আমাদের ভ্রমণকথাই আমাদের জীবনকথা

আমাদের ভ্রমণকথাই আমাদের জীবনকথা লিখেছেন শাকুর মজিদ, ভ্রমণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন বিদেশ ঘুরে বেড়ানোর খায়েসটা আমার জন্মেছিল মূলত; আমার নাবিক বাবার কাছ থেকে বিদেশের গল্প শুনে। প্রথম বিদেশ যাওয়ার সুযোগ হয় ১৯৯০ তে, তখন আমি বুয়েটে পড়ি, থার্ড ইয়ারে। ৫০ মার্কিন ডলার আর পাঁচশো টাকার ৪ খানা নোট নিয়ে ৮ দিনের জন্য রওয়ানা হয়েছিলাম। দলের সঙ্গে যাত্রা। ভ্রমণের ধকল কিছুই বুঝিনি।  

1
388
মাঝে মাঝে আমার এই মনে হয় যে, আমাদের সারা জীবনে আমরা একটি মাত্র ভ্রমণকাহিনি লিখি। আমাদের এই জীবনপথ নানা বাকে ঘুরে ঘুরে এক জায়গা থেকে শুরু হয়ে আরেক জায়গায় শেষ হয়। এই সময় আমরা যা দেখি, যা শিখি তা নানা ভাবে প্রকাশ করি। কখনো পদ্যে, কখনো গদ্যে , কখনো সরাসরি নিজের মুখে, কখনো অসরাসরি, চরিরের মুখ দিয়ে সংলাপের আকারে।
এই বায়ান্ন বছরের হিসাবে এসে দেখি আমার আসলে লেখালেখির বয়স প্রায় চল্লিশ। স্কুলের দেয়াল পত্রিকার কবিতা দিয়ে শুরু। এরপর কলেজ ম্যাগাজিনে গল্প, ভ্রমণকাহিনি। কলেজ থেকে বেরিয়ে সিলেটের সাপ্তাহিক পত্রিকায় গল্প, কবিতা, সিলেট বেতারে নাটক। এই দিয়ে শুরু।
তিরিশ বছর আগে, ১৯৯৬ সালে নিজের টাকায় প্রথম একটা গল্পের বই বের করেছিলাম। তাঁর অনেক বছর পর প্রকাশক নিজের টাকায় বের করেন আমার প্রথম বই, তাও ভ্রমণের। এ পর্যত্ন ৩৫ টি বই আমার হয়ে গেছে। বইগুলোর ২৭ টি প্রথম পুরুষে লেখা, ভ্রমণকাহিনি, আত্মজৈবনিক, স্মৃতিকথা বা ভ্রমনগদ্য।

শাকুর মজিদের সবগুলো বইয়ের কিছু অংশ পড়ে দেখুন

ফিকশন, ননফিকশন, দুই জায়গাতেই আমি কাজ করি। সেটা ছাপা বা ভিজ্যুয়াল, দুটোই। আমি নাটক-টেলিফিল্ম যেমন বানাই তেমনি প্রামাণ্যচিত্রও। গল্প-কবিতা যেমন লিখেছি, তেমনি দালিলিক গ্রন্থও। তবে হিসেব করে দেখি, ভ্রমণ সাহিত্যে সংখ্যার দিক থেকে আমার অনেক বেশি কাজ হয়ে গেছে।
বিদেশ ঘুরে বেড়ানোর খায়েসটা আমার জন্মেছিল মূলত; আমার নাবিক বাবার কাছ থেকে বিদেশের গল্প শুনে। প্রথম বিদেশ যাওয়ার সুযোগ হয় ১৯৯০ তে, তখন আমি বুয়েটে পড়ি, থার্ড ইয়ারে। ৫০ মার্কিন ডলার আর পাঁচশো টাকার ৪ খানা নোট নিয়ে ৮ দিনের জন্য রওয়ানা হয়েছিলাম। দলের সঙ্গে যাত্রা। ভ্রমণের ধকল কিছুই বুঝিনি।

শাকুর মজিদের বেস্টসেলার সবগুলো বই একসাথে দেখুন

এর ৭ বছর পর যাই সংযুক্ত আরব আমিরাতে। তখন মনে হলো বিদেশ সফরে এসেছি। ভিন্ন লোকালয়, ভিন্ন মানুষ, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন তার প্রকৃতি। এরপর থেকে ধীরে ধীরে শুরম্ন হয়ে যায়। এরপর যেকোনো ছুঁতো পেলেই আমি পাসপোর্ট গোছাই। বিগত ২৫ বছর ধরে বিদেশ ঘুরছি। ঘোরাঘুরি নেশার মতো হয়ে গেছে। এশিয়া-ইউরোপ-উত্তর-দক্ষিন আমেরিকা-আফ্রিকা মিলে প্রায় তিরিশটি দেশ আমার দেখা হয়ে গেছে। এসব দেখা-দেখির বিষয় আমি একার মধ্যে রাখিনি। ভ্রমণকাহিনী হয়েছে ২০টি, ভ্রমণচিত্র বানিয়েছি প্রায় তিনশো। আমার দেখাদেখি – লেখালেখি আর ভ্রমণচিত্র বানানোর মাধ্যমে শেষ হয়। আবার নতুন নতুন জায়গার প্রতি তৈরি হই।
আমার কোন কোন পাঠকের অভিযোগ এমনটি পেয়েছি যে আমার ভ্রমণগ্রন্থগুলোতে স্থাপত্যের বর্ণনা অনেক বেশি থাকে । এই অভিযোগ আমি আমি অস্বীকার করতে পারি না। কারন, স্থাপত্যের ছাত্র হিসেবে যেকোন জায়গায় গিয়ে তার অতীতকে জানতে হলেই আমি কালের সাক্ষি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তার পুরনো দালানগুলোর দিকেই তাকাই। সেটা দেখেই কিন্তু আমি নতুনকে পাই। তবে সবচেয়ে হতাশা জেগেছিল রাজকীয় স্থাপনাগুলো দেখে। ইস্তাম্বুলের ওসমানি প্রাসাদ কিংবা আগ্রা-দিলস্নীর মুঘলীয়ানার চিহ্ন সমূহ দেখতে দেখতে ক্লান্তি এসেছে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছিলাম- সময়ের আবর্তে মানুষের ঐশ্বর্য  যখন বিলীন হয়ে যায়, তখন কী করে মানুষেরা মূল্যায়িত হোন।

        অনেক ক্ষেত্রেই একই জায়গায় আমায় একাধিকবার যাওয়া হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয়বারও গিয়ে দেখেছি সুক্ষ্ম বেশকিছু পরিবর্তন হয়েছে। যদিও একবার দেখা কোনো শহরেই দ্বিতীয়বার যেতে আগ্রহ জাগে না, কিন্তু পুণর্বার গিয়েও দেখি- সেই নদীটা হয়তো ঠিকই আছে, কিন্তু সেই জলটা আর নেই, যে মানুষটি প্রথমবার সেই নদীতে স্নান করেছিল দ্বিতীয়বারের স্নানের নদীটা ঠিক হয়তো থাকে, কিন্তু পানিটার বদল হয়ে যায়, মানুষটারও।
আমার প্রকাশিত সবগুলো বই অবশ্য বাজারে নাই। বেশ কিছু বইয়ের, বিশেশ করে ভ্রমণ বিষয়ক বইয়ের সংস্করণ শেষ হয়ে গেলে কথা প্রকাশের জসিম উদ্দিন নতুন একটি পরিকল্পনা নিয়ে আসেন। সবগুলো বই চার খণ্ডে নিয়ে আসেন। এর আগের তিন-চারটে ছাড়া অন্য ভ্রমণগ্রন্থগুলোতে আমার স্টিল ক্যামেরার ছবিগুলো  আমার পাঠকদের দেখাতে পারিনি। এ কাজটি এবার করেছে কথা প্রকাশ।
নতুন প্রকাশিত বইটি দেখুন এই লিঙ্ক এ ক্রাউন সাইজের বইটির প্রায় পাতায় পাতায় বড় করে পুরো চার রঙ্গে ছেপে পাঠকের জন্য আমার দেখা ও লেখা প্রকাশের যে সুযোগ করে দিয়েছে । চার খণ্ডে আট মলাটের মধ্যে আমার ১৭টি ভ্রমন গ্রন’ একসাথে পাওয়ার সুযোগ আমার এবং আমার পাঠকের জন্য খুবই আনন্দেও খবর। বাহান্নতম জন্মদিনে এটাই আমার বড় উপহার।

________________________________________________________________________

এক নজরে শাকুর মজিদ
শাকুর মজিদ পেশায় স্থপতি, নেশায় লেখক-নাট্যকার-আলোকচিত্রী-চলচ্চিত্র নির্মাতা। শৈশবে কবিতা দিয়ে লেখালেখি শুরু। পরে গল্প, নাটক, ভ্রমণ-কাহিনি লিখেছেন অনেক। নাটকের সকল শাখায় তার বিচরণ। কুড়ি বছর বয়সে সিলেট বেতারে তাঁর লেখা নাটক ‘যে যাহা করোরে বান্দা আপনার লাগিয়া’ প্রথম (১৯৮৫) প্রচার হয় । লন্ডনী কইন্যা, নাইওরী, বৈরাতী, করিমুন নেছা, চেরাগসহ বেশ কয়েকটি টেলিভিশন-নাটক ও টেলিফিল্মের রচয়িতা তিনি। দেশ-বিদেশের ভ্রমণচিত্র নিয়ে তিনশতাধিক প্রামাণ্যচিত্র বানিয়েছেন। দেশ ভ্রমণ তার একটি বড় নেশা। ত্রিশটি দেশ ভ্রমণ করেছেন।তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩২, বেশীরভাগই ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিচারণ ও আত্মজৈবনিক গ্রন্থ। তার সবগুলো বই এখানে

1 COMMENT

  1. আমাদের জীবনকে খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন ।এই পোষ্টটি পড়ে খুবই উপকারে আসবে।লেখক কে অসংখ্য ধন্যবাদ এমন একটি সুন্দর Experience শেয়ার করার জন্য।

LEAVE A REPLY