প্রদোষে প্রাকৃতজন এবং একজন শওকত আলী

0
978
ক্ষিণায়নের দিনকুলায় কালস্রোত এবং পূর্বরাত্রি পূর্বদিন যেগুলোকে বলা হয় ত্রয়ী উপন্যাস এবং যার জন্য শওকত আলী ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬) লাভ করেন।
এই ত্রয়ী উপন্যাস সর্ম্পকে শওকত আলী এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন,
ষাটের দশকের মানুষের মধ্যে চিন্তাভাবনার যে পরিবর্তন আসছে, সেটাই ‘দক্ষিণায়নের দিন’ যার মানে হচ্ছে শীতকাল আসছে। ‘কুলায় কাল স্রোত’ হচ্ছে পরিবর্তন যেখানে আঘাত করছে। আর ‘পূর্বরাত্রি পূর্বদিন’ হচ্ছে নতুন সময়টি আসার একেবারে আগের সময়টি। মূলত ষাটের দশকে আমাদের মধ্যবিত্ত এবং সমগ্র সমাজব্যবস্থায় একটা পরিবর্তন আসে। নতুন একটা চিন্তা-চেতনা দ্বারা আলোড়িত হয় পুরো সমাজ। ধ্যান-ধারণা চাল-চলন জীবনব্যবস্থায় একটা পরিবর্তনের সুর বেজে ওঠে। সেসবই উপন্যাসে আনতে চেয়েছি।

পিঙ্গল আকাশ উপন্যাস রচনার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে তার উজ্জ্বল রেখাপাত। প্রধানত উপন্যাসকেই তিনি চিন্তা-চেতনা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তার শেষ রচনা সম্ভবত ‘মাদারডাঙ্গার কথা (২০১১)। তবে ‘পিঙ্গল আকাশ’ প্রকাশের পর বোঝা গিয়েছিল সাহিত্যের এ বন্ধুর পথে তিনি সিন্ধু তীরে বালু নিয়ে খেলতে আসেননি। উপন্যাসে মঞ্জুর আত্মহননে ফুটে ওঠে ক্ষয়িষ্ণু ও মূল্যবোধহীন বিকৃত একটি নগরসংস্কৃতি বিকাশের চিত্র। এ প্রসঙ্গে মনে রাখা ভালো, শওকত আলীর উপন্যাসের সব চরিত্রই কম-বেশি আত্মোন্নয়নকামী। এর পেছনে যে লেখকের ব্যক্তিজীবনের সংগ্রাম-সংকটের ছায়াপাত ঘটেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশের ষাটের দশকের গল্প-উপন্যাসে গ্রাম ও শহরকেন্দ্রিক নাগরিক জীবনের যে আশা-আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন এবং সংগ্রামশীলতা কিংবা সামষ্টিক জীবনে সামাজিক-রাজনৈতিক যে প্রভাব পড়েছে, তা উপন্যাসে তুলে ধরার ক্ষেত্রে শওকত আলীর দক্ষতা অসামান্য। একই সময় তিনি উপন্যাস-গল্প রচনার একটি স্বাতন্ত্র্য ভাষা গড়ে তুলেছেন সফলভাবে; যে ভাষা সহজেই সাধারণ পাঠককে আকর্ষণ করে। আর এভাবেই ‘পিঙ্গল আকাশ’ থেকে ‘মাদারডাঙ্গার কথা’ তার সবগুলো উপন্যাসে আমরা যে শওকত আলীকে আবিষ্কার  করি সেখানে তিনি ভিন্ন পথরেখা নির্মাণ করেছেন- যা শুধুমাত্র শওকত আলীর কথাসাহিত্য নির্দেশ করে।
শওকত আলীর জন্ম পশ্চিমবঙ্গের দিনাজপুর জেলায়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ তার অন্তর-বাহির কুড়ে কুড়ে খায়। নিজ ভূমি হারানোর বেদনা থেকে তিনি আর মুক্ত হননি। তার কথায় বিভিন্নভাবে উঠে আসতো পৈতৃক বাড়ি, বাড়িতে একটা পুকুর ছিলো, পুকুরের জল কাকচক্ষু যাকে বলে; একটা কুকুর ছিলো খুব প্রভুভক্ত। বাড়ির পাশে মেলা হতো, কীর্তন, যাত্রা, সার্কাস- মোদ্দাকথা তিনি সংস্কৃতিসমৃদ্ধ এলাকায় বড় হয়ে উঠেছিলেন। কাছ থেকে সেসব দেখেছেন। তারপর একদিন সকালে শোনা গেল- এদেশ আর তাদের নেই! সেই কষ্ট তিনি লালন করেছেন।
দেখুন অসাধারণ কথাসাহিত্যিক শওকত আলীর সকল উপন্যাস
দুই.
জন্মভূমি ত্যাগের পরও সার্বিক শান্তি কখনোই আসেনি। বাংলাদেশে এসে প্রত্যক্ষ করেছেন পাকিস্তানের নব্য ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ-নির্যাতন। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষ ঐক্য গড়ে তুলে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু স্বাধীনতার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি পুরোপুরি। আগে যারা সামন্ত ছিলো, সেখানে নতুন সামন্ত এলো। শ্রেণী বদলালো, শ্রেণী চরিত্র রয়েই গেল। ফলে স্বপ্ন ভাঙার নতুন কষ্ট জমা হলো। এই স্বপ্ন ভঙের বেদনা তার ট্রিলজিতে (দক্ষিণায়নের দিন, কুলায় কালস্রোত, পূর্বরাত্রি পূর্বদিন) লিখেছেন তিনি। এখানে বাংলাদেশের যাত্রালগ্ন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা-উত্তর অস্থির রাজনৈতিক বাস্তবতা। সামরিক শাসনের অবরুদ্ধ কালের চিত্রসহ সচেতন নাগরিক শ্রেণীর ভিতর-বাহির অসাধারণ দক্ষতায় অঙ্কন করেছেন। একাত্তর-পরবর্তী বাঙালির জীবন দেখতে গিয়ে শওকত আলী বাঙালি জাতি-গোষ্ঠীর পেছনের ইতিহাসও এক নজরে দেখে নেয়ার প্রয়াস গ্রহণ করেছেন ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসে। এই উপন্যাসে তিনি বাংলায় মুসলিম আগমন, সেনদের অত্যাচার-নির্যাতনে অতিষ্ঠ সমাজের নিচু শ্রেণীর অবস্থা পাঠকের সামনে হাজির করেছেন। এখানেই থেমে যাননি। দেখিয়েছেন সমাজের এই নির্যাতিত শ্রেণীই প্রকৃতপক্ষে ছিল বাঙালির আদি-বংশধর। শওকত আলী ইতিহাসশ্রয়ী এ উপন্যাসে স্পষ্টভাবেই দেখিয়েছেন, বাঙালি জাতিকে প্রাচীনকালে তো বটেই মধ্যযুগে এবং আধুনিক যুগেও তার ভাষা-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি রক্ষার সংগ্রাম করতে হয়েছে।
‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসটি শওকত আলীকে রাতারাতি খ্যাতির শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। এই উপন্যাসে তিনি বিশ শতকের প্রায় শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে সুদূর পেছনপানে তাকিয়ে ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণের শিল্পভাষ্য রচনা করেছেন। লক্ষণ সেন ২৮ বছরের রাজত্বকালের শেষ বছরগুলোতে বার্ধক্যে এবং ক্ষমতা প্রয়োগে খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। অনেক সময় শাসনকার্য পরিচালনা তার জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছিল। এই দুর্বলতার সুযোগে সাম্রাজ্যের ভেতরে ঐক্য ও সংহতিতে ফাটল ধরে এবং কিছু স্বাধীন শক্তির উত্থান ঘটে। এ ছাড়া শক্তিমান ও ক্ষমতাধরদের অরাজকতা দেশময় ছড়িয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে তুরস্কের অভিযানকারী বখতিয়ার খিলজি অনায়াসেই বাংলা দখল করে নেন। এই বিশৃঙ্খল পটভূমিতে গ্রামবাংলা কীভাবে অস্থির হয়ে উঠেছিল, ক্ষমতাধরদের তাণ্ডব ও লুটপাটে কীভাবে মানুষ গ্রামছাড়া হয়েছিল এবং এর মধ্যে কিছু নরনারী বিচিত্র সম্পর্কের টানাপোড়েনে কীভাবে রক্তাক্ত হয়ে উঠেছিল, সেসবের নানামাত্রিক বুনন-বিন্যাসে গড়ে উঠেছে ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসটি।
উল্লিখিত উপন্যাসের সবচেয়ে বড় শক্তি এর ভাষা; প্রতিটি পদে, পদবন্ধনে। সাধু ভাষার শব্দভান্ডার বিস্ময়কর নৈপুণ্যে তিনি ব্যবহার করেছেন চলিত ভাষার গড়ন-সৌষ্ঠবে। সম্ভবত ষোড়শ শতকের ভাষিক জগতের ধ্রুপদি আবহের স্বাদ পাইয়ে দেওয়ার জন্য তিনি এই অসাধারণ ভাষাপ্রপঞ্চ বেছে নিয়েছেন। কমলকুমার মজুমদারের ভাষাব্যবহারের সঙ্গে আমাদের পরিচয় আছে, বাক্যগড়নের রীতির সঙ্গে পরিচয় আছে। সেখানে কাঠিন্য নির্ধারণই যেন কর্তব্য। কিন্তু সে অন্য অভিধা। শওকত আলী ভাষার মধ্যে পুরে দিতে চেয়েছেন জীবনের প্রতি গভীর মমত্ববোধের আলো, আনন্দ আর অফুরন্ত প্রবাহ। বাক্যের গড়নসৌষ্ঠবের মধ্যেও তার এই অফুরন্ত শক্তির পরিচয় মেলে। পথ চলতে চলতে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত শ্যামাঙ্গ সম্মুখে যে প্রহেলিকা দেখতে পায়, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে শওকত আলী লিখেছেন: ‘সে বড় বিচিত্র অবস্থা। এখন স্মরণ হলে কৌতুক বোধ হয়। অবশ্য তখনও তার কৌতুক বোধ হচ্ছিল। কৌতুক বোধ হবারই কথা। কারণ প্রথমে তুমি দেখলে বংশবীথিকার বিনত শাখায় একটি বনকপোত। পরক্ষণে সেই ক্ষুদ্রাকার পাখিটি হয়ে গেলো একটি ঊর্ধ্বলম্ফী মর্কট মুহূর্তেক পরে সেই মর্কটও আর থাকলো না, নিমেষে হয়ে গেলো একটি বিশুদ্ধ বৃক্ষশাখা। চক্ষু কচালিত করলে অতঃপর তুমি আর কিছুই দেখলে না। বংশবীথিকা না, বনকপোত না, মর্কট না, বিশুদ্ধ শাখাও না।’
আরোও দেখুনঃ যেভাবে লেখা হলো প্রদোষে প্রাকৃতজন
এই রচনার মধ্যে প্রায় প্রতিটি শব্দই তৎসম। কিন্তু কোথাও দুর্বোধ্যতার লেশ নেই। অধিকন্তু এমন একটি সহজতা বিরাজমান, যা পাঠকের বোধের জগত তৃপ্ত করে। লেখকের ‘কুলায় কালস্রোত’ ‘পূর্বরাত্রি পূর্বদিন’ নতুন সময় আসার একেবারে আগের সময়ের বয়ান। মূলত ষাটের দশকে আমাদের মধ্যবিত্ত এবং সমগ্র সমাজ ব্যবস্থায় একটা পরিবর্তন আসে। নতুন একটা চিন্তা-চেতনা দ্বারা আলোড়িত হয় পুরো সমাজ। ধ্যান-ধারণা, চাল-চলন জীবন ব্যবস্থায় একটা পরিবর্তনের সুর বেজে ওঠে। সে সবই উল্লিখিত দুটো উপন্যাসে তিনি তুলে ধরেছেন। শওকত আলীর উপন্যাসের জগৎ নির্মিত হয়েছে মূলত মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীকে ঘিরে; এদের জীবনের টানাপোড়েন, জীবনবোধ, সংগ্রাম প্রভৃতি তার উপন্যাসের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে উঠে এসেছে। নগরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত সমাজ মূলত তার উপন্যাসে ঘুরেফিরে এসেছে। একই সময় তার রচনায় সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা, ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ও স্থান করে নিয়েছে।
শওকত আলীর প্রথম উপন্যাস ‘পিঙ্গল আকাশ’-এ নাগরিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নগ্ন, নীতিহীনতা, রুচির বিকৃতি, কামনার করাল গ্রাসের পরিণাম, উপন্যাসের কেন্দ্রীয় নারী-চরিত্র মঞ্জুর দীর্ঘশ্বাস, রক্তরক্ষণ ও আত্মহনন শিল্পিত হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে দিয়ে বোঝা যায় তার সাহিত্য রস আস্বাদন বা প্রদানের ক্ষমতা। এই মধ্যবিত্ত জীবনেরই নানাকৌণিক দিকের প্রতিফলন ঘটেছে লেখকের অন্যান্য উপন্যাসে।
শওকত আলীর রচিত উপন্যাসের তালিকা দীর্ঘ না হলেও একেবারে সংক্ষিপ্ত নয়। জীবনভর সাহিত্যসেবায় নিয়োজিত থেকে গুণী এই কথাশিল্পী বাংলা একাডেমি এবং একুশে পদকসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বামঘেঁষা রাজনৈতিক চেতনা দ্বারা তিনি উত্তাল যৌবনে প্রভাবিত হলেও তার রাজনৈতিক বিশ্বাস ও ধারণা স্বচ্ছ। তার ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারণা কতটা স্বচ্ছ সে কথার প্রমাণ আমরা পাই ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসে।

 

LEAVE A REPLY