আমার দেশের মাটির ঘ্রাণে- তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পায়ে হেঁটে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লব্দ গল্প

লিখেছেন জাহাঙ্গীর আলম শোভন, যিনি পায়ে হেটে বাংলাদেশের ১৮ টি জেলা ভ্রমণ করেছেন।

0
179
যখন যেখানে থাকি আমার কেবল মন ছুটে যায় কৃষকের শর্ষে ফলানো হলুদ গালিচা বিছানো মাঠে। স্বপ্নের ঘোরে ঘুরে আসি সোনানী ধান ক্ষেত কিংবা গাড় সবুজ ভূট্টার পাশ দিয়ে। দিগন্তজোড়া গ্রামের কুড়েঘর ছুয়ে হৃদয়ে বাজে পালতোলা নৌকার গলুইয়ে বসে গাওয়া মাঝির গানের সুরে। ক্ষেতের আল ধরে হেঁটে যায় কৃষানী গামছায় বেঁধে পান্তাভাতের বাটি। গরুর গাড়ি চলে ক্যাচর ক্যাচর আরো কতো কী!
ছোট বেলায় বইয়ে পাতায় ঘুরে বেড়িয়েছি বিশ্বময়। বিশ্ব জয়ের কথা, সুইস ফ্যামিলি রবিনসন, হোয়াইট ফ্যাং, সার্কাসের কুকুর, হ্যান্সব্যাক অব নোতরদম, একশ আশি দিনে পৃথিবী ভ্রমণ, চাঁদের পাহাড়, রবিনসন ক্রুশো আরো কত বাস্তব অভিযান আর কল্পনার রোমাঞ্চকর গল্প। বাস্তবে কখনো যাওয়া হয়নি মিসিসিপি নদীর পাশ ঘিরে জংলীদের আস্তানায়। যাওয়া হয়না ব্যবিলনের শুন্য উদ্যানে, যাওয়া হয়না গ্রীণল্যান্ডের বরফগলা নদীর ধারে যাওয়া হয়নি কখনো কালাপানি দ্বীপের জনালয়ে। অথবা নায়াগ্রার উৎসমুখে কিংবা নীলনদের সূত্রমুখে। তাতে কি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ষোলোকোটি মানুষের দেশ। এখানে হাটে ঘাটে মাঠে সর্বত্র কেবল মানুষ আর মানুষ। তাই মানুষ দেখতে, মানুষের জীবন ও তাদের কাঁদামাখা হাসি, ধুলিমাখা স্বপ্ন দেখে সে এক দেশদেখার অভিযানে পায়ে হেঁটেই বেরিয়ে পড়ি ২০১৬ সালের ১২ ফ্রেব্রুয়ারী।
সেদিন পদযাত্রা শুরু করি বেলা এগারোটায় বাংলাবান্ধা জিরোপয়েন্ট থেকে ১৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বিকেল ৫টার মধ্যে তেঁতুলিয়া উপজেলা শহরে। বিকেলে মহানন্দা নদীর সূর্যাস্ত দেখলাম। মহানন্দাকে দেখলে মনে পড়ে যাবে রবীন্দ্রনাথের সেই ছোটনদী কবিতা।
পথ নয় যেন এক উদার উন্মুক্ত বাংলাদেশ আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। পথের ধারে চা বাগান ভূট্টাক্ষেত, গরুর গাড়ি সরিষার ঘানি এসব দেখে দেখে পথচলার আনন্দ কষ্টকে ছাপিয়ে যায় সত্যি। পঞ্চগড় শহরে পৌছি তৃতীয় দিন। এখানে সুপারীগাছের খাট, আর নাপিতদের ফুটপাতে বসে চুলকাটার দৃশ্য। মনে গেঁথে আছে এখনো।
জাহাঙ্গীর আলম শোভনের লেখা বই দুটি দেখুন এখানে 
তারপর দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির তারপর সৈয়দপুর, রঙপুরের ভিন্নজগত, মিঠাপুকুর পাড়ি দিলাম বেগম রোকেয়ার বাড়ীর সামনে দিয়ে, পীরগঞ্জ ড. ওয়াজেদ মিয়ার বাড়ীর গেট মাড়ালাম একইদিনে, পরেরদিন গেলাম গোবিন্ধগঞ্জ।
বগুড়ার স্বাতন্ত্রটা খুব সহজের চোখে পড়ে।  হিউয়েন সাঙ এর বিবরণ থেকে আরো জানা যায়, অঙ্গের পর তিনি পুন্ড্রে এসেছিলেন। তিনি ক লা তু নামে এক বড় নদীর কথা উল্লেখ করেন। গবেষকরা মনে করেন এটি করতোয়া নদী। মূলত করতোয়া নদীকে ঘিরেই পুন্ড্রবর্ধন এর সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল।
 
বগুড়া থেকে সিরাগঞ্জে। এখানে স্বাধীনজীবন নামে একটি পরিবেশ বাদী সংগঠনের হয়ে একটি স্কুলে শিশুদের পরিবেশ বিষয়ক সচেতনতার কথা বললাম।তারপর স্বপ্ন দুয়ার নামে একটি সামাজিক সংগঠনের অভ্যর্থনা পেলাম। উষ্ণ ভালোবাসা জানালো সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স। জেলা প্রশাসক মহোদ্বয় সময় দিলেন কিছুক্ষণ।
এখানখার শষ্যক্ষেত, জালের মতো বিস্তৃত নদী, পুরনো বিস্তৃত গাছ গাছালি, বিস্তৃত যমূনা সব কিছু মিলিয়ে যেন মানুষের মনকে একটা বিস্তৃতি দিয়ে গেলো।
ততদিনে পথে পথে মানুষের বিশেষকরে ড্রাইভারদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছি। গাড়ির চালকরা হাত নাড়িয়ে আসা যাওয়ার পথে অভিবাদন জানায়। রোদে পুড়ে তখন কালো হওয়ার আর বাকী নেই। সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইলমির্জাপুর থেকে আশুলিয়া,তারপর ঢাকা। আবদুল্লাপুরে আসার পর ফুল দিয়ে বরণ করলো গাজীপুরের শিশুর জন্য আমরা সংগঠনের তিন তরুন। পরের জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আমরা ফেনীবাসীর ব্যানারে আয়োজিত হলো গণসংবর্ধনার।
ঢাকা ছেড়ে নারায়নগঞ্জে আবার ঐহিত্যকে হাতছানিতে প্রাচীন বাংলা ও লোক ঐতিহ্য এর সাথে পরিচয়।  লোকশিল্প যাদুঘর পরিদর্শণ শেষে পরের দিন চান্দিনা। মানে ৮ মার্চ। ২০১৬। কৃষিভিত্তিক কুমিল্লার পরিচয়কে স্বার্থক করে দিলো আলু, টমেটা আর বাঙ্গিক্ষেত। মার্চ এর দশ তারিখ তখন কুমিল্লা ময়নামতি শালবহনবিহার দেখছিলাম।  শালবিন বিহার পরিচ্ছন্নতায়ও হাত লাগালাম।
পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, বিহার, মুড়া দেখে রওনা  সুয়াগাজী, চৌদ্দগ্রাম হয়ে ফেনী আমি।  সেদিন রাতে আমার থাকার ব্যবস্থা ছিলো জেলাপ্রশাসকের মেহমান হিসেবে সার্কিট হাইসে। ফুলেল শুভেচ্ছা জানালেন ডিসি আমিনুল আহসান কামাল। সম্ভবত এখন খুলনায় আছেন।
ফেনী থেকে বারইয়ার হাট হয়ে সীতাকুন্ড। ইকোপার্কে দেখা ও ছবিতোলা হলো। তারপর ভাটিয়ারী হয়ে ভাটিয়ারী হয়ে চট্টগ্রাম।  বেশ কয়েকটা সামাজিক অনুষ্ঠান যোগ দিয়েছি। রাতে ছিলাম পুলিশ ভাইদের সাথে সিএমপির ব্যারাকে। পরেরদিন রোটারী ক্লাবের অনুষ্ঠানে দরিদ্র নারীদের চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা দান করে দেই।  এর মধ্যে সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমীতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দেই। পরের দিন রক্তদান করি রেড ক্রিসেন্টে, সাথে ছিলো সিটিজি ব্লাড গ্রুপের কর্মীরা।
কর্ণফূলি ব্রিজ, আনোয়ারা, চন্দনাইশ, পাঁচলাইশ পেরিয়ে ঠেকে গেলাম চুনুতি গিয়ে। ছোট একটি পাহোড়ের উপর বাংলোতে রাত কাটিয়ে বনের মধ্য দিয়ে কক্সবাজারের পথ ধরি। একটি রাত কাটালাম কেরানীহাটে।
কক্সবাজারে অপ্রতাশিতভাবে ফুলেল শুভেচ্চা জানিয়ে বরণ করলো প্রেট্রোনাইজ হাউজিং নামে একটি কোম্পানী, কক্সবাজার ই শপ ও হোটেল উপল। আন্তরিক আতিথিয়েতা গ্রহণ করলাম কক্সবাজারের থ্রি স্টার হোটেল বেস্ট ওয়েস্টার্ণ হেরিটেজ এর।
কক্সবাজার থেকে ২৫ মার্চ সমুদ্রকুল ধরে রওনা দিলাম টেকনাফের পথে। একপাশে পাহাড় অন্যপাশে সমুদ্র এভাবে প্রায় আশি কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলাম।  এরমাঝে একরাত গ্রামবাসীর সাথে কাটালাম।  টেকনাফে একদিন থেকে গন্যমান্য ব্যক্তি যেমন চেয়ারম্যান, টিএনও সবার সাথে দেখা করে। ২৮ মার্চ দুপুরের পর টেকনাফ শহর থেকে পথচলা শুরু করি শেষ ১৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়ার জন্য।
তখন মনের ভেতর কি উত্তেজনা কাজ করছে সেটা বুঝিয়ে বলতে পারবনা। ৪৬ দিন ধরে পায়ে ব্যথা, ফোসকা অবর্ননীয় কষ্ট সব কিছু অবসান হতে চলেছে মাত্র কয়েক ঘন্টা পর। আমি কাংখিত সাফল্য ছুতে চলেছি।এরমধ্যে ঢাকা থেকে আমার ৩ বন্ধু এসে যোগ দিয়েছেন ছোটনভাই, শিপন ভাই এবং আশরাফভাই যোগ দিয়েছেন স্থানীয় বন্ধু সাংবাদিক জসিম স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তি ও বিজিবির সিনিয়র অফিসার।
শাহপরীর দ্বীপের গোলার চরের শেষ বিন্দুতে যেখানে আছড়ে পড়ছে নীল সাগরের ঢেউ সেখানে দেশ ও মানুষের প্রতি উৎসর্গ করে শেষ সীমানায় পত পত করে উড়িয়ে দিলাম লাল সবুজের নিশাণ। সে পতাকা পত পত করে উড়ছিলো আর জানান দিচ্ছিলো এই দেশ ও জাতির আগামী দিনের সম্ভাবনার কথা।
 কি আনন্দ আকাশে বাতাসে। বিজয়ের এই আনন্দের সাথে পৃথিবীর কোন সুখেরই তুলনা হয়না। ধন্যবাদ জানালাম ট্যুর বিডির ইমরান ভাই, বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন, পাটার তৌফিক রহমানসহ সকলকে।
এই দীর্ঘ পথযাত্রায় মানুষ দেখেছি, মানুষের জীবন দেখেছি। এমন অনেক কিছু দেখেছি জেনেছি যা অন্যকোনোভাবে ভ্রমণ করলে সম্ভব হতো না। আমি প্রায় হাজার পঞ্চাশেক মানুষের সাথে মিশেছি, কথা বলেছি। তাদের ভাবনা জেনেছি। প্রান্তিক মানুষদের জীবন দেখেছি। মানুষ দেখার অমোঘ নেশায় আবারো বেরিয়ে পড়তে চাই আরো বেশী বড়ো বা লম্বা কোনো পথের সন্ধানে। ফিরে এসে আপনাদের আবার শোনাবে সে গল্প। মাটি ও মাটির মানুষের ঘ্রাণ আমাকে ঘুমের মধ্যে, কাজের মধ্যে, আনভোলা দুপুরে ঢেকে ঢেকে যায়? যেন বলে কোথায় আছ বঙ্গবালক তোমাকে যে ডাকছে বাংলার শিমুল বিছানো গাঁয়ের পথ, মহুয়াঝরা বুনো রাস্তা, আর সরল হাসি ঝরা নগর বন্দরের অলি গলি।
আর যদি পুরো গল্পটা শুনতে চান। তাহলে এ বিষয়ে লেখা আমার বইদেখব বাংলাদেশ গড়ব বাংলাদেশপড়ুন রকমারি ডট কম থেকে।

LEAVE A REPLY