কলমের ইতিবৃত্ত

কলম

কলম সম্পর্কে আমি কি লিখব? পাঠকবৃন্দও হয়তো সেই চিন্তায় করছেন। চিন্তার কথায় বটে। কলম নিয়ে লিখতে হবে এ চিন্তাও আমি কোনোদিন করিনি। হঠাৎ করেই একদিন কথা প্রসঙ্গে আমার স্নেহভাজন “জাতীয় বৃক্ষ আম গাছ, জানা-অজানা অধ্যায়ের” লেখক সাব্বির আহম্দ কেন যেন বলে ফেললেন, “স্যার, আপনি কলম নিয়ে কিছু লিখেন”। আমি মনে মনে ভাবলাম সাব্বির কেন যে আমাকে কলম সম্পর্কে লিখতে বললো, আমি এখন পর্যন্ত তা বুঝে উঠতে পারছি না। তার ধারণা আমি বেশ ভাল লিখি, কাজেই কলম ও কালি এতোই গুরুত্বপূর্ণ এবং আমাদের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে যে, এ সম্পর্কে আমি বোধ হয় ভাল কিছু লিখতে পারবো। তাঁর চিন্তা ভাবনা একেবারে অমূলক নয়। আমাদের জীবনের সঙ্গে তথা সমগ্র মানব জাতির কল্যাণে এই কলম ও কালি যে কত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে তার হিসাব রাখা কি সম্ভব? পবিত্র কোরান শরীফেও এই কালি ও কলমের কথাই উল্লেখ আছে। সুরা লোকমানের ২৭ আয়াতে বর্ণিত আছে, “পৃথিবীর সমস্ত বৃক্ষ যদি কলম হয় এবং এই যে সমুদ্র ইহার সহিত যদি আরও সাত সমুদ্র যুক্ত হইয়া কালি হয়, তবুও আল্লাহর বাণী নিঃশেষ হইবেনা, আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” অন্যদিকে হাদিসের কথা” জ্ঞান সাধকের কলমের কালি, শহীদের রক্ত-এর চেয়েও পবিত্র।” কত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ কথা। ইসলাম ধর্মে লেখাপড়া শেখা অর্থাৎ জ্ঞান অর্জন করা ও মানুষকে জ্ঞানদান করা একটি মহৎ কাজ। এর জন্য কালি ও কলমের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রকৃত প্রস্তাবে কলম ও কালির ব্যবহার কখন থেকে আরম্ভ হয়েছে, এর কোনো সঠিক ইতিহাস আমার জানা নেই। অথচ কোরান শরীফ যখন নাজেল হয়, তখনও এই কলম ও কালির কথা উল্লেখ আছে। আনুষ্ঠানিকভাবে কালি ও কলমের ব্যবহারের অনেক পূর্ব থেকেই এর বিকল্প হিসেব রং তুলি ও আঙ্গুলের ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়।

পবিত্র কোরান শরীফেও এই কালি ও কলমের কথাই উল্লেখ আছে। সুরা লোকমানের ২৭ আয়াতে বর্ণিত আছে, “পৃথিবীর সমস্ত বৃক্ষ যদি কলম হয় এবং এই যে সমুদ্র ইহার সহিত যদি আরও সাত সমুদ্র যুক্ত হইয়া কালি হয়, তবুও আল্লাহর বাণী নিঃশেষ হইবেনা, আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”

পড়তে পারেন  আল্লাহর প্রথম সৃষ্টি : কলমের ইতিহাস বইটি রকমারি ডট কম থেকে ! 

লিউনার্দো দ্য ভিঞ্চি (১৪৫২-১৫২৯) পৃথিবী খ্যাত শিল্পকর্ম মোনালিসা আমাদের সকলের কাছেই অতি পরিচিত। মানব সভ্যতার ইতিহাস লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি পৃথিবীর কয়েকজন পূর্ণাঙ্গ মানুষের মধ্যে তিনি একজন। এমন বহু বিচিত্র প্রতিভার সম্মিলন মানুষ যা খুব কম মানুষের মধ্যেই দেখা যায়। তিনি ছিলেন চিত্রশিল্পী, ভাস্কর্য, গণিত বিশারদ, গায়ক, প্রকৃতি বিজ্ঞানী, শরীর তত্ত্ববিদ, সামরিক বিশেষজ্ঞ, আবিষ্কারক, স্টেজ ডিজাইনার, দার্শনিক সব কিছুই। সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেও তিনি মনে করতেন, তাঁর জীবন এক অসমাপ্ত যাত্রাপথ। তিনি এই চিত্রটি অঙ্কন করেছিলেন কি দিয়ে হয়তো বা রং তুলি না হয় কালি কলম দিয়ে কিংবা হাতের আঙ্গুল দিয়ে যা কলমেরই রূপান্তরিত রূপ। কিন্তু এ ছবি যে হাতের আঙ্গুল দিয়ে আঁকা সম্ভব ছিল না, তা ছবিটি বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়। তবে রংতুলির ব্যবহার দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসছে, এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। রং-তুলির কাজ করতে লেখা পড়া জানার তেমন প্রয়োজন হয় না। পৃথিবীখ্যত চিত্র শিল্পীর রং তুলি দিয়েই সব কিছু করেছেন।

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি” বইটি কিনতে ক্লিক করুন এখানে !! 

হাতের আঙ্গুল দিয়ে লিখেও যে কঠিন পাথরের উপর লেখা যায় তার এখানে একটি উদাহরণ দিচ্ছি। ১৯৬১-৬২ শিক্ষাবর্ষে আমি ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে অবস্থান করছিলাম। কলকাতায় আমাদের এক হিন্দু বন্ধু আমাদের নিয়ে গেলো ব্রিস্টলের কাছে একটি জায়গায় ঘুরতে। জায়গাটা ফাঁকা, বেশ কিছু গাছপালা আছে, তবে জঙ্গল নয়। খোলা জায়গার মধ্যখানে একটি বাড়ি। এই বাড়িটায় ছিলো এই জায়গাটার আকর্ষণ, যা আমরা পূর্বে জানতাম না। বাড়িটা বেশ পুরাতন। দ্বিতীয় তলায় কয়েকটি কক্ষ ছিলো। তবে বাড়িটার দরজা জানালা তেমন ছিলো না। দিনে ফাঁকায় পড়ে থাকে। রাত্রে দু’চারজন ভবঘুরে এখানে ঘুমিয়ে থাকে। এখানে বাস করার মতো তেমন পরিবেশ নেই, যাকে বলে ভুতুড়ে বাড়ি। গাড়ি থেকে নেমে আমরা বাড়িটাতে প্রবেশ করলাম। সেখানে একজন গার্ড কাম গাইড দাঁড়িয়ে ছিলো। তাঁর বর্ণনা মতে কয়েক শত বছর পূর্বে এই বাড়িটা কারাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বিচার আচার হতো কি না তা তিনি বলতে পারেন নি, তবে যে কোন অপরাধের জন্যই তাদের এই কারাগারে কয়েক মাস, বছর, কয়েক বছর কাটাতে হতো। এতে সেই যুগের মানুষের নিষ্ঠুরতারই প্রমাণ পাওয়া যায়। দেখলাম কক্ষগুলো বেশ ছোট, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২.৫০ মিটার ১.৫০ মিটার কোন রকমে একজন মানুষ থাকা যায়। বাড়িটার দেয়ালগুলো সব পাথরের তৈরি, তিন দিকে দেয়াল, এক দিকে মোটা লোহার শিকের দরজা। এই অন্ধকার কুঠুরিতে তাদের দীর্ঘসময় কাঠাতে হতো। কোন কোন কুঠুরিতে দেখলাম বিভিন্ন ধরনের লেখা, তাতে তাদের জীবনের করুণ কথাগুলো ফুটে উঠেছে। এই লেখার মধ্যে তাদের জীবনের হৃদয়-বিদারক জ্বালা, যন্ত্রণামূর্ত প্রতীক হয়ে কঠিন পাথরের উপর অঙ্কিত হয়েছে, যা সব কিছুই হয়েছে হাতের আঙ্গুলের সংস্পর্শে। ফলে আঙ্গুলের নখ দিয়ে যে কঠিন পাথরের উপরেও লেখা যায় এর থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। কাজেই লেখালেখির ক্ষেত্রে কলম যে একেবারে অপরিহার্য সেটা জোর দিয়ে বলা যাবে না।

কলমের গত একশত বছরের ইতিহাসও এর ব্যবহার সম্পর্কে আমি মোটামুটি জানি। কলমের ব্যবহারের কথা জানতে হলে, এর সঙ্গে কালির যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে তা আপনা থেকে চলে আসে। আমাদের প্রথমে যখন হতে খড়ি হয় তখন লেখা হতো স্লেট এবং পেন্সিল দিয়ে। স্কুলের ছেলে মেয়েদের লেখার জন্য কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো স্লেট পাথরের ফালিকেই স্লেট বলা হতো। এর রং ছিলো কিছুটা ধুসর, তবে মাঝে মধ্যে কালো রং দিয়ে কালারিং করা হতো। স্লেটে লেখার জন্য স্লেট পাথরের তৈরি সরু পেন্সিল ব্যবহৃত হতো। স্লেটের রং ধুসর বা কালো পেন্সিলের রংও ধুসর, কিন্তু লেখা হতো সাদা। একবার লেখা হয়ে গেলে, সেগুলোকে হাত দিয়ে বা ভেজা ন্যাকড়া দিয়ে পরিষ্কার করলেই (যাকে বলে Clean Slate) সেখানে আবার নতুন করে লেখা যেতো। এই স্লেটগুলোর ব্যবহার চলতো বছরের পর বছর ধরে, এমন কি বংশানুক্রমে। যে স্লেট পাথরকে জোরে আঘাত করলে অবশ্য ভেঙ্গে যায়, কিন্তু যত্ন রাখলে এটা ছিল অক্ষয় এবং বারংবার ব্যবহারের জন্য একটা আদর্শ বস্তু। বাড়িতে শিশু থাকলে একাধিক শ্লেট ও পেন্সিল থাকবেই। এগুলো বইয়ের দেকানে বইয়ের সঙ্গে বিক্রি হতো। তখন অবশ্য কাঠ-পেন্সিলেও ছিলো, কিন্তু এর ব্যবহার ছিলো অত্যন্ত সীমিত, যেহেতু কাঠ-পেন্সিলের ব্যবহারের জন্য লেখার কাগজ তো লাগবেই। এই শ্লেট এখনও অনেক বাড়িতে পাওয়া যায়।

কবির মাহমুদ এর ‘কলমের কান্না‘ বইটি কিনুন রকমারি থেকে !

বিংশ শতাব্দির প্রথম দিকে স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত নানা বস্তু দিয়ে কলম তৈরি হতো। যেমন উলু খড়ের গেড়ার দিকের মোটা অংশ দিয়ে কলম তৈরি করা যেতো। সেগুলোকে কলমের আকার মতো করে কেটে, মাথাটা সুচালো করলেই কলম হয়ে যায়। কলমের জন্য লাগতো কালি। এই কালি তৈরির জন্য স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত নানা রকমের বস্তু ব্যবহার করা হতো। ব্রিটিশ আমলে দেখেছি সিমগাছের পাতার রস দিয়ে এই কালি নামক বস্তুর ব্যবহার। কাঠ কয়লা দিয়েও মাঝে মধ্যে কালির কাজ চালানো হতো। সাধারণত চাল ভেজে মুড়ি তৈরি হয়। বেশি সময় ধরে ভাজলে সেগুলো পুড়ে কালো রং ধারণ করে। সেই কালো ভাজা মুড়িকে পানিতে দিলে সেই পানি কিছুটা কালো হয়ে কতকটা কালির রং ধারণ করলে সেগুলো কালি হিসেবে ব্যবহার করা যায়, যা আমরাও করেছি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় সুজনি, নকশী কাঁথা ও লহরী কাথার প্রচলন ছিল খুব বেশি, যা আজও বিদ্যমান। এই কাঁথার উপর ডিজাইন করতো হলে, প্রথমে সেই কাঁথার কাপড়ের উপর কালির ছাপ দিতে হয়। কালির সেই রেখা ধরেই সেলাই করলে বিভিন্ন ধরনের ডিজাইন পাওয়া যায়। এখানেও কালির ব্যবহার কম গুরুত্ব বহন করে না। ১৯৩০ এর দশকের পর থেকেই আমাদের গ্রামাঞ্চলে কাঠপেন্সিলের ব্যবহার আরম্ভ হয়। ১৯৪০ এর দশকেই আরম্ভ হয় কলম কালির ব্যবহার। তখন কলমকে বলা হতো হান্ডেল। কাঠের তৈরি, নিচের অংশ একটু মোটা, নিব ফিট করার জন্য এবং উপরের অংশ ক্রমশ সরু হয়ে থাকে। এই হান্ডেলের মাথায় নিব লাগিয়ে লেখার কাজ চলতো। নিবের নিচের অংশ ফাটা থাকতো যাতে করে কালি পাস করা সহজ হয়। কালি থাকতো ভিন্ন দোয়াতে। হান্ডেলের নিবটাকে কালির দেয়াতের মধ্যে বার বার চুবিয়ে লেখার কাজ চলতো নিরবিচ্ছিন্নভাবে। আমরা লেখালেখি ও পরীক্ষায় লেখার কাজ এই দোয়াত কলমের কালি দিয়েই চালাতাম।

এর পূর্বেই অবশ্য দোয়াতের কালি ও কলম দিয়ে লেখার প্রচলন হয়েছিল। মাইকেল মধূসুদন দত্তকে নিয়ে যে একটি সিনেমা হয়েছিল, সেখানেও দেখেছি মধূসুদন একই সঙ্গে দু’জন বা তিনজন লেখককে ডিকটেশন দিচ্ছেন। আর মহুরিরা লিখে যাচ্ছেন, এই দোয়াতের কালি ও কলম দিয়ে। মাইকেল মধূসুদন দত্ত ছিলেন এক বিস্ময়কর প্রতিভা। তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। সেকালের সিনেমাগুলোতে মাঝে মধ্যে এই সব দৃশ্য দেখা যায়। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও নিজ হাতে সব কিছুই লিখতেন এই হ্যান্ডেল কলম দিয়ে। কবি গুরুর হাতের লেখা ছিল এক কথায় চমৎকার। তিনি ভাল ছবিও আকতে পারতেন। একজন চিত্র শিল্পীও বটে। তিনি ছিলেন বহুগুণে গুণান্বিত। শাহবাগে অবস্থিত জাতীয় জাদুঘরে প্রতি বছরই Calligraphy‘ র প্রদর্শনী (Exhibition) হয়। সেখানে দেখেছিলাম রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার এক স্বল্প শিক্ষিত ভদ্রলোক এই উলুখড়ের কলম দিয়ে বড় বড় হরফে পবিত্র কোরআন শরীফ নকল করেছিলেন। সেটি এতো বড় আকারের হয়েছিলো যে, এর ওজন ছিলো প্রায় ২৫ কেজি। হাতের লেখাও চমৎকার। একেবারে ছাপার মতো। সকলে প্রাণ ভরে দেখে বিস্ময় প্রকাশ করলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য তাঁর কোন মূল্যায়ন করা হলো না। তাঁকে কেউ একটা সান্তনা বাক্যও শোনালেন না। বড়ই দুর্ভাগ্য তিনি আশা করেছিলেন যে, তিনি হয়তো যাওয়া আসার খর” পাবেন। কিন্তু না, সেরকম সৌভাগ্য তাঁর হয়নি। এই প্রদর্শনী এখনও জাতীয় জাদুঘর হয়ে থাকে।

১৯৪০ সালে আমি তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হই। তখন অবশ্য শ্লেট বাদ দিয়ে কাগজের উপর কাঠ পেন্সিল দিয়ে লেখা আরম্ভ করি। কিন্তু অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষা দেয়ার সময় দোয়াতের কালি ও কলম দিয়ে পরীক্ষার হলে লিখতে হতো। তখন বাজারে গুঁড়ো কালি পাওয়া যেতো। সেগুলোকে পানিতে গুললেই বেশ ভাল কালি তৈরি হয়। আমার আব্বা একবার লটারিতে ছাব্বিশ কৌটা গুঁড়া কালি পেয়েছিলেন। ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত এই চার বছর কলম কালির ব্যবহার মোটামুটিভাবে স্থান করে নিয়েছিল। অন্য দিকে ১৯৪৪ সালে আমি হাই স্কুলে ভর্তি হই সপ্তম শ্রেণিতে। সেখানে চার বছর অধ্যয়ন করে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। এই চার বছর কলম কালির ব্যবহার নেহাৎ কম দেখিনি। দেখতাম প্রতি বছরই অর্ধ বার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষার সময় পরীক্ষার উত্তর পত্র মূল্যায়নের জন্য স্যারদের প্রত্যেকেই একটি করে লাল কালির বড়ি ও হ্যান্ডেলের ব্যবহারের জন্য একটি করে নতুন নিব দেয়া হতো। উত্তর পত্র মূল্যায়নের জন্য লাল কালি অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে এবং খাতায় লেখার মধ্যে কোনো ভুল-ত্রুটি থাকলে তা এই লালকালি দিয়েই চিহ্নিত করতে হবে। ফলাফল প্রকাশের পূর্বে আমাদের শ্রেণিকক্ষে এই উত্তরপত্রগুলোও দেখানো হতো, যাতে করে আমরা আমাদের ভুল ভ্রান্তিগুলো জানতে পারতাম। পরীক্ষার খাতায় লেখার জন্য আমরা বাসা থেকেই কালি-কলম নিয়ে যেতাম। এই ভাবেই যুগ যুগ ধরে কালি কলমের ব্যবহার চলতে থাকে।

১৯৪৮ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেয়ার সময় আমাদের কালি সরবরাহ করা হতো অফিস থেকেই। পরীক্ষা দেয়ার জন্য আমাদের যে টেবিল ব্যবহার করা হতো তার এক কোণায় চার কোণা আকারের একটি ‘গ্রুভ’ থাকতো যেখানে কাঠের তৈরি দোয়াত রাখার ব্যবস্থা ছিলো। এই দোয়াতগুলো পরীক্ষার পূর্বে প্রতি দিনই পূর্ণ করা হতো এই কালি দিয়ে। তবে কলম নিজেই আনতে হতো। কেননা কলমটা মানুষ নিজেরাই পছন্দ করে থাকে। নিজ কলম না হলে লেখার গতি আসে না। যেমন ক্রিকেট খেলায় নিজের ব্যাট না হলে ব্যাটে-বলে সংযোগ ততো সহজ হয় না। এযে চিরকালের অভ্যেস।

যা হোক, স্কুল থেকে চলে গেলাম কলেজে। সেখানেও একই নিয়ম দোয়াত কলমের প্রচলন তখনও ছিল, তবে এর পাশাপাশি বাজারে এলো ফাউন্টেইন পেন। এর সঙ্গে এলো তৈরি কালি। তবে কালির ব্যবহার ছিল অত্যন্ত সীমিত। কেননা ফাউন্টেন পেনের দাম ছিলো অনেক বেশি এবং তার সঙ্গে কালিও কিনতে হতো। আই,এস.সি পরীক্ষা দেয়ার সময় অফিস কর্তৃক সরবরাহকৃত কালি দিয়েই আমাদের লিখতে হয়েছে। বি.এস.সি ক্লাসে পড়ার সময় ফাউন্টেইন পেন কিনলাম, ফলে দোয়াতের সাধারণ কালির ব্যবহার কমতে থাকে। তখন পার্কার কলম ছিল পৃথিবী খ্যাত এবং সঙ্গে পার্কার কোম্পানির দোয়াতসহ কালিও কিনতে হয়েছে। যতদূর মনেপড়ে বি.এস.সি পরীক্ষার সময় এই কলম দিয়েই লিখতে হয়েছিল। তবে বি.এস.সি পাস করার পর আমি অন্য একটি কলম কিনেছিলাম, সেটিও খানদানি কলম, তার নাম ছিল সেফার্স। সেফার্স কলম ছিল আমার খুব পছন্দের। পার্কার থেকে সেফার্স কলম দিয়ে লিখতে আমি বেশি স্বান্ধবোধ করতাম। তবে সেফার্স কোম্পানির কালি ছিল না। তাছাড়াও -ছিল পেলিকান কালি। কম দামের মধ্যে পাইলট কলমও মন্দ ছিল না। এম.এস.সি ক্লাস ও পরবর্তীকালে আমি এই কলম দিয়েই লিখেছি এবং পরীক্ষা দিয়ে ভাল ফলও করেছি। পার্কার বা সেফার্স কলমের মধ্যখানে পাতলা রবারের তৈরি একটি টিউব থাকে। সেই টিউবে চাপ দিলে বাতাস বেরিয়ে গেলে সেই টিউবকে কালির দোয়াতের ভেতরে প্রবেশ করালে আপনা থেকেই বায়ুর চাপে টিউবে কালি উঠে ভর্তি হয়ে যায়। এই জন্যই ঐ নাম হয়েছে ফাউন্টেন পেন। তা দিয়ে বেশ কিছু দিন লেখা হতো। পরীক্ষার হলে আমরা প্রবেশ করলে সঙ্গে থাকতো কলম এবং কালির দোয়াত। পরীক্ষায় দীর্ঘ সময় ধরতে লিখতে হয় ফলে কালি শেষ হয়ে গেলে সেই দোয়াত থেকে কালি ভরে আবার লেখার কাজ চালিয়ে যেতে পারতাম।

কেন্দ্র থেকে সরবরাহকৃত কালির বিড়ম্বনা কম ছিল না। ১৯৫৩ বা ৫৪ সালের দিকে একটা ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। ১৯৫৫ সালে আমি এম.এস.সি পাস করে খুলনার দৌলতপুর কলেজে পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। সেখানে গিয়ে এই ঘটনাটি শুনেছিলাম। কলেজে ডিগ্রি পরীক্ষা হচ্ছে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর প্রশাসন একটু ঢিলেঢালাই ছিল, যেমনটি ছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে অর্থাৎ ১৯৭২ সালে। শিক্ষাক্ষেত্রে একটু উদারনীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। ফলে শিক্ষার মানও নিম্নগতি লক্ষ্য করা যায়। ডিগ্রি পরীক্ষা চলছে, ইতিহাসের একজন শিক্ষক পরীক্ষার হলে ডিউটি করছেন। ভদ্রলোক বেশ আদর্শবাদী। তিনি হলে কাউকে কথা বলতে দেবেন না। নকল করা, সেতো অনেক দূরের কথা। ফলে তিনি পরীক্ষার্থীদের রোষানলে পড়লেন। দিন দিন অসন্তোষ পুঞ্জিত হতে থাকে। তখন অবশ্য দৌলতপুর কলেজে হিন্দু ছাত্রের সংখ্যাই ছিল বেশি। তারা যুক্তি পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো, যা করার শেষ দিন করা হবে। এই লোককে উচিত শিক্ষা দিতে হবে, তিনি যেন শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যান। বাস্তবে ঘটলও তাই। পরীক্ষার শেষের দিন শেষ মুহূর্তে পরীক্ষার্থীদের নেতা কি একটা সাঙ্কেতিক শব্দ ব্যবহার করলে করার সঙ্গে সঙ্গে হলের সকল পরীক্ষার্থী একই সঙ্গে কালি ভরা কাঠের দোয়াতগুলো তাঁর গায়ে ছুড়ে মারলো। সমস্ত শরীর কালিতে ভরে গেছে এবং তিনি একজন জংলি মানুষে পরিণত হলেন। মানুষকে মুখ দেখানোই ভার। পরীক্ষার হলের সামনে পুকুর। দৌড় দিয়ে গিয়ে পুকুরে ঝাপ দিলেন। জামা কাপড় সব খুলে খালি গায়ে মেসে গিয়ে হাজির। সকলেই এলেন তাঁকে সহানুভূতি জানাতে। অধ্যক্ষও সাহেবও এলেন, সহ-মর্মিতা প্রকাশ করলেন। যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে কথা দিলেন। কিন্তু কাউকেই ধরা সম্ভব হয়নি। কেননা তারা ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করে নিজ নিজ গন্তব্যে চলে গেছে। অধ্যাপক সাহেব ঘর থেকে আর বের হন নি। কি লজ্জা। দারুণ অপমান বোধ তাঁকে ব্যথিত করেছে। রাত্রে খেয়ে ঘুমিয়ে গেছেন। সম্ভবত রাতে তাঁর ভাল ঘুমও হয়নি। সারা রাত ছটপট করেছেন। ভোরে তাঁর খোঁজ নেয়া হলো। তাঁর কক্ষে কেউ নেই। চতুর্দিকে খোজা-খুজি আরম্ভ হলো। তাঁকে কোথাও পাওয়া গেল না। খবর এ পর্যন্তই। মাস ছয়েক পরে কলেজে তাঁর এক সহকর্মীকে চিঠি লিখেছেন এই বলে যে, তিনি ভালই আছেন এবং মুন্সেফ হিসেবে চাকুরিতে যোগদান করেছেন। তিনি আগেই ‘ল’ পাস করেছিলেন। এই বিষয়টি অবতারণ করার উদ্দেশ্যই হলো, কিভাবে এই পবিত্র কালি অপব্যবহার করে একটি মানুষের জীবনকে ও চিন্তা ধারাকে আমূল পরিবর্তন করে দিতে পারে। অবশ্য এতে লাভ-লোকসান দুই হতে পারে। অধ্যাপক সাহেবের জন্য এই কালি অভিশাপ না হয়ে আর্র্শীবাদে পরিণত হয়েছিল। এই জন্যই মানুষে বলে, ‘জায়গা বিশেষ কালি এবং জায়গা বিশেষে কাজল। এ দোয়াতের কালি, কালি না হয়ে তাঁর জন্য হয়েছিল কাজল।

আশির দশকেও লিখেছি পার্কার কলম দিয়ে। শতশত পৃষ্ঠার লেখায় ব্যবহৃত হতো এই কলম। আমার হাতের লেখা মোটেই ভাল না। কোনো কোনো কলমে আবার হাতের লেখা স্পষ্ট ও পরিষ্কার হয়। কিন্তু বল পয়েন্ট কলম প্রথম দিকে লেখার অভ্যেস ছিলনা এবং লেখার মানও ভাল হতো না। ফলে কালির কলম দীর্ঘদিন ছাড়তে পারিনি। প্রাথমিক পর্যায়ে বল পয়েন্ট কলম দিয়ে লেখা সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হয়নি। দস্তখত করা, দলিল দস্তাবিজ লেখা এবং যে কোন সরকারি কাগজ পত্রে লেখা বল পয়েন্টের হলে গ্রহণ যোগ্য হতো না। অথচ বর্তমানে এই বল পয়েন্টে লেখা এতো বেশি চালু হয়ে গেছে যে, এর থেকে মুক্তি পাওয়া ততো সহজ হবে না। সর্বত্রই বল পয়েন্ট কলমের ছড়াছড়ি। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে, অফিস আদালতে, দস্তখত করতে, অর্থাৎ বর্তমানে লেখার জন্য বল পয়েন্ট কলম অনিবার্য হয়ে উঠেছে। এতে অবশ্য ঝামেলাও অনেক কমে গেছে। একবারেই ব্যবহার করে এগুলো ফেলে দেয়া হয়, যদিও এই কলমগুলোকে রিফিল করা যেতো, কয়েক বছর পূর্বেও। এখন কোনো ঝামেলা নেই। “লিখে যাও কালি শেষ হলে ফেলে দাও”। তুলনামূলকভাবে দামও কম। বর্তমানে অর্থাৎ কম্পিউটার ব্যবহারের পর থেকে, এখন অনেকে আর কলম দিয়ে লিখেন না, সরাসরি কম্পিউটারে টাইপ করে ফেলেন। লেখালেখির কোন প্রয়োজন হয় না।

কলমের কেরামতি

হায়রে কলম, ছোট একটি কাঠি, তারসঙ্গে কালির সংযোগ হলে সেটি একটি শক্তিশালী যন্ত্রে পরিণত হয়, যার ক্ষমতা শত শত মারণাস্ত্র থেকেও কোন অংশে কম নয়। এই কলমের জোরেই পৃথিবী ঘোর অন্ধকার থেকে আলোর মুখ দেখেছে। এই কলম দিয়েই লেখা হয়েছে, শত শত, হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি গ্রন্থ বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষায়। পরবর্তীকালে তা মেশিনে বা হাতে ছাপা হয়েছে। এই অসংখ্য পুস্তক থেকে মানব জাতি জ্ঞান অর্জন করে তা মানুষের কল্যাণে কাজে লাগিয়েছে। অন্য দিকে ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা এই কলমের মাধ্যমেই তাঁদের ক্ষমতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। পৃথিবীতে অসংখ্য ক্ষমতাবান ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে এবং তাঁরা বিধির বিধান অনুযায়ী কালের বৃত্তে হারিয়েও গেছেন। কিন্তু সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি কে ছিলেন? কার কলমের জোর ছিলো সবচেয়ে বেশি? ফ্রান্সের বীরযোদ্ধা নেপোলিয়ান বেনাপার্ট (১৭৬৯-১৮২১), যিনি তাঁর ব্যক্তিত্ব, কৃতিত্ব, রণ কৌশল, অসীম সাহস ও শক্তি দিয়ে ইতিহাসের গতিকে পরিবর্তন করতে সমর্থ হয়েছিলেন, সেই নেপোলিয়ান বলতেন, Nothing is impossible in this world. Impossible is a word to be found only in the Dictionary of the fools”| । তাঁর মতো অসীম সাহসী ও যোদ্ধা বলে গেছেন, তিনি সাংবাদিকদের সবচেয়ে বেশি ভয় করেন। তাঁদের কলমের খোঁচায়, সমগ্র পৃথিবীর সব কিছুই ওলটপালট হয়ে যেতে পারে। তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার কোন সুযোগ আছে কি? সাংবাদিকরা অসীম সাহসী। নিজের জীবন তুচ্ছ করে তাঁরা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করতে তিলমাত্র দ্বিধা বোধ করেন না। তাঁদের মান আছে, সম্মান আছে, কিন্তু জীবনের ঝুঁকিও আছে অনেক বেশি।

হায়রে কলমের কালি? তার কতই না ক্ষমতা। যিনি কলম পরিচালনা করেন, কলমের সব ক্ষমতা তাঁদের হাতেই থাকে। কলম কেবল তাঁদের ক্ষমতা প্রয়োগের সহায়তা করা একটি যন্ত্র মাত্র। মাননীয় বিচারপতিদের এক কলমের খোঁচায় মানুষ মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হচ্ছে আবার, পরক্ষণেই মুক্তিও পাচ্ছে এই কলমের খোঁচায়। এই কলমের বদোলতে বিস্ময়কর সব ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ হচ্ছে আবার স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের জোড়াও লাগছে, বা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন সবই ঘটছে কলমের মতো জাদুর একটি কাঠির ছোয়ায়। লেখাপড়া শিখতে একের পর এক ডিগ্রি নিতে, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিতে, এবং কৃতকার্য হয়ে বড় বড় চাকরি পেতে কলম কালির কোন বিকল্প আছে কি? বলাহুল্য, আমরা কলম দিয়ে যতো সব বড় বড় কাজ করছি, কিন্তু কালিটুকু শেষ হয়ে গেলে, সেটি হচ্ছে উচ্ছিষ্ট, আবর্জনা, যখন তখন যেখানে সেখানে ফেলে দিচ্ছি। কলমটির দুখের কথা আমরা কেউ ভাবছিনা বা কিছু বলছিও না। কলমের আফসোস ক্ষমতাবানদের হাতে থাকলে তার ক্ষমতা অসীম কিন্তু কালি শেষ হয়ে গেলে, তার জীবনের সবকিছুই শেষ হয়ে যায় এবং সেটি একটি জড় বস্তুতে পরিণত হয়। যেমন পিস্তল, রিভলভার, মেশিনগান, তখনই শক্তিশালী হয়ে উঠে যখন এর মধ্যে গুলি থাকে। গুলি না থাকলে এটি হয়ে পড়ে মুল্যহীন। অথচ কারও হাতে থাকলে, সে যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠে এবং জীবে পরিণত হয়ে অসাধ্য সাধন করতে পারে।

নেপোলিয়ান বলতেন, Nothing is impossible in this world. Impossible is a word to be found only in the Dictionary of the fools”

বিচারকেরা বিচার করেন। দীর্ঘ আলোচনা ও লেখালেখির পর তাঁরা রায় দেন। রায় লিখতে গিয়ে দেখা যায় তাঁকে শত শত থেকে হাজার হাজার পৃষ্ঠা লিখতে হয়েছে। কাজটি যেমন কষ্টের তেমনি তাদের মেধার পরিচয় বহন করে। গাজীপুরের ভাওয়াল রাজা সন্ন্যাসী তাঁর উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যে মামেলা হয়েছিল তার রায় লিখতে হয়েছিল কয়েক হাজার পৃষ্ঠাব্যাপি। সবই তো লিখতে হয় কলম কালি দিয়ে। বিচারকদের দেখা গেছে, কোন আসামীকে মৃত্যুদন্ডাদেশ দিতে তাঁরা খুব অস্বস্তি বোধ করেন, ফলে রায় লেখা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কলমটিকে ভেঙ্গে ফেলেন, ফলে এই অস্বস্তিকর পরিবেশ থেকে কিছুটা হলেও মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এই রায় লেখা তাঁর জন্য সুখকর না হলেও তাঁরা তা করতে বাধ্য হন। এ যে তাঁদের দায়িত্ব এবং এ দায়িত্ব পালন করা তাঁদের পেশার ও কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে।

কলম কালির ব্যবহার ক্রমাগতভাবে কমতে আছে। তার জায়গা নিচ্ছে কম্পিউটার এমনকি মোবাইল ফোনও। এখন সব কিছুই লেখা হয়ে যাচ্ছে সরাসরি কম্পিউটারে। সেখানে কালির ব্যবহার হলেও সেই ছোট বস্তুটির আর যেন প্রয়োজন হয় না। তবে কি এই ছোট বস্তুটি একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যাবে? কেননা এখন লেখার কাজ তো কাগজে কলমে খুব কমই হচ্ছে। কলমের এই লেখাগুলো এখন তো আর মুদ্রণের প্রয়োজন হয় না। সবকিছুই পাওয়া যাচ্ছে ইন্টারনেটে। গত কয়েক বছর যাবত বিশ্ব কোষ বা ঊহপুপষড়ঢ়বফরধ মুদ্রিত হচ্ছে না। এর নাকি প্রয়োজনীয়তা নেই। বিক্রি একেবারে কমে গেছে। ফলে লোকসান দিয়ে এই জ্ঞান কোষ প্রকাশকেরা কেনই বা মুদ্রণ করবে? আমরা কোন দিকে যাচ্ছি। তা হলে কি কলমের কদর আর কোন দিনই হবে না। এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।

পৃথিবী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিস্ময়করভাবে এগিয়ে চলেছে। ফলে বর্তমানে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কৃতও হচ্ছে, আর সেগুলো কলম কালি ব্যবহারের বিকল্প হিসাবে জায়গা করে নিচ্ছে। কিন্তু না কলম কালির স্থান কোন কিছুতেই নিতে পারবে বলে মনে হয় না। মুদ্রিত গ্রন্থের মর্যাদায় আলাদা। যান্ত্রিক যুগে সবকিছুই যন্ত্র দিয়ে চলে না। মানুষের পরশ লাগবেই। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠ্যাভাস গড়ে তুলতে হলে এবং কার্যকরী করতে হলে মুদ্রিত বস্তুর বা গ্রন্থমালার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যাবে না। যে কলম কালির কথা আমাদের ধর্মগন্থে লিখিত আছে, তার মৃত্যু কোন দিনই হবে না। এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারি।

প্রফেসর মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন এর বই সমূহ !! 


প্রফেসর মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন
সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম
ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা।

 

আরও পড়ুনঃ

ক্যাসিনোর ইতিহাস: সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব

বাংলা সাহিত্যের যেসব বই থেকে সিনেমা বানানো হয়েছে

জাপানের বৈধ জুয়া !!

বঙ্গে ইংরেজি শিক্ষার ইতিহাস

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png