পড়ো বাংলাদেশ- এ জার্নি উইথ সাদাত হোসাইন (পার্ট-১)

1
289
১৬ নভেম্বর, ২০১৭ এর সকালটা একটু ক্লান্ত উদাস ছিল। সকাল থেকেই আকাশটার মন ভার, দেখে বোঝার উপায় নেই কী ঝলমলে উচ্ছল একটা দিনই না আসছে সামনে! রকমারি ডট কম বই নিয়ে কাজ করা শুরু করেছে বছর পাঁচেক হয়ে গেছে। ঘরে বসেই বই কেনার একটা অভ্যাস পাঠকের মাঝে গড়ে দিতে পেরেছি আমরা। এই সময়টা পার করতে গিয়ে আমরা বারবারই দেখেছি পাঠক এবং লেখকের মাঝে একটা দূরত্ব থেকেই যায় সবসময়। লেখকের লেখার সাথে পাঠকের মনের একটা সম্পর্ক ঠিকই সৃষ্টি হয় কিন্তু ব্যক্তি লেখকের সাথে ব্যক্তি পাঠকের সম্মিলন সবসময়ই দূরকথা।
কেমন হয় যদি লেখকের সাথে পাঠকের দেখা হয়, গল্প হয়?
কেমন হয় যদি লেখক নিজেই তার বই নিয়ে যান পাঠকের দুয়ারে?
ঠিক এই ভাবনা থেকেই রকমারি ডট কম আয়োজন করলো একটা নতুন কিছুর। লেখক আর পাঠকের ‘মাইন্ড দ্য গ্যাপ’ টাইপ সম্পর্ককে ‘বাইন্ড দ্য গ্যাপ’ করার চেষ্টা।
আর রকমারির এই আয়োজনের সঙ্গী হলেন বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় তরুণ কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন। তাঁর নতুন কবিতার বই “আমি একদিন নিখোঁজ হবো” র প্রি-অর্ডারকারী ২০০ জন থেকে বাছাই করা হল ৭ জন পাঠককে, যাদের কাছে সাদাত হোসাইন নিজেই গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসবেন তাঁর বইটি।
রকমারি ডট কম টিম ১৬ নভেম্বর সকালেই ২০০ বই নিয়ে রওয়ানা দিলো সাদাত হোসাইনকে পিক করার জন্য। ৭ টা বই আলাদাভাবে পার্সেল করা হয়েছে ডেলিভারির জন্য আর বাকি বইগুলোতে সাদাত হোসাইনের অটোগ্রাফ নেয়া হবে। সাদাত হোসাইনকে নিয়ে রকমারি টিম রওয়ানা হল আমাদের প্রথম পাঠক কর্নেলিয়াস রোজারিওর কাছে। র‌্যাংগস ইলেকট্রনিক্সে কর্মরত রোজারিও সাদাত হোসাইনকে দেখে প্রথমে একটু চমকেই গিয়েছিলেন। কিন্তু পঞ্চাশোর্ধ্ব এই তরুণ পাঠক সামলে নিয়ে জড়িয়ে ধরলেন প্রিয় লেখককে। প্রিয় লেখক ও রকমারি টিমের সবার জন্য আলাদা করে চকলেটও উপহার দিলেন তিনি। বইয়ে অটোগ্রাফ নিলেন তার কন্যা লাবণ্যের জন্য। কিন্তু প্রিয় লেখকের একটি বই নিয়েই তিনি ক্ষান্ত হবেন না। তার আরও দুটি বই লাগবে বলে দাবি করে বসেন তিনি। পরে আমাদের সাথে কিছুদূরের পথ পার হয়ে আরও দুটি বই ও অটোগ্রাফ নেয়া হল তার। প্রথম পাঠকের কাছেই এরকম ভালোবাসা পেয়ে লেখক ও রকমারি টিম মুগ্ধ।
সাদাত হোসাইনের সবগুলো বই এখানে
এরপর আমরা গেলাম কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে। এখানে বিডিজবসে কর্মরত আছেন আমাদের পরবর্তী পাঠিকা খালেদা ইয়াসমিন। লিফটে করে উঠতে গিয়ে লেখক কথা বলতে লাগলেন লিফটম্যানের সাথে। পড়াশুনার পাশাপাশি লিফটে কাজ করতে হয় তাকে, দমবন্ধ পরিবেশে প্রচণ্ড মাথাব্যথায় কাতর সে ছেলেটির সাথে লেখকের দরদী কথোপকথন নতুন একটি গল্প দেয় আমাদের। বিডিজবসে ঢুকেই খোঁজ পড়ে যায় খালেদা ইয়াসমিনের। এরই মাঝে আরও এক পরিচিত পাঠিকার দেখা পেয়ে যান সাদাত। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর অবিশ্বাসী এক এক্সপ্রেশন নিয়ে আসেন খালেদা ইয়াসমিন। সোফায় বসে থাকা প্রিয় লেখককে দেখে যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না তার। এক বইতে অটোগ্রাফ নিতে গিয়ে তিনি বের করে আনেন প্রিয় লেখকের অন্য বইগুলোও, সবগুলোতেই যে অটোগ্রাফ চাই তার। পাঠক-লেখকের খুনসুটির মাঝেই আমরা ক্লিক করতে থাকি অনিন্দ্য সুন্দর সে মুহূর্তগুলো।
এরপরের লোকেশন বসুন্ধরা সিটির মার্কেটের পাশে অবস্থিত সিটি ইউনিভার্সিটি। বিডিবিএল ভবন থেকে বের হয়ে আমরা হেঁটেই রওয়ানা দিলাম সেদিকে। এরই মাঝে রাস্তায় শসা-আমড়া-জাম্বুরা বিরতি। লেখক এদিকে তৃপ্তি নিয়ে শসা খাচ্ছেন আর ওদিকে পাঠিকা ফোনে রাগ ঝারছেন তার বই কই বলে! তাই আর না দেরি করে আমরা চলে আসি সিটি ইউনিভার্সিটির সামনে। আসতে দেরি হওয়া, রাগ-অভিমান সবকিছুই এক ফুঁৎকারে উড়ে গেল। পাঠিকা সোনিয়া ইসলাম শামুর চোখে মুখে অবিশ্বাসের হাসি, হাত কাঁপছে তার থরথর করে। প্রিয় লেখককে সামনে দেখে কিছু বলতেই পারছিলেন না যেন তিনি। সাদাত হোসাইন তার বইয়ে অটোগ্রাফ দিলেন আর বই হাতে দিতে গিয়ে দেখলেন তখনো তাঁর পাঠিকার হাত কম্পমান। এরকম একটি অপার্থিব অভিজ্ঞতাকে সঙ্গী করে আমরা চলে আসি সেগুনবাগিচা, বিদ্যুৎ ভবনে। ডেপুটি ম্যানেজার একাউন্টসের শামসুন নাহার আমাদের পরবর্তী গন্তব্য।
শামসুন নাহার একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়ার পাশাপাশি একজন জেনুইন সাদাত হোসাইন রিডারও বটে। লেখককে দেখে তার উচ্ছ্বসিত হাসিতে আমরা মুগ্ধ কম হয়েছি, বেশি হয়েছি তার সাদাত ম্যানিয়া দেখে। সাদাত হোসাইনের সকল চরিত্র, সকল গল্প সবকিছুই তার আগাগোড়া মুখস্ত বলা যায়। এরকম একজন পাঠিকা পাওয়া যেকোনো লেখকের জন্যই সৌভাগ্যের ব্যাপার। সাদাত হোসাইনও এমন পাঠক পেয়ে মুগ্ধ হয়েছেন তা তাঁর অভিব্যক্তি দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। এবার খাওয়া-দাওয়ার পালা। বৃষ্টিদিনে সেগুনবাগিচার ভোজের আচারি খিচুড়ির চেয়ে ভালো কিছু আর কী হতে পারে! খাওয়া শুরুর আগেই সাদাত হোসাইন অর্ধেক দিনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন রকমারি টিমের সাথে, একটা ছোট্ট সাক্ষাৎকারও দিয়ে ফেললেন। খাওয়া-দাওয়া শেষে গেলাম হাতিরপুল শর্মা হাউজে। না, আবার খেতে নয়; আরও একজন পাঠিকা যে শর্মা হাউজের বিল্ডিং এ অপেক্ষা করছিলেন।
শামীমা নিশিথ। একটি আইটি কোম্পানির কর্মকর্তা। শর্মা হাউজের বিল্ডিং এর লক্করঝক্কর লিফটে জীবন বাজি রেখে উঠছি আর ভাবছি সবাই এখানে আর আসা যাবে না। কিন্তু এমন একজন পাঠিকা পেলে লেখক যে বারবার আসবেন, আসতেই হবে। ঠিক কবিতার মতো সুন্দরী এই পাঠিকা আপ্যায়ন করালেন চমৎকারভাবে। কবিতা পছন্দ করেন তাই প্রিয় লেখকের কবিতার বই পেয়ে খুশি অনেক। সুন্দর একটা স্মৃতি রেখে আমরা গেলাম আমার সেকেন্ড লাস্ট ডেস্টিনেশন টিএসসি। একজন নেত্রী যে সেখানে তার প্রিয় লেখকের অপেক্ষায়।
লিজা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি স্টাডিজে মাস্টার্স করছেন, পাশাপাশি রাজনীতির সাথেও জড়িত। তার সাথে আছেন চারুকলায় পড়া তার বান্ধবী ফালাকও। গত বছর বইমেলায় ‘মানবজনম’ এর ক্রেজ দেখে লেখকের প্রথম বই পড়া। তারপর আর থামাথামি নেই, তার আনা লেখকের ‘অন্দরমহল’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছেন ফালাক। তাই দুই বান্ধবী মিলেই চলে এসেছেন সারপ্রাইজড হতে। লেখকের হাত থেকে বই নিয়ে, অটোগ্রাফ নিয়ে উচ্ছ্বসিত পাঠিকাদ্বয় খুশিমনেই তাই বিদায় নিলেন লেখকের কাছ থেকে।
ধানমন্ডির ক্যামেলিয়া টুম্পা ছিলেন আমাদের সর্বশেষ গন্তব্য। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত তখন, ব্যস্ত ঢাকা আরও ব্যস্ত হয়ে উঠেছে যেন। কিন্তু লেখক সাদাত হোসাইন আর রকমারি টিমের যেন ক্লান্তি নেই। এরকম ভালোবাসা পেলে আসলে ক্লান্তিরাও দূরে চলে যায়। শেষ গন্তব্যে পৌঁছে পাঠক-লেখকের এক অসাধারণ মিলনমেলা দেখলাম যেন আমরা। পূর্ব পরিচিত পাঠিকা নার্ভাস হয়ে গেলেন প্রিয় লেখককে বাসার দরজায় দেখে। কিছুদিন পরেই স্থায়ীভাবে ইতালি চলে যাচ্ছেন সপরিবারে, কিন্তু যাবার আগে তার ইচ্ছা ছিল প্রিয় লেখকের সাথে দেখা করার। কী অদ্ভুতভাবেই না সে ইচ্ছে পূরণ হয়ে গেল রকমারি ডট কমের সৌজন্যে। লেখককে ও রকমারি টিমকে দুটি সুন্দর স্যুভেনির উপহার দিয়ে মুগ্ধ করলেন এই পাঠিকা।
এমন অভিজ্ঞতাপূর্ণ এক দিন তখনও যে শেষ হয়নি। প্রায় ২০০ বইয়ে অটোগ্রাফ দেয়া তখনো বাকি। লেখকের বাসায় যাচ্ছিলাম সবাই কিন্তু কারও মনে এতটুকু ক্লান্তি ছিল না, অশান্তি ছিল না। কারণ পুরো দিনটির অভিজ্ঞতাই যে বাঁধাই করে রাখবার মতো। ঢাকার মতো ব্যস্ত শহরে বই নিয়ে ছুটছিল কিছু মানুষ, যাদের মাঝে একজন লেখক; চাওয়া ছিল পাঠকের সান্নিধ্য। সেদিক থেকে অপূর্ণতা তো নেই ই বরং ভালোবাসা ও সম্মানে উদ্ভাসিত হয়েছে লেখক, রকমারি বারবার। লেখক ও পাঠকের মাঝে সৃষ্টি হওয়া দূরতের এই ভ্যাকুয়াম সরিয়ে দিয়ে তাদের এক করার পথে একটি ছোট্ট পদক্ষেপ নিয়ে রকমারি ডট কম গর্বিত বোধ করছে। আর এই গর্ব শুধু আমাদের না, এই গর্ব সব লেখকের, সব পাঠকের, বইপড়ুয়া সকল মানুষেরও বটে।
সাদাত হোসাইন এর মুখেই শুনুন বাইন্ড দ্যা গ্যাপের গল্প