এক বইপাগলের গল্প

0

60

এক বইপাগলের গল্প

  • 0
  • #খোশগল্প
  • Author: Zahid Hasan
  • Share

লোকে ইদানিং আমাকে পাগল বলে, ‘বইপাগলা’ বলে ডাকে। পাগলামি বলতে কোন হম্বিতম্বি-চিৎকার চ্যাঁচামেচি করিনা আমি, লোকে আমাকে পাগল বলে কারণ আমি প্রতি বছর বইমেলার সময় প্রতিদিন বইমেলায় এসে এ মাথা থেকে ও মাথা হেঁটে বেড়াই। আমার জটা চুল,কাঁধে ঝোলানো বইয়ের বিশাল ঝোলার সাথে কেতাদুরস্ত পোশাক বিসদৃশ লাগে বলেই হয়তো সহজে চোখে পড়ে যাই মানুষের। বইপাগলা নামটা খারাপ লাগেনা আমার,কারণ পাগলের মতোই বই খুঁজি ও বই পড়ি আমি। বই পড়ার শুরুটা যদি বলতে হয় তাহলে বইমেলার কথাই প্রথমে মনে আসে। মায়ের কোলে করে প্রথম এসেছিলাম বাংলা একাডেমির এই আঙিনায়। তার হাত ধরেই বই পড়ায় হাতেখড়ি, তার হাত ধরেই বইমেলায় বইয়ের রাজ্যে প্রথম প্রবেশ। মনে আছে, তখন স্টলগুলো বিশালকায় মনে হতো, টেবিলে রাখা বইগুলোর নাগাল পেতাম না বলে মা কোলে নিয়ে বই দেখাতো। যে কয়টা বই কেনা হতো সবগুলো বুকে আগলে নিয়ে বাসায় আসতাম। মনে হতো কেউ আমার বই বুঝি ছিনিয়ে নেবে। রাক্ষস-খোক্কস,দৈত্য-দানো,আলাদিন-সিন্দাবাদ-হারকিউলিস-পিটার প্যান-হ্যারি পটার সবই যেন ছিল তখন যক্ষের ধন। তারপর ধীরে ধীরে তিন গোয়েন্দা,মাসুদ রানা,ওয়েস্টার্ন অনুবাদ,জাফর ইকবাল হয়ে হুমায়ূন আহমেদে মগ্ন হওয়া। হুমায়ূন আহমেদের হিমুর সাথে খালি পায়ে পথ চলতে চলতেই দেখা সুনীল-শীর্ষেন্দু-বুদ্ধদেবের সঙ্গে। কিশোর পাশা আর মিসির আলি যেন আমার সামনে বসেই সব রহস্যের জট খুলছেন। অন্যদিকে রবিবাবু আর লালন সাঁই হিমুকে নিয়ে মনের মানুষের খোঁজে জগত অন্বেষণ করছেন। মাথার ভেতর নতুন নতুন গল্প সাজাতাম আমি। সেই গল্পের নায়ককে নিতাম সুনীলের কাছ থেকে তো নায়িকা হতো হুমায়ূন আহমেদের গল্পের নায়িকা, তাদের সন্তান হতো জাফর ইকবালের মেকুর মতো দুষ্টু কেউ আর রাশেদের মতো সাহসী। অ্যালান কোয়াটারমাইনের সাথে মাসুদ রানাকে পাঠিয়ে দিতাম আফ্রিকার কোন জঙ্গলে গভীর কোন রহস্যের খোঁজে। বড় হচ্ছিলাম আর আমার কল্পনার জগতও বিস্তৃত হচ্ছিল। যেদিন মানসিক রোগের ডাক্তারের চেম্বারে শুয়ে ছিলাম আর মায়ের কাছে ডাক্তারকে বলতে শুনেছিলাম- আপনার ছেলে সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত, তখন বুঝতে পেরেছিলাম যে কল্পনার চরিত্রগুলো এখন আর কল্পনায় নেই বাস্তবে চলে এসেছে। এরপর জীবনে অনেক চড়াই-উৎরাই, অনেক দুঃখ-দুর্দশা পার হয়ে বাসা ছেড়ে যাযাবরের মতো বের হয়ে গেলাম। মায়ের মৃত্যুর পর আসলে বই বাদে আর কোন পিছুটান ছিলও না। তারপর আর কি যেখানে সুযোগ পাই, সেখানেই বসে পড়ি বই নিয়ে। বইমেলার সময় প্রতিদিন বইমেলায় না আসলে ঠিকমতো নিঃশ্বাস নিতে পারি না। বইপড়ুয়া মানুষগুলোর মাঝে যেন নিজেকেই খুঁজে বেড়াই। একদিন রকমারি ডট কম থেকে একজন এসে কথা বলতে চাইলো, ওরা নাকি অনলাইনে বই বিক্রি করে। শুনে বেশ খুশি হলাম, কারণ দেখেছি যে সব মানুষের বইমেলায় এসে বই কেনার মতো সময়-সুযোগ হয়ে ওঠে না আর বইমেলাও তো হয় কেবল এক মাসই। রকমারি থেকে নাকি সারা বছরই বই কেনা যায় নিজের পছন্দমতো। আলাপ শেষে আমাকে একটা টিশার্টও দিলো যেখানে লেখা- আমরা যদি রাখি ভালো তবেই থাকবে ভালো বাংলাদেশ। কথাটা মনে এসে খট করে লাগলো, নিজের সত্ত্বার সাথে মেলাতেও পারলাম যেন। আমি বই পড়ে নিজেকে ভালো রাখি, নিজে ভালো থাকি, এভাবে সবাই যদি নিজেকে ভালো রাখে তাহলে দেশও ভালো থাকবে। একটা মোবাইল কিনেছি বই কেনার টাকা দিয়ে কিছুদিন আগে। না…না… বইমেলার বই ঠিকই আছে আমার কাছে, বইপাগলা হিসেবে পরিচিতি পাওয়ায় প্রকাশকরা স্টল থেকে ফ্রিতেই আমাকে বই উপহার দিয়েছেন তাই সেই টাকা দিয়ে মোবাইল কিনে ফেলেছি। এখন রকমারি থেকে ফোন করে বই কিনবো সবসময়। আমার মতো বইপাগলাদের জন্য এরকম কিছু বইপাগল প্রতিষ্ঠানের আসলেই প্রয়োজন আছে।

Write a Comment