একরোখা আহমদ ছফা’র ৭ টি সাহসী ঘটনা

আহমদ ছফা

আহমদ ছফা, বাংলাসাহিত্যে এ পর্যন্ত যত প্রাবন্ধিক, লেখক এবং সাহিত্যিক জন্মগ্রহণ করেছেন তারমধ্যে সবচেয়ে সাহসী, বুদ্ধিমান, কুশলী, বহুমুখী, সাধারণ এবং তেজময়। নির্লোভ মননশীলতা এবং সত্যসমৃদ্ধ স্পষ্টবাদিতার জন্য তাঁকে ভয় পেতেন সে সময়ের সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবিরা। আজকের আয়োজনে থাকছে এই বিশিষ্টজনের সাতটি সাহসী ঘটনা।

  • খালেদা জিয়ার সাথে ফোনালাপ:

একবার খালেদা জিয়া আহমদ ছফাকে ফোন করে দাওয়াত করেছিলেন। তিনি বেগম জিয়াকে বলেছিলেন, যেতে পারি এক শর্তে। আমাকে নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াতে হবে। শেখ হাসিনার কাছে গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে রান্না করে খাইয়েছিলেন। খালেদা জিয়ার রান্না করার সময়ও হয়নি, ছফাও যেতে পারেননি।

খালেদা জিয়ার সঙ্গে ছফা’র আরেকবার ফোনালাপ হয়েছিল। উপলক্ষ ছিল এনজিও ব্যুরো থেকে ‘বাংলা-জার্মান সম্প্রীতি’র রেজিস্ট্রেশনের ব্যাপারে। ছফা-ই বেগম জিয়াকে ফোন করেছিলেন। ফোনটি ধরেছিলেন তাঁর পিএস। ছফা বিনয়ের সঙ্গে পিএসকে বলেছিলেন, 

– ম্যাডামকে কি একটু দেয়া যাবে? আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাই।

– আপনি কে?

– আমি আহমদ ছফা।

– কোন আহমদ ছফা?

পিএস-এর কথায় ছফা ভয়ানক রকম ক্ষেপে গিয়েছিলেন। তিনি রাগলে সচরাচর যে গালটি তাঁর মুখ দিয়ে বের হত সেটি বেরিয়ে গিয়েছিল। তারপর তিনি কোন রকম ভূমিকা না করে বললেন, 

– বাংলাদেশে আহমদ ছফা দু’জন আছে নাকি?

ছফা কথা না বাড়িয়ে রিসিভারটি ধপাস করে রেখে দিয়েছিলেন।

পিএস সাহেব ছফার এ অশোভন আচরণের কথা বেগম জিয়াকে জানিয়েছিলেন কিনা জানা যায়নি। কিছুক্ষণ পরে বেগম জিয়া ফোন করেছিলেন। ছফা’র কথার ঝাল তখনও থেকে গিয়েছিল। ফোন পেয়ে তিনি বেগম জিয়াকে বিরক্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, 

– ম্যাডাম, কী সব অশিক্ষিত পিএস টিএস রাখেন আহমদ ছফার নাম জানে না।

ছফা’র কথায় বেগম জিয়া হেসে জবাব দিয়েছিলেন, 

– আমি নিজে অশিক্ষিত; শিক্ষিত মানুষ পাব কোথায়? আপনারা কেউ তো এগিয়ে আসছেন না।

  • কলকাতা বইয়ের বিরোধীতা:

বাংলা একাডেমীর একুশে বইমেলায় কলকাতার বই আসত। আহমদ ছফা এর বিরোধীতায় নামেন। তার বিরোধীতার ফলে কলকাতার বই আসা বন্ধ হয়। ছফা কাজটা করেছিলেন দেশের লেখকদের কল্যাণের জন্য কিন্তু এদশেরই লেখক শওকত ওসমান তাকে বাজে লোক বলে মন্তব্য করেন। ছফা তাকে নিয়ে নিউমার্কেটের বইয়ের দোকানে দোকানে নিয়ে যান। গিয়ে জিজ্ঞেস করেন শওকত ওসমানের কোনো বই আছে কী-না। কেউ লেখককেই চিনতে পারল না। তখন কলকাতার একজন সাধারণ মানের লেখকের নাম বলতেই অনেকগুলো বই বের করে দিলো। আহমদ ছফা তখন শওকত ওসমানকে জিজ্ঞেস করলেন,

– দেশটা আমরা বাল ছেঁড়ার জন্যে স্বাধীন করেছি?

  • ছফার প্রতিজ্ঞা:

হুমায়ূন আহমেদসহ কয়েকজন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন কেউ বিয়ে করবেন না। সবাই বিয়ে করেছিলো, এক আহমদ ছফা ছাড়া। তিনি চিরকুমার-ই ছিলেন।

  • হুমায়ূন আহমদকে প্রকাশ: 

আহমদ ছফা হুমায়ূন আহমেদকে প্রকাশকদের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন, তার লেখা যে ভালো এবং তা যে প্রকাশ করা উচিত এই মর্মে প্রকাশকদের কনভিন্স করেছিলেন। তারই প্রেক্ষিতে হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্যিক হিসেবে প্রকাশিত হলেন। 

  • পুরস্কার প্রত্যাখ্যান:

আহমদ ছফাকে যেন বাংলা একাডেমী পুরস্কার দেওয়া হয় সেজন্য তলব করেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। আহমদ ছফা সেই পুরস্কার নেননি, উল্টো হুমায়ূন আহমেদকে বলেছেন- হুমায়ূন, তোমার এত্তবড় সাহস! তুমি আমার জন্য তলব করো পুরস্কারের? 

  •  তির্যক মন্তব্য:  

আহমেদ ছফার কবিতার বই প্রকাশ হইছে। হুমায়ুন আজাদ বইটা দেইখা বললেন, এইরকম একটা কবিতার বই আমি চিৎ হয়ে শুয়ে বাম হাতে লিখে দিতে পারি।  

মন্তব্য কানে যাওয়ার পর আহমদ ছফা জবাব দিলেন, হুমায়ূন আজাদের অলৌকিক ইস্টিমারের মতো কবিতার বই আমি মাস্টারবেট করতে করতে লিখতে পারি। 

  • হুমায়ূন আহমেদের বাড়ি রক্ষা: 

রক্ষীবাহিনীর দখল থেকে হুমায়ূন আহমেদের বাড়িটি বাঁচিয়েছিলেন আহমদ ছফা।

স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর হুমায়ূন আহমেদ তাঁর মায়ের সাথে বাবর রোডের একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে উঠেছিলেন। বাংলাদেশ সরকার শহীদ পরিবারের সম্মানার্থে হুমায়ূন আহমেদের মায়ের নামে ওই পরিত্যক্ত বাড়িটি বরাদ্দ করেছিলেন। কিন্ত অল্প কয়েক দিন পর গভীর রাতে রক্ষী বাহিনীর একটি সশস্ত্র দল হুমায়ূন পরিবারকে বাড়ি থেকে বের করে দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়। চারিদিকে ঘোর অন্ধকার, কোথায় যাবেন তাঁরা?

সকাল হল, কেউ নেই, কেউ আসার কোনো আশা নেই। চর্তুদিকে গিজগিজ করছে রক্ষী বাহিনী। কার বুকে এত পাটা যে এগিয়ে আসবে। আহমদ ছফা এসে হাজির। ছফার হাতে একটি টিন, কেরোসিনে ভর্তি, কাঁধে মোটা চাদর।

এ নিয়ে আমীন এবং ছফার কথোপথন: 

– আপনি কি হুমায়ূনের কাছে একাই গিয়েছিলেন?

– হ্যাঁ, একাই। তবে হাতে একটা কন্টেনার ছিল, তাতে পাঁচ লিটার কেরোসিন, কিনেছিলাম।

– কেরোসিন কেন?

– জ্বলব এবং জ্বালাব বলে।

– কাকে?

– নিজেকে এবং গণভবনকে। আমি হুমায়ূনকে বললাম, আমার সাথে রিক্সায় উঠুন, আমরা গণভবন যাব। একটি রিনাউন শহীদ পরিবারকে বাড়ি হতে উচ্ছেদ করে জ্ঞানীর কলমের চেয়েও পবিত্র রক্তকে অবমাননা করা হয়েছে। অপমান করা হয়েছে স্বাধীনতা ও জাতির আত্মদানের গৌরবমন্ডিত ঐশ্বর্যকে। আমি কেরোসিন ঢেলে আত্মহুতি দেবার সংকল্পে উম্মাদ হয়ে উঠেছিলাম সেদিন।

– কেন?

– যে দেশের সরকার স্বাধীনতায় জীবন বিসর্জনকারী একজন প্যাট্রিয়ট পরিবারকে বাসা হতে গভীর রাতে উচ্ছেদ করে দেয়ার মত জঘন্য ঘটনা ঘটাতে পারে সে দেশে আর যাই থাকুক, আমি নেই। এমন ঘৃণ্য দেশে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভাল, অনেক। তো, আমি হুমায়ূনকে বললাম, আপনি তাড়াতাড়ি রিক্সায় উঠুন। হুমায়ূন বললেন, কোথায় যাব? আমি বললাম গণভবনে যাব। নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেব। একটি শহীদ পরিবারের প্রতি যে অপমান করা হয়েছে- তার প্রতিবাদে এ কাজটা করব। আত্মহুতি।

– কী বলছেন ছফা ভাই?

– কথা বলে সময় নষ্ট করবেন না। উঠে আসুন। সঙ্গে ভারী চাদরও নিয়ে এসেছি। আপনি আমার গায়ে ভালোমত চাদরটা জড়িয়ে দেবেন। যেন আগুনটা ঠিকমত লাগে।

আহমদ ছফার গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহুতি দেয়ার সংবাদ দাবানলের মত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। সবাই আস্তে আস্তে জড়ো হতে লাগলেন। বন্ধুরা ছফাকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন। কিন্ত ছফা অনঢ়, তিনি আত্মহুতি দেবেনই। অন্য কেউ হলে ভাবা যেত আত্মহুতি নয়, কেবল হুমকি, কথার কথা। কিন্ত সবাই জানে ছফা অন্য রকম, সিদ্ধান্ত যখন নিয়েছেন প্রতিকার না পাওয়া পর্যন্ত একচুলও এদিক সেদিক করবেন না, যাহোক কিংবা যাই ঘটুক।

কবি সিন্দাকার আবু জাফর ব্যস্ত হয়ে ছফার কাছে এলেন। জোর গলায় বললেন, আমি ব্যবস্থা করছি। কথা দিচ্ছি, এই শহীদ পরিবারের জন্য থাকার একটা ব্যবস্থা করব। তুমি কেরোসিন টিন আমার বাসায় দিয়ে এসো। ছফা বললেন, হুমায়ূন পরিবারকে আবার সস্থানে তুলে না দেয়া পর্যন্ত আমি আমার সিদ্ধান্ত পাল্টাবো না এবং আপনার হাতে সময় মাত্র ১ ঘন্টা।

পরবর্তীতে সরকার হুমায়ূন আহমেদের পরিবারকে পুনরায় উচ্ছেদকৃত বাসায় তুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল। 

আহমদ ছফা’র সকল বই

 

আরও পড়ুন আইনস্টাইনের যেসব ঘটনা আপনাকে হাসাবে

 

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png