গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এর নিঃসঙ্গতার একশ বছর, জাদুবাস্তবতার গল্প

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের নিঃসঙ্গতার একশ বছর, জাদুবাস্তবতার গল্প ও অন্যান্য

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী লেখকদের মধ্যে একজন। শুধু লেখক হিসেবেই নয় সাংবাদিক ও প্রকাশক হিসেবেও তাঁর সুনাম ছিল। উপন্যাসের পাশাপাশি প্রচুর ছোটগল্প লিখেছেন তিনি। জাদুবাস্তবতাই ছিল তাঁর লেখার অন্যতম বিষয়বস্তু। যদিও তিনি নিজেকে কোনো প্রথাবদ্ধতায় আটকে রাখেননি এবং তাঁর রচনাও কখনো একই ধাঁচে আবদ্ধ থাকেনি। তাঁর প্রতিটি উপন্যাসই বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। উল্লেখযোগ্য বইটি হচ্ছে ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’। পৃথিবীব্যাপী আলোড়ন তোলা উপন্যাস এটি। মার্কেসকে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি এনে দেয় বইটি। এটি নিয়ে আসে নোবেল পুরস্কারের স্বীকৃতি। ১৯৮২ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পান।

যেমন ছিলেন-

কঠিন মানুষ ছিলেন মার্কেস। তবে দারুণ সৃজনশীল তো বটেই। সাড়া দেয়ার বেলায় ক্ষিপ্র ছিলেন। এক বিস্ময়কর মানুষ ছিলেন তিনি।

যে কারণে সাংবাদিকতা বেছে নেওয়া-

পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে সাংবাদিক হিসেবে শুরু করেছিলেন মার্কেস। কারণ তাঁর ধারণা ছিল- সাহিত্যে সামনে এগোতে গিয়ে বাস্তবতার কিছুটা ছোঁয়া খোয়াতে হয়। অন্যদিকে সাংবাদিকের কাজে প্রতিটি দিন নিকট বাস্তবতার কাছাকাছি থাকার সুবিধা রয়েছে। তিনি সাংবাদিকতা বেছে নিয়েছিলেন কারণ তাঁর চোখে সাহিত্যের চেয়ে বাস্তব বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারাই বেশি কৌতূহলোদ্দীপক। এদিক থেকে সাংবাদিকতাকে, বিশেষ করে রিপোর্টাজকে অবশ্যই সাহিত্যের একটা ঘরানা হিসেবে দেখেছেন। সাংবাদিকরাও রিপোর্টাজকে সাহিত্যিক ঘরানা বলে মানতে অস্বীকার করেলেও তিনি এর পক্ষে ছিলেন। মার্কেসের কাছে রিপোর্টাজ পুরোপুরি বাস্তবে প্রোথিত একটি ছোটগল্প। যদিও ছোটগল্পও বাস্তবতা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে থাকে, তেমনি উপন্যাসও। কোনো উপন্যাসই এ পর্যন্ত বানানো হয়নি। সবসময়ই তা অভিজ্ঞতাভিত্তিক গল্প বলা।

সেরাদের সেরা-

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস হচ্ছেন সেরাদের সেরা। লাতিন আমেরিকার সাহিত্যিক বিস্ফোরণের শুরু হয়েছিল মারিও বার্গাস ইয়োসা নামে এক অচেনা লেখকের একটি উপন্যাস দিয়ে। তখনই দুনিয়া খেয়াল করে যে তাদেরও মহান লেখক আছে। একজন না। বহুজন। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কণ্ঠটি ছিলেন তিনি হলেন ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচ্যুড’ নিয়ে আসা গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। এরপর থেকে তার লেখা প্রতিটি উপন্যাস কেবল সমালোচকদের কাছে প্রশংসিত এবং অনূদিতই হয়নি, অগুনতি পুরস্কার পেয়েছে এবং সেগুলো জনপ্রিয়ও ছিল। ডিকেন্স বা বালজাক পড়ার মতো ছিল ব্যাপারটা। রাস্তার লোকজন গার্সিয়া মার্কেস পড়েছে। তাঁর লেখা প্রতিটি বই-ই জননন্দিত হয়েছে। তো, এক অর্থে পাঠক ও বিশ্বকে জয় করে নিয়েছেন তিনি এবং দুনিয়াকে লাতিন আমেরিকার কথা জানিয়েছেন।

নিঃসঙ্গতার একশ বছরের গল্প-

মার্কেসের জগতখ্যাত বইয়ের নাম ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’। এ বইটি কেবল লাতিন আমেরিকা নয় বরং সারা বিশ্বে শক্তিশালী বইতে পরিণত করেছে। বইটি মূলত কলম্বিয়ার বিস্মৃত সীমান্ত অঞ্চলের একটা পরিবারের কয়েক প্রজন্মের কাহিনী, একটি ছোট গ্রামের কাহিনি।

জাদুবাস্তবতা এই বইটিকে গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী কাজে পরিণত করেছে। জগৎ ও জীবন দারুণ রহস্যময়। আমরা কিছুই নিয়ন্ত্রণ করি না। আমাদের কাছে সবকিছুর ব্যাখ্যা নেই। নিরাপদ বোধ করি বলে আমরা একটা নিয়ন্ত্রিত দুনিয়ায় থাকার চেষ্টা করি। এই বইতে আমাদের ঘিরে রাখা অবিশ্বাস্যের এই বিস্ফোরণ রয়েছে। এবং আমরা যেকোনো কিছুই নিয়ন্ত্রণ করি না, কোনো ব্যাখ্যা নেই, একটা কিছুর আস্তিত্ব আছে— আত্মা আছে— তারই স্বীকারোক্তি। কাকতাল, ভাববাদী স্বপ্ন, আমরা ব্যাখ্যা জোগাতে পারি না বলে জাদুময় সব ঘটনা রয়েছে।

লেখায় দাদির প্রভাব-

মার্কেজের কাছে দাদি ছিলেন মায়ের মতো। দারুণ কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ ছিলেন তিনি। লেখকের সবসময় মনে হতো, দাদির বোধ হয় বিশেষ কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ আছে, কারণ ছোটবেলায় তাকে বারবার সবকিছু জেনে ফেলার, আগাম আঁচ করার এবং ফলে যাওয়া ভবিষ্যদ্বাণী করতে দেখে অবাক মানতেন। ভীরু স্বভাবের ছিল তাঁর দাদি। বার্ধক্যে পৌঁছেই মারা গিয়েছে এবং বেশ বিকারগ্রস্ত হয়ে। দাদি অসাধারণ অপ্রচলিত মনোমুগ্ধকর ছবি ফুটিয়ে তোলা স্প্যানিশে কথা বলত সবসময়। লেখক হিসেবে মার্কেসের সূচনা বিন্দু ছিল এটা। এরপর তার দাদির সব বুলি, ধুয়া, শব্দ নিয়ে গবেষণা করেছিলেন।

জাদুবাস্তবতার শুরু-

গার্সিয়া মার্কেস এটা আবিষ্কার করেননি। অসাধারণ কায়দায় এই বিষয়টিকে তুলে ধরার কারণে তিনি সেরা ছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে জায়গায় গৃহীত হয়েছেন। কিন্তু অনেক আগেই শুরু হয়েছিল এই জাদুবাস্তবতা। লতিন আমেরিকায় আসা কনকুইজিটরদের সঙ্গেই জাদুবাস্তবতার শুরু। রাজা কিংবা স্পেনে লেখা চিঠিতে তারা তারুণ্যের ফোয়ারাওলা এক মহাদেশের কথা  লিখেছে, যেখানে জমিন থেকে সোনা বা হীরে কুড়োনো যায়, লোকের কাছে ইউনিকর্ন আছে কিংবা তাদের একটা পা এত বড় যে সিয়েস্তার সময় ছায়ার জন্য প্যারাসলের মতো মাথার উপরে তুলে দেয়। কনকুইজিটরদের চিঠিপত্রে আছে এসব। লাতিন আমেরিকা ও স্পেনের একসঙ্গে জাদুময় সূচনার মুহূর্তেই এ বাস্তবতার সৃষ্টি হয়েছিল। এবং একজন মহান কিউবান লেখক সবার আগে এ দুটি শব্দকে জুড়েছেন। তার পর গার্সিয়া মার্কেস একে জনপ্রিয় করে তুলেছেন।

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এর সকল বই দেখতে

 

আরও পড়ুন একজন সৎ রাষ্ট্রপতির গল্প

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png