বেশী বেশী বই পড়ার ৭ টি কার্যকর উপায়

1
2707
সফলতা এবং সম্পদের ক্ষেত্রে বই পড়া বিশাল বড় চাবিকাঠি। অথচ ব্যস্ত বয়:প্রাপ্ত হিসেবে এই অভ্যাস থেকে আমরা আসলে কিভাবে লাভবান হতে পারি? আমি অনেকবার বলেছি, সফলতার ক্ষেত্রে বই পড়া একটি প্রধান চাবিকাঠি। বিল গেটস কিংবা এলোন মাস্ক- এর মতো বিশ্বসেরা ধনী এবং সফল মানুষেরা তাদের সময়ের একটি বিশাল অংশ বই পড়ার পেছনে ব্যয় করেছেন। গবেষণা প্রমাণ করেছে যে পড়ার অভ্যাস মানসিক চাপ কমায়, মনোযোগ বৃদ্ধি করে এবং দীর্ঘ ও স্বল্প মেয়াদী স্মৃতিশক্তির উন্নতি ঘটায়।
বই পড়ার উপকারি দিকগুলো আমাদের কাছে পরিষ্কার। অথচ এটি সময় সাপেক্ষ- অথচ ব্যস্ত পেশাদারীত্বের কারণে বই পড়ার সময় বের করা এবং এ থেকে যথাযথ উপকারিতা লাভ করা উভয়েই প্রায় অসম্ভব।
সৌভাগ্যবশত, Harvard Business Review এর বিশেষজ্ঞগণ বেশ কিছু উপায় আবিষ্কার করেছেন যাতে করে বই পড়াকে প্রতিদিনের অভ্যাস হিসেবে নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ থেকে যথাযথ পরিমাণ উপকৃত হওয়া সম্ভব।
নিচের সাতটি অভ্যাস সময়ের সাথে আপনার বই পড়ার অভ্যাসকে আরো উন্নত করবে:
. হাল ছেড়ে দিতে শিখুনঃ
মাঝে মাঝে আপনি একটি বই শুরু করার পর টের পাবেন যে বইটি পড়ে আপনি মজা পাচ্ছেন না কিংবা কোনো অর্থ খুঁজে পাচ্ছেন না। তবুও হয়তো আপনি যেভাবেই হোক এটি শেষ করবেনই কারণ আপনি মাঝপথে হাল ছেড়ে দিতে রাজী নন!
Gretchen Rubin সর্বোচ্চ বিক্রিত বই The Happiness Project এর লেখক এবং Harvard Business Review এর অভ্যাস বিশেষজ্ঞ, এর মতে- “বিজয়ীরা হাল ছেড়ে দেয় না”- এমন মনোভাব আপনার বই পড়ার অভ্যাসের ক্ষেত্রে হয়তো বা কার্যকরী হবে না।
রুবিন এর মতে, বই পড়ার ক্ষেত্রে তাড়াতাড়ি হাল ছেড়ে দেওয়াটা ভালো বই পড়ার ক্ষেত্রে অধিক সময়ের যোগান দেবে। ব্যাপারটাকে এভাবে চিন্তা করা যায়- প্রতি বছর ৫০,০০০ বই প্রকাশিত হয়, সময়গুলো পছন্দের বই পড়াতে কাজে লাগানোই কি যথেষ্ট যৌক্তিক নয়?
আপনি যদি একটি বই পড়তে আসলেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করেন, তবে ছেড়ে দিন। নিজেকে দোষী ভাবার কারণ নেই।
. সবখানেই সময় লুকিয়ে আছে:
Stephen King , লেখক হিসেবে সাফল্যের পিছনে যিনি বই পড়াকে গুরুত্ব  দেন, তার মতে কেউ যদি তার পদচিহ্ন অনুসরণ করতে চায়, তবে সেক্ষেত্রে তিনি প্রতিদিন ৫ ঘন্টা বই পড়ার উপদেশ দেন।
এমন উদ্যোক্তা- যার হাতে কিনা সময় সীমিত হিসেবে এই উপদেশটা প্রথমে আমার জন্য হাস্যকর মনে হয়েছিল। তবে এই ভুল পরে ভেঙেছিল যখন আমি বুঝতে পারলাম লেখক কিভাবে চলাফেরা করার সময় বা বাড়ির বাইরেও বই পড়ার জন্য সময় খুজে নেন।
একজন সাধারণ পথিকের জন্য কোন একটি পার্কে বই পড়াটা বেশ রকমের পাগলামিই বটে। অথচ তারা যদি জানতো যে এই একই অভ্যাস King কে ৩৫০ মিলিয়নের বেশি সংখ্যক বই বিক্রি করতে সাহায্য করেছিল , তাহলে তারা হয়তো এরপর থেকে সাথে করে অন্তত একটি পেপার হলেও নিয়ে ঘুরবেই।
Parisha’র মতে, “দিনের প্রত্যেক অংশে সময় লুকিয়ে আছে। আর তারা সব মিলে অনেক বেশি সময়ের সৃষ্টি করে।” আমি বলছি না যে আপনি আপনার বোনের বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে বসে বসে বই পড়ুন, তবে প্রায় সবখানেই বই পড়ার সুযোগ রয়েছে।
. আপনার উদ্দেশ্য গোপন রাখুন:
বিজ্ঞান প্রমাণ করে যে, যখন আপনি কোন লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ করছেন, তখন সেই উদ্দেশ্যের কথা অন্যদের বলে বেড়ানোর ফলে সফলতার হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়।
২০০৯ সালের একটি গবেষণামূলক পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, যে সকল শিক্ষার্থীরা মনস্তত্ত্ববিদ হতে চেয়েছিল এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাদের কর্মকান্ড লিখে সেসব গবেষণায় নিযুক্ত ব্যক্তিদের সাথে শেয়ার করেছির, তারাই তাদের লক্ষ্য অর্জনে কম সফল হয়েছিল। আর যে দলের শিক্ষার্থীরা তাদের কর্মকান্ড শেয়ার করে নাই, লক্ষ্য অর্জনে তাদের সফলতার হার ছিল তুলনামূলক বেশি।
মানুষ যখন তাদের লক্ষ্য অন্যদের সাথে শেয়ার করে, তখন তাদের কঠোর পরিশ্রম করার ব্যাপারে উৎসাহ কমে যায়। তাই আপনি যদি অনেক বই পড়ার জন্য ঠিক করেন, তাহলে আপনার উদ্দেশ্য প্রকাশ করুন-লিখেও ফেলতে পারেন, তবে সেটা নিজের কাছেই রেখে দিন।
  1. DISTRACTION কমিয়ে আনা
একটা ছোট্ট ঘটনার মাধ্যমে জিনিসটা ব্যাখ্যা করি- আমার পরিচিত একজন বেশি বেশি বই পড়ার জন্য একবার তার টিভিটাকে লিভিং রুম থেকে সরিয়ে বেসমেন্টে নিয়ে রাখলেন আর লিভিং রুম ভরে ফেললেন বুকশেলফ দিয়ে। HBR এর মতে, আমাদের বন্ধুটি নিজের বই পড়ার পরিমাণ বাড়ানোর জন্য সাইকোলজিস্ট Roy Baumeister এর বিখ্যাত Chocolate Chip Cookie and Radish” নামক পরীক্ষাটির অনুকরণ করেছে।
একটু খোলাসা করে বলা যাক- এই পরীক্ষাটিতে একদল ক্ষুধার্ত মানুষদের বেকটি বেশ বড়সড় ধাঁধা দিয়ে তার সমাধান বের করতে বলা হয়েছিলো। কিন্তু সমাধানপর্ব শুরু করার আগে তাদের মধ্যে একাংশকে কোনো খাবার দেয়া হয়নি; আরেকাংশকে চকলেট কুকি দেয়া হয়েছিলো কিন্তু সেটি না খেয়ে মূলা খেতে বলা হয়েছিলো। খাওয়াদাওইয়া পর্ব শেষে তারা যখন ধাঁধাটি সমাধান করতে বসলেন তখন যাদের কুকি দেয়া হয়েছিলো তারা আগেভাগেই হাল ছেড়ে দিলেন। ব্যাপারটিকে Roy Baumeister ব্যাখ্যা করেন এমনভাবে যে – কুকি খাওয়ার ইছাটা সংবরণ করতে করতেই তাদের ইচ্ছাশক্তির অনেকখানিই ফুরিয়ে এসেছিলো এবং একারণেই তারা ধাঁধা সমাধান করার সময় নিজের সর্বোচ্চটা দিতে পারেনি।
তাই যদি বেশি বেশি বই পড়তে চান তাহলে সবকিছু সরিয়ে রেখে বই পড়ার একটা আলাদা পরিবেশ তৈরী করে ফেলুন এবং নিজের ইচ্ছাশক্তিকে সম্পূর্ণভাবে বই পড়ার জন্য ব্যবহার করুন।
 
  1. বইয়ের হার্ডকপি পড়া
ডিস্ট্র্যাকশন এড়িয়ে পড়ার প্রতি মনোযোগ দিতে চাইলে ই-বুক না পড়ে হার্ডকপি পড়ার চেষ্টা করুন।  স্মার্টফোন-যেটি কিনা ইন্টারনেটের সাথে সংযুক্ত, যাতে কিছুক্ষণ পর পর ইমেইল চেক করা যায় কিংবা Pinterest এ খানিক্ষণ রেসিপি দেখে নেয়া যায়- হাতে নিয়ে বই পড়ার চেয়ে মলাটে বাঁধানো, একগাদা কাগজে ছাপানো বই পড়লে পড়ার প্রতি মনোযোগ দিতে পারবেন বেশি।  ইবুক না পড়ে হার্ডকপি পড়ার আরো কিছু সুবিধা আছে- যে যুগে বিনোদন এবং মিডিয়ার সবটাই আস্তে আস্তে স্ক্রিনের দিকে সরে আসছে, সে সময়টাতে হার্ডকপি হাতে নিয়ে মনটাকে একটু ভিন্ন কিছুর স্বাদ দেয়াটা মন্দ না।

 

  1. দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টানো
মিডিয়া স্ট্র্যাটেজিস্ট এবং লেখক, Ryan Holiday  বেশ জোর দিয়ে বলেন যে বেশি করে পড়তে চাইলে বই পড়ার প্রতি নিজের দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টানো দরকার।  তিনি বলেছেন, “ আপনার বই পড়ার ব্যাপারটা ‘কাজটি আমার করতে হবে’ এমন না ভেবে বরং খাওয়া-দাওয়া কিংবা শ্বাস নেয়ার মত স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিতে হবে।  অর্থাৎ জিনিসটা যেনো ‘ইচ্ছা হলো তাই করলাম’ এর পর্যায়ে না থেকে বরং স্বাভাবিক প্রবৃত্তিতে পরিণত হয়। ”
যারা সফল, সাফল্য লাভের আকাঙ্ক্ষা তাদের মনে সারাক্ষণই থাকে- একারণে না যে তারা সাফল্য নিয়ে ঘনঘন ভাবেন বরং এজন্য যে এই আকাঙ্ক্ষা সহজাত; অন্তত তাদের জন্য।  আপনিও চাইলে আজ থেকেই বই পড়ার শখটাকে প্রতিদিন নিজের প্রায়োরিটি লিস্টের শুরুতে রেখে পছন্দনীয় একটি অভ্যাসে পরিণত করে ফেলতে পারেন।
 
  1. ভালো বইয়ের তালিকা সংগ্রহ
সিদ্ধান্ত নিতে নিতেও যে আমাদের মধ্যে ক্লান্তি চলে আসে তা কি জানেন? এরকম ক্লান্তি পারতপক্ষে খারাপ কেননা এহেন ক্লান্তি আপনার ইচ্ছাশক্তিকে কমিয়ে দেবে।  ফলে বই পড়ার মত নতুন কোনো অভ্যাস গড়ে তোলা আপনার জন্য কষ্টকর হয়ে উঠবে।  প্রতিবছর হাজারখানেক বইয়ের লিস্ট ঘেটে পড়ার জন্য বই খুঁজে বের করাটা অত্যন্ত ক্লান্তিকর। এবং এর ফলে বইয়ের একটা পাতা পড়ার আগেই আপনি বইটি পড়ার আগ্রহ অনেকাংশে হারিয়ে ফেলবেন।  এজন্যই HBR এর মতে ভালো বইয়ের লিস্ট তৈরী না করে লিস্ট খুঁজে বের করা ভালো।
সৌভাগ্যক্রমে, Bill Gates এবং Mark Zuckerbergমত মানুষেরা প্রতিনিয়তই তাদের পঠিত বইয়ের তালিকা শেয়ার করেন।  গুগলে খানিকক্ষণ ঘাটাঘাটি করলেই আপনি তাদের কোন কোন বই পড়েছেন-পড়েন-পড়বেন সে সম্পর্কে তথ্য পেয়ে যাবেন।
 বিল গেটস কে নিয়ে সকল বই রকমারি ডট কম-এ
হয়তো Warren Buffet এর মত দিনে পাঁচশো পেজ পড়া কিংবা Bill Gates এর মত বছরে পঞ্চাশটা বই পড়া সম্ভব হবেনা।  কিন্তু আশা করা যায় এই সাতটি টিপস কাজে লাগিয়ে এ বছর থেকেই আপনারা – আগের তুলনায় বেশি বেশি বই পড়তে পারবেন, আপনার তথ্য অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা উন্নত করবেন এবং বই পড়ার যত উপকারী দিক আছে তার সবগুলো উপভোগ করতে পারবেন।

 


আরো দেখুনঃ
যে ৯ টি বই পালটে দিতে পারে আপনার চিন্তার জগত
বিশ্ববরেণ্য কোটিপতিদের জীবন পাল্টে দেওয়া ৭টি বই
যে ১৫ টি ভুল কখনো সফল মানুষেরা করেননি
দর্শনের যে ১০ টি বই আপনার অবশ্যই পড়া উচিৎ

1 COMMENT

LEAVE A REPLY