কথাগুলো সৈয়দ মুজতবা আলীর জীবনী থেকে নেয়া !

সৈয়দ মুজতবা আলী

সৈয়দ মুজতবা আলী ।  একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, অনুবাদক ও রম্যরচয়িতা। বিশেষভাবে জনপ্রিয় তাঁর ভ্রমণকাহিনীর জন্য। বহুভাষা দখলে ছিল এই লেখকের। তাঁর রচনা একই সঙ্গে পাণ্ডিত্য এবং রম্যবোধে পরিপুষ্ট। এখানে তাঁর জীবনের কিছু জানা-অজানা অধ্যায় তুলে ধরা হলো।

গল্পবলার ধরণ

সৈয়দ মুজতবা আলীর গল্প বলার ভঙ্গি, তাঁর মেজাজ, তাঁর শৈলী, তাঁর ঐশ্বর্য অননুকরণীয় ছিল। তিনি পরিশীলিত ভাষার চর্চাকারী, রবীন্দ্রনাথের ভাষা তিনি কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন অনেক সাধনায়, তাঁর অধিকারে ছিল ভাষার অহংকারী সব নির্মাণ ও ভাষার লিখিত রূপের মেধাবী প্রকাশ। কিন্তু সেই তিনিই অবলীলায় বিচরণ করতেন কথ্যভাষার অলিগলিতে, মৌখিক সাহিত্যের পথেপ্রান্তরে। ফলে তাঁর ‘বলা’ ছিল বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।

ভাষা দক্ষতা

সৈয়দ মুজতবা আলী অনেকগুলো ভাষা জানতেন, কিন্তু ভাষার পাণ্ডিত্য দেখানো ছিল তাঁর প্রবৃত্তির বাইরে। ভাষা শিখে তিনি যা করেছেন: ওই সব ভাষার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বয়ানগুলো অভিনিবেশ নিয়ে পড়েছেন। এক ভাষার লেখা সাহিত্যের সঙ্গে অন্য ভাষার সাহিত্যের তুলনা করেছেন; ভাষার প্রাণ ও ভাষার অন্তর্গত গান খুঁজে বেড়িয়েছেন; ভাষার মানুষি আদলটি পরম যত্নে উন্মোচিত করেছেন। চিহ্নিত করেছেন ভাষার ভেতরের শক্তিকে, ভাষার প্রতিরোধ-প্রতিবাদের ক্ষমতাকে।

পরবাসী জীবন

বাংলার মর্যাদার প্রশ্নে সৈয়দ মুজতবা আলী লড়লেন, পাকিস্তানিদের চক্ষুশূল হলেন ও দেশান্তরে গেলেন! পরবাস তাঁকে নিঃসঙ্গতা দিয়েছে, যা তাঁকে নিজের কাছে স্থিত অথবা অস্থিত করেছে; একসময় তাঁকে শুধু নিজের কাছেই জবাবদিহি করতে শিখিয়েছে। ফলে তাঁর ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে যেসব অপূর্ণতা অথবা বিচ্যুতি ছিল, সেসব নিয়ে তিনি কোনো আক্ষেপ করতেন না।

পরবাস তাঁর অন্তদৃর্ষ্টি খুলে দিয়েছে। সেই দৃষ্টিতে তিনি দেখেছেন বস্তু-প্রকৃতি-মানুষের ভেতরের জীবন-ওয়ার্ডসওয়ার্থের ভাষায় the life of things। পরবাস তাঁকে শিখিয়েছে মানুষকে পড়তে, সহনশীল হতে এবং কৌতুক ও রসবোধের অস্ত্রটিকে সার্থকভাবে প্রয়োগ করতে। এক কথায় বলা যায়, সৈয়দ মুজতবা  আলীকে মুজতবা আলী হয়ে ওঠার জন্য এই পরবাসের প্রয়োজন ছিল।

শান্তিনিকেতনের শান্তি

পায়ের নিচে মুজতবার সরষে ছিল ছোটবেলা থেকেই। তা না হলে শান্তিনিকেতনে পড়ার ভূত তাঁর মাথায় এমনভাবে চাপত না। শান্তিনিকেতন তো লাউয়াছড়া নয় যে মৌলভীবাজার থেকে দুই ঘণ্টায় একটা চক্কর দিয়ে আসা যায়। তাঁর সৈয়দ মুজতবা আলী হয়ে ওঠার জন্য শান্তিনিকেতনের বিকল্প ছিল না। রবীন্দ্র-সান্নিধ্যের বিকল্প ছিল না। শান্তিনিকেতনে এসে তিনি জাতীয়তার একটা পাঠ পেয়েছেন, যে জাতীয়তাবাদ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের দ্বিধা ছিল, আপত্তি ছিল। শান্তিনিকেতনে তিনি হিন্দু-মুসলমান বিভাজনও দেখেছেন। কিন্তু রবীন্দ্রসান্নিধ্য তাঁকে এসবের বহিঃস্থ প্রকাশকে পাশ কাটিয়ে অন্তরের মিলগুলো খুঁজতে সাহাঘ্য করেছে।

আঞ্চলিক অভিমান

আঞ্চলিকতা নিয়েও যথেষ্ট অভিমান ছিল মুজতবা আলীর।  তিনি আজীবন সিলেট-সমর্পিত মানুষ ছিলেন।  আমাদের সঙ্গে যখন কথা বলতেন, যে সিলেটি ব্যবহার করতেন তার তুলনা অন্য কারও চর্চায় আমি পাইনি।  তিনি বলতেন, তাঁর ভাষাটি ছিল ন্যাপথলিনের যত্নে সুরক্ষিত তোরঙ্গে তোলা সিলেটি, যেহেতু এর ব্যবহার প্রতিদিন তাঁকে করতে হতো না। কিন্তু মনেপ্রাণে তিনি ছিলেন বৈশ্বিক।

ছদ্মনামে লেখা

শান্তিনিকেতনে পড়ার সময় সেখানের বিশ্বভারতী নামের হস্তলিখিত ম্যাগাজিনে মুজতবা আলী লিখতেন।  পরবর্তীতে তিনি ‘সত্যপীর’, ‘ওমর খৈয়াম’, ‘টেকচাঁদ’, ‘প্রিয়দর্শী’ প্রভৃতি ছদ্মনামে বিভিন্ন পত্রিকায়, যেমন– দেশ, আনন্দবাজার, বসুমতী, সত্যযুগ, মোহাম্মদী প্রভৃতিতে কলাম লিখেন।

সাহিত্যে প্রবেশ

সৈয়দ মুজতবা আলী দেশে-বিদেশে গ্রন্থের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে প্রথম প্রবেশ ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।  গ্রন্থখানি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি পাঠক মনে নাড়া দিতে সক্ষম হন। কাবুলে অবস্থানের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও অন্তরঙ্গ উপলব্ধির ফসল এ গ্রন্থখানি।  দেশে-বিদেশে উপন্যাস নাকি ভ্রমণ কাহিনী এ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে।  তবে যেভাবেই বিবেচনা করা হোক না কেন গ্রন্থটিকে ভ্রমণ-উপন্যাস বললে খারাপ বলা হবে না।  ভ্রমণ-উপন্যাসটিতে ভ্রামণিক অভিজ্ঞতাকে তিনি গল্প আকারে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন দক্ষ শিল্পীর কৌশলী আঁচড়ে।

বইটিতে লেখক ভূগোল ও প্রকৃতির বিবরণ, জীবন ও সংস্কৃতির বিশেষণ এবং মানবগতির বিচিত্র স্বভাবের যে অনুপুঙ্খ, হৃদয়গ্রাহী ও আনন্দঘন উপস্থাপনা করেছেন, তাতে তার চিন্তা এবং পরিবেশনশৈলীর নৈপুণ্যে পাঠক বিস্মিত না হয়ে পারে না।  দেশে-বিদেশে হয়তো তার জীবন-অভিজ্ঞতার এক বিশ্বস্ত বিবরণ; সে অর্থে এটি জীবন-ঘনিষ্ঠ সাহিত্যের কাতারে দাঁড়াতে পারে অনায়াসে।  গ্রন্থটিতে ভ্রমণের আনন্দ ও অজানাকে জানবার সুধারসের পাশাপাশি গভীর পর্যবেক্ষণের অনুভবে পরিবেশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির হাল হকিকত।  আফগান, হিন্দুস্থান, ইরান কিংবা চীন বিষয়ে ইংরেজদের মনোভাব ও রাজনৈতিক অভিপ্রায় কী, তারও নিবিড় পর্যবেক্ষণ ধরা পড়ে লেখকের বর্ণনায়।

স্বাধীন আফগানের মানুষের জীবনের চালচিত্র প্রকাশ করতেও তিনি কোনোরকম কুণ্ঠাবোধ করেননি।  জীবন-অভিজ্ঞ সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে-বিদেশে বইটিতে কিছু প্রবাদবাক্য পাঠকের নজর কাড়ে।  ‘কোনো দেশের গরিব মেয়েই পর্দা মানে না, অন্তত আপন গাঁয়ে মানে না।’  ‘ইংরেজ এবং অন্য হরেক রকম সাদা বুলবুলিকে আফগান পছন্দ করে না।’  ‘পরের অপকার করিলে নিজের অপকার হয়।’ ‘বাঙালি আর কিছু পারুক না পারুক, বাজে তর্কে খুব মজবুত।’

রম্য রসায়ন

মুজতবা আলীর লেখালেখিতে রম্য ও রসের যে উপস্থিতি, তা কখনো মাত্রাতিরিক্ত নয়।  কোন কথায়, কতটা কথায়, কোন প্যাঁচে কে কতটা হাসবে এবং হাসতে হাসতে ভাববে, নিজেকে মাপবে, সেই রসায়ন তিনি জানতেন।  তাঁর এই পরিমিতিবোধ ছিল অসামান্য।  তিনি বলতেন, মোনালিসা যে এত অবিস্মরণীয় এক চিত্রকর্ম, তার পেছনে দা ভিঞ্চির আঁকিয়ে-হাতের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না তাঁর পরিমিতিবোধ।  ব্রাশের একটা অতিরিক্ত সঞ্চালন ছবিটির রহস্য কেড়ে নিত।  একজন রম্যলেখকেরও থাকতে হবে সেই জ্ঞান, তালে-ঠিক কোনো মদ্যপায়ীর মতো, ঝানু জুয়াড়ির মতো।

একাধিক পরিচয়

বাংলা সাহিত্যে মুজতবা আলীর পাকাপোক্ত স্থান রম্যলেখক হিসেবে।  কিন্তু এটিই তাঁর একমাত্র পরিচয় নয়।  মুজতবা-গবেষক নূরুর রহমান খান (মুজতবা-সাহিত্যের রূপবৈচিত্র্য ও রচনাশৈলী, ঢাকা ২০১০) সেগুলোকে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন এভাবে: ক. হাস্যরস-প্রধান গল্প, খ. করুণ রসাত্মক গল্প, গ. বিশেষ উদ্দেশ্যমূলক গল্প, ঘ. প্রণয়মুখ্য গল্প, ঙ. অম্লমধুর গল্প, চ. ভয়ংকর রসের গল্প।  ভয়ংকর রসের গল্প অবশ্য মাত্র একটি, ‘রাক্ষসী’, যেখানে এক বৃদ্ধার মৃতদেহের বর্ণনা সত্যিই ভয়ংকর।

মুজতবা আলীর গল্পগুলোর কাহিনি ও বিস্তার এবং এদের অন্তর্গত জগৎটি বিচিত্র।  এই বৈচিত্র্যের একটি কারণ তাঁর ঋদ্ধ অভিজ্ঞতা। নানা দেশে গিয়েছেন তিনি, অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতার সামনাসামনি হয়েছেন, বিচিত্র সব মানুষজন দেখেছেন, শুনেছেন তাদের গল্প।  ফলে তাঁর সাহিত্যের জগৎ হয়েছে বহু স্তরে বিন্যস্ত, বহু রেখায় নির্ণিত। আমাদের সীমিত অভিজ্ঞতার কম্পাস সে জগতের হদিস করতে পারে না।

সৈয়দ মুজতবা আলীর যে জনপ্রিয় বই গুলো পড়তে পারেন! 

গ্রন্থ পরিসংখ্যান

সৈয়দ মুজতবার মোট ত্রিশটি উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ ও ভ্রমণকাহিনী প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো- দেশে-বিদেশে, জলে-ডাঙায়, উপন্যাস অবিশ্বাস্য, শবনম, পঞ্চতন্ত্র, ময়ূরকণ্ঠী এবং ছোটগল্প চাচা-কাহিনী, টুনি মেম প্রভৃতি। মুজতবা আলীর ডি.ফিল অভিসন্দর্ভটি বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়। ‘পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ তাঁর আরেকটি অনবদ্য গ্রন্থ।

আরও পড়ুনঃ

কী লিখেছেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় !

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ১০ উপন্যাসের পেছনের ঘটনা !

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png