লেখক হয়ে ওঠার গল্প- ইমদাদুল হক মিলন

ইমদাদুল হক মিলন

বাংলাসাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম ইমদাদুল হক মিলন। বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার তিনি।  গল্প, উপন্যাস এবং নাটক সাহিত্যের এই তিন শাখাতেই তাঁর বিচরণ।  লেখালেখির হাতেখড়ি হয় শিশুতোষ গল্প লিখে।  সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকায় ‘সজনী‌’ নামে একটি ছোট গল্প লিখে পাঠকের নজরে আসেন।  এরপর আত পেছনে তাকাতে হয়নি।  একের পর এক জনপ্রিয় লেখা তিনি উপহার দিয়ে চলেছেন।  ইমদাদুল হক মিলন যেভাবে লেখক হলেন ও তাঁর অন্যান্য প্রসঙ্গ এখানে তুলে ধরা হলো।

প্রথম প্রকাশিত

ইমদাদুল হক মিলনের প্রথম লেখা গল্প ‘বন্ধু’।  এটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে।  প্রথম উপন্যাস যাবজ্জীবন। এটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে।  প্রথম গল্পগ্রন্থ ভালোবাসার গল্প ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত হবার পর থেকেই বিপুলভাবে আলোচিত, পঠিত, সংবর্ধিত হন তিনি।

যেভাবে লেখক হলেন

লেখালেখি করবেন, লেখক হবেন এমন কোনকিছুরই স্বপ্ন ছিল না ইমদাদুল হক মিলনের।  এমনকি লেখকের চারপাশে যারা বা তাঁর পূর্বপুরুষরা কেউ কখনও সাহিত্যপেশা বা লেখালেখি পেশায় যুক্ত ছিলো না। ছোটবেলায় তিনি অনেকটা বছর একা একা বড় হয়েছে।  তিনি তাঁর নানীর কাছে থাকতেন।  তাঁদের বাড়িটি ছিল একেবারে নির্জন। মানুষজন কম ছিল।  নানী মাঝে মাঝে গল্প শোনাতেন তাঁকে।  রূপকথার বই পড়ে শোনাতেন। মুখস্ত কবিতা শোনাতেন। ফলে তাঁর মধ্যে একটা কল্পনার জগৎ তৈরি হয়। তারপর ঢাকায় এসে উঠলেন।  আর যখন বড় হয়ে উঠছিলেন তখন তাঁর বাবা কিছু বই কিনে দিতেন।  বইগুলো ছিল- সিন্দাবাদের সপ্তঅভিযান, ঠাকুমার ঝুলি ইত্যাদি। এগুলি পড়ে পড়ে বই পড়ার একটা অভ্যাস তৈরি হলো। পড়তে পড়তে লেখকসত্ত্বা তৈরি হলো।  এভাবেই একদিন লেখক হয়ে গেলেন।

একনজরে দেখে নিন কিংবা একটু পড়ে নিন ইমদাদুল হক মিলনের সকল বই, এখানে

প্রথম লেখাছাপার গল্প

তখন ঢাকার গেণ্ডারিয়াতে থাকতেন তারা।  সেখানে একটা পাঠাগার ছিলো।  অনেক বয়স, সীমান্ত গ্রন্থাগার, ওখানে গিয়ে বিকেলবেলা বই পড়তেন।  খেলাধুলা বা দৌঁড়ঝাপ তাঁকে টানতো না।  বই পড়তে পড়তে একদিন দেখললেন, ওখানে একজন তরুণ লেখক আসেন যার দৈনিকের শিশুদের পাতায় লেখা ছাপা হতো।  একদিন তার লেখা ছাপা হলো, সে তখন খুব অহংকার করে পত্রিকার কাটিংটা মিলনদের দেখালো।  তখন নিজের ভেতরে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়- ঐ তরুণ পারলে তিনি কেনো পারবেন না!  ঐ চ্যালেঞ্জ থেকেই একটা গল্প লিখলেন।

লেখকের ছোট ভাই, একটা বাচ্চা ছেলে তখন, ওকে দেখতেন যে একটা বানর সকালবেলায় ওর হাত থেকে এসে একটুকরো রুটি নিচ্ছে বা ও নিজে নাস্তা করছে ওখান থেকে বানরটাকে দিচ্ছে।  বানরটার হাত ভাঙা।  বানরটা প্রতিদিন আসে, ভাঙা হাতটা এগিয়ে দিলে ভাইটা খাবার এগিয়ে দেয় সে নেয়।  এই দুজনের রসায়ন নিয়ে তিনি সেই গল্প লিখেন। বানরের সাথে বাচ্চা ছেলের সম্পর্ক নিয়ে।  গল্প তো লেখা হলো, এখন এ গল্প কীভাবে পাঠাতে সেটা তো আর লেখক জানেন না।  তখন মিলনকে একজন বললো, পত্রিকাতে লেখা ডাকে পাঠাতে হয়।  তিনি পাঠিয়ে দিলেন। পরের সপ্তাহে গল্পটা ছাপা হয়ে গেল।

যে কারণে কবিতা লেখেননি

কবিতা লেখার কোন চেষ্টা করেননি ইমদাদুল হক মিলন। কবিতার যে ছন্দ মিল-টিল, লেখকের এ ব্যাপারটা আসতো না।  তাঁর দুর্বলতা ছিল গল্প বলার প্রতি।  যেহেতু নানীর কাছে গল্প শুনে শুনে বড় হয়েছিলেন।

প্রথম উপন্যাসেই বাজিমাত

লেখকের প্রথম উপন্যাসের নাম ‘যাবজ্জীবন’।  উপন্যাসটি প্রকাশ হবার শহীদ কাদরী থেকে শুরু করে বাংলাদেশের যারা সাহিত্যের বোদ্ধা, হুমায়ূন আজাদ থেকে শুরু করে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ডঃ আবু হেনা মোস্তফা কামাল, প্রত্যেকে ইমদাদুল হক মিলনের খোঁজ খবর নিতে শুরু করলেন।  যদিও তখন পর্যন্ত মিলনের সাহিত্যবোধ ছিল না। একটা ঘটনাকে লিখতে জানতেন শুধু।

রফিক আজাদের সাথে সম্পর্ক

কবি রফিক আজাদের সাথে ইমদাদুল হক মিলনের সম্পর্ক ছিল নিবিড়। রফিক আজাদ ছিলেন মিলনের সাহিত্যগুরু। খুব স্নেহ করতেন তাকে। ছেলের মতো জানতেন।  সময় পেলেই মিলনকে শেখাতেন সাহিত্যের খুঁটিনাটি সবকিছু। যেমন: কেমন বই পড়া উচিৎ, কার বই পড়া উচিৎ, লেখায় ভাষাকে কীভাবে ব্যবহার করতে হয় ইত্যাদি। ধীরে ধীরে মিলনের সাহিত্যবোধ তৈরি হয়।

বাংলাদেশের প্রথম জনপ্রিয় লেখক

দ্বিতীয় উপন্যাস ‘ও রাধা ও কৃষ্ণ‘ লিখে মিলন চলে গেলেন জনপ্রিয়তার বনে।  বাংলাদেশের প্রথম জনপ্রিয় লেখক বলা হয় তাঁকে।  মিলনের মনের বাসনাই ছিল জনপ্রিয় লেখক হবার।  এরপর বের হলো ‘ভালোবাসার গল্প‘নামক গল্পগ্রন্থ।  জনপ্রিয়তা বাড়তে লাগল ধীরে ধীরে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা থেকে লেখকের কাছে তখন অনবরত লেখা চাওয়া হতে থাকল।  যখনি তিনি একটা লেখা প্রকাশ করেন তখনই মানুষ সেটা নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন।

যে মাধ্যমে লেখেন

অনেকে হয়তো ধারণা করছেন তিনি কম্পিউটারে লেখেন। কিন্তু না,  কম্পিউটারে লেখেন না। এখনও তিনি হাতে লেখেন।  লেখকের একজন টাইপ করার লোক আছে।

রেকর্ডসংখ্যক বইবিক্রি

১৯৯৩ সালে মিলন বাংলা একাডেমী পুরস্কার পান।  সে বছর তাঁর তিন-চারটা বই বেরিয়ে ছিল। তারমধ্যে একটি উপন্যাসের নাম ছিল ‘ভালোবাসার সুখ দুঃখ‘।  বইটি পয়ষট্টি হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল সেবার বইমেলাতে।  একরকম রেকর্ড হয়ে গেল।  একজন লেখকের এত বই মেলাতে এর আগে কখনও বিক্রি হয়নি

প্রাপ্তিসমূহ

কথাসাহিত্যে ১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন ইমদাদুল হক মিলন। ২০১১ সালে মহাকাব্যিক নূরজাহান উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন আই পি এম সুরমা চৌধুরী স্মৃতি আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কারসহ অনেক প্রাপ্তি তিনি অর্জন করেছেন।

আরোও পড়ুনঃ
নায়ক থেকে মহানায়ক, অরুণ কুমার থেকে উত্তম কুমার !

ইংরেজী শেখার সেরা ৩ বই

বঙ্গে ইংরেজি শিক্ষার ইতিহাস

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png