‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’- জীবনকে কেন্দ্রে রেখে কদম কদম হেঁটে অগণিত গল্পের ইশারায় রচিতঃ ইফতেখার মাহমুদ

মানিকগঞ্জের জহিরুল হক-জাহেদা বেগম তাদের পাঁচ সন্তানকে নিয়ে রোজকার যে ছিমছাম জীবন কাটাচ্ছিলেন—বিরাশি সালের মার্চে দেশজুড়ে সামরিক শাসন চেপে বসল বলে, তাদের সেই জীবন ভিন্ন পথ ধরল, যেমন পথ বদলালো বাংলাদেশও। একই কেন্দ্র থেকে অসংখ্য বৃত্ত যেভাবে নির্মিত হতে পারে, একইভাবে এক জীবনকে কেন্দ্রে রেখে কদম কদম হেঁটে অগণিত গল্পের ইশারা রচিত হয়, তাই লেখা রইল আহমাদ মোস্তফা কামালের ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ উপন্যাসে- পাঠপ্রতিক্রিয়া লিখেছেন ইফতেখার মাহমুদ।

0
1111
লম্বা জীবনকেও একদিন একদিন করেই যাপন করতে হয়। ঘর বারান্দা উঠোনের মধ্যে কাটিয়ে দেয়া জীবন একই সাথে গ্রহ,মহাবিশ্ব এসবের মধ্যেও থাকে। মানিকগঞ্জের জহিরুল হক-জাহেদা বেগম তাদের পাঁচ সন্তানকে নিয়ে রোজকার যে ছিমছাম জীবন কাটাচ্ছিলেন—বিরাশি সালের মার্চে দেশজুড়ে সামরিক শাসন চেপে বসল বলে, তাদের সেই জীবন ভিন্ন পথ ধরল, যেমন পথ বদলালো বাংলাদেশও। একই কেন্দ্র থেকে অসংখ্য বৃত্ত যেভাবে নির্মিত হতে পারে, একইভাবে এক জীবনকে কেন্দ্রে রেখে কদম কদম হেঁটে অগণিত গল্পের ইশারা রচিত হয়, তাই লেখা রইল আহমাদ মোস্তফা কামালের নিরুদ্দেশ যাত্রা’ উপন্যাসে।
এই গল্প বাংলাদেশের। একটি পরিবারের স্নেহ, মায়া, ভালোবাসা আর স্বপ্নের। জন্মভূমি ছেড়ে এসে ‘নিজদেশ’-‘ভিনদেশ’ এইসব রাজনৈতিক বোঝাপড়া মনোজগতে মোকবেলার। এই গল্প প্রকৃতির নিবিড়ে অবগাহনের। প্রেমের। সেনাপতির রাজা হওয়ার গল্পও এ। পোকায় কাটতে শুরু করা দেশটিকে সুরক্ষার প্রচেষ্টার। দেশের জন্য খুইয়ে দেয়া জীবনের অনুচ্চারিত বহু প্রশ্নের উত্তরের। নিরর্থকতার দোলাচল মোকাবেলার। বন্ধুদের গল্পও এটা বটে। বন্ধুতার গল্প। শিউরে ওঠা ত্যাগের, নিবেদনের অবিচলতার, সঁপে দেয়ার সত্যের। জনম জনমের ভালোবাসার। জন্মমৃত্যুর বহতার। গমনের গল্প এটি, নিরুদ্দেশে।
২.
দীর্ঘসময় ধরে সাথে থাকার কারণেই বোধহয়, যেকোনো দীর্ঘলেখা পাঠ শেষে যে ছেদ ঘটে, তাহার শূন্যতা সামলানো মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ যখন শুরু হয়, সজীব দশম শ্রেণির। ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছর (তিনশ সাতষট্টি পৃষ্ঠা, লিপইয়ারের চেয়েও একদিন বেশি)ওর জীবনের সাথে কাটিয়ে, নিজের জীবনে যে সংযুক্তি ঘটে, তার এক দুঃসহ ভার আছে, মন মাথা মগ্নতা থেকে বেরুতে সময় নেয়।
আহমাদ মোস্তফা কামালের ছবি আঁকাটা, আঁকা ছবি বলে ধরা যাচ্ছে না শেষে এসে। প্রাণ বসানো এই লেখায় যেন তিনি কিছু প্রমাণ করতে চাচ্ছেন না। যেন এতদিন পর কাউকে করে দেখানোর কিছু নেই। মুন্সিয়ানার সতর্কতা অনুপস্থিত। আগলখোলা কবিততাড়িত ভাষায় বলে যাচ্ছেন সেই গল্পটি যার জন্য দীর্ঘদিবস দীর্ঘরজনী তিনি অপেক্ষা করেছেন। জীবন বলেছেন, জীবনী অগ্রাহ্য করে।
আমরা যখন একটা ঘরে বসে কোনোদিকে তাকাই, ধরা যাক, সামনের সোফাটার দিকে চোখ রাখি যখন, তখনো পেছনের জানালাটার কথা ভুলে যাই না। সোফার ওপরে পড়ে থাকা খয়েরিরঙা বেল্ট আর পাশের আড়ংয়ের ব্যাগ দেখে যা বুঝি, যা মনে আসে, তার সাথে এও মনে থাকে আজ পনেরোই ফেব্রুয়ারি ছোট—বোনটার জন্মদিন, ওকে শুভেচ্ছা জানানোর কথা যেন না ভুলে যাই। এই যে সামান্য বসে থাকার মুহূর্তটিতে অসামান্য অনেক কিছু থাকে, বেছে দুতিনটাকে আমরা সামনে আনতে পারি, কোনোটাকেই ভুলে গিয়ে অসত্য করে দিতে চাই না যেমন, কামাল-ও তার এই লেখায় তাই করেছেন। বেছে লিখেছেন, কিন্তু একই সময়ের অনেককিছুকে ঠাঁই দিয়েছেন, কয়েকদিক থেকে দেখে নিয়ে তবেই লিখেছেন। রশোমনের চোখ তাকে সময়কে দেখিয়েছে নিবিড় করে। পড়তে পড়তে তাইই মনে হয়।
৩.
সজীব, তার বড়ভাই হাসিব, ভাবি রুনু, আরেক ভাই-ভাবি রাজীব-শান্তা, আপা তৃণা, পিঠাপিঠির বোন স্বর্ণা—এদের মা জাহেদা বেগম, বাবা জহিরুল হক, যিনি তার বাবার পীড়াপীড়িতে ভারত ছেড়ে পাকিস্থানে আসা ঠিকানাহীন জীবনবিভোর মানুষ—এদের গল্পে লেখক পাঠককে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন যেমন, তেমনি একই সময়ে ধীরে ধীরে পরিচয় ঘটে, সম্রাটের বেশপরা সিপাহশালারের সাথে। গোলযোগ যোগ করে ঝংকার। কামালের গল্পগদ্যের যে প্রবন্ধ-দোষ, সত্যের মতো তা-ই তার কণ্ঠস্বর, তাই তার বিশেষ। সামরিক কূট পদক্ষেপ আর স্বাভাবিক বিকাশের বিপর্যয় যে জীবনের সামনে দাঁড় করায় আমাদের, সংগ্রামে লড়াইয়ে মাঝে মাঝে তার তাত্ত্বিক বোঝাপড়া জরুরী বলেই বোধ হয়। কামালের গদ্যশৈলী তাই এই উপন্যাসের সাথে একাকার হয়ে মিশে যেতে পারে। আটকায় না কোথাও।
উপন্যাসটির প্রথম পর্যায়ের জীবনে কোথাও কোনো কলহ নেই। দুঃসহ যাতনা নেই। অসুবিধাগুলো যেন গেরো পাকায় না। আপনিই খুলে যায় জটিল জট। কেউই অপরের হাতে পায়ে গায়ে কদর্য কাদা ছুঁড়ে দেয় না। এই পর্যায় পার করে কাহিনিক্রম প্রবেশ করে তছনছের এক প্রবল জীবনে। গল্প এগিয়ে যায় অন্য আবেশে। কিছুই সেখানে মনের মতো নয়। জীবন ভাঙতে থাকে। স্মৃতি ধুয়ে ধুয়ে নোংরা জল। মৃত্যু, হত্যা, দুর্ঘটনা, দাম্পত্যের হীনতা জেঁকে বসে কাহিনিতে। সংঘাত পাঠককে আঘাত দেয়। খোসা খসে পড়ে। জিহ্বার ভেতরের দিকে ছোটমাছের বিঁধে যাওয়া কাঁটা বহনের মতো, আরামের জীবন বয়ে চলে চির-অস্বস্তির যাতনা, স্থির হয় না আর তা।
নৌকা এগিয়ে চলেই, যে মৃদু ঢেউগুলো আসে তারা তাকে আটকাতে না পারলেও দোলা দিয়ে যায়। উপস্থিতি জানান দেয়া এইসব ঢেউ নদীবুকে ভাসতে থাকা নৌকাজীবনকে নিথর-অনড় থাকতে দেয় না। এই উপন্যাসে কিছুদূর পরপরই দোলা দেয়ার দোহাই জুটে যায়। ঢেউয়ের মতো করে চিন্তা আসে। উপন্যাসটিতে অনর্গল ঘটনা ঘটে চলে না। চলতে চলতেও ভাবা আছে। জীবনের মধ্যে চিন্তার অবসর আছে। রাজনৈতিক ঘটনার একটা বড় অংশ রাজীবের মনোদেশে উঁকি দেয়া ভাবনা আর দ্বন্দ্বের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সাধারণত গল্পের মানুষেরা একটার পর একটা ঘটনা দুর্ঘটনা পার করে, কখনো গল্পের দরকারে ভাবে, গল্পের দরকারেই তারা উদাস হয়। অদরকারের জীবনটা লেখা হয় কমই। যা ঠিক মূল গল্পের সাথের নয়, অথচ জীবনের অংশ, (কী নয় জীবনের অংশ?),—বড় আর দীর্ঘ লেখায় সেসবকে জায়গা দেয়ার ফুরসত আছে। এই উপন্যাসে সেরকম অতলে নেমে পড়ার, ভাবনা-গহনে স্থাণু হওয়ার সুচিন্তিত আয়োজন আছে। এগুতে এগুতে আচ্ছন্ন হয়ে যেতে হয়।
৪.
এরশাদকে চেনার জন্য এই বই চিরদিনের পাঠতালিকায় যুক্ত হয়ে গেল। সামরিক সরকারের হঠকারিতা, ছদ্মকল্যাণাকাঙ্ক্ষা, স্তাবকতোষণ, ঋজুতাকে কূটকৌশলে নমনীয় পদলেহনে রূপান্তর—সব, ছোট করে হলেও এসেছে গল্পে গল্পে। এদেশের দুর্নীতিবৃক্ষের চারাগাছগুলো যে তারই রোপণ করা এই সত্য নিপুণে, শৈলীতে আঁকা রইল পাতায় পাতায়। হাসিনা-খালেদা’র তিরাশি, চুরাশি, পঁচাশি, ছিয়াশি, সাতাশি, আটাশি, নব্বই—পুনর্বার ফিরে দেখা হলো। অতীতের হাতেই ভবিষ্যতের মানচিত্র—কথাটা মিথ্যে নয়।
কতভাবে যে এল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তাল সেসব দিনের কথা, ডাকসু নির্বাচন, ক্যাডার রাজনীতি, সংসদ নির্বাচন, হ্যাঁ-না ভোট, সপ্তম সংশোধনী, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফ্রিডম পার্টি দিয়ে বেতারে টিভিতে ফিরে আসা, ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষ—আরো অনেক কথা—এতো কিছুকে মাধুর্যে সৌকর্যে বহন করল এই লেখা। বিভোর হবেন যত্নশীল পাঠকমাত্রই। অনেক ছোট কথাও হেলা ফেলা করে ফেলে দেয়ায় নয়। এই যে সামরিক সরকার সোডিয়াম লাইট লাগালো, হলুদ সোডিয়াম পরিষ্কারকে করে দিল ঘোলা, সামরিক সরকার বারবার স্পষ্টতাকে ঝাপসা করে আড়ালে নিয়ে যেতে চায়, তাই জানলাম রূপকে।
৫.
‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ একসময় রূপ নেয় বন্ধুদের গল্পে। তুমুল বন্ধুত্বে বুঁদ হয়ে থাকা সজীব, অমিত, অপু মামুনদের বন্ধু-ছাড়া জীবনের গল্প হয়ে ওঠে একফাঁকে। নিজেদের কাছে প্রত্যাবর্তনও আছে। প্রত্যেকের জীবনকে জায়গা দিয়েছেন লেখক। পরিবারগুলোকে চিনতে দিয়েছেন পাঠককে। তাদের প্রেম পরিসর পেয়েছে লেখায়। শারীরিক সংলগ্নতায় লেখকের এক অনাড়ষ্ট মন আমাদের চোখে পড়ে। গল্পে সেসবের অকুণ্ঠিত উপস্থিতি নারী পুরুষসম্পর্ককে উদার মর্যাদা দেয় বৈকি। দুয়েকজায়গায় অবশ্য অতিরিক্তও ঠেকে শরীরীজীবন।
বন্ধুদের ত্যাগ এবং বিচ্ছেদ এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এই উপন্যাসের। মারাত্মক এবং মানবিক সে উপাখ্যানাংশ।
মৃত্যুদৃশ্যকে এত সহজিয়া বিভোর ঢঙে আঁকা কমই দেখেছে বাংলাভাষার পাঠক। নির্মোহ শান্তির মৃত্যু, গভীর ভালোবাসায় জীবন-বিদায়কে এই যে লিখে রাখা, অন্তত দুটো মৃত্যু দৃশ্য আছে, পাতা উল্টে বের করে ফের পড়ে নিতে ইচ্ছে করবে সংবেদনশীল পাঠকের। তবু ফুরাবে না। ফের ফিরতে হবে।
৬.
উপন্যাসের ভাষা, বাক্যগড়ন, বর্ণনা, কোথাও পীড়ন নেই। কবিতাকে প্রাণে বসতে দিলে গদ্যে যে ছন্দ উপ্ত হয়ে যায়, তার প্রতিফলন লেখায় চোখে পড়বে। বাক্যের পুনরাবৃত্তি আছে বেশ কয়েকজায়গায়। অন্তত বারো পনেরো জায়গায়। লেখার কালে চিন্তার ছেদ থাকার ফলেই হয়তো এটা হয়েছে। বিরতি দিয়ে লেখার ফলেও এটা হয়ে থাকতে পারে। যে নাম একবার বলা হয়েছে, তাকে আবার পরিচয় করিয়ে দেয়ার মতো, কিংবা বলা কথা আবার সরুস্বরে পুনর্বার বলা—এরকম ঘটেছে কয়েকক্ষেত্রে।
কিছু বিশেষণ বোধহয় লেখকের প্রিয়তার জন্যেই প্রশ্রয় পেয়েছে বেশি। ভারি সুন্দর, ভারি অবাক, ভারি ভালো লাগত, ভারি চঞ্চলমতি মেয়ে। ‘অন্য’ শব্দটিও পক্ষপাতিত্বের মনে হচ্ছে। অন্যকোথাও অন্য কোনোখানে, এরা অন্যরকম মানুষ, জীবনের অন্য সব আয়োজন। জোড়াশব্দের ব্যবহারেও চোখে পড়ার মতো আধিক্য আছে। ‘নিঃসঙ্গতা এবং নির্জনতা’ বা ‘স্বস্তি ও আনন্দ’ —এরকম সব শব্দ পাশাপাশি থাকছে অনেক জায়গায়।
‘দৌড়ের ওপর’ থাকা বলে এক অভিব্যক্তি আছে। আশির দশকের শেষে এই বাক্যবন্ধ চালু ছিল কি না, নাকি এই শব্দগুচ্ছ আসলে এই কালের, সে প্রশ্ন জাগে মনে। বইয়ের মাঝখানে আরেক জায়গায় পড়লাম, ‘আড্ডাবাজি’, এটাও সাম্প্রতিকের শব্দ বোধহয়। পড়ার সময় সময়ের সাথে বেমানান লাগে। অবশ্য গল্পের শেষে আরও তিন-চার জায়গায় ‘আড্ডা’ শব্দটিই লেখা হয়েছে, আড্ডাবাজি লেখার দরকার হয়নি।
দুতিন স্থানে বানান নিয়ে খটকা লাগে। উনার (ওনার না হয়ে), উনাদের (ওনাদের না হয়ে)—বানানগুলো কি প্রথমার নিজস্ব নির্বাচন? অবশ্য প্রথমারও বানান ফসকে যাচ্ছে ইদানীং। বইয়ের শুরুতে নাম, ঠিকানা,পরিচয়ের ঘরে লেখা আছে, A Nobel (Novel নয়) in Bangla by Ahmad Mostafa Kamal, প্রথমার কাছে সামান্য সচেতনতা আশা করা অতিরিক্ত দাবী নয় বোধকরি।
শব্দ নিয়ে আরেকটা কথা তোলা দরকার। দ্বিত্ব শব্দের ব্যবহার মৌখিক রীতিকে লেখায় প্রাণবন্ত করে তোলে এ নিয়ে দ্বিধা নেই কোনো। কামাল তার এই লেখায় এই কাজটি করছেন কয়েকজায়গায়। এই যেমন, ‘রাজনীতি-ফাজনীতি’ বা ‘বলে-টলে’ এইসব শব্দযুগলকে জায়গা দিয়েছেন। গতি জুটেছে গদ্যের তাতে।
কামাল খুব সংবেদনশীল, নিঃসন্দেহে। ধর্ষণদৃশ্যে ধর্ষণ কথাটা কোথাও লেখেননি তিনি। পরেও উচ্চারণ করেননি। লিখেছেন, মেয়েটিকে ‘ক্ষতবিক্ষত’ করল তারা। ধর্ষণ না লিখে, নতুন শব্দে দৃশ্যটি নির্মাণ করেছেন তিনি। যে লেখক চালু শব্দের বিপরীতে দাঁড়ান তিনি ভাষায় তুচ্ছ নন।
৭.
কোথাও কোথাও গল্পকে দ্রুত টানতে দেখা যায়। ধীরে বলার ভঙ্গিটি ব্যহত হয়। শেষের আগে আগে যেন গল্পটিকে জোর করে টেনে বর্তমানে আনা হলো। মাঝখানে আরো কতগুলো অধ্যায় যেন নেই। দশবারোটা অধ্যায় বা আরো শ খানেক পাতা জরুরী ছিল মনে হয়।
মাঝে মাঝে গল্পের কথক সীমা অতিক্রম করে বেশি ভেতরে ঢুকে পড়েছেন, এ কথা বললে কি সীমা অতিক্রম করা হবে? তার বেমানান কণ্ঠস্বরে লয় কেটে গেছে কোথাও কোথাও। সংবাদপত্রের কণ্ঠ যেন উপন্যাসে হাজির হয়ে পড়েছে। ‘প্রাইভেট সেক্টর ফুলে ফেঁপে উঠেছে’- এইভাবে চরিত্রটি ভাবছে না, যেন লেখক ২০১৭ সালে এসে বুঝে গিয়েছেন, তাই পেছনে গিয়েও এই ঢঙ্গে কথা বলছেন। বেঢপ লাগে।
কোথাও কোথাও, সামান্য যদিও, কিছু বিষয়ে খটকা লাগে।
সজীব ছোটসন্তান, তার ডাকনাম খোকা, তার মা তার বাবাকে ‘খোকার বাবা’ বলে সম্বোধন করছেন। বড়ছেলে হাসিব, মেয়ে তৃণা বা রাজীব, স্বর্ণা—এরা খোকার আগে জন্মেছে, খোকার জন্মের আগে কি জাহেদা বেগম তার স্বামীকে কোনো নামে ডাকতেন না? খোকার বাবা না হয়ে জহিরুল হকের তো হাসিবের বাবা হওয়ার কথা।
পিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনা আটাশে ফেব্রুয়ারি লেখা আছে, এটা কি চোদ্দই ফেব্রুয়ারির ঘটনা নয়?
তারপর, জেলা পার করে, উপজেলায় উপজেলায় সামাজিক জীবনে এরশাদকে যেভাবে বরণ করে নেয়ার দৃশ্য রচিত হয়েছে, সামরিক সরকার যে দেশে দেশে গ্রামে গ্রামে প্রিয় হয়ই, সেটার ব্যাপারে আলোকপাত নেই, বিশ্লেষণ থাকলে মজবুত হত। এরশাদকে যে নয় বছর মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল, সমর্থন জোটাতেও যে সে পেরেছিল, সেদিকেও ইংগিত নেই। CMLA যে, শুধু চিফ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর নয়, বরং এরশাদকে বিদ্রূপে(CMLA –এর আরেক ইলাস্ট্রেশন) ক্যান্সেল মাই লাস্ট এনাউন্সমেন্টের প্রবক্তা হিসেবে দেখা হতো, যার মধ্যে তার সামরিক সরকারের কঠোরতার বদলে আপসের ইংগিত রয়েছে, যে জায়গায় কৌশলে তিনি অন্যদের চেয়ে অগ্রবর্তী ছিলেন, তার টিকে থাকার ইতিহাস তার গৃহীত নীতির মধ্যেই আছে, এসবও উপন্যাসে বিশ্লেষিত হতে পারত হয়তো।
৮.
বড় যাত্রা ছোট ছোট পদক্ষেপের যোগফলমাত্র। দীর্ঘ আখ্যানকেও মানবজীবনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম চিরগুলোকে গ্রাহ্য করতে হয়। আতশ কাচের কদর আছে, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রকে দেখে ফেলতে পারে বলেই।
নিরুদ্দেশ যাত্রা উপন্যাসটায় বহু কিছুকে, ছোট ছোট বহু ঘটনাকে, মনোযোগ দিয়ে, যত্ন করে গাঁথা হয়েছে। কল্পনার গভীরে নামতে দেয়া আছে। মিথকে জায়গা ছাড়া হয়েছে। সব প্রচলিতকে হটিয়ে দেয়া হয়নি। লেখাটির অদ্ভুত শক্তি হলো লেখার ভেতরের জীবনকে বিশ্বাস করা যায়। প্রকৃতির পাশে গভীরভাবে দাঁড়ানো আছে, ইতিহাসকে গ্রাহ্য করেছেন, ঠাট্টা হাসিকে-ও ফুরসত পেতে দেখি। বিষণ্ণতার প্রেম যেমন আছে, তুমুল প্রেমিক-মাতালকেও জায়গা দেয়ার কথা ভুলে যাননি লেখক। চরিত্রগুলোকে নিয়ে ভাবতে বসলে খেই হারিয়ে যায়। কত দিকেই না ছড়িয়েছে গল্প। বিপুলবিস্তারি এই যাত্রার সাথী হইলাম—আনন্দ হয় ভেবে।
হাজারো অভিজ্ঞতার ভ্রমণ ছিল যেন। আর স্মৃতির কাছে সমর্পণের শপথ করিয়ে নিতেও তার আপত্তি আছে দেখে নতুনত্বের স্বাদ মেলে। ‘স্মৃতি বা স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলতে পারাটাও মানুষের জন্য খুব প্রয়োজনীয় ব্যাপার। সবাই যদি অনন্তকাল ধরে এসব ধরে রাখতে চাইত, তাহলে সারা পৃথিবীই হয়ে উঠত সমাধিক্ষেত্র। মানুষ সমাধির ওপর জীবনের সৌধ গড়ে তুলতে জানে বলেই চলমান থাকে।’
বইয়ের ভেতরে ভেতরে অসংখ্য দার্শনিক জিজ্ঞাসায় মতামত দিয়েছেন লেখক, গল্প বলার ছলে। সেসবের গুরুত্বও কম নয়। বইটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ—এমন কথা বলতে ইচ্ছে করছে, পাছে না রত্ন সনাক্ত করার কারণে জহুরীর নামদাবী রত্নকে ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে, সংবরণ করছি নিজেকে।
রোজকার আয়নায় নিজের দিকে তাকালেও, চোখে পড়ে না কতটা পথ পার করে এসেছে এই মুখমণ্ডল। অথচ পুরনো ছবির এ্যালবাম ঠিকই মনে করিয়ে দেয় পার হয়ে আসা পথ কম নয়। ভুলে যাওয়া ছবির মতো, বাংলাদেশের কয়েকজন মানুষের জীবনকে সময়ের জাদুঘরে এনে রাখা গেল এই বইয়ে। পাতা উল্টে বারবার দেখে নেয়া যাবে বাংলাদেশের জীবন।
শেষে শুধু এইটুকু বলে যেতে চাই, মানুষকে স্বাধীনভাবে জীবন যাপন করতে দিলে পাণ্ডুলিপির তরে তার কোনো আপস থাকে না।
সত্য তো এই, লিখিত হওয়ার জন্য মানুষ জীবন যাপন করে না।
সব জীবনের ভেতরেই যে নিরুদ্দেশ যাত্রা আছে, নিজের সাথে চলতে চলতে তাকে খুঁজে পাওয়া, তাহার দিকে নিজেকে টেনে নেয়াই এই লেখার না-লেখা মন্ত্রতুল্য কথাখানি।
অশেষ কষ্ট-স্বীকার করা নিবেদিত গদ্য লেখকের কঠোর শিল্পী-জীবন আমাদেরকে ক্রমশ ঋণী করে দেয়। সবকিছুর জন্য আহমাদ মোস্তফা কামালকে জানাই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

LEAVE A REPLY