উপর। সেকারনেই নিজে মৌলিক লেখা না লিখে অন্যের লেখা অনুবাদ করেছি, অন্যের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। আরো লক্ষ করি লেখা প্রকাশের জন্য মুল ধারার প্রধান পত্রিকা বা প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য পত্রিকা নয় আমি বরং নির্ভর করেছি বিকল্প ধারার ছোট পরিসরের লিটল ম্যাগাজিনের উপর। এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে শিল্পসাহিত্যের মানচিত্র বিষয়ে ক্রমশ ধারনাগুলো খোলাসা হতে থাকলে এক পর্যায়ে অনুভব করি নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে চলতে গিয়ে নিজের ভেতর একান্তভাবে যে ভাবনা, অনুভবগুলো জারিত হচ্ছে তার সবকিছু প্রবন্ধ, সাক্ষাৎকার, অনুবাদ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে ঠিক প্রকাশ করা যাচ্ছে না। এসব লেখায় আমার নিজের কন্ঠস্বরটা আমি ঠিক উচ্চারন করতে পারছি না। এরকম একটা পর্যায়ে আমার মৌলিক গল্প লেখার ইচ্ছা জাগে। কোন তাত্বিক বিষয়ে প্রবন্ধ না, কোন স্বনামধন্য মানুষের সাক্ষাৎকার না, আমি সিদ্ধান্ত নেই আমার নিজের একটা গল্প আমি লিখবো। নীরিক্ষামুলকভাবে একটা গল্প লিখে পাঠিয়ে দেই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্পাদিত ‘সাহিত্যপত্র‘ পত্রিকায়। সেটা মধ্য আশির দশক। গল্পটা ছাপা হয়ে যায়। আমার প্রথম লেখা গল্প একটা সম্মানীয় পত্রিকায় ছাপা হওয়াতে মৌলিক লেখার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হই। পাশাপাশি আমি বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে, দৈনিক পত্রিকায় চলচ্চিত্র, নাটক, চিত্রকলা  বিষয়ে নিয়মিত নিবন্ধ লিখে শিল্পসাহিত্যের নানা শাখার ব্যাপারে আমার কৌতুহলটাকেও জাগরুক রাখি। ইতিমধ্যে আমি মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করে চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেই গ্রামীন চিকিৎসা কেন্দ্রে। বাংলাদেশে নানা প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরবার সুযোগ হয় তখন আমার। জীবনের নানা নতুন দিগন্তের মুখোমুখি হই। দেশের একেবারে পাকস্থলীতে গিয়ে চোখ রাখবার সুযোগ হয়। বাস্তবতার নানা  ঘাত প্রতিঘাতের মুখোমুখি হই, স্বপ, স্বপ্নভঙ্গ, প্রেম, বেদনার বিবিধ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাই। বাইরের আর ভেতরের জগতের নানা টানাপেড়েনের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে অনেক ভাবনা, প্রশ্ন, দ্বন্দ্ব, কথা জমা হতে থাকে মনে। এসময় লেখার তাগাদাটা মনের ভেতর বাড়ে। মনে হয় শুধুমাত্র লিখেই মনের এইসব তোলপাড়গুলো মোকাবেলা করা সম্ভব। নানা রকম লেখা লিখতে থাকি তখন কিন্তু ঝোঁকটা বাড়ে গল্প লেখার দিকে। গল্প লিখতে গিয়ে লক্ষ্য করি চলচ্চিত্র, চিত্রকলা, নাটক ইত্যাদি মাধ্যমের নানা পরীক্ষা নীরিক্ষার সঙ্গে আমার যে পরিচয় ঘটেছিলো, গ্রাম জীবনের কথকতার সাথে যে যোগাযোগ ঘটেছিলো, রাজনীতি, দর্শনের যে ভাবনাগুলো দিয়ে তাড়িত হয়েছিলাম সেগুলোরও একটা পরোক্ষ প্রভাব আমার গল্পে পড়ছে। এসব মিলিয়ে হয়তো আমার গল্পের একটা নিজস্ব চরিত্র ক্রমে দাঁড়াতে থাকে।
মধ্য নব্বইয়ে ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা সংস্থা মাওলা ব্রাদার্স কথাসাহিত্যের পান্ডূলিপি প্রতিযোগীতা আহ্বান করলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত আমার গল্পগুলো সংগ্রহ করে পাঠিয়ে দেই। আমার পান্ডূলিপি শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয় এবং ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম গল্প গ্রন্থ ‘কয়েকটি বিহ্বল গল্প‘। এরপর ধারাবাহিকভাবে প্রতি বছরই কথাসাহিত্যের নানা শাখায় বই প্রকাশিত হয়েছে আমার। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, অনুবাদ, গবেষনা, সাক্ষাৎকার, সম্পাদনা ইত্যাদি নানা ধারার বই প্রকাশিত হয়েছে আমার। অন্যদিকে আমার চিকিৎসাবিজ্ঞানের পড়াশোনাকে আমি যুক্ত করেছি সমাজবিজ্ঞানের সঙ্গে। উচ্চতর পড়াশোনা করেছি চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানে। গবেষনা আর অধ্যাপনাকে আমার পেশা হিসেবে নিয়েছি। আমার লেখালেখিতে তা সহায়ক ভুমিকাই রাখে এখন। পরবর্তীকালে পড়াশোনার সূত্রে, কাজের সুত্রে এশিয়া, ইউরোপ, আরব, আফ্রিকার অনেকগুলো দেশে ঘুরবার, বসবাস করবার অভিজ্ঞতা হয় আমার। এইসব ভ্রমনের অভিজ্ঞতা আমার লেখার ক্ষেত্রেও ব্যাপক প্রভাব ফেলে। কেন লিখি, সে প্রশ্নে যদি আবার ফিরি তাহলে বলবো, জীবন, সমাজ, রাজনীতি, মানব সম্পর্ক ইত্যাদির প্রতি কৌতুহল আর বিবিধ জিজ্ঞাসাই আমাকে বারবার লেখায় প্ররোচিত করে। ঠিক গল্পকার, উপন্যাাসিক বা প্রাবন্ধিক এমন কোন নির্দিষ্ট পরিচয় গড়ে তুলবার জন্য লিখি না। সাহিত্যিক হবার বাসনা থেকেও ঠিক লিখি না। যে জীবনটা যাপন করছি তাকে ঠিক ঠাক বুঝবার জন্যই লিখি। জীবন যাপন করতে গিয়ে নানা রকম ভাবনা, অনুভুতি, প্রশ্ন ভীড় করে মনের ভেতর। একটা চাপ বোধ করি, ভার বোধ করি। অনেকটা মাল বোঝাই ট্রাকের মত সেইসব প্রশ্ন, অনুভুতি, বোধগুলো বয়ে বেড়াই। একসময় মনে হয় এই বোঝা থেকে মুক্ত হওয়া দরকার। ভেতরের বোঝাগুলো নামিয়ে রাখবার জায়গা খুঁজি। লিখলে যেন সেই বোঝা নামে। কিন্তু সব লেখায় সব বোঝা নামিয়ে রাখা যায় না। কিছু বোঝা নামাই গল্পে, কিছু উপন্যাসে, কিছু প্রবন্ধে, অনুবাদে, কিছু বা পত্রিকার কলামে। এভাবে এক এক পরিসরে এক এক ভাবনার বোঝা নামিয়ে রেখে ভারমুক্ত হই। হালকা বোধ করি। লেখা তাই আমার কাছে নিজেকে ভারমুক্ত করার একটা উপায়। যে দেশকালের ভেতর দিয়ে, যে ব্যাক্তিগত আর সামাজিক সম্পর্কসমুহের জটাজালের ভেতর দিয়ে জীবন যাপন করছি তাকে মোকাবেলা করা এক কঠিন সংগ্রাম বলেই মনে হয়। আমাদের দিন যাপনের ভেতর থাকে অনেক অন্তর্গত রক্তক্ষরন। কেউ একজন বলেছিলেন আমাদের জীবন এখন শেয়ালের মুখে ধরা মোরগের মত। বাস্তবতা হচ্ছে সেই শেয়াল যা আমার চেয়ে চালাক, আমার চেয়ে শক্তিশালী। আমি তার কামড়ে রক্তাক্ত হয়ে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে বেঁচে থাকি। শিয়ালের মুখে বসে কেন এই জীবন যাপন করি, কিভাবে এই জীবন যাপন করি সে কথা জানান দিতেই লিখি। লেখা আমার কাছে তাই জীবনের একটা অর্থ খোঁজার উপায়। লেখালেখির মুহুর্তগুলো মনে হয় সেই শেয়ালের মুখ থেকে যেন হঠাৎ কিছুক্ষনের জন্য ছাড়া পেয়েছি। নতুন করে তখন জীবনকে মোকাবেলা করার শক্তি পাই। ফলে আমি লিখি অনেকটা আমার নিজেকে বাঁচাতেই। লেখা তাই আমার কাছে এক ধরনের থেরাপী। কিন্তু সে লেখা যখন প্রকাশ করি তখন দেখতে পাই অনেককে তা স্পর্শ করছে। হয়তো লেখা পড়তে গিয়ে তারাও মুুহুর্তের জন্য সেই শেয়ালের মুখ থেকে ছাড়া পাবার আনন্দ পান, মুক্তির স্বাদ পান,শক্তি পান। লেখক আর পাঠকের এই যুগলবন্দীতেই তো সাহিত্য সৃষ্টি হয়। আশা নিরাশার নাগরদোলায় চড়া আমাদের এই জীবন আশ্চর্য বর্নাঢ্য এবং বিস্ময়কর।
সাহিত্য আমাদের জীবনের সেই বিস্তৃত বিশ্ময়ের মুখোমুখি করতে পারে। আলবেরুনীর একটা কথা বেশ ভালো লাগে আমার। তিনি লিখেছিলেন, ‘হে সৃষ্টিকর্তা, তুমি আমাকে দীর্ঘ জীবন দিও না বরং প্রসারিত জীবন দাও।‘ সেই প্রসারিত জীবনযাপনের লোভেই লেখালেখি করি।

________________________________________________________________________

এক নজরে শাহাদুজ্জামান
শাহাদুজ্জামান তার ব্যতিক্রমী, নিরীক্ষাধর্ম গ্রন্থগুলোর মধ্য দিয়ে মননশীল বাংলা কথাসাহিত্যে তার অনিবাৰ্য অবস্থানটি ইতিমধ্যে নিশ্চিত করেছেন। গল্প, উপন্যাস ছাড়াও প্ৰবন্ধ, অনুবাদ, ভ্ৰমণ, এবং গবেষণার ক্ষেত্রে রয়েছে তার উল্লেখযোগ্য গ্ৰন্থ। ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনী সংস্থা মাওলা ব্রাদার্স আয়োজিত কথাসাহিত্যের পাণ্ডুলিপি প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পেয়ে প্রকাশিত হয়। শাহাদুজ্জামানের প্রথম গল্পগ্রন্থ “কয়েকটি বিহ্বল গল্প” ১৯৯৬ সালে। বাংলা কথাসাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি ২০১৬ সালের বাংলা একাডেমী পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। শাহাদুজ্জামান পড়াশোনা করছেন মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। পরবর্তীকালে তিনি নেদারল্যান্ডের আমস্টার্ডাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.এইচ.ডি অর্জন করেন চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানে। পেশাগত ভাবে তিনি ডাক্তার হিসেবে কাজ করেছেন উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের গ্রামীণ স্বাস্থ্য প্রকল্পে, পরে অধ্যাপনা করেছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্কুল অব পাবলিক হেলথে”। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা এবং অধ্যাপনায় যুক্ত আছেন। শাহাদুজ্জামানের জন্ম ১৯৬০ সালে ঢাকায়।
লেখকের সবগুলো বইয়ের নাম ও কিছু অংশ দেখে নিন এই লিঙ্ক থেকে

1 COMMENT

LEAVE A REPLY