ই-বুক বনাম মুদ্রিত বই

ই-বুক বনাম মুদ্রিত বই

উপন্যাস পাঠকালে গভীর মনোযোগ দিয়ে আপনি অভিজ্ঞতার মধ্যে ডুবে থাকেন। আপনার মস্তিষ্ক কল্পনাজগত ও আবেগগুলোর সঙ্গে জীবন্ত হয়ে উঠে। ইন্দ্রিয়গুলো সক্রিয় হয়ে উঠে। কথাগুলো শুনতে কাল্পনিক মনে হলেও এটি বাস্তব। পাঠকালে মস্তিষ্কে এধরণের পরিবর্তন ঘটে থাকে। পাঠ আমাদের দৈহিক পরিবর্তনও ঘটায়, যা আমাদের অধিকতর সহানুভূতিশীল করে তোলে।  উপন্যাসের বিবৃত অভিজ্ঞতা নিয়ে ভাবতে পাঠ মস্তিষ্ককে চিন্তা করতে বাধ্য করে ।

০১. পাঠ মনে ছবি নির্মাণ করে

পাঠ আমাদের মনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্বকে তুলে ধরে। গবেষকরা বলছেন, প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়। এতে কোনো ধরণের আগাম পরিকল্পনা বা প্রস্তুতির প্রয়োজন পড়ে না। পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়ে উঠে। শব্দ বা বাক্য পড়ার মধ্যদিয়ে আমাদের মনে ছবিগুলোর উদ্রেক ঘটে। অক্ষরগুলো মনের মধ্যে ছবিটির চিত্র তুলে ধরে। ফলে মস্তিষ্কের বিকাশ ও পরিবর্তন ঘটে।

০২. শ্রুতিবই মস্তিষ্ককে কাজ করতে সক্রিয় করে তোলে

সমালোকচকরা শ্রুতিবইকে অভিজ্ঞতার স্বাভাবিক পাঠের নিম্নস্তর হিসেবে সহজেই খারিজ করে দেন। কিন্তু গবেষকরা মনে করেন একটি গল্প শোনার প্রক্রিয়াটি আপনার মস্তিষ্ক আলোকিত করে। গল্প শুনলে কেবল মস্তিষ্কের ভাষা প্রক্রিয়ার অংশগুলো সক্রিয় হয়ে উঠে না, বরং সেই সঙ্গে মস্তিষ্কের পরীক্ষণ সংশ্লিষ্ট অংশগুলোও ক্রিয়াশীল হয়ে উঠে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের মস্তিষ্কগুলো সর্বক্ষণ সক্রিয় থাকে। বিশিষ্ট গবেষক জেরেমি হাসু (Jeremy Hsu) বলেন, “আপনার কথোপকথনের ৬৫ শতাংশ ব্যক্তিগত গল্প ও আড্ডা।” সুতরাং মস্তিষ্কের বিকাশে আপনি শ্রুতিবই বা আপনার সহকর্মীর গল্প শুনতে পারেন। গাড়িতে কিংবা কোনো পার্কে বেতার বা শ্রুতিবই আপনার সঙ্গী হতে পারে। মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য তা উপকারী।

০৩. পাঠ ও অভিজ্ঞতার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই 

আপনি কি এমন কোনো গল্প পড়েছেন যা পাঠকালে বাস্তব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন? আপনার মস্তিষ্ক কি এই অভিজ্ঞতাকে প্রকৃতঅর্থে বিশ্বাস করে? পাঠলব্ধ অভিজ্ঞতা ও বাস্তব জগতের মধ্যে মস্তিষ্ক কোনো ধরণের পার্থক্য তৈরি করে না। কেননা পাঠ বা অভিজ্ঞতাকালে একই স্নায়বিক এলাকাগুলো ক্রিয়াশীলে হয়ে উঠে। উপন্যাস আমাদের চিন্তা ও অনুভূতি জগতে প্রবেশ করতে পারে।  আপনি ভার্সুয়াল গেমস খেলে খুব উপভোগ করতে পারেন। তবে পাঠই অন্ততপক্ষে আপনার মস্তিষ্কের জন্য প্রকৃত বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে।

. পাঠের ধরণের উপর  ভিত্তি করে মস্তিষ্কের পরিবর্তন ঘটে

যে কোনো ধরণের পাঠ আপনার মস্তিষ্কে পরিবর্তন নিয়ে আসে। তবে বিভিন্ন ধরণের পাঠ স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতার নিরিখে  আলাদা আলাদা উপকার নিয়ে আসে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, বিশ্লেষণাত্মক সাহিত্য পাঠ (ক্লোজ লিটারারি) আপনার মস্তিষ্ককে বহুমুখী জটিল জ্ঞানগত কার্যাবলিকে (কগনিটিভ ফাঙ্কশন) ক্রিয়াশীল করে তোলে। সখের পাঠ (প্লেজার রিডিং) মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে রক্তপ্রবাহ বাড়িয়ে দেয়। গবেষকরা সিদ্ধান্তে বলেছেন যে, সখের বশে পড়ার চেয়ে সাহিত্যের মান বুঝতে কোনো উপন্যাস পড়া মস্তিষ্কের জন্য অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর ও কার্যকর।

পাঠলব্ধ অভিজ্ঞতা ও বাস্তব জগতের মধ্যে মস্তিষ্ক কোনো ধরণের পার্থক্য তৈরি করে না। কেননা পাঠ বা অভিজ্ঞতাকালে একই স্নায়বিক এলাকাগুলো ক্রিয়াশীলে হয়ে উঠে। উপন্যাস আমাদের চিন্তা ও অনুভূতি জগতে প্রবেশ করতে পারে।  আপনি ভার্সুয়াল গেমস খেলে খুব উপভোগ করতে পারেন। তবে পাঠই অন্ততপক্ষে আপনার মস্তিষ্কের জন্য প্রকৃত বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে

. নতুন ভাষা আপনার মস্তিষ্কের সমৃদ্ধি ঘটায়

আপনি কি আসলে আপনার মস্তিষ্ককে ক্রিয়াশীল পেতে চান? তাহলে ভিনদেশী ভাষার কোনো উপন্যাস হাতে তুলে নিন। সুইডেনের লুন্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকরা সুইডিশ আর্মড ফোর্সেস ইন্টাপ্রিটার অ্যাকাডেমি ও উমেয়া ইউনিভার্সিটির মেডিসিন ও কগনিটিভ সায়েন্সের কয়েকজন শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি পরীক্ষা চালিয়েছেন। উল্লেখ্য, সুইডিশ আর্মড ফোর্সেস ইন্টাপ্রিটার অ্যাকাডেম‘র শির্ক্ষার্থীদের মূল বিষয় ছিলো সুনিবিড়ভাবে ভাষা শিক্ষণ। পরীক্ষণের পূর্বমুহূর্তে উভয় শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্ক স্ক্যান করা হলো। তিন মাস সুনিবিড় পাঠের পর মস্তিষ্ক পুনরায় পরীক্ষা করা হলো। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, এই সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের প্রচেষ্টা ও শিক্ষণের উপর ভিত্তি করে ভাষা শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস ও সেরেভরাল কর্টেক্স অঞ্চলে সমৃদ্ধি ঘটেছে।

পড়তে পারেন Helen Fielding এর “How to Read and Why“বইটি ।

. আপনার মস্তিষ্ক ৭ দিনের মধ্যে ইবুক পড়তে অভ্যস্ত হয়ে উঠে

আপনি মুদ্রিত বই পড়তে অভ্যস্ত হলে ই-বুক পড়তে আপনার অস্বস্তি লাগবে। কিন্তু গবেষকরা বলছেন আপনার মস্তিষ্ক দ্রুত প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খেতে পারে। এটি মুদ্রিত বই পড়ার অভ্যাস বা আপনার বয়সের উপর নির্ভর করে না। বস্তুত, মাত্র ৭ দিনের মধ্যে মানবমস্তিষ্ক ই-বুক পড়তে অভ্যস্ত হয়ে উঠে।

. বুক স্থান চিহ্নিতকরণে (স্প্যাশাল নেভিগেশন) দুর্বল

যদিও আপনার মস্তিষ্ক খুব দ্রুত ই-বুকের সঙ্গে অভিযোজিত হতে পারে। এর মানে এই নয় যে, ই-বুক মুদ্রিত বইয়ের মতোই উপকার প্রদান করে। মূলত ই-বুকের ‘স্থান চিহ্নিতকরণ’র অভাব রয়েছে। পৃষ্ঠার হেফ্ট (ভাজ)-এর মতো স্পর্শযোগ্য খাতগুলো পড়ার সময় আমাদেরকে স্থানিক ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা প্রদান করে। এসব খাত বিবর্তনের মধ্যদিয়ে মনের মধ্যে এক ধরণের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। স্থানিক চিহ্নিতকরণের জন্য আমরা খাতগুলেরা উপর নির্ভর করি। অন্যথায়, আমরা হারিয়ে যেতে পারি। কিছু ই-বুক অসংখ্য পৃষ্ঠার কারণে স্বল্প ক্ষেত্রে স্থানিক চিহ্নিতকরণে সাহায্য করতে পারে। যাই হউক, পৃষ্ঠা নম্বরসহ হিসাব রাখা, স্পর্শযোগ্য চিহ্নিতকরণের সুযোগ থাকলে ই-বুক মুদ্রিত বইয়ের মতো আমাদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠবে। 

 আপনি মুদ্রিত বই পড়তে অভ্যস্ত হলে ই-বুক পড়তে আপনার অস্বস্তি লাগবে। কিন্তু গবেষকরা বলছেন আপনার মস্তিষ্ক দ্রুত প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খেতে পারে। এটি মুদ্রিত বই পড়ার অভ্যাস বা আপনার বয়সের উপর নির্ভর করে না। বস্তুত, মাত্র ৭ দিনের মধ্যে মানবমস্তিষ্ক ই-বুক পড়তে অভ্যস্ত হয়ে উঠে।       

. গল্পের আকার মস্তিষ্ককে ঘটনাক্রম, মনোযোগের বিস্তৃতি অনুসারে চিন্তা করতে প্ররোচিত করে

প্রতিটি গল্পের শুরু, মধ্যভাগ ও সমাপ্তি রয়েছে। এগুলো আপনার মস্তিষ্কের জন্য উপকারী। এই গঠন অনুসারে আমাদের মস্তিষ্ক ঘটনাক্রম ও কার্যকরণের সম্পর্কের ভিত্তিতে চিন্তা করতে প্ররোচিত হয়। আপনি যতই পড়বেন, ততই এই নিয়মে আপনার মস্তিষ্ক চিন্তা করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। নিউরোসায়েন্টিস্টগণ সন্তানদের জন্য সাধ্যমত এধরণের গল্প পাঠের ব্যবস্থা করতে পিতামাতাদের উৎসাহিত করেন। এভাবে আপনি সন্তানদের মধ্যে মস্তিষ্কের নমনীয়তা ও মনোযোগের বিস্তৃতির সক্ষমতা লাভে ভূমিকা রাখছেন।

পড়তে পারেন Daniel Smith এর “Banned Body Language Secrets: Ex CIA Agent Reveals How to Read Anyone Like a Book and Master the Art of Non-verbal Communication” বইটি ।  

. পাঠ আপনার মস্তিষ্কের গঠনশৈলী পরির্তন করে

আমাদের মধ্যে প্রত্যেকেই পাঠের অভ্যেস নিয়ে জন্মলাভ করেননি। একজন দুর্বল পাঠক সাহিত্য পাঠের মজা নাও বুঝতে পারেন। কিন্তু তাদের প্রত্যেককেই ভালো পাঠক হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। এই প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে তাদের মস্তিষ্কের পরিবর্তন হতে পারে। বিজ্ঞানী কার্নেগী মেলন আবিষ্কার করেছেন যে, ছয়মাস নিয়মিত পড়াশোনার মধ্যদিয়ে মস্তিষ্কের ভাষার অঞ্চলের সাদা উপাদানগুলো (হুয়াইট ম্যাটার) বৃদ্ধিলাভ করেছে। এভাবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মস্তিষ্কের গঠন বিকশিত ও অধিকতর  পাঠপ্রবণ হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।

১০. গভীর পাঠ সহানুভূতিশীল হতে শেখায়:

পাঠে গভীরভাবে ডুব দেওয়ার মধ্যদিয়ে আপনার মস্তিষ্কের মধ্যে দৈহিক পরিবর্তন ঘটাতে পারেন। আমরা যেমন বাস্তবজগতের বিভিন্ন ঘটনা বা গল্প শুনতে উপভোগ করি তেমনি কোনো গল্পের গভীরে ডুব দিয়ে চরিত্রগুলোকে উপলব্ধি করতে আনন্দ লাভ করি। ‍এগুলো বাস্তবজগতে অন্যদের প্রতি আমাদেরকে আরো সহানুভূতিশীল হতে শেখায়।

সূত্র: https://oedb.org/ilibrarian/your-brain-on-books-10-things-that-happen-to-our-minds-when-we-read/

 

আরও পড়ুনঃ 

বই পড়া কিভাবে আমাদের মস্তিষ্কে পরিবর্তন ঘটায়

বই পড়লে আয়ু বাড়ে !

দক্ষ কর্মী হওয়ার জন্য মস্তিষ্কের বিকাশ কেন জরুরি ?

বইয়ের সঙ্গে পাঠকের যত রসায়ন !

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png