হাসান আজিজুল হকের গল্প ভাবনা ও নির্মাণ শৈলী

হাসান আজিজুল হকের গল্প

আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ ও ‘খাঁচা’ বাংলা সাহিত্যের অপ্রতিদ্বন্দ্বী কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের এ দুটি গল্প নিয়ে কিছু আলাপ।‎ হাসান আজিজুল হকের গল্প চিনেছিলাম হায়াৎ মামুদ স্যারের বই, ‘মৃত্যুচিন্তা রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য জটিলতা’ পড়ার পর। বইটিতে তিনি বোদলেয়ার, হাসান আজিজুল হক আর জ্যোতি প্রকাশ দত্তের কবিতা ও গল্প সম্পর্কে অপূর্ব ভাষার বুননে সুন্দর আলোচনা লিখেছিলেন।

সময়টি ১৯৬৯ সাল । আমি এইচএসসির ছাত্র। কলেজের বার্ষিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হলে দশটি বই পুরস্কার পেয়েছিলাম। স্মরণ করার মতো দুটি বই ছিলো। তার ভেতর বর্ণিত বইটি ছাড়াও খন্দকার ইলিয়াসের সাড়ে সাত শো পৃষ্ঠার উপন্যাস কতো ছবি কতো গান ছিলো। বইটিতে হাসান আজিজুল হকের গল্প সম্পর্কে পড়ে সিরাজুল চাচার কাছ থেকে আত্মজা ও একটি করবী গাছ বইটি পেয়ে যাই। তিনি ১৯৬০ সালে রাজশাহী ভার্সিটির প্রথম ব্যাচের পাশ করা ছাত্র ছিলেন। স্যারও মনে হয় ওই সময় ভার্সিটি থেকে পাশ করেন। স্যারের কাছে শুনেছিলাম, তিনি ইংরেজি সাহিত্য পড়তে ভার্সিটি এসে মত বদল করে দর্শনে ভর্তি হন। ‎

এখন মূল বিষয়, তাঁর গল্প লিখার গল্পে আসি। ‎ তাঁর খুব বিখ্যাত গল্প ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ বেরিয়েছিলো ১৯৬৬ সালে। বই হয়ে বেরিয়েছিলো ১৯৬৭ সালে। এই গল্প নিয়ে তাঁর মুখোমুখি বসার সুযোগ হয়েছিলো আমার। আমি বললাম, আপনি বাংলাদেশের গল্পে সম্পূর্ণ নতুন ভাষা ব্যবহার করেছেন। ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্পের শুরুর আবহ এইভাবে এই যে ‘অল্প বাতাসে একটা বড় কলার পাতা একবার বুক দেখায় একবার পিঠ দেখায়।’ এমন কাব্যিক ভাষায় আমি কারো লিখা গদ্য পড়ি নি। তিনি বললেন, দ্যাখো অতো ভেবে মেপে লিখি না। আমি গল্পে ঢুকতে পারছিলাম না। একবার লিখি। ফের কাটি। যখন আমি এই লাইনটি লিখলাম সাথে সাথে লিখার ভাষা পেয়ে গেলাম। ভাষা নির্বাচন করে লিখা যায় না। লিখা তার নিজস্ব ভাষা ও গতি খুঁজে নেয়। আমি আর থামি নি। পুরো গল্পটি লিখে তারপর উঠেছি। ‎ গল্প তার ভাষা ও গতি নিজে খুঁজে নেয়। জলের গতির মতো কথা তাঁর। আমার সাথে তাঁর একথা হয়েছিলো ১৯৮৮ সালে। আজো মনের ভেতর জ্বলজ্বল করে। এই ভাষা নিয়ে তাঁর মাপের একজন গল্প লেখকের উক্তিটি তিনি পরেও করেছেন।‎

গল্পের পটভূমি হচ্ছে দেশভাগের পরের মানবিক বিপর্যয়ের অভিঘাত। বিশ্ব সাহিত্যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরের মানবিক বিপর্যয়ে যে অভিঘাতমূলক সাহিত্য গড়ে ওঠে, হাসান আজিজুল হক, দেশ ভাগের কাহিনীতে না গিয়ে দেশভাগের অভিঘাতে নির্মম অবস্থা এই গল্পে দেখিয়ে দিয়েছেন। আমি বললাম, আপনি কি করবী গাছকে বিষ অর্থে ব্যবহার করেছেন? তিনি বললেন, আর উপায় কি ছিলো বলো? মানবিক বিপর্যয়ে বিধস্ত বাবা এপারে নিজের মেয়েকে অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছে। এর চেয়ে কষ্টের কী হতে পারে! বিষতুল্য বটে। ‎

ভাষা নির্বাচন করে লিখা যায় না।  লিখা তার নিজস্ব ভাষা ও গতি খুঁজে নেয় – হাসান  আজিজুল হক । 

দেশ ভাগ নিয়ে তাঁর আরেকটি গল্প ‘খাঁচা’। ‘জীবন ঘষে আগুন’ বই এর গল্প। আমি খাঁচা গল্পটি পড়ে একটা নতুন ধরনের ভাষা খুঁজে পাই যা তিনি অন্য কোনো গল্পে ব্যবহার করেন নি। ছোট ছোট শব্দগুচ্ছে ছোট ছোট চিত্র অঙ্কন। অসাধারণ এই ভাষার ব্যবহার। পরম্পরায় আর কারো ভাষায় এমনটি দেখি নি আমি। পড়েছিলাম ১৯৭৪ সালে। আর প্রশ্ন করেছিলাম ১৯৮৮ সালে, স্যার এই মার্বেল কাটিং ভাষা আপনি কিভাবে নির্মাণ করলেন? একেকটি ছোট বাক্যবন্ধে একটি রং বেরিয়ে আসছে। টুটা ফাটা জংলা জীবনের ভেতর একটি পরিবারের বউটি ভারত যাবার স্বপ্ন দেখে আর স্বামী সেটি এড়িয়ে এদেশেই থেকে যেতে চায়। এইসব টানাপোড়নের ফলে ছেলে উচ্ছন্নে যাচ্ছে। বাবা দাড়ি কাটার জন্যে দু আনা চাচ্ছে। এই বৈকল্য ভাবা যায় বলো? ‎এই গল্প নির্মাণে লেখকের ভাষা ও বাক্য ব্যবহারের কুশলতা সম্পর্কে আমি তাঁকে অনেকবার জিজ্ঞাসা করেছি। কীভাবে এই ভাষা দেশভাগের অভিঘাতের মতো গল্পে তিনি ব্যবহার করলেন? হাসান আজিজুল হকের একই উত্তর, ভাষা গল্পের সাথে তার পথ খুঁজে নেয়। আমি নিজে ভাষাকে নির্মাণের পক্ষের লেখক নই। যদি তোমার জিজ্ঞাসা থাকে, তুমি আমার লিখার ভাষা উন্মোচন করে দেখাও। ‎সেই দায়বদ্ধতা থেকেই আমি আপনাদের সামনে গল্পই দুটির ভাষা ও বিষয় নিয়ে পড়ার অনুরোধ রাখলাম।

হাসান আজিজুল হকের মতে, তার শ্রেষ্ঠ গল্প ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গ্রন্থের ‘আমৃত্যু আজীবন’ সম্পর্কে বিশ্লেষণ ও লেখকের হালনাগাদ মতামত। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত হাসান আজিজুল হক স্যারকে যতবার জিজ্ঞেস করেছি, তাঁর মতে তাঁর সেরা লিখা কোনটি। তখন পর্যন্ত তাঁর চার বা পাঁচটি ছোট গল্পের বই বেরিয়েছে। সক্রেটিস, লাল ঘোড়া আমি, ফুটবল থেকে সাবধান ও দুটি প্রবন্ধের বই বেরিয়েছে। ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত তিনি দ্বিধাহীন বলতেন, ওই ‘আমৃত্যু আজীবন’ গল্পটিকে এগিয়ে রাখতে পারো।

১৯৯০ সালে আমার সাথে এক ভিডিও সাক্ষাৎকারেও তিনি সে মত পাল্টান নি। তবে পাতালে হাসপাতালের ‘অচিন পাখি’ গল্পটির প্রতি তাঁর দুর্বলতা আমি লক্ষ্য করেছি। কেন সারা জীবন ওই ‘আমৃত্যু আজীবন’ গল্পটিকে তিনি এগিয়ে রাখেন? আমি অনেকবার, শতবার হয়তো গল্পটি পড়েছি। গল্পটি আমার গল্পের উপর প্রভাব রেখেছে। আমি বলেছিলাম, আপনি ‘জীবন ঘষে আগুন’ গল্পটিকে শ্রেষ্ঠ বলতে পারতেন। তিনি মাথা নেড়েছেন। না। ওটি নয়। তুমি ‘আমৃত্যু আজীবন’-কেই শ্রেষ্ঠ ধরতে পারো। অনেক গল্পের প্রতি আমার দুর্বলতা আছে। আমি বলেছিলাম, ‘মন তার শঙ্খিনী’ বা ধরুন ওই ‘উত্তর বসন্তে’ নয় ক্যানো? আমার তো সেদিকেও টান বেশি পড়ে। তিনি একটি কমপ্লিট জীবনের গল্প, চিরকালীন বাংলার মানুষের ভাগ্যালিপির গল্প যা কবিতার মতো বয়ানে প্রায় ছন্দিত ও বিশাল ক্যানভাসে প্রতিফলিত গল্প ‘আমৃত্যু আজীবন’-কে তাঁর সাহিত্যের কপালের টিপ ভাবতেন।

বাংলা সাহিত্যে এমন জীবনদর্শন এর গল্প আর একটিও নেই। কেন এটি বাঙলার ছোটগল্পে শ্রেষ্ঠ লেখকের শ্রেষ্ঠ গল্প? গল্প শুরুর আবহ দেখুন। ‘আকাশে হাওয়া ছিল তখন ‎করমালি দেখছিল মোষের মত কালো মেঘ উঠে আসছে। সে চিৎকার করে ছেলেকে ডাকলো, বিষম মেঘ আসতিছে বাজান। দেরি করিসনি আর। বলে সে উঠে গোয়াল ঘরে গিয়ে বলদ দুটোর দিকে একটু মন দিলো। ধোলা গরুটার লেজ নাচছিল চঞ্চলভাবে। একপাশে খোঁড়া গাইটা শুয়ে খড়ের গাদার উপর। বিশাল কালো চোখে চেয়ে আছে অন্ধকারের দিকে। ছাই গাদা থেকে উঠে গা ঝাড়ল কুকুরটা, আকাশের দিকে মুখ তুলে জলো বাতাস শুকল। ‘মেঘ আসার মুহূর্তে এ এক অতি সূক্ষ্ম দৃষ্টির নিপুন কাব্যিক বর্ণনা। শাশ্বত বাংলার আবহাওয়ার ভেতর মানুষ ও পশুর আচরণ এইটুকু কথার ভেতর বলা হয়ে গেলো। ‎এটি গল্পের প্রথম পঙক্তি।

তৃতীয় পঙক্তি দেখুন: ‘এইটুকু সময়মাত্র গেছে। যে সুর্মা রঙের মেঘবাহিনী উঠে আসছিল, তারা এখন আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে। করমালি শুনতে পেল গর্জন গড়িয়ে বেড়াচ্ছে শানের উপর পিপের মতো।’ গদ্যের ভেতর এমন নিখুঁত কাব্যিক উদাহরণ ভাবা যায়? ভাবা কঠিন কিন্তু বিশাল গল্পে হাসান আজিজুল হক বাংলার কৃষকের বিধিলিপি সর্বময় এঁকে দিয়েছেন। ‎একদা এক মেঘলা বিকেলে ছেলে ও করমালি জমিতে গিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে তার বিশালত্ব দেখে অবাক হয়ে নিজের জমিতে কোদালের কোপ দেয়া মাত্র সে একটা অতি অলৌকিক হিস শব্দ শুনতে পেয়েছিলো। সেই শব্দের কেন্দ্র একটি সাপের ফণা যেন তার সামনের আকাশটা ঢেকে ফেলেছিল। একটা মুহূর্তে সব ঘটে যাবার পর করমালি ভয় পেয়ে তার ছেলেকে ও রহম বলে ডেকেছিল। সে ডাক সে শব্দ করে ডেকেছিল কিনা তার মনে নেই। তারপর রহমকে সে বলেছিল তার শরীর খারাপ। বাড়ি চল। রহম বাবার ভয়ার্ত চেহারা দেখে বাড়ির পথ নিলে, গোয়াল ঘরের জটলা দেখে করমালি সেখানে তার বলদ জোড়ার একটিকে পা ছড়িয়ে পড়ে থাকতে দেখেছিল। লোকে বলছিলো, সাপে কেটেছে। এই সাপ ও আকাশ দেখে তার ভয় পাওয়ার ব্যাপারটি বড় অদ্ভুত ভাবে একসূত্রে এসে বাঁধা পড়ে। অনেকের সান্ত¦না নিয়ে করমালি বাড়ি যায় যখন, তখন রাত নেমে আসে। সাথে বৃষ্টি। দেওয়ায় বসে করমালি ভাবে তার নিজের কয়েক ছটাক জমি। দুটি বলদ দিয়ে সে পরের জমি বর্গা করে। এখন কিভাবে একটা বলদে সে চাষ করবে? সে তখন অবিনাশী মৃত্যু দর্শন করে। বউ এগিয়ে এসে বলে, আমি রহমকে কোলে করেছি। আমি একদিকের জোয়াল টানতে পারবো। কি ভয়াবহ এই কথা! গল্পে আরো অনেক রূপক আছে। দর্শন আছে। ‎এমন ধ্রুপদী গল্প পড়ে আমি আপ্লুত না হয়ে গল্পের ভেতরে ঢুকে যাই। আর একদিন আমিও অমন বিশাল করে একই দর্শনে লিখে ফেলি আমার গল্প ‘গফুরের জীবনদর্শন।’ বুঝতে পারি, আমি হাসান আজিজুল হক কে অনুসরণ করেছি। কিন্তু সত্যি আমার কিছু করার ছিলো না। ‎ গল্পের মূল দর্শন কিন্তু এক মহাশক্তি, যাকে শুধু করমালির মতো খালি চোখে দেখা যায়। কেউ কোনো যন্ত্র দিয়ে এই মহাশক্তিকে থামাতে পারে না। এই দর্শন আমি উইলিয়াম ফকনারের ‘দি বিয়ার’ গল্পে দেখেছি। গল্পটি বেশ বড়। শত সুন্দরের বর্ণনা দেয়া যায়। তার চেয়ে বলি, গল্পটি পড়লে, গল্প লিখার অনেক কলাকৌশল জানা যাবে। একারণেই গল্পটি পড়া জরুরি মনে করি। ‎দর্শনভিত্তিক গল্প অথচ গোটা বাংলার কৃষকের বিধিলিপি এই গল্পের সারসংক্ষেপ।

ভাষা লিখাকে টানে ঠিক, কিন্তু লিখার বিষয়ও ভাষা নির্বাচন করে নিজে।

হাসান আজিজুল হকের রহস্যময় নতুন ভাষার গল্প ‘সারা দুপুর’ প্রত্যেক বাড়ির সিঁড়ি আলাদা। প্রত্যেক গল্পের ভাষা আলাদা। কারো বড় ধাপের সিঁড়ি। কষ্টের। আর কারো আয়েশ করে উপরে ওঠার ছোট মাপের সিঁড়ি । সিঁড়ি কিন্তু সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়েই ঘর পর্যন্ত উঠতে হয়। গল্প পড়ার ক্ষেত্রেও আমরা শত রকম বাক্য বিন্যাসের ভেতর দিয়ে গল্পের ভেতরে ঢুকি এবং গল্প শেষ করে ভাবি, এ কেমন গল্প। কোনটির শেষটা স্পষ্ট। কোনটি রহস্যময় ধুয়াশায় আটকে গেছে। ‎এমন একটি ধোঁয়াশায় আটকে যাওয়া ছোট ছোট বাক্য বিন্যাসে লিখা কষ্টের গল্প হাসান আজিজুল হকের লিখা ‘সারা দুপুর।’ খুব ধীর লয়ে গল্প ক্রমশ এগিয়ে গেছে। গল্পের বক্তব্য প্রায় শেষ। কিন্তু গল্প যার চেতনার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে তার পরিণতি কি হলো, সেটি জানা যাবে না। অদ্ভুত এই গল্প নির্মাণের কৌশল। এই কৌশলকেই গল্পের মোচড় বলে। হ্যাচকা টানে বুকের দম বন্ধ করে ফ্যালে।

‘সারা দুপুর’ গল্প শুরুর কথা এরকম- ‎‘কাঁকন ছেলেটা বেড়াতে বেরুলো। শুকনো মুখে খালি পায়ে বেরিয়ে এলো। মা বললো না, কাঁকন কোথায় যাস। ওকেও বলতে হলো না, কোথাও না, এমনি। কাঁকন জানে, মা কিছুই জিজ্ঞেস করবে না, কারণ ডাক্তার এসেছিল, বলে গেছে, দাদু মারা যাবে আজ। না হয় কাল। না হয় পরশু। কিন্তু মারা যাবেই।’ এর পরে এই ছোট কাঁকন এর মনের অনুভূতি পড়–ন ‘সব মরে যাচ্ছে গো- কাঁকন এই কথাটা শোনাবার মত লোক খুঁজে পেল না। দ্যাখো না, পাতা মরে যাচ্ছে, ঘাস মরে যাচ্ছে, বাগানগুলো ফাঁক ফাঁক, ফ্যাকাশে হলদে হলদে ভিজে ভিজে। মরে যাচ্ছে আর কি ! দাদুও মরে যাচ্ছে এই সঙ্গে।’ ‎এতো সহজ সরল ভাষা। এতো প্রাঞ্জল। কারণ কি? কারণ ভাবনা ও গল্পের কেন্দ্রবিন্দু ওই বালক কাঁকন। ভাষা কাঁকন এর গল্প টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তাই ভাষাও এতো নরম।

লেখক বলেছিলেন, ভাষা লিখাকে টানে ঠিক, কিন্তু লিখার বিষয়ও ভাষা নির্বাচন করে নিজে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব কাঁকন এর অনুভব। তাই এই সহজ সিঁড়ির মতো হালকা ভাষাকে রকমই হোক। গল্প কিন্তু জড়িয়ে আছে কাঁকন এর মা, দাদু, মায়ের অচেনা আপন মানুষ ও কাঁকন এর বাবার পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে। সেই গল্পটি হচ্ছে, কাঁকন এক বালক। মায়ের সাথে থাকে। সাথে দাদু থাকেন। তিনি অসুস্থ । বিছানায় পড়ে থাকেন। দাদু কাঁকন এর কাছে ভাজা ইলিশ মাছ রান্না ঘর থেকে আনতে বলেন। তিনি বালিহাঁসের মাংস খেতে চান। কাঁকন এর কিছুই দিতে পারে না । কাঁকন শুনেছে, তার বাবা দূরে ঢাকায় থাকে। এতটুকুই। বাবা সম্পর্কে কাঁকন আর কিছুই জানে না। কিন্তু কাঁকন আর বন্ধুরা একদিন কাঁকনকে তার বাবা কোথায়, জিজ্ঞেস করলে কাঁকন বললো ঢাকায় থাকে। তার বন্ধুরা কাঁকনকে বললো, তোর বাবা এক মাগী নিয়ে পালিয়ে ঢাকায় থাকে। এখানে আসলে লোকে মারবে। ‎ কাঁকন এ কথা শুনে ‘মাগী’ শব্দটির অর্থ বের করতে না পেরে গভীর রাতে মাকে জিজ্ঞেস করলো, মাগী অর্থ কী? কে তোমাকে বললো? কাঁকন বললো বন্ধুরা বলেছে বাবা নাকি….।‎ তার মা উত্তরে তার গালে প্রচ- একটা চড় দিয়ে বললো, এতো রাতে বজ্জাতি? মাগী চেনো না? আমি হলাম মাগী। কি ভয়াবহ উক্তি। ক্রোধ। এক মা ছেলেকে বলছে নিজ সম্পর্কে এ কথা। ভয়াবহ নয় কি? ‎কাঁকন এর মা ফের বললো, আর একটি কথা নয়। এ কথা কাউকে বলো না। শুয়ে পড়।

হাসান আজিজুল হকের সকল বই কিনুন  রকমারি ডট কম থেকে ! 

একদিন কাঁকন একটা লোককে তার মায়ের কোলে বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখলো। তার মা পরম আদরে লোকটির চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কাঁকন লোকটিকে বাজারের পথে প্রায় দেখতে পাই।‎ কাঁকন বিমর্ষ হয়ে গেলো। এর পর সে একা হতে থাকলো। আর একদিন এক মরা দুপুরে একাকী কাঁকন অনেক কষ্ট বুকে নিয়ে রেল লাইনের পাশে বসে প্রকৃতির মরা ঝরা রূপ প্রত্যক্ষ করে রেল লাইনের উপর উঠে এলো। ট্রেন চলে যাবার পর লাইন ঝকঝকে করছিল। ‎ঠিক তার পরের লিখার শেষ স্তবকে লেখক লিখলেন, ‘তারপর কি নিদারুণ স্তব্ধ প্রশান্তি।’ ‎কাঁকন কি তবে আত্মহত্যা করলো? লেখককে আজ আমি জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, তুমি বুঝে নাও। পাঠক নিজের মতো করে বুঝে নেবেন। ‎আসলে কাঁকন তখন আর পৃথিবীতে নেই। ‎কি প্রশান্ত ভাষায় এক আত্মঘাতি জীবনের গল্প লিখলেন হাসান আজিজুল হক? ভাবতে পারেন?


হাসান আজিজুল হকের গল্প ভাবনা ও নির্মাণ শৈলী লিখেছেন
ভাস্কর চৌধুরী

 

আরও পড়ুনঃ 

বাংলা সাহিত্যের যেসব বই থেকে সিনেমা বানানো হয়েছে

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের বৈচিত্রময় জীবন

কথাগুলো সৈয়দ মুজতবা আলীর জীবনী থেকে নেয়া !

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ১০ উপন্যাসের পেছনের ঘটনা !

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png