নবীজির (স.) মতো রমজান এর সকল প্রস্তুতি নিয়েছেন তো?

রমজান

প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্যই সে-কাজের প্রস্তুতির গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। প্রস্তুতি যত কার্যকর ও উপযোগী হয়, কাজটি তত গোছালো ও সুন্দর হয়। ইবাদতের পূর্বে প্রস্তুতি গ্রহণ করা নবীজির সুন্নত। বিভিন্ন হাদিস থেকে জানা যায় নামাজ ও হজের মতো রাসুল (স.) পবিত্র রমজানকে উপলক্ষ্য করেও প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন, উম্মতকে মহিমান্বিত মাসে ইবাদতের জন্য প্রস্তুত হতে বলতেন। সুতরাং সমাজের নেতৃস্থানীয় আলেম ও ইসলামবেত্তাতের উচিত নবীজির সে-সকল প্রস্তুতির কথা জনসাধারণকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং মুসলিম নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের দায়িত্ব হলো সে-মতে আমল করা। রাসুল (স.)-এর জীবন ও কর্মপন্থা অনুসারে রমজানের পূর্বে প্রস্তুতি হিসেবে বেশ কিছু করণীয় হলো:

রমজান প্রাপ্তির জন্য দোয়া করা-

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে দোয়াই সকল ইবাদতের মগজ। (তিরমিজি, হাদিস ৩২৯৩)

আমলের তাওফিকের জন্যও দোয়া করা নবীজির স্বভাব ছিল। কুরআনের দিকে বর্ণনাধারার দিকে লক্ষ করুন, সূরা বাকারায় পর পর তিনটি আয়াতের ১৮৩ আয়াত থেকে ১৮৫ ক্রমান্বয়ে রমজানে রোজা ফরজ হওয়ার বিধান বর্ণনা করেছে। ঠিক তার পরের ১৮৬ নং আয়াতটিতে দোয়ার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে এবং ১৮৭ নং আয়াতে আবার রোজার একটি বিধান বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন : “(হে নবী) আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে বস্তুতঃ আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নিই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে। কাজেই আমার হুকুম মান্য করা এবং আমার প্রতি নিঃসংশয়ে বিশ্বাস করা তাদের একান্ত কর্তব্য। যাতে তারা সৎপথে আসতে পারে।” (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৬)

তাই আমরা দেখি, রমজান প্রাপ্তির জন্য রাসুল (স.) রজব মাস থেকেই দোয়া করতেন। আনাস (রা.) বলেন : যখন রজব মাস প্রবেশ করত তখন রাসুল (স.) বলতেন : “হে আল্লাহ, রজব ও শাবান মাস আমাদের জন্য বরকতময় করুন এবং আমাদেরকে রমজান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিন। (তাবারানি, হাদিস ৩৯৩৯;  বাইহাকি, হাদিস ৩৫৩৪)

হাদিসবেত্তাদের মধ্যে স্বতঃসিদ্ধ বিষয় হলো, এ-হাদিসে এমন কোনও দলিল নেই যে, রজব মাসের প্রথম রাত্রিতে এটা বলতে হবে। বরং এটি বরকতের জন্য সাধারণ দোয়া—এ দোয়া রমজানের পূর্ব পর্যন্ত বলা যাবে।

পূর্বসূরি অনেকে আলেম থেকে রমজান পাবার জন্য দোয়া করার কথা বর্ণিত হয়েছে। ইবনে রজব রহ. বলেন : মুয়াল্লা বিন ফজল বলেছেন, তারা ছয় মাস দোয়া করতেন রমজান মাস পাওয়ার জন্য এবং ছয় মাস দোয়া করতেন তাদের আমলগুলো কবুল হওয়ার জন্য। ইয়াইয়া বিন কাসির বলেন : তাদের দোয়ায় বলতেন, হে আল্লাহ, আমাকে রমজান পর্যন্ত নিরাপদ রাখুন। রমজানকে আমার জন্য নিরাপদ করুন এবং রমজানের আমলগুলো কবুল করে আমার কাছ থেকে রমজানকে বিদায় করবেন। (লাতায়িফুল মাআরিফ, পৃষ্ঠা ১৪৮)

রমজানের জন্য দিনক্ষণ গণনা করা-

রমজানের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে রমজানের জন্য শাবান মাসের তারিখের হিসাব রাখা এবং দিনক্ষণ গণনা করাও রমজানপূর্ব একটি সুন্নাত আমল। প্রকৃত অর্থে এটা রমজানের জন্য বিভোর প্রতীক্ষার একটি নিদর্শনও বটে; মানবীয় স্বভাবও অধিক প্রত্যাশিত বস্তুর জন্য দিন গোণার ব্যাপারে সায় দেয়। রমজানের আগমনের জন্য মহানবী (স.) দিনক্ষণ গণনা করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন : আল্লাহর রাসুল শাবান মাসের (দিন-তারিখের হিসাবের) প্রতি এত অধিক লক্ষ রাখতেন, যা অন্য মাসের ক্ষেত্রে রাখতেন না। (আবু দাউদ, হাদিস ২৩২৫)

ইসলামী সকল বই দেখতে ভিজিট করুন

এমনকি তিনি শাবানের হিসাব রাখার জন্য নির্দেশও দিয়েছেন, যেন রমজান আগমনের বিষয়ে সন্দেহে পতিত হতে না হয়। তিনি বলেন : তোমরা রমজানের জন্য শাবানের চাঁদের হিসাব রাখো। (সিলসিলাতুস সহিহাহ, আলবানি, ২/১০৩)


রমজানের পূর্বের দিনগুলোতে রোজা নারাখা-

রসুলের (স.) জীবন থেকে বোঝা যায়, রমজানে দীর্ঘদিন রোজা রাখার দৈহিক ও মানসিক প্রস্তুতির জন্য শাবান মাসে অধিক হারে রোজা পালন করা সুন্নাত। তবে তা পুরো শাবান মাস জুড়ে নয়। বরং রাসুল (স.) রমজানের ঠিক পূর্বেকার দিনগুলোতে রোজা রাখতেন না; এ-সময় তিনি রমজানের প্রস্তুতিকল্পে শরীর গঠনে মনোযোগ দিতেন।

আয়েশা রা: হতে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে : রাসুল (স.) কখনও কখনও এমনভাবে রোজা পালন করতেন যে আমাদের মনে হত, তিনি রোজা ত্যাগ করবেন না। আর কখনও এত দীর্ঘ সময় রোজা ত্যাগ করতেন যে, আমাদের মনে হত তিনি আর রোজা পালন করবেন না। (বুখারি, হাদিস ১৯৬৯)

রাসুলের (স.) এই রোজা ত্যাগ করার বিষয়টি অন্য হাদিস থেকে  এসেছে, আয়েশা (রা.) বলেন : শাবানের তুলনায় অন্য কোনও মাসে আমি তাকে এত অধিক-হারে রোজা পালন করতে দেখি নি। তিনি শাবানের প্রায় পুরোটাই রোজায় অতিবাহিত করতেন, তবে (রমজানের প্রস্তুতির জন্য) কিছু দিন বাদ রাখতেন। (মুসলিম, হাদিস ১১৫৬)

সুতরাং, ধর্মপ্রাণ মুসলমান মাত্ররই কর্তব্য, শাবান মাসের শেষের দিকে রোজা না রেখে রোজার প্রস্তুতি গ্রহণ করা।


জনসাধারণকে রমজানের প্রতি উৎসাহী করে তোলা-

রাসুল (স.) সাহাবিগণকে রমজানের পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করার জন্য নানাভাবে উৎসাহিত-উদ্দীপিত করতেন, সর্বস্ব নিয়োগ করে তাতে কল্যাণ আহরণের জন্য আত্মনিয়োগের পরামর্শ দিতেন। রমজানের ফজিলত সম্পর্কিত হাদিসগুলোর অধিকাংশই রমজানের পূর্বের বিভিন্ন বৈঠকে রাসুল (স.) সাহাবিদের জানিয়েছেন। তিনি তাদের উৎসাহ দিয়ে বলতেন : রমজান—বরকতময় মাস—তোমাদের দুয়ারে উপস্থিত হয়েছে। পুরো মাস রোজা পালন আল্লাহ তোমাদের জন্য ফরজ করেছেন। এ মাসে আল্লাহ কর্তৃক একটি রাত প্রদত্ত হয়েছে, যা হাজার মাস হতে উত্তম। যে এর কল্যাণ হতে বঞ্চিত হলো, সে বঞ্চিত হলো (মহা কল্যাণ হতে)। (নাসায়ি, হাদিস ২১০৬)

আরও বলতেন : রমজানের প্রথম রাত্রিতে শয়তান ও দুষ্ট জিনদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, জাহান্নামের কপাটগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়; তার একটি দরজাও খোলা হয় না। উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় জান্নাতের দরজাগুলো, বন্ধ করা হয় না তার একটিও। একজন আহ্বানকারী আহ্বান জানিয়ে বলেন : হে কল্যাণের প্রত্যাশী, অগ্রসর হও। আর যে অকল্যাণের প্রত্যাশী, বিরত হও। আল্লাহ জাহান্নাম হতে অনেককে মুক্তি দিবেন, এবং তা প্রতি রাতেই।’ (তিরমিজি, হাদিস ৬৮৩)

তিনি রোজাদারদের জান্নাতের সুসংবাদ দিতেন। সাহাবিদের জানাতেন— জান্নাতের একটি দরজা রয়েছে রইয়ান নামে। বলা হবে : রোজাদারগণ কোথায়? তখন তারা দাঁড়াবেন, তারা ব্যতীত এ দরজা দিয়ে অপর কেউ প্রবেশ করবে না। তারা প্রবেশ করার পর সে দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। অপর কেউ তাতে প্রবেশের সুযোগ পাবে না। (বুখারি, হাদিস ১৭৯৭)

সুতরাং দীনদার ও ধার্মিকদের করণীয় হলো, রসুলের সুন্নাহ অনুসরণে রমজানের ফজিলত সম্পর্কিত নানা অনুষঙ্গ ও হাদিসগুলো জনসাধারণের সামনে তুলে ধরা। তাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া এবং জাহান্নামের ভয় দেখানো। রোজার নেয়ামত সানুপুঙ্খ তাদের সামনে বর্ণনা করা।


রমজানের বিধান সম্পর্কে জানাশোনা-

রমজান বিষয়ক অনেক হাদিস ও হাদিসাংশ জানা যায়, রাসুল (স.) নিজেও রমজান মাসে সাহাবিদের নানা বিধান সম্পর্কে অবগত করাতেন, সঠিক দিক-নির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে ঋজু পথ আঁকড়ে ধরতে উৎসাহিত করতেন। একইভাবে বর্তমান সময়ে, যারা উম্মতের মহান আলেম ও বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব, সম্মানিত দায়ি, তারা সাধারণ মানুষকে রমজানের যাবতীয় হুকুম সম্পর্কে জ্ঞাত করাবেন, রমজান-পূর্ব ও মধ্যবর্তী সময়ে মানুষের মাঝে ব্যাপক দাওয়াতি কার্যক্রম অব্যাহত রাখবেন। প্রত্যেকে সাধ্য ও সামর্থ্যরে সবটুকু ব্যয় করবেন, যে যে উপায়ে বিষয়টির বাস্তবায়ন সম্ভব, সে-সকল উপায় অবলম্বন করবেন।

সাধারণ মুসলমাণের কর্তব্য হলো, রমজানে পালিত যাবতীয় এবাদত ও জিকির-আজকার বিষয়ক বিধি-বিধান সম্পর্কে পূর্ণ অবগতি লাভ করা। রমজান বিষয়ক বই-পত্র অধ্যয়ন করা এবং অডিও প্রোগ্রাম শ্রবণ করে স্বচ্ছ ধারণা লাভে প্রয়াস চালানো। ইলম ও জ্ঞানের মজলিস সমূহে হাজির হবে।

কারণ, যে-কোনও বিষয়ের মৌলিক খুঁটি হচ্ছে সে সম্পর্কে পূর্ণ অবগতি লাভ করা এবং পরবর্তী সময়ে সে অনুসারে আমল করা। যেন রাসুল (স.) কর্তৃক অনুমোদিত নয়—এমন সকল আমল সর্বার্থে পরিত্যাগ করা যায় এবং কেবল সে আমলই গ্রহণ করা হয়, যার ভিত্তি মজবুত, যার আচরিত কর্মপন্থা সঠিক ও নির্ভুল।


রমজানের আগমন সংবাদে আনন্দ প্রকাশ-

রমজানের আগমনে মুমিন বান্দামাত্রই আনন্দ প্রকাশ করে থাকেন। আর আনন্দিত হওয়াই যুক্তিসঙ্গ। আল্লামা ইমাম সাদি বলেন : ইহকালীন ও পরকালীন বিপুল নেয়ামত-রাজির সাথে পার্থিব জগতের অর্জনের কোন তুলনা নেই; পার্থিব সঞ্চয়—তা যতই অঢেল ও বিচিত্র হোক না কেন, একদিন অবশ্যই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

আল্লাহ তাআলা তাই, তার প্রদত্ত ফজিলত ও করুণাকে আনন্দের উপকরণ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন এবং তাকে স্ফূর্তির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন— “বল, এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়ায়। সুতরাং এতে তারা আনন্দিত হোক। তারা যা সঞ্চয় করে এটা তার চেয়ে উত্তম।” (সূরা ইউনুস, আয়াত ৫৮)

রসুলে করিম (স.) তাই নিজেও অতিশয় আনন্দিত হতেন এবং বিভিন্ন সময়ে রহমত-বরকত ও কল্যাণ বর্ষণ এবং অবতরণের উপলক্ষ্য ও অনুষঙ্গগুলোর কারণে ব্যাকুল হতেন। সাহাবিদের বলতেন : তোমাদের দ্বারে বরকতময় মাস রমজান এসেছে। (নাসায়ি, হাদিস ২১০৬)

নৈকট্য লাভের মাহেন্দ্রক্ষণ এই রমজানের সদ্ব্যবহারের উত্তম প্রমাণ হলো এ ব্যাপারে নবীজির (স.) মতো করে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করা, মানসিক ও আত্মিকভাবে রমজানকে স্বাগত জানানোর জন্য ব্যাকুল হওয়া; যেন তা পূর্ণাঙ্গভাবে কল্যাণব্রতী হয় এবং সময়গুলো পরিপূর্ণ কাজে লাগে। কেননা, ইলম, আমল, ও দাওয়াতি ক্ষেত্রে যে নবীজির (স.) পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, গ্রহণযোগ্য কেবল তার আমলই।

আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফিক দান করুণ।

লেখক: মনযূরুল হক

প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট, মুহম্মাদ স. রিসার্চ সেন্টার (এমআরসি)

[email protected]

নবীজির স. জীবন ও আমল সম্পর্কে জানতে পড়ুন—  ‘মুহাম্মাদ স. : ব্যক্তি ও নবী’

আরও পড়ুনঃ 

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png