ইমপ্যাক্ট বিপ্লব : ব্যবসার নতুন জগত !

ইমপ্যাক্ট বিপ্লব

বর্তমান বিশ্ব প্রতিমূহুর্তে একটি গতিশীল সমাজের দিকে এগুচ্ছে। ক্রমশ আমাদের নিত্যনৈমিত্তিক জীবনযাপন অনেক বেশি কাঠামোবদ্ধ হয়ে পড়ছে। কাজের চাপ ও পারিপার্শ্বিক  অবস্থার কারণে পারিবারিক জীবনও অনেকটা বিপন্নের মুখে। করপোরেট অফিসগুলোর ব্যস্ততার কারণে বাসা ও অফিসের কাজের মধ্যে আমাদের ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে। তাই দেখা যায় যে, ভোক্তা, বিনিয়োগকারী, কর্মকর্তা-কর্মচারি, নেতা-নেত্রী, উদ্যোক্তা সবাই এই সমস্যার মুখোমুখী হচ্ছে।

সুদীর্ঘ সময় ধরে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আমাদের যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এই ব্যবস্থা সমাজের শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিত্তবান ব্যক্তিরা ক্রমশ সম্পক্তির পাহাড় করছে, অন্যদিকে সম্পদহীনদের অবস্থা আরো মন্দের দিকে এগুচ্ছে। সামাজিক নেতিবাচক দিকগুলো সমাধানে আমরা ফলপ্রসূ কোনো উদ্যোগ নিতে পারছি না। জনসেবামূলক কর্মকা- সমাজের জন্য উপকারি হলেও এর প্রভাব খুবই সীমিত। বড় ধরণের সামাজিক পরিবর্তন বা কল্যাণ এধরণের কর্মকা- দিয়ে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়, যা ইতোমধ্যে আমরা অনুধাবন করেছি। তাই, বর্তমান পরিস্থিতিতে পুঁজিবাদীর একচ্ছত্র মুনাফাভিত্তিক ব্যবস্থা প্রশ্নের সম্মুখীন।

বর্তমান বিশ্ব বাজারের এমন অবস্থার প্রেক্ষিতে ইমপ্যাক্ট বিনিয়োগ একটি শক্তিশালী ব্যবসায় ধারণা হিসেবে সকলের কাছে সমাদৃত হয়েছে। সিএসআর বা করপোরেট সোসাল রেসপন্সিবিলিটি ও ট্রাইপল বটম লাইনের সূত্রপাত ঘটেছিলো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিষয়ের বহির্ভূত কর্মসূচি হিসেবে, যা ব্যবসার মাধ্যমে সামাজিক দায়িত্ব পালন করে। ইমপ্যাক্ট বিনিয়োগ হলো সেই ধরণের ধারণা যা কেবল মুনাফার উপর প্রতিষ্ঠিত নয়, বরং এর পাশাপাশি সামাজিক ও পরিবেশগত ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসে।

কোনো কোম্পানি, সংগঠন কিংবা ফান্ড বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে পরিমাপযোগ্য, সামাজিক ও পরিবেশগত উপকার সাধনের উদ্দেশ্যে মুনাফাভিত্তিক বিনিয়োগ করা। আবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্ষুদ্র ঋণ ও দীর্ঘস্থায়ী কৃষিখাত নিয়ে ইমপ্যাক্ট বিনিয়োগ কাজ করে থাকে। বর্তমান বিশে^র উন্নত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্সসহ অনেক ইমপ্যাক্ট বিনিয়োগের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

ইমপ্যাক্ট বিনিয়োগ উদ্ভবের পটভূমি:

২০০০ সালে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্টার্ন স্কুল অব বিজনেস-এর অধ্যাপক ‘ইন্টাঙ্জিবল অ্যাসেট’ শিরোনামে তাঁর একটি বই ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে আর্থিক বহির্ভূত বিষয়ের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন। এরই প্রেক্ষিতে ২০০৭ সালে ‘ইমপ্যাক্ট ইনবেস্টিং’ শব্দটির উদ্ভব ঘটে। আর্থিক লাভালাভের প্রয়োজনীয়তার মতোই সামাজিক ও পরিবেশগত অবস্থা পরিমাপের উপর একই ধরণের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা বিনিয়োগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে বিবেচনা করা হয়।

ইমপ্যাক্ট’র মূল কথা হলো মুনাফা লাভের পাশাপাশি সোসাল ইমপ্যাক্ট প্রদানের মাধ্যমে বর্তমান বিশ্বকে আরো সমৃদ্ধিতর পথে এগিয়ে নেওয়া। পুঁজিবাদের একমাত্র মুনাফা লাভের কেন্দ্রাভিমুখিতাকে উল্টো প্রশ্নবিদ্ধ করাও ইমপ্যাক্ট বিনিয়োগের আরেকটি উদ্দেশ্য। কেবল মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে পরিচালিত ব্যবসার মাধ্যমে বৃহৎ অর্থে সামাজিক কল্যাণ নিয়ে আসা সম্ভব নয়। মুনাফা লাভের পাশাপাশি সামাজিক ও পারিপাশির্^ক কল্যাণ সাধন না হলে গেড়ে বসা বৈষম্যভিত্তিক সমাজকে আমরা আরো সুদৃঢ় করতে যাচ্ছি। তাই, বর্তমান বিশ্বে ইমপ্যাক্ট বিনিয়োগ খুবই শক্তিশালী ব্যবসায়-ধারণা হিসেবে ভূমিকা রাখছে।

ইমপ্যাক্ট বিনিয়োগের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

১. অর্থনৈতিক লাভবানের পাশাপাশি সামাজিক কল্যাণও নিয়ে আসে।
২. রিস্ক-রিটার্ন-ইমপ্যাক্ট মডেল অনুসরণ করে।
৩. ইমপ্যাক্ট’র মাধ্যমে গৃহীত পদক্ষেপের উপকারিতা পরিমাপ ও তুলনা করা যায়।
৪. ইমপ্যাক্ট মডেলে পে-ফর-সাকসেস নীতি অনুসরণ করা হয়।
৫. প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায় উদ্যোগকে আরো বিকশিত ও সমাজের জন্য উপকারী করে প্রতিষ্ঠা করা।
৬. ইমপ্যাক্ট’র স্বার্থে মুনাফার পরিমাণ হ্রাস করার প্রয়োজন পড়ে না, বরং মুনাফা লাভের মধ্যদিয়ে সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক  ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানো যায়।
৭. ইমপ্যাক্ট বিনিয়োগ গতানুগতিক জনহিতৈষীমূলক কর্মকা- ও আন্তর্জাতিক উন্নয়নমূলক ব্যবসায় ধারণার সমালোচনা করে, যেগুলো প্রধানত স্বল্পস্থায়ী ও সংশ্লিষ্ট দাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য দ্বারা পরিচালিত হয়।
৮. ইমপ্যাক্ট অমুনাফাভিত্তিক সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আলাদা। ইমপ্যাক্ট বিনিয়োগ সাধারণত মুনাফার সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং সামাজিক ও পরিবেশগত লক্ষ-উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে।

ইমপ্যাক্ট সমাজের সর্বস্তরের জনসাধারণকে কর্মক্ষম ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে চায়। সর্বোপরী, তা বৈষম্য হ্রাসের মধ্যদিয়ে, প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর পুনরায় উৎপাদন, জনসাধারণের অবাধ সম্ভাবনার উপভোগ নিশ্চিতকরণ এবং অধিকতর উন্নত ও মানসম্মত একটি বিশ্ব বিনির্মাণ করতে চায়।

ইমপ্যাক্ট ইন্ড্রাস্ট্রি:

২০০৬ সালে ইউএন পিআরআইএস প্রতিষ্ঠালাভের পর থেকে ৫০টি দেশের ১৯০৫ টি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সামাজিক ও পরিবেশগত কল্যাণ সাধনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৯০ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যমানের একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ফ্যামিলি অফিস ও ‘লিভিং ডুনার’ ফাউন্ডেশনগুলো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ফাইন্যান্সিয়াল রিটার্নে ইমপ্যাক্ট প্রদানের জন্য ‘প্রথমসারির উদ্যোক্তা’ হিসেবে ভূমিকা রাখছে। ইমপ্যাক্ট ইনবেস্টমেন্টের উন্নয়নে প্রাথমিক পর্যায়ে ওমিডিয়ার নেটওয়ার্ক, স্কল ফাউন্ডেশন, কেইস ফাউন্ডেশন, আর্নল্ড ফাউন্ডেশন ও টোনিক নেটওয়ার্ক উল্লেখযোগ্য।

বিনিয়োগ উদ্ভবের পাঁচ বছরের মধ্যে খুব দ্রুতবেগে প্রসার লাভ করতে থাকে। ২০০৯ সালে ‘মনিটর গ্রুপ’ নামের একটি গবেষণা ফার্মের প্রতিবেদন অনুসারে, পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে ইমপ্যাক্ট বিনিয়োগ ইন্ডাস্ট্রি ৫০ বিলিয়ন থেকে ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হতে পারে ভবিষ্যদ্বাণী করে। ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন মতে, ইমপ্যাক্ট বিনিয়োগের বাজারের মূল্য ৬১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ইমপ্যাক্ট বিনিয়োগ ক্রাওফান্ডিং (এক ধরণের আউসোর্সিং)-এর ইন্ডিয়েগগো বা কিকস্টারটার থেকে ভিন্ন একটি ব্যবসায় ধারণা। কেনন, ক্রাওফান্ডিং খুব ছোট আকারের উদ্যোগ। অন্যদিকে, সাধারণত ১,০০০ মার্কিন ডলারের বেশি ঋণ বা ইক্যুইটি বিনিয়োগ করা হয়, যা গতানুগতিক ভেনচার ক্যাপিটালের আকারের তুলনায় অনেক বড়।

বিশ্বে এরই মধ্যে প্রযুক্তি বিপ্লব ঘটার পরও এখনো অনেক সামাজিক সমস্যা রয়ে গেছে। বৈষম্য, সামাজিক অনাচার, জবাবদিহিতার অভাব ইত্যাদি সমস্যা গেড়ে বসে আছে। কেবল আর্থিক সমৃদ্ধতা দিয়ে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাই, আমাদের দরকার সুষ্ঠু পরিকল্পনা। বিশেষত, সমাজের প্রধান সমস্যাগুলো নির্মূলে আমাদের সবাইকে একতাবদ্ধ হতে হবে। এক্ষেত্রে বৃহৎ পরিসরে দ্রুতবেগে সামাজিক কল্যাণ সাধনের হাতিয়ার হিসেবে আমরা  বিনিয়োগের প্রসারের মাধ্যমে এসব সমস্যা নির্মূলে ভূমিকা রাখতে পারি।

আরও পড়ুনঃ 

বঙ্গে ইংরেজি শিক্ষার ইতিহাস

ব্যবসা শুরুর আগে উদ্যোক্তাদের অবশ্যপাঠ্য যে ৭ টি বই

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png