দক্ষ কর্মী হওয়ার জন্য মস্তিষ্কের বিকাশ কেন জরুরি ?

মস্তিষ্কের বিকাশ

এতোদিন আমার জানতাম যে, পাঠ আমাদের বিশ্লেষণ ক্ষমতার (কগনেটিভ) সমৃদ্ধি ঘটায়।  কিন্তু সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে যে, পাঠ কেবল কগনেটিভ ফ্যাকাল্টির উন্নতি ঘটায় না, বরং তা আমাদের কাজের গতিকে আরো বেগবান করে তোলে।  এছাড়া পাঠ ব্যক্তির মধ্যে পরিশ্রমী মানসিকতা গড়ে উঠতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।  পাঠ করা মানে কেবল মাথায় তথ্য নেওয়া নয়। বরং আপনার মস্তিষ্কের বিকাশকে নিশ্চিত করা।  সম্প্রতি বিজ্ঞান পাঠের এধরণের কার্যকরতার কথা তুলে ধরেছেন।

আপনি তেলযুক্ত মাছ অথবা হলুদ মসলাযুক্ত (টার্মেরিক) অন্য কোনো খাবার খেতে পারেন। আত্মবিকাশের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপও গ্রহণ করতে পারেন।  প্রতি সপ্তাহে কোনো ল্যাংগুয়েজ ক্লাব, ধাঁধাঁসম্পন্ন কোনো বই অথবা শারীরিক কসরত করে নিজের বিকাশ ঘটানোর প্রচেষ্টা নেওয়া যায়।  আমাদের বিশ্লেষণক্রিয়া ও স্মৃতিশক্তির উন্নয়নে বিভিন্ন মাধ্যম রয়েছে।

“সদ্য একটি গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ২০২২ সালের মধ্যে মস্তিষ্ক প্রশিক্ষণ ও কলকারখানার সক্রিয় (অ্যাসেসমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি) রাখার জন্য ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে।  কিন্তু স্বল্পমূল্যে, সহজ উপায়ে এবং কার্যকর সময়ে মস্তিষ্ক শাণিত করার মাধ্যমটি আমাদের হাতের নাগালে।  আর তা হলো পাঠ করা।”

পাঠ আপনার মস্তিষ্কের জন্য উপকারী— এটি বিস্ময়কর কোনো বার্তা নয়।  মায়েরা সন্তানদের সামনে টেলিভিশন বন্ধ করে রাখে এবং একটি ভালো বই হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এই সাধারণ কর্মকাণ্ড আপনার মস্তিষ্ককে বিভিন্নভাবে বিকশিত হতে সাহায্য করে।

পাঠের মধ্যদিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয় ভাষাগ্রহণের ক্ষেত্র (ল্যাংগুয়েজ রিসেপশন) ও বাম পাশের টেম্পরাল কর্টেক্স।  লেখন প্রক্রিয়ায় একটি বর্ণ থেকে শব্দ তৈরি, শব্দ থেকে বাক্য তৈরি এবং বাক্যের গাঁথুনির মধ্যদিয়ে গল্প তৈরি আমাদের নিউরণগুলোকে তথ্যের প্রবাহ সম্পর্কে সজাগ করে তোলে।  কথোপকথনকালেও একইভাবে নিউরনগুলো সক্রিয় থাকে।

“সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো পাঠ আপনার মস্তিষ্কের মধ্যে অধিকতর পরিশ্রম ও ভালো কিছু করতে প্রতিনিয়ত উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।”

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার শিক্ষা বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ডিস্লেক্সিয়া, ডাইভার্স লার্নার্স অ্যান্ড সোসাল জাস্টিস-এর পরিচালক ম্যারিআন্নে ওলফ্-এর মতে, সাধারণত পড়ার সময় আমাদের মস্তিষ্ক সবচেয়ে ক্রিয়াশীল থাকে এবং এসময় প্রচুর চিন্তা করার সুযোগ থাকে। পাঠ আপনার মধ্যে কোনো কিছু বুঝা ও অন্তর্দৃষ্টি জন্য একটি অনন্য বিরতি বোতাম (পজ বাটন) প্রদান করে, যা কথোপকথ কিংবা কোনো মুভি দেখা অথবা কাউকে শুনার সময় এই বাটনের সুযোগ থাকে না।

mostisker bikasতাছাড়া, পাঠের বিশেষ উপকার হলো একটি বই পড়ার পর আপনি ফেলে রাখলেও তা আপনার মস্তিষ্কে দীর্ঘ সময়ের জন্য ক্রিয়াশীল থাকে। ইমোরি ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় উঠে এসেছে যে, এধরণের প্রভাব ৫ বছর পর্যন্ত ক্রিয়াশীল থাকে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর নিওরোপলিসি’র পিএইচডি পরিচালক জর্জ বার্নস বলেন, “পাঠের এই দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবকে আমরা ছায়াকর্ম (শ্যাডো অ্যাকটিবিটি) বলে থাকি, যা প্রায় মাসল মেমোরি’র মতো অবচেতনভাবে ক্রিয়াশীল থাকে। মূলত এভাবেই পাঠ আমাদের স্মরণশক্তিকে শাণিত করে।

দক্ষ কর্মী হওয়ার ও মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য যে বই গুলো পড়তে পারেন !

পাঠ কেবল আমাদের ভাষার ক্ষেত্রটিকে ক্রিয়াশীল রাখে না।  এর পাশাপাশি আমাদের উজ্জীবিত হওয়ার কেন্দ্রিয় শক্তিকে (সালকাস নিউরোঅ্যানাটমি) গতিশীল করে তোলে।  কেননা, জীবন ও জগতের বিচিত্র ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক প্রধানতম ভূমিকা পালন করে। একারণে কর্মজীবনে মস্তিষ্কের বিকাশ আমাদের অবস্থা নির্ধারণ করে।  দৈহিক কর্মকাণ্ড সংশ্লিষ্ট কোনো বই পড়ার সময় নিউরনগুলোও বইয়ের বার্তা অনুসারে সাড়া প্রদান করে।  যেমন- সীবিসকুইট (১৯৩৮ সালে আমেরিকান হর্স অব দ্য ইয়ার নির্বাচিত হন, যার ভিত্তিতে লরা হিলেনব্রান্ড Seabiscuit : An American Legend গ্রন্থটি লিখেছিলেন )। উক্ত বইটি পড়ার সময় আপনি অশ্বারোহীর ভূমিকা পালন না করলেও আপনার মস্তিষ্কে একই ধরণের প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল থাকে। আর মস্তিষ্কের যত অঙ্গ সক্রিয় হবে তেমনি আপনার বিশ্লেষণ বা চিন্তা করার কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।

পাঠের ফলাফলে তারতম্য রয়েছে।  অর্থাৎ একেক ধরণের পাঠ আলাদা আলাদা ফলাফল নিয়ে আসে।

“স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় প্রাথমিকভাবে উঠে এসেছে যে, ক্লোজ সাহিত্যপাঠ (সাহিত্যের বিশ্লেষণধর্মী পাঠ) প্রবলভাবে মস্তিষ্ককে ক্রিয়াশীল করে তোলে। এমআরআই স্ক্যানে দেখা গেছে যে, জন অস্টিন’র উপন্যাস-মগ্ন পাঠকের মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ খুব বেশি পরিমাণে ক্রিয়াশীল থাকে, যা বিশ্লেষণ (কগনিটিভ) ও কর্মকা- পরিচালনাকে নিয়ন্ত্রণ করে। একইভাবে অন্য সাধারণ পাঠ তুলনামূলকভাবে কম নিয়ন্ত্রণ করে।”

আপনি কিংবা আপনার বন্ধু যদি কম পড়ুয়া বা অল্প বুদ্ধিসম্পন্ন (ডাইস্ল্যাসিক) হন, তাহলে কি এসব সুবিধা পাওয়ার জন্য আপনি কখনো বিপুল পরিমাণ পড়তে সক্ষম হবেন না? মনে রাখবেন, একটি বই কোনো একটি বিশেষ সমস্যার সমাধান হতে পারে! কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় দেখা যায় যে, ৮ থেকে ১০ বছরের শিশুরা সাধারণ পাঠক।
রেমিডিয়াল রিডিং’র (শিশুদের পড়ার আগ্রহ বাড়ানোর ক্লাস) একশো ঘণ্টার কোনো ক্লাস আবশ্যিকভাবে তাদের মস্তিষ্কের সাদা পদার্থগুলোর (হুয়াইট মেটার হলো মস্তিষ্কের এক ধরণের টিস্যু) বিকাশ ঘটাবে, যা ধূসর টিস্যু বা পদার্থের মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান ঘটায়। গবেষকদের সিদ্ধান্ত হলো এসব শিশুদের মস্তিষ্কে কেবল পাঠকেন্দ্রিক টেমপরাল কর্টেক্সের বিকাশ ঘটায়নি, বরং পুরো মস্তিষ্কের মধ্যে পুননির্মাণ করতে শুরু করেছিলো।

আত্মউন্নয়ণের জন্য বিখ্যাত লেখকদের এই ইংরেজি বই গুলো পড়তে পারেন !

গভীর মনোযোগের সঙ্গে পড়ার জন্য আপনাকে নিয়মিত চর্চা করতে হবে। ম্যারিআন্নে ওলফ্ তার সদ্য প্রকাশিত Reader, Come Home শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, নিয়মিত না পড়লে আমাদের মস্তিষ্ক ক্রমশ বিশেষ কোনো কিছুর গভীর যাওয়ার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারাতে থাকে। অবশ্যই এক্ষেত্রে একটি সহজ সমাধান রয়েছে। মোবাইল ও কম্পিউটার বন্ধ করে দুয়েক ঘণ্টা কেবল পড়তে থাকা।

মার্ক পেইসার
নির্বাহী সম্পাদক, রিডার্স ডাইজেস্ট অ্যাসোসিয়েশন

সূত্র: https://www.yahoo.com/lifestyle/why-reading-important-brain-110213840.html

আরও পড়ুনঃ 

ইমপ্যাক্ট বিপ্লব : ব্যবসার নতুন জগত !

পেপসিকোর সিইও থাকাবস্থায় ইন্দ্র নওয়ীর অর্জিত ৮ শিক্ষা

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png